প্রকাশ : ১১ জুন ২০২৩, ০৮:০০ এএমআপডেট : ১৪ আগস্ট ২০২৫, ০২:০৮ পিএম
সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান। ছবি: ফেসবুক
একটি দেশের কলঙ্কিত ও ভয়ঙ্কর ভাবমূর্তিকে আড়াল করে ক্লিন ইমেজ সামনে আনার জন্য খেলাধুলাকে বেছে নেওয়ার কৌশল বহু আগে থেকেই চলে আসছে। ১৯৩৬ সালের বার্লিন অলিম্পিকে এমনটাই করেছিলেন জার্মানির অ্যাডলফ হিটলার। সমালোচকদের মতে, ২০১৪ সালে ক্রিমিয়া দখলের চার বছর পর ২০১৮ সালে ফিফা বিশ্বকাপ ফুটবল আয়োজন করে সে পথেই হেঁটেছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। আর এবার যুক্ত হচ্ছে আরেকটি নাম, সৌদি আরবের ক্ষমতাধর নেতা, দেশটির কার্যত (ডি-ফ্যাক্টো) শাসক যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান।
যুক্তরাজ্যের সংবাদমাধ্যম মিররে ৯ জুন প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এমনটাই বলছেন লেখক ম্যাট রোপার। প্রতিবেদনে বলা হয়, সৌদি আরবে প্রতি বছর গড়ে ১২৯ জনকে শিরশ্ছেদ করে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয় (২০১৫-২০২২ সালের হিসাব)। ৯/১১-এর হামলায় সৌদি আরবের জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। সাংবাদিক জামাল খাসোগি হত্যাকাণ্ড মোহাম্মদ বিন সালমানের নির্দেশেই হয়েছে বলে মনে করেন বিশ্ব রাজনীতির বিশ্লেষকেরা। এ ছাড়া মানবাধিকার লঙ্ঘনের একাধিক অভিযোগ রয়েছে সৌদি সরকারের বিরুদ্ধে। এসব আড়াল করার চেষ্টায় কোন পথে এই নেতা?
সম্প্রতি গলফের রাজত্ব নিজেদের করে নিতে সবচেয়ে বড় পদক্ষেপের অংশ হয়েছে সৌদি আরব। তিন আয়োজক পিজিএ ট্যুর, ডিপি ওয়ার্ল্ড ট্যুর ও এলআইভি গলফ এক হয়ে যাওয়ায় গলফের তারকাদের সবাইকেই পাবে সৌদি আরব। আর তাতে তারা গলফে দেখাতে পারবে আধিপত্য। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হচ্ছে, এখান থেকে বেশ আয় হবে সরকারের। তাতে চাঙ্গা হবে অর্থনীতির চাকাও।
শুধু জ্বালানি তেলের মাধ্যমে সৌদি আরব কেন, কোনো দেশই ভবিষ্যতে অর্থনীতি ভালোভাবে চালাতে পারবে না বলে মনে করেন বিশ্লেষকেরা। এই ভাবনা আগেই ভেবে রেখেছেন মোহাম্মদ বিন সালমান। এ কারণে ২০১৬ সালে ‘ভিশন ২০৩০’ হাতে নিয়েছিলেন তিনি, যার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে আছে খেলা। এর মাধ্যমে তেলনির্ভর অর্থনীতি থেকে বের হতে চায় দেশটি। এরই মধ্যে দেশটির বিভিন্ন ফুটবল ক্লাবে যুক্ত হয়েছেন ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো, করিম বেনজেমা ও কান্তের মতো তারকারা। মেসিকে যদিও আনা সম্ভব হয়নি। তবে এবার আলোচনা ব্রাজিলিয়ান তারকা নেইমারকে নিয়ে।
মিররের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব ঘটনা ঘটছে মোহাম্মদ বিন সালমানের পরোক্ষ মদতেই। বর্তমানে তাঁর অন্যতম লক্ষ্য, খেলাধুলায় বিশ্বের প্রথম সারির দেশ হওয়া। সেটি পারফরম্যান্সের মাধ্যমে না হয়ে আয়োজক হিসেবে হলেও ক্ষতি কী! খেলা যেখানে, সেখানে বাড়বে স্পন্সর, বাড়বে ব্যবসা। আর সরকারের দপ্তরে জমবে মোটা অংকের অর্থ।
কিন্তু এ খেলাপ্রীতি দেখাতে গিয়ে সবার চোখে ধুলো দিতে চাইছেন মোহাম্মদ বিন সালমান। যুক্তরাষ্ট্রের কুইন্সি ইনস্টিটিউট ফর রেসপন্সিবল স্টেটক্রাফ্টের রিসার্চ ফেলো বেন ফ্রিম্যান মনে করেন, গলফের এই চুক্তি একটি কর্তৃত্ববাদী শাসনের সবচেয়ে বড় জয়।
বেন ফ্রিম্যান বলেন, আন্তর্জাতিক মঞ্চে সৌদি আরবকে স্বাভাবিক করাই তাদের (সৌদি প্রশাসনের) লক্ষ্য। তাদের সরকার চায় না, বিশ্বজুড়ে মানুষ যখন সৌদি আরবের কথা ভাবে, তখন তারা জামাল খাসোগির কথা ভাবুক।
২০১৮ সালে তুরস্কের ইস্তাম্বুলের সৌদি কনস্যুলেটে খুন হন ওয়াশিংটন পোস্টের সাংবাদিক ৫৯ বছর বয়সী জামাল খাসোগি। তিনি সৌদি আরবের সরকারের কঠোর সমালোচক ছিলেন। এ কারণেই তাঁকে হত্যা করা হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। এমনকি অনেক মানবাধিকার কর্মীকেও সৌদি আরবের সরকার টার্গেট করেছে বলে সন্দেহ আছে।
এ ক্ষেত্রে উল্লেখ করা যায়, মানবাধিকারকর্মী আবদুল রহমান আল-সাধানের কথা। টুইটারে সরকারের সমালোচনা করায় ২০২১ সালে তাঁকে কারাবরণ করতে হয়। এরপর তাঁকে কখনো দেখা যায়নি। এমনকি তাঁর পরিবারের সদস্যরাও জানেন না তিনি কোথায় আছেন, তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে কি-না!
এর মধ্যেই সৌদি আরবের ক্রীড়ামন্ত্রী প্রিন্স আবদুল আজিজ বিন তুর্কি আল-ফয়সাল বলেন, ‘আমরা অগ্রসর হচ্ছি, আমরা একটি উন্নত সমাজের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। ভবিষ্যতের জন্য একটি উন্নতমানের জীবনমান, একটি উন্নত দেশের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি।’
তবে ফ্রান্সের স্কেমা বিজনেস স্কুলের খেলাধুলা ও ভূ-রাজনৈতিক অর্থনীতির অধ্যাপক সাইমন চ্যাডউইক বলছেন, মানবাধিকারের সমালোচনা থেকে মনোযোগ সরিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি সৌদি আরবের সরকার রাজনৈতিক অস্থিরতা এড়াতে এবং তেলের ওপর নির্ভরতা কমাতে চায়।
সাইমন চ্যাডউইক আরও বলেন, বিশ্ব যখন কার্বন জ্বালানি থেকে দূরে সরে যাওয়ার চেষ্টা করছে, সৌদি অর্থনীতি তখন ঝুঁকির মুখে পড়েছে। দেশ-বিদেশে খেলাধুলায় বিনিয়োগ এই দুর্বলতা মোকাবিলার একটি উপায় হিসেবে ধরে নিয়েছে দেশটি।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু উল্লেখ করা হয়েছে মিররের প্রতিবেদনে। এতে বলা হয়, বর্তমানে সৌদি আরবের ৭০ শতাংশ নাগরিকের বয়স ৩৫ বছরের কম। এ প্রজন্মের কাছে সরকারের সমালোচনা যাতে না পৌঁছে, সেই ব্যবস্থা করতে চান মোহাম্মদ বিন সালমান। খেলাধুলার কার্যক্রম বেড়ে গেলে এরা সবাই এসব নিয়েই ব্যস্ত থাকবে। সরকারের সমালোচনা নিয়ে ভাবার সময় তারা পাবে না।
মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি বলছে, এ ধরনের পদক্ষেপ রাজতন্ত্রের ‘স্পোর্টসওয়াশিংয়ের’ ক্ষেত্রে অবশ্যম্ভাবী। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের পরিচালক মিনকি ওয়ার্ডেন বলেন, নারীদের অধিকার না দেওয়া একটি দেশকে এভাবে সহায়তা করা যাবে না। এমনকি সৌদি আরব এলজিবিটির অধিকারও কেড়ে নিয়েছে। তিনি মনে করেন, কাতারে ফুটবল বিশ্বকাপ দিয়ে যে ভুল করা হয়েছে, সেই একই ভুল আর না করাই উচিত হবে।
মিনকি ওয়ার্ডেন বলেন, সৌদি আরবকে বিশ্বকাপের সহ-আয়োজক দেশ হওয়ার সুযোগ দেওয়া হলে ফিফার মানবাধিকার নীতির বরখেলাপ করা হবে। এ ছাড়া সৌদি আরবের নির্যাতনেরও পুরস্কার দেওয়া হবে। অথচ এসব কারণে দেশটি লাল কার্ড পাওয়ার যোগ্য।
সংবাদমাধ্যম কোয়ার্টজ বলছে, মোহাম্মদ বিন সালমানের এমন ‘রক্তাক্ত হাতের কারণে’ অনেকের আপত্তির মুখে পড়ছেন দেশটির খেলাধুলা জগতের মহাপরিকল্পনায় যুক্ত হওয়া তারকারা। ৯/১১-এর হামলায় নিহতদের আত্মীয় ও আহতদের নিয়ে গঠিত একটি গ্রুপের সদস্যরা বলছেন, এলআইভি গলফের সঙ্গে এক হওয়ার মধ্য দিয়ে একটি বড় প্রতারণা করেছে পিজিএ ট্যুর ও ডিপি ওয়ার্ল্ড ট্যুর।
সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানে এ বছরের ৭ জুন প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে এর প্রধান ক্রীড়া প্রতিবেদক সীন ইংগল বলেন, এত সহজে রক্তে রঞ্জিত হাত লুকিয়ে রাখতে পারবেন না এমবিএস। এর কারণ হিসেবে গত ১৫ মাসের বিভিন্ন ঘটনা তুলে ধরেন তিনি। ভিন্নমতাবলম্বীদের অনুসরণ করা এবং তাদের লেখা টুইটারে শেয়ার করার জন্য গত বছর সালমা আল-শিহাবকে ৩৪ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছে দেশটি। একদিনে ৮১ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার ঘটনাও ঘটেছে দেশটিতে। জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার মিশেল ব্যাচেলেট জানান, এদের মধ্যে ৪১ জন শিয়া সম্প্রদায়ের অনুসারী। ২০১১-১২ সালে সরকারবিরোধী বিক্ষোভে অংশ নিয়েছিলেন তারা।
অবশ্য এতসব সমালোচনাকে পাত্তাই দিচ্ছেন না মোহাম্মদ বিন সালমান। এ ব্যাপারে তিনি কিংবা তাঁর সরকারের কোনো কর্মকর্তা কোনো ধরনের মন্তব্যও করছেন না। নিজেদের মতো করে এগিয়ে যাচ্ছে সৌদি আরব। মোহাম্মদ বিন সালমান এখন এক ঢিলে দুই পাখি মারতে চাইছেন। এক. খেলার মধ্য দিয়ে বিদেশি স্পন্সর টেনে আনা। আর তার মাধ্যমে বড় অঙ্কের আয়ের দিকে যাওয়া। আর দুই. নিজের রক্তাক্ত হাত এমনভাবে লুকিয়ে রাখা যাতে এ নিয়ে কেউ মাথা না ঘামায়। এ দিক থেকে তিনি কতটা সফল হবেন তা সময়ই বলে দেবে।
বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় এবং মেগা ইভেন্ট— ফুটবল বিশ্বকাপ। ফুটবলপ্রেমীদের মনে তাই এখন একটাই উন্মাদনা- বিশ্বকাপ। ৩টি দেশ, ১৬টি শহর, ৪৮টি দল আর রেকর্ড ১০৪টি ম্যাচ! স্বাভাবিকভাবেই ফিফার পকেটে ঢুকছে...
মধ্যপ্রাচ্য এখন আগ্নেয়গিরির মুখে। গত ছয় সপ্তাহ ধরে ইরান ও ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলা বিধ্বংসী যুদ্ধ পুরো অঞ্চলকে তছনছ করে দিয়েছে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ, তেলের বাজারে আগুন আর নিরাপত্তা কাঠামোর...
সরকারের দাবি, দেশে জ্বালানি তেলের মজুদ নাকি ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে। সরবরাহেও কোনো ঘাটতি নেই। কিন্তু এরপরেও সারা দেশের তেলের পাম্পগুলোতে মানুষের দীর্ঘ অপেক্ষার সামনে এই দাবি ঠিক মিলছে না। কোথাও ৮...
সম্প্রতি বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছে খাগড়াছড়ি সদর, দীঘিনালা, মহালছড়ি ও পানছড়ি উপজেলা। তলিয়ে গেছে জেলার ৮ হাজার ১৩০ হেক্টর আবাদি জমির মধ্যে ১ হাজার ৩১ হেক্টর জমির ফসল। এর মধ্যে পুরোপুরি...
দুদক রাজধানীর গুলশানে সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদের দুটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট জব্দ করেছে। তল্লাশিতে বিলাসবহুল গাড়ির চাবিসহ দুর্নীতির নানা আলামত পাওয়ার দাবি করেছে সংস্থাটি।
প্রায় আট বছর পর ভারতীয় সিনেমায় ফিরছেন প্রিয়াঙ্কা চোপড়া। আর সেই প্রত্যাবর্তন হচ্ছে এস এস রাজামৌলির বহুল প্রতীক্ষিত সিনেমা ‘বারাণসী’ দিয়ে। নায়িকার জন্মদিন উপলক্ষে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে...
ইউএনডিপি প্রতিনিধি দলের সঙ্গে বৈঠকে ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল বলেন, সরকার শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে। ই-পার্লামেন্ট, সংসদীয় ফেলোশিপ, স্থায়ী কমিটি শক্তিশালীকরণ...
খেলার আড়ালে চোখে ধুলো দিচ্ছেন বিন সালমান?
একটি দেশের কলঙ্কিত ও ভয়ঙ্কর ভাবমূর্তিকে আড়াল করে ক্লিন ইমেজ সামনে আনার জন্য খেলাধুলাকে বেছে নেওয়ার কৌশল বহু আগে থেকেই চলে আসছে। ১৯৩৬ সালের বার্লিন অলিম্পিকে এমনটাই করেছিলেন জার্মানির অ্যাডলফ হিটলার। সমালোচকদের মতে, ২০১৪ সালে ক্রিমিয়া দখলের চার বছর পর ২০১৮ সালে ফিফা বিশ্বকাপ ফুটবল আয়োজন করে সে পথেই হেঁটেছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। আর এবার যুক্ত হচ্ছে আরেকটি নাম, সৌদি আরবের ক্ষমতাধর নেতা, দেশটির কার্যত (ডি-ফ্যাক্টো) শাসক যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান।
যুক্তরাজ্যের সংবাদমাধ্যম মিররে ৯ জুন প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এমনটাই বলছেন লেখক ম্যাট রোপার। প্রতিবেদনে বলা হয়, সৌদি আরবে প্রতি বছর গড়ে ১২৯ জনকে শিরশ্ছেদ করে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয় (২০১৫-২০২২ সালের হিসাব)। ৯/১১-এর হামলায় সৌদি আরবের জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। সাংবাদিক জামাল খাসোগি হত্যাকাণ্ড মোহাম্মদ বিন সালমানের নির্দেশেই হয়েছে বলে মনে করেন বিশ্ব রাজনীতির বিশ্লেষকেরা। এ ছাড়া মানবাধিকার লঙ্ঘনের একাধিক অভিযোগ রয়েছে সৌদি সরকারের বিরুদ্ধে। এসব আড়াল করার চেষ্টায় কোন পথে এই নেতা?
সম্প্রতি গলফের রাজত্ব নিজেদের করে নিতে সবচেয়ে বড় পদক্ষেপের অংশ হয়েছে সৌদি আরব। তিন আয়োজক পিজিএ ট্যুর, ডিপি ওয়ার্ল্ড ট্যুর ও এলআইভি গলফ এক হয়ে যাওয়ায় গলফের তারকাদের সবাইকেই পাবে সৌদি আরব। আর তাতে তারা গলফে দেখাতে পারবে আধিপত্য। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হচ্ছে, এখান থেকে বেশ আয় হবে সরকারের। তাতে চাঙ্গা হবে অর্থনীতির চাকাও।
শুধু জ্বালানি তেলের মাধ্যমে সৌদি আরব কেন, কোনো দেশই ভবিষ্যতে অর্থনীতি ভালোভাবে চালাতে পারবে না বলে মনে করেন বিশ্লেষকেরা। এই ভাবনা আগেই ভেবে রেখেছেন মোহাম্মদ বিন সালমান। এ কারণে ২০১৬ সালে ‘ভিশন ২০৩০’ হাতে নিয়েছিলেন তিনি, যার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে আছে খেলা। এর মাধ্যমে তেলনির্ভর অর্থনীতি থেকে বের হতে চায় দেশটি। এরই মধ্যে দেশটির বিভিন্ন ফুটবল ক্লাবে যুক্ত হয়েছেন ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো, করিম বেনজেমা ও কান্তের মতো তারকারা। মেসিকে যদিও আনা সম্ভব হয়নি। তবে এবার আলোচনা ব্রাজিলিয়ান তারকা নেইমারকে নিয়ে।
মিররের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব ঘটনা ঘটছে মোহাম্মদ বিন সালমানের পরোক্ষ মদতেই। বর্তমানে তাঁর অন্যতম লক্ষ্য, খেলাধুলায় বিশ্বের প্রথম সারির দেশ হওয়া। সেটি পারফরম্যান্সের মাধ্যমে না হয়ে আয়োজক হিসেবে হলেও ক্ষতি কী! খেলা যেখানে, সেখানে বাড়বে স্পন্সর, বাড়বে ব্যবসা। আর সরকারের দপ্তরে জমবে মোটা অংকের অর্থ।
কিন্তু এ খেলাপ্রীতি দেখাতে গিয়ে সবার চোখে ধুলো দিতে চাইছেন মোহাম্মদ বিন সালমান। যুক্তরাষ্ট্রের কুইন্সি ইনস্টিটিউট ফর রেসপন্সিবল স্টেটক্রাফ্টের রিসার্চ ফেলো বেন ফ্রিম্যান মনে করেন, গলফের এই চুক্তি একটি কর্তৃত্ববাদী শাসনের সবচেয়ে বড় জয়।
বেন ফ্রিম্যান বলেন, আন্তর্জাতিক মঞ্চে সৌদি আরবকে স্বাভাবিক করাই তাদের (সৌদি প্রশাসনের) লক্ষ্য। তাদের সরকার চায় না, বিশ্বজুড়ে মানুষ যখন সৌদি আরবের কথা ভাবে, তখন তারা জামাল খাসোগির কথা ভাবুক।
২০১৮ সালে তুরস্কের ইস্তাম্বুলের সৌদি কনস্যুলেটে খুন হন ওয়াশিংটন পোস্টের সাংবাদিক ৫৯ বছর বয়সী জামাল খাসোগি। তিনি সৌদি আরবের সরকারের কঠোর সমালোচক ছিলেন। এ কারণেই তাঁকে হত্যা করা হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। এমনকি অনেক মানবাধিকার কর্মীকেও সৌদি আরবের সরকার টার্গেট করেছে বলে সন্দেহ আছে।
এ ক্ষেত্রে উল্লেখ করা যায়, মানবাধিকারকর্মী আবদুল রহমান আল-সাধানের কথা। টুইটারে সরকারের সমালোচনা করায় ২০২১ সালে তাঁকে কারাবরণ করতে হয়। এরপর তাঁকে কখনো দেখা যায়নি। এমনকি তাঁর পরিবারের সদস্যরাও জানেন না তিনি কোথায় আছেন, তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে কি-না!
এর মধ্যেই সৌদি আরবের ক্রীড়ামন্ত্রী প্রিন্স আবদুল আজিজ বিন তুর্কি আল-ফয়সাল বলেন, ‘আমরা অগ্রসর হচ্ছি, আমরা একটি উন্নত সমাজের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। ভবিষ্যতের জন্য একটি উন্নতমানের জীবনমান, একটি উন্নত দেশের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি।’
তবে ফ্রান্সের স্কেমা বিজনেস স্কুলের খেলাধুলা ও ভূ-রাজনৈতিক অর্থনীতির অধ্যাপক সাইমন চ্যাডউইক বলছেন, মানবাধিকারের সমালোচনা থেকে মনোযোগ সরিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি সৌদি আরবের সরকার রাজনৈতিক অস্থিরতা এড়াতে এবং তেলের ওপর নির্ভরতা কমাতে চায়।
সাইমন চ্যাডউইক আরও বলেন, বিশ্ব যখন কার্বন জ্বালানি থেকে দূরে সরে যাওয়ার চেষ্টা করছে, সৌদি অর্থনীতি তখন ঝুঁকির মুখে পড়েছে। দেশ-বিদেশে খেলাধুলায় বিনিয়োগ এই দুর্বলতা মোকাবিলার একটি উপায় হিসেবে ধরে নিয়েছে দেশটি।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু উল্লেখ করা হয়েছে মিররের প্রতিবেদনে। এতে বলা হয়, বর্তমানে সৌদি আরবের ৭০ শতাংশ নাগরিকের বয়স ৩৫ বছরের কম। এ প্রজন্মের কাছে সরকারের সমালোচনা যাতে না পৌঁছে, সেই ব্যবস্থা করতে চান মোহাম্মদ বিন সালমান। খেলাধুলার কার্যক্রম বেড়ে গেলে এরা সবাই এসব নিয়েই ব্যস্ত থাকবে। সরকারের সমালোচনা নিয়ে ভাবার সময় তারা পাবে না।
মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি বলছে, এ ধরনের পদক্ষেপ রাজতন্ত্রের ‘স্পোর্টসওয়াশিংয়ের’ ক্ষেত্রে অবশ্যম্ভাবী। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের পরিচালক মিনকি ওয়ার্ডেন বলেন, নারীদের অধিকার না দেওয়া একটি দেশকে এভাবে সহায়তা করা যাবে না। এমনকি সৌদি আরব এলজিবিটির অধিকারও কেড়ে নিয়েছে। তিনি মনে করেন, কাতারে ফুটবল বিশ্বকাপ দিয়ে যে ভুল করা হয়েছে, সেই একই ভুল আর না করাই উচিত হবে।
মিনকি ওয়ার্ডেন বলেন, সৌদি আরবকে বিশ্বকাপের সহ-আয়োজক দেশ হওয়ার সুযোগ দেওয়া হলে ফিফার মানবাধিকার নীতির বরখেলাপ করা হবে। এ ছাড়া সৌদি আরবের নির্যাতনেরও পুরস্কার দেওয়া হবে। অথচ এসব কারণে দেশটি লাল কার্ড পাওয়ার যোগ্য।
সংবাদমাধ্যম কোয়ার্টজ বলছে, মোহাম্মদ বিন সালমানের এমন ‘রক্তাক্ত হাতের কারণে’ অনেকের আপত্তির মুখে পড়ছেন দেশটির খেলাধুলা জগতের মহাপরিকল্পনায় যুক্ত হওয়া তারকারা। ৯/১১-এর হামলায় নিহতদের আত্মীয় ও আহতদের নিয়ে গঠিত একটি গ্রুপের সদস্যরা বলছেন, এলআইভি গলফের সঙ্গে এক হওয়ার মধ্য দিয়ে একটি বড় প্রতারণা করেছে পিজিএ ট্যুর ও ডিপি ওয়ার্ল্ড ট্যুর।
সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানে এ বছরের ৭ জুন প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে এর প্রধান ক্রীড়া প্রতিবেদক সীন ইংগল বলেন, এত সহজে রক্তে রঞ্জিত হাত লুকিয়ে রাখতে পারবেন না এমবিএস। এর কারণ হিসেবে গত ১৫ মাসের বিভিন্ন ঘটনা তুলে ধরেন তিনি। ভিন্নমতাবলম্বীদের অনুসরণ করা এবং তাদের লেখা টুইটারে শেয়ার করার জন্য গত বছর সালমা আল-শিহাবকে ৩৪ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছে দেশটি। একদিনে ৮১ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার ঘটনাও ঘটেছে দেশটিতে। জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার মিশেল ব্যাচেলেট জানান, এদের মধ্যে ৪১ জন শিয়া সম্প্রদায়ের অনুসারী। ২০১১-১২ সালে সরকারবিরোধী বিক্ষোভে অংশ নিয়েছিলেন তারা।
অবশ্য এতসব সমালোচনাকে পাত্তাই দিচ্ছেন না মোহাম্মদ বিন সালমান। এ ব্যাপারে তিনি কিংবা তাঁর সরকারের কোনো কর্মকর্তা কোনো ধরনের মন্তব্যও করছেন না। নিজেদের মতো করে এগিয়ে যাচ্ছে সৌদি আরব। মোহাম্মদ বিন সালমান এখন এক ঢিলে দুই পাখি মারতে চাইছেন। এক. খেলার মধ্য দিয়ে বিদেশি স্পন্সর টেনে আনা। আর তার মাধ্যমে বড় অঙ্কের আয়ের দিকে যাওয়া। আর দুই. নিজের রক্তাক্ত হাত এমনভাবে লুকিয়ে রাখা যাতে এ নিয়ে কেউ মাথা না ঘামায়। এ দিক থেকে তিনি কতটা সফল হবেন তা সময়ই বলে দেবে।
বিষয়: