সৌদি আরব কেন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে এফ-৩৫ চায়, ইসরায়েল কেন এ নিয়ে অস্বস্তিতে?

আপডেট : ১৯ নভেম্বর ২০২৫, ১১:০১ পিএম

সৌদি আরবের ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান যুক্তরাষ্ট্র সফরে গেছেন, হোয়াইট হাউজে যুক্তরাষ্ট্র প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে সাক্ষাতও করেছেন। ২০১৮ সালের পর এই প্রথম মোহাম্মদ বিন সালমানের যুক্তরাষ্ট্র সফরকে দুই দেশের মধ্যে জোরাল সম্পর্কের প্রতীক হিসেবে দেখা হচ্ছে। ট্রাম্প এরই মধ্যে সৌদি আরবকে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান ‘নন-ন্যাটো মিত্র’ বলেও বর্ণনা করেছেন।

তবে দুই দেশের সম্পর্কের গভীরতার, অথবা বলা উচিত ট্রাম্পের সঙ্গে মোহাম্মদ বিন সালমানের বন্ধুত্বের গভীরতার একটা বড় প্রমাণ হতে পারে এটিই যে, সৌদি আরবের অনুরোধে তাদের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি অত্যাধুনিক প্রযুক্তির এফ-৩৫ ফাইটার জেট বিক্রি করতে প্রাথমিকভাবে রাজি হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। মানে, ট্রাম্প রাজি হয়েছেন, কিন্তু এই প্রক্রিয়া এত সরল নয়। এফ-৩৫-এর মতো মহাগুরুত্বপূর্ণ ফাইটার জেট কোন দেশের কাছে বিক্রি করা হবে, এই ফাইটার জেটের কোন সংস্করণ বিক্রি করা হবে কিংবা কী পরিমাণে বিক্রি করা হবে – এই সিদ্ধান্তের প্রক্রিয়াও যুক্তরাষ্ট্রে সংসদ ঘুরে আসতে হয়।

শেষ পর্যন্ত কি সৌদি আরবের কাছে এফ-৩৫ বিক্রি করবে যুক্তরাষ্ট্র? উত্তর সময় বলবে। তবে এর সঙ্গে আরও কিছু প্রশ্ন না চাইতেও জড়িয়ে যায়। যুক্তরাষ্ট্র এফ-৩৫ শেষ পর্যন্ত বিক্রি করলেও কতগুলো করবে? সৌদি আরব তো ধাপে ধাপে ৪৮টি পর্যন্ত এফ-৩৫ চায় যুক্তরাষ্ট্রের কাছে! সৌদি আরব এই ফাইটার জেটের অনেক বছর ধরেই যুক্তরাষ্ট্রের ধরনা দিয়ে বসে আছে, কিন্তু তারা এটি চায় কেন? আর যে ইসরায়েলের বিরোধিতার কারণে এত বছর সৌদির কাছে এফ-৩৫ বিক্রি করেনি, তারা কেন এখনো এ নিয়ে অস্বস্তিতে আছে?

প্রশ্নগুলোর উত্তর একে একে দেখা যাক –

সব প্রশ্নের আগে এফ-৩৫ সম্পর্কে একটু জেনে নেওয়া যাক। এফ-৩৫ হলো যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারোস্পেইস কোম্পানি লকহিড মার্টিনের তৈরি পঞ্চম প্রজন্মের ফাইটার জেট। পুরো নাম এফ-৩৫ লাইটনিং টু, যেটিকে বলা হয় ‘দুনিয়ার সবচেয়ে আধুনিক ফাইটার জেট।’ উন্নততম সেন্সরসহ আধুনিক সব সুযোগ-সুবিধা তো আছেই, এর সবচেয়ে বড় হাতিয়ার সম্ভবত প্রতিপক্ষের রাডার এড়িয়ে চুপিসারে প্রতিপক্ষের আকাশসীমায় ঢুকে পড়ার ক্ষমতা ‘স্টেলথ ডিজাইন।’

এর বেশ কয়েকটি সংস্করণ আছে। এফ-৩৫এ সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত সংস্করণ, এফ-৩৫বি আর এফ-৩৫সি-ও আছে। আর ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্রের অনুমতি নিয়ে এতে নিজেদের কিছু বাড়তি সংস্কার করেছে, এই সংস্করণকে বলা হয় এফ-৩৫আই ‘আদির।’

যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি এফ-৩৫ ফাইটার জেট কিনতে চায় সৌদি আরব, ইসরায়েল এ নিয়ে আছে অস্বস্তিতে। ছবি: রয়টার্স

কেন সৌদি আরব এফ-৩৫ চায়?

বেশ কয়েকটি দশক ধরেই যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে সমরাস্ত্রের সবচেয়ে বড় ক্রেতা দেশগুলোর একটি সৌদি আরব। তবে এখন পর্যন্ত এফ-৩৫ পায়নি তারা। মধ্যপ্রাচ্যে শুধু ইসরায়েলের কাছেই এই ফাইটার জেট আছে।

সৌদি আরব এটি কেন চায়, তা বুঝতে তো আইনস্টাইন হতে হয় না। অত্যাধুনিক প্রযুক্তির এই ফাইটার জেট সৌদির বিমানবাহিনীকে আরও উন্নত করবে। মধ্যপ্রাচ্যে তাদের দাপট আরও বাড়বে, বিশেষ করে যেখানে আঞ্চলিক দাপট নিয়ে ইরানের সঙ্গে তাদের একটা ঠাণ্ডা যুদ্ধ চলছে। ইয়েমেনের বিদ্রোহীগোষ্ঠী হুতিদের সঙ্গে এর আগে লড়াইয়ের ইতিহাস আছে সৌদি আরবের, যে সংঘাত এখন কিছুটা ঠাণ্ডা হয়ে এলেও একেবারে শেষ হয়ে যায়নি।

 

যুক্তরাষ্ট্র কি সৌদির কাছে এফ-৩৫ বিক্রি করবে?

সমরাস্ত্র বিক্রির চুক্তির ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্ট অনুমোদন করলেও যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের ক্ষমতা আছে সেটি বাতিল করে দেওয়ার। এবারও সেটা তারা করার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাঁর অবস্থান পরিষ্কার করে দিয়েছেন। মঙ্গলবার সৌদি প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে প্রথমবার সংবাদমাধ্যমের সামনে এসে ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন, ‘আমরা এটা করব। আমরা এফ-৩৫ বিক্রি করব।’

সৌদি প্রিন্সের বিরুদ্ধে ২০১৮ সালে সাংবাদিক জামাল খাসোগি হত্যার পেছনে জড়িত থাকার অভিযোগ আছে, যে অভিযোগটা জো বাইডেন প্রশাসনের সময়ে সৌদি আরব-যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কে একটা ফোঁড়ার মতো হয়ে ছিল। কিন্তু ট্রাম্প এই অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছেন।

এমনকি মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলের বাইরে কোনো দেশের কাছে সমরাস্ত্র বিক্রির কাছে ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের যে ‘সামরিকশক্তিতে মানগত পার্থক্যে’র নীতি আছে, সে নিয়েও ভ্রুক্ষেপ দেখাননি ট্রাম্প। নীতিটা কী? সংক্ষেপে এই যে, মধ্যপ্রাচ্যের অন্য যে কোনো দেশের যে সমরাস্ত্র থাকবে, তার চেয়ে ইসরায়েলের কাছে আরও বেশি আধুনিক ও মানসম্পন্ন সমরাস্ত্র নিশ্চিত করতে হবে।

কিন্তু ট্রাম্প মঙ্গলবার বলেছেন, সৌদি আরবের কাছে তিনি সেই সংস্করণের এফ-৩৫-ই বিক্রি করতে চান, যে সংস্করণটি ইসরায়েলকেও দেওয়া হয়েছে। এমনকি এফ-৩৫ বিক্রির এই চুক্তির শর্ত হিসেবে আগে সৌদি আরবকে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণ, অর্থাৎ ইসরায়েলকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়ার শর্ত দেওয়া হবে বলে মনে করা হলেও ট্রাম্প দুটি ব্যাপারকে আলাদাই রাখছেন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। ফিলিস্তিন ইস্যুতে ফিলিস্তিনকে আলাদা দেশ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে ‘দ্বিরাষ্ট্র সমাধান’ না আসা পর্যন্ত ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের চুক্তি ‘অ্যাব্রাহাম অ্যাকর্ডে’ সই না করার অবস্থানই এখনো ধরে রেখেছে সৌদি আরব, তারপরও তাদের কাছে এফ-৩৫ বিক্রি করতে রাজি হচ্ছেন ট্রাম্প।

 

ইসরায়েল কেন অস্বস্তিতে?

সৌদি আরব ‘অ্যাব্রাহাম অ্যাকর্ডে’ এখনো সই করতে রাজি নয়, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও তাঁর জোটের উগ্রপন্থী ডানপন্থী দলগুলো ফিলিস্তিনের অস্তিত্বেই বিশ্বাসী নয় বলে সে সম্ভাবনাও আপাতত দেখা যাচ্ছে না। এই অবস্থায় সৌদি আরবকে তাদের কাছে এফ-৩৫-এর সমমানের এফ-৩৫ যুক্তরাষ্ট্র বিক্রি করার কথা বললে ইসরায়েলের অস্বস্তিতে পড়ারই কথা। সিএনএনে ইসরায়েলের নিরাপত্তাবিষয়ক এক সূত্র এফ-৩৫ বিষয়ক চুক্তিকে ইঙ্গিত করে বলেছেন, ‘বছরের পর বছর ধরে এটা একটা অলিখিত নিয়ম ছিল যে, আমরা সতর্কতার সাথে নিশ্চিত করব মধ্যপ্রাচ্যে আর কারও কাছে আমাদের (ইসরায়েলের) মতো বিমান বা শক্তি থাকবে না। এটার ভয়াবহতা মোটেও বাড়িয়ে বলা হচ্ছে না। এটা (ইসরায়েলের জন্য) মোটেও ভালো কিছু নয়।’

তবে অ্যাব্রাহাম অ্যাকর্ডে সই হলেও যে ইসরায়েল একেবারে নিশ্চিন্ত থাকবে, এমন নয়। তাদের শঙ্কা, সৌদি আরবে কখনো সরকারে বদল এলে, ইসরায়েল-বিরোধী সরকার এলে এই এফ-৩৫-ই তাদের জন্য বড় দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়াবে। কারণ, এফ-৩৫ দিয়ে সৌদি আরবের উত্তর-পশ্চিমের এয়ার বেইজ থেকে বলতে গেলে ৫ মিনিটেই ইসরায়েলে আক্রমণ করা সম্ভব হবে। এমনকি লোহিত সাগরের উপকূলবর্তী মিলিটারি বেইজ থেকে এফ-৩৫ নিয়ে আক্রমণ করতে চাইলে ইসরায়েলের আকাশসীমায় না ঢুকেও যথাযথ মিসাইল ব্যবহার করে আক্রমণ করতে সক্ষম হবে সৌদি আরব।

 

যুক্তরাষ্ট্রেও আছে অস্বস্তি

মধ্যপ্রাচ্যে অন্য কোনো দেশের কাছে এফ-৩৫ বিক্রির চুক্তি ট্রাম্প এবারই প্রথম করতে যাচ্ছেন, এমন নয়। তাঁর প্রথম মেয়াদের শেষ দিকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের কাছেও এফ-৩৫ বিক্রির চুক্তি করে ফেলেছিলেন তিনি, যার বিনিময়ে আমিরাত ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ‘অ্যাব্রাহাম অ্যাকর্ডে’ সই করার কথা ছিল। কিন্তু বাইডেন প্রশাসন ক্ষমতায় যাওয়ার পর চুক্তিটা ভেস্তে যায়। কারণ, চীনের সঙ্গে আমিরাতের সামরিক সমঝোতা বাড়ছিল। যুক্তরাষ্ট্র চায়নি, তাদের সবচেয়ে আধুনিক ফাইটার জেটের প্রযুক্তির তথ্য বেইজিংয়ের হাতে যাক। সৌদি আরবের ক্ষেত্রেও এ নিয়ে অস্বস্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের অনেকে, কারণ সৌদি যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র হলেও চীনের সঙ্গেও তাদের অনেক চুক্তি আছে।   

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শেষ করতে প্রাথমিক চুক্তি সই হয়েছে। শুক্রবার থেকেই খুলছে হরমুজ প্রণালি। আর এতেই ওলটপালট হয়ে গেছে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি। বড় ধাক্কা...
ইরানের সঙ্গে চলমান উত্তেজনার আড়ালে লেবাননে সামরিক অভিযান আরও জোরদার করছে ইসরায়েল। বিশ্লেষকদের মতে, শুধু নিরাপত্তা নয়, লেবাননকে কৌশলগতভাবে বিচ্ছিন্ন করে সীমান্তের বাস্তবতা বদলে দেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে...
আসলে প্রতিবেশী এই দুই দেশের বিরোধ ও উত্তেজনায় তাইওয়ানের পক্ষ নেওয়ার ইতিহাস আছে যুক্তরাষ্ট্রের। তাইওয়ান দ্বীপকে নিজের বিদ্রোহী অঞ্চল বলেই বিবেচনা করে আসছে চীন। এজন্য তাইপের সঙ্গে বহির্বিশ্বের কারও...
হরমুজ প্রণালীতে ধৈর্য্যহারা যুক্তরাষ্ট্র–ইরানের সৈন্যরা। তারা সংঘাতে লিপ্ত হওয়ায় আরও চড়ছে উত্তেজনার পারদ। ফুটো হয়ে যাচ্ছে শান্তি চুক্তির আশার বেলুন! হরমুজ প্রণালী ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যে যেকোনো সময় শুরু...
পথসভায় জাতীয় নাগরিক পার্টির মূখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, সরকার অটো পাসের মতো করে সরকার চালাতে চায়। আবু সাঈদের রক্তের উপর দাঁড়িয়ে জনগণের সেবা না করে, বাংলাদেশে আর কাউকে অটো পাসের...
কারা অধিদপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক জান্নাত-উল-ফারহাদ জানান, গত বৃহস্পতিবার গাজীপুরের কাশিমপুর মহিলা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে মোছা. রিম্পা নামের এক নারী বন্দি পালিয়ে যান। রোববার তাকে মোহাম্মদপুর থেকে...
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে পাসপোর্ট থেকে বাদ দেওয়া ‘ইসরায়েল ব্যতীত’ (Except Israel) শব্দগুচ্ছ আবারও যুক্ত হচ্ছে। আজ রোববার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক আদেশে এ তথ্য জানা গেছে। এ ছাড়া নতুন...
আগামী বছর যেসব নতুন এয়ারক্রাফট যুক্ত হবে, সেগুলোতে থাকবে ওয়্যারলেস স্ট্রিমিং, ইন-ফ্লাইট ইন্টারনেট এবং প্রতিটি সিটে মোবাইল চার্জিং সুবিধা। পৃথিবীর অনেক এয়ারলাইন্স যেখানে এই সেবার জন্য অতিরিক্ত...
লোডিং...

এলাকার খবর