লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলকে দেশের বাকি অংশের সঙ্গে যুক্ত রাখা শেষ সেতুটিও ভেঙে দিয়েছে ইসরায়েল। বৃহস্পতিবার লেবাননের কাসমিয়েহ এলাকায় হামলা চালিয়ে ব্রিজটি ধসিয়ে দিয়েছে ইসরায়েলি বাহিনী।
লেবাননের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানায়, লিতানি নদীর ওপর থাকা শেষ পারাপার সেতুটি বৃহস্পতিবার ধ্বংস করেছে ইসরায়েলি বাহিনী। এই নদী লেবাননকে কার্যত দুই ভাগে বিভক্ত করেছে। ফলে দক্ষিণের কয়েক হাজার মানুষ গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা ও যোগাযোগ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন। কার্যত, এই অঞ্চলটি দখলই করে ফেলছে ইসরায়েল।
লিতানি নদীর ওপর এই সেতুতে ইসরায়েলের হামলা এবং লেবাননের এই অঞ্চলকে দেশটির বাকি অংশ থেকে আলাদা করে ফেলার খবরের গুরুত্ব আরও বাড়ে গত ২৩ মার্চের একটি খবরের কারণে। সেদিন রয়টার্স এক প্রতিবেদনে জানায়, ইসরায়েলের অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মটরিচ বলেছেন, লেবাননের ভেতরে দক্ষিণাঞ্চলে লিতানি নদী পর্যন্ত নিজেদের সীমান্ত বাড়ানো উচিত। সেটিই ছিল লেবাননের ভূখণ্ড দখলের বিষয়ে কোনো জ্যেষ্ঠ ইসরায়েলি কর্মকর্তার পক্ষ থেকে সবচেয়ে স্পষ্ট মন্তব্য।
এরপর গত ৩১ মার্চ ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর (আইডিএফ) প্রধান বলেছেন, লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে সীমান্ত থেকে বেশ ভেতরে লিতানি নদী পর্যন্ত পুরো অঞ্চলকে একটা ‘বাফার জোন’ বানিয়ে সেখানে কর্তৃত্ব ধরে রাখার পরিকল্পনা ইসরায়েলের।
ওয়াশিংটনে ইসরায়েল-লেবাননের আলোচনার পর যখন লেবাননের রাষ্ট্রপতির সঙ্গে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি বৈঠকের খবর চাউর হয়েছে – যদিও লেবানন তা অস্বীকার করেছে – সে সময়ে এই গুঞ্জনও ছিল যে, আলোচনায় ঢোকার আগেই লিতানি নদীর দক্ষিণের অংশে নিজেদের দাপট প্রতিষ্ঠা করতে চায় ইসরায়েল।
আজ লেবাননের ন্যাশনাল নিউজ এজেন্সি (এনএনএ) জানায়, উপকূলীয় শহর সাইদা (সিডন) থেকে দক্ষিণের শহর টাইরকে যুক্ত করা কাসমিয়েহ সেতুতে ইসরায়েলি বাহিনী ‘পরপর দুটি বিমান হামলা’ চালায়। এতে সেতুটি পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যায়।
এনএনএ আরও জানায়, এই হামলার আগে একটি ড্রোন একই সেতুর আশপাশে আলাদা দুটি হামলা চালায়।
ঘটনার পর ধারণ করা ভিডিওতে দেখা যায়, সেতুর কাছাকাছি এলাকায় একের পর এক বড় বিস্ফোরণ ঘটছে। সবুজ মাঠের ওপর দিয়ে বিশাল ধোঁয়ার কুণ্ডলী ছড়িয়ে পড়ছে।
তবে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী সিএনএনকে দাবি করেছে, তারা ‘সরাসরি সেতুটিকে লক্ষ্য করেনি।’ তবে ‘সেতুর আশপাশে’ হামলা চালানোর কথা স্বীকার করেছে তারা।
সাম্প্রতিক দিনগুলোতে দক্ষিণ লেবাননে হামলা আরও জোরদার করেছে ইসরায়েল। একদিকে এসব হামলা চলছে, অন্যদিকে আঞ্চলিক নেতারা ইসরায়েল ও লেবাননের মধ্যে সরাসরি আলোচনার উদ্যোগ নিচ্ছেন।
লিতানি নদীর দক্ষিণের এলাকাগুলোকে হিজবুল্লাহর জন্য ‘নিষিদ্ধ এলাকা’ বানাতে বুধবার সৈন্যদের নির্দেশ দেন ইসরায়েলের সেনাপ্রধান এয়াল জামির। মানবাধিকার সংস্থাগুলো বারবার সতর্ক করে বলছে, লেবাননে বেসামরিক মানুষের চিকিৎসা, খাদ্য ও সহায়তা পাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর ওপর হামলা যুদ্ধাপরাধ হিসেবে গণ্য হতে পারে।
মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডাব্লিউ) জানিয়েছে, ১২ মার্চ থেকে ৮ এপ্রিলের মধ্যে ইসরায়েলি বাহিনী লিতানি নদীর দক্ষিণাঞ্চলকে দেশের অন্য অংশের সঙ্গে যুক্ত করা সব প্রধান সেতু ধ্বংস করে ফেলেছে বা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। ফলে ১০ এপ্রিল পর্যন্ত কাসমিয়েহ সেতুটিই ছিল একমাত্র কার্যকর প্রধান পারাপার পথ।
এইচআরডাব্লিউ আরও জানায়, এসব হামলার ফলে বেসামরিক মানুষের নিরাপদ চলাচল মারাত্মকভাবে সীমিত হয়ে গেছে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় সংস্থা, মানবিক সংগঠন, হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্রগুলোর পক্ষে সহায়তা পৌঁছে দেওয়া এবং চিকিৎসাসেবা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।



