গাজা যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে গোটা মধ্যপ্রাচ্য উত্তাল। ইসরায়েলের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশ নেওয়া প্রতিটি পক্ষের সাথে ইরানের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ রয়েছে। ইরান শুরু থেকেই এই অভিযোগ অস্বীকার করে এলেও তা যে এক রকম কূটনৈতিক জবাব তা যে কেউ বুঝতে পারে। এ তো গেল একটি দিক। অন্যদিকে ইরানের অভ্যন্তরীণ সংকটও কম নয়। অর্থনীতি ও সমাজের নানা ইস্যু নিয়ে ইরানের সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরনের অস্বস্তি রয়েছে। এরই জেরে কয়েকটি আন্দোলন প্রত্যক্ষ করতে হয়েছে তেহরানকে। এই অবস্থায় প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসির মৃত্যু বেশ কিছু ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।
শুরুতে একটু বাইরে তাকানো যাক। আগেই বলা হয়েছে, গাজা যুদ্ধ ইরানের জন্য এমনিতেই এক বড় চ্যালেঞ্জ। গাজা ইস্যুতে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে যে পক্ষগুলো যুদ্ধে লিপ্ত, তাদের মধ্যে রয়েছে, গাজায় হামাস, ইয়েমেনের হুতি ও লেবাননের হিজবুল্লাহ। এই প্রতিটি পক্ষই ইরানের সমর্থনপুষ্ট বলে পরিচিত। সুয়েজ খাল ও এর আশপাশে পশ্চিমা যুদ্ধ ও বাণিজ্য জাহাজগুলো যে সংকট মোকাবিলা করছে, তার ভাবনার কেন্দ্র হিসেবেও রয়েছে ইরান। এর বাইরে আছে সৌদি আরবের সাথে তেহরানের প্রতিযোগিতার বিষয়টি। সৌদি ব্লকের অংশ হিসেবে পরিচিত দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে মিশর, বাহরাইন ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো দেশ। আর এই সৌদি ব্লক মূলত মধ্য প্রাচ্যের মার্কিন স্বার্থেরই প্রতিনিধিত্ব করে। ফলে এই সংকট ও প্রতিযোগিতায় নেতৃত্বে বদল একটি বড় প্রভাবক হয়ে উঠতে পারে। আর রাইসির মৃত্যু সেই বদলকেই অবশ্যম্ভাবী বাস্তবতা হিসেবে সামনে এনেছে।
এবার আসা যাক ইরানের অভ্যন্তরীণ ইস্যুতে। ইরানের রাজনৈতিক বাস্তবতায় ইব্রাহিম রাইসি বা প্রেসিডেন্ট পদটি তেমন নীতিনির্ধারণী ক্ষমতা রাখে না। এর পুরোটাই ধরতে গেলে শীর্ষ নেতা বা সুপ্রিম লিডারের হাতে থাকে। ইরানের সুপ্রিম লিডার আয়াতুল্লাহ খামেনির বয়স ৮৫ বছর। তিনি এই পদ থেকে অবসরে যাওয়ার কথা শিগগিরই। রাইসি মূলত খামেনির অতি বিশ্বস্ত হিসেবেই পরিচিত, যিনি খামেনির নির্দেশগুলো বাস্তবায়ন করতেন।
খামেনি সরে গেলে তাঁর জায়গা রাইসি নিতে পারেন বলে একটা গুঞ্জন ছিল। এই গুঞ্জনের কারণ ইরানের শাসনকাঠামো অনুযায়ী শীর্ষ নীতিনির্ধারণী মহল অর্থাৎ, ধর্মীয় নেতাদের পরিষদ এই রাইসিকেই খামেনির স্থলাভিষিক্ত হওয়ার মতো যোগ্য হিসেবে ধরে নিয়েছিলেন। এখন রাইসির মৃত্যুর কারণে সে কাজটি আর সম্ভব হচ্ছে না। ফলে হয়তো খামেনির ছেলের দিকে সে দায়িত্ব যেতে পারে। তেমনটি হলে ইরানের ইসলামি বিপ্লবের একটি মূল ভিতের ওপর আঘাত হানবে। কারণ, ইসলামি বিপ্লবের সময় শীর্ষ নেতা নির্বাচনে যোগ্যতাকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। কোনো উত্তরাধিকারকে এখানে বিবেচনা না করার বিষয়ে উৎসাহিত করা হয়েছে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের এ সম্পর্কিত এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ইরানের ক্ষমতা কাঠামো ধর্মীয় নেতা, সেনাবাহিনী ও রাজনীতিকদের এক সমন্বয়ে চলে। এই ক্ষমতাকাঠামোর একেবারে মাথায় বসে আছেন শীর্ষ নেতা, যাঁর বয়স বর্তমানে ৮৫ বছর। ধর্মের নামে চলা এই একনায়ক শাসনে প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা একটি সীমার মধ্যে আবদ্ধ। তাঁরা মূলত যেকোনো নীতি সম্পর্কিত সমালোচনা থেকে শীর্ষ নেতাকে রক্ষা করার একটি বর্ম হিসেবে কাজ করেন। এরই বলি হয়েছিলেন ইরানের সাবেক প্রেসিডেন্ট রুহানি।
গত কয়েক মাস ধরে রাইসি অবশ্য আরেকটি কারণে আলোচনায় আসেন। গার্ডিয়ান জানাচ্ছে, ইরানের ৮৮ সদস্যের ‘অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস’ খামেনির উত্তরসূরি হিসেবে রাইসিকে মনোনীত করেছিল। কিন্তু রাইসির মৃত্যু সেই ক্ষমতার হাতবদল হতে দিল না। ফলে এখন বিকল্প হিসেবে সামনে আসছে খামেনির ছেলে, যা ইরানের ইসলামি বিপ্লবের নীতিবিরুদ্ধ হিসেবে ধর্মীয় নেতারা খারিজ করেন।
পাশাপাশি রয়েছে সর্বশেষ নির্বাচন ও সাম্প্রতিক নানা আন্দোলনের বিষয়াদি। ইরানের সর্বশেষ নির্বাচনে নতুন আইনসভা গঠিত হয়েছে মার্চে। কোনো কোনো অঞ্চলে ভোট পড়ার হার এমনকি ১০ শতাংশের নিচে ছিল। আর সার্বিক ভোট পড়ার হার ছিল ৪১ শতাংশ, যা ইরানের ইতিহাসে সর্বনিম্ন। বলা প্রয়োজন যে, এই হিসাব কিন্তু ইরানের রাষ্ট্রীয় হিসাব। বিশ্লেষকদের মতে, এ হার বাস্তবে আরও কম ছিল। অর্থাৎ, ইরানের শাসনকাঠামো, নির্বাচনী প্রক্রিয়া ও ক্ষমতাসীনদের বিষয়ে এক ধরনের অবিশ্বাসজনিত নির্লিপ্ততা সাধারণ ভোটারদের মধ্যে বাড়ছে। এর মধ্যে যখন নির্বাচনের আগে আগে পরিবর্তনের কথা বলা বা মধ্যপন্থী রাজনীতিকদের নির্বাচনের অযোগ্য হিসেবে ঘোষণা করা হয়, তখন অর্থনৈতিক সংকটে পর্যুদস্ত ইরানের জনতা ভোটকেই এক রকম বর্জন করেছে।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, পশ্চিমা দেশগুলোর তরফ থেকে আরোপিত নানা নিষেধাজ্ঞার ধকল ইরানের অর্থনীতির পক্ষে আর বহন করা সম্ভব হচ্ছে না। এমনই এক প্রেক্ষাপটে সাবেক প্রেসিডেন্ট রুহানিকে বিদায় নিতে হয়েছিল সব দায় নিয়ে। খামেনি যথারীতি থেকে যান ধরাছোঁয়া ও যাবতীয় সমালোচনার বাইরে। এর মধ্যে নয়া আইনসভায় মধ্যপন্থীদের অনুপস্থিতিতে কট্টর ও অতি কট্টরপন্থীদের মধ্যে এক ধরনের দ্বন্দ্ব দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে।
ইরানের ইসলামি বিপ্লবের পর, আরও ভালো করে বললে ১৯৭৯ সালের পর থেকে কোনো নির্বাচনেই মধ্যপন্থীদের এভাবে হটিয়ে দেওয়া হয়নি। ফলে ইরানের আইনসভা এক ধরনের মনোপলি নীতির দিকে যাচ্ছে, যাকে ইরানের তরুণেরা এরই মধ্যে বাতিলযোগ্য বলে আওয়াজ তুলতে শুরু করেছে।
কর্মসংস্থান সংকটে ভোগা তরুণ জনগোষ্ঠীর সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়েছে আয়–উপার্জন। এই বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে তারা পশ্চিমের সাথে তেহরানের দ্বন্দ্ব বা মধ্যপ্রাচ্যের একক শক্তি হিসেবে ইরানের উত্থানের মতো স্বপ্নকে ঠিক প্রশ্রয় দিতে রাজি নয়। এ ক্ষেত্রে পারমাণবিক শক্তি হিসেবে ইরানের শৌর্যের প্রশ্ন অনেক দূর। এখানে বলা প্রয়োজন যে, ইরানের অভ্যন্তরীণ তরুণদের এই চাপের কারণেই কিন্তু পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে ছয় জাতি চুক্তি করতে হয়েছিল ইরানকে। ওই চুক্তি শুধু পশ্চিমা চাপের কারণে হয়েছিল, এমনটা বলা যাবে না।
ফলে রাইসির এই মৃত্যু ইরানের রাজনীতিকে এক বড় ধরনের অনিশ্চয়তায় ফেলে দিয়েছে। এখানে ভোলা ঠিক হবে না যে, একই দুর্ঘটনায় কিন্তু পররাষ্ট্রমন্ত্রী হোসেইন আমির–আবদুল্লাহও নিহত হয়েছেন। পশ্চিম ও মধ্যপ্রাচ্যের বাকি দেশগুলোর সাথে সম্পর্ক নিয়ে বিচিত্র সব চ্যালেঞ্জের মাঝখানে এটি অনেক বড় ক্ষতি। ফলে শুধু রাইসির মৃত্যু দিয়ে ইরানের অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক চ্যালেঞ্জকে বিবেচনা করাটা ঠিক হবে না। রাইসির স্থান নিতে যাচ্ছেন ভাইস প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মোখবার, আর আমির আবদুল্লাহর স্থলাভিষিক্ত হবেন তাঁর ডেপুটি আলী বাঘেরি।
বাঘেরি তাঁর পূর্বতন আমির আবদুল্লাহর মতো করে পশ্চিমা দেশগুলোর বিপরীতে দাঁড়িয়ে মিত্র হিসেবে রাশিয়া ও চীনকে কতটা কাছে টানতে পারবেন, সে প্রশ্ন থেকে যায়। পাশাপাশি ইয়েমেনসহ বিভিন্ন দেশে ইরানের ছায়া অবস্থানকে কতটা টিকিয়ে রাখতে পারেন, সে প্রশ্নও সামনে আসে। এটা সত্য যে, খামেনিই শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত গ্রহীতা। কিন্তু মুখোমুখি আলোচনায় কিন্তু খামেনি বসছেন না। তিনি যতই নিশ্চিত করুন যে, ‘ইরানের শাসন পদ্ধতি ও প্রক্রিয়ায় কোনো ব্যাত্যয় হবে না’, প্রশ্ন কিন্তু থেকেই যায়।
সংশ্লিষ্ট খবর:
- ইরানের প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসি হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় নিহত
- রাইসি মারা গেলে ইরানের প্রেসিডেন্ট হবেন কে?
- দুর্ঘটনার কবলে ইরানের প্রেসিডেন্টের হেলিকপ্টার
- হেলিকপ্টার দুর্ঘটনা: ইরানের প্রেসিডেন্ট কি বেঁচে আছেন, যা জানা গেল
- রাইসির খোঁজে উড়োজাহাজ পাঠানোর নির্দেশ পুতিনের
- প্রেসিডেন্ট রাইসির অনুপস্থিতিতে শাসনের ব্যত্যয় হবে না: খামেনির প্রতিশ্রুতি
- এখনও খোঁজ মেলেনি রাইসির, তল্লাশি অভিযানে সহায়তা করছে তুরস্ক
- রাইসিকে নিয়ে বিধ্বস্ত হেলিকপ্টারে ‘প্রাণের চিহ্ন নেই’
- রাইসিকে বহনকারী হেলিকপ্টারটি ছিল ষাটের দশকের
- রাইসিকে নিয়ে বিধ্বস্ত হেলিকপ্টারে আরও যাঁরা ছিলেন
- রাইসির হেলিকপ্টার বিধ্বস্তের জায়গা খুঁজে পেয়েছে তল্লাশি দল
- রাইসিকে বহনকারী বিধ্বস্ত হেলিকপ্টার উদ্ধার নিয়ে সর্বশেষ যা জানা গেল
- রাইসির মৃত্যুতে ‘গভীরভাবে শোকাহত’ ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট


রাইসির মৃত্যুতে মধ্যপ্রাচ্যের সংকট কি আরও গভীর হবে?
রাইসির মরদেহ উদ্ধার, তল্লাশি অভিযান সমাপ্ত
ইরানের অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট হতে যাওয়া কে এই মোহাম্মদ মোখবার?
