গাজা যুদ্ধ নিয়ে গতকাল শুক্রবার এক ঐতিহাসিক রায় দিয়েছেন আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে)। রায়ে অবিলম্বে ফিলিস্তিনের রাফাহতে হামলা বন্ধ করতে ইসরায়েলকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে আইসিজের এই আদেশ বাস্তবায়নের অগ্রগতি সম্পর্কে ইসরায়েলকে এক মাসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। এ ছাড়া গাজায় মানবিক সহায়তা প্রবেশের জন্য ইসরায়েলকে রাফাহ সীমান্ত ক্রসিং খুলে দেওয়ার নির্দেশও দিয়েছেন আন্তর্জাতিক বিচার আদালত।
এমন অবস্থায় গাজার যুদ্ধ পরিস্থিতি পাল্টাবে কি না, তা নিয়ে সারা বিশ্বে শুরু হয়েছে আলোচনা। বিশ্লেষকেরা মনে করেন, আইসিজের রায়ের প্রভাব খুব একটা পড়বে না গাজার যুদ্ধের ময়দানে। দোহা ইনস্টিটিউট ফর গ্র্যাজুয়েট স্টাডিজের শিক্ষক মোহাম্মদ ইলমাসরি বলেন, ‘আইসিজের রায় ইসরায়েল মেনে নেবে বলে মনে হয় না।’
মোহাম্মদ ইলমাসরির আশঙ্কাই সত্যি প্রমাণিত হয়েছে। গতকাল আইসিজের রায় ঘোষণার কয়েক মিনিট পরই রাফাহ শহরের কেন্দ্রস্থলে শাবোরা ক্যাম্পে একের পর এক বিমান হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। অর্থাৎ তারা যে আদালতের রায়কে তোয়াক্কা করে না, তা গতকালের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমেই বুঝিয়ে দিয়েছে। এরপর আজ শনিবার ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, ‘এ রায় অগ্রহণযোগ্য, জঘন্য ও বিরক্তিকর।’
বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কার্যালয় থেকে পাঠানো বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, প্রত্যেক দেশেরই আন্তর্জাতিক আইন ও মূল্যবোধ অনুসরণের ভিত্তিতে নিজেদের নাগরিক ও সীমানা রক্ষার অধিকার রয়েছে এবং ইসরায়েল ঠিক তাই করছে।
ঠিক এই যুক্তিতেই গত সাত মাস ধরে গাজায় নৃশংস হত্যাযজ্ঞ চালাচ্ছে ইসরায়েল। ঘটনার সূত্রপাত হয়েছিল গত বছরের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলের বিভিন্ন অবৈধ বসতিতে হামাসের হামলার মধ্য দিয়ে। সে সময় গাজার সীমান্তে চলছিল নোভা মিউজিক ফেস্টিভাল। হামাসের হামলায় ওই ফেস্টিভালে ৩৫০ জন প্রাণ হারান। ওই দিন হামাসের হামলায় সবমিলিয়ে ১ হাজার ২০০ ইসরায়েলি ও অন্যান্য দেশের নাগরিকরা নিহত হন।
পরে হামাসের হামলার পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে গাজায় হামলা শুরু করে ইসরায়েল। সেই হামলা এখনো চলছে। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত সাত মাসে ৩৫ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে, যাদের এক–তৃতীয়াংশই শিশু।
হাজার হাজার নিরীহ ফিলিস্তিনির মৃত্যুর পরিপ্রেক্ষিতে আন্তর্জাতিক মহল থেকে নানভাবে ইসরায়েলকে যুদ্ধ থামাতে বলা হচ্ছে, চাপ দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে, কিন্তু কোনো কিছুকেই তোয়াক্কা করছে না ইসরায়েল।
গবেষক ও শিক্ষক মোহাম্মদ ইলমাসরি বলেন, ‘গত কয়েক মাসে ইসরায়েলের আচরণে দেখা গেছে, আন্তর্জাতিক আইন কী বলে, সে বিষয়কে তারা তেমন পাত্তা দেয় না। এই আদেশ বা আইনগুলো পাস হওয়ার পর দেখা যায়, তারা হামলা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। যতক্ষণ না আমেরিকা ইসরায়েলকে সরাসরি বলবে যথেষ্ট হয়েছে, এবার থামো; ততক্ষণ কিছু বদলাবে বলে আমি মনে করি না।’
গাজায় গণহত্যা বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে গত জানুয়ারিতে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে মামলা করে দক্ষিণ আফ্রিকা। এরপর গাজার রাফাহতে হামলা বন্ধে জরুরি পদক্ষেপ নিতে দক্ষিণ আফ্রিকা আরেকটি আবেদন করে। সেই আবেদন আদালত প্রত্যাখ্যান করলে গত মার্চে তৃতীয়বারের মতো আরেকটি আবেদন করে দক্ষিণ আফ্রিকা। ওই আবেদনের প্রেক্ষিতে গতকাল রায় দেন আইসিজে।
আইসিজের রায় মানতে বাধ্যবাধকতা রয়েছে বলে জানিয়েছেন জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস। তিনি বলেন, ‘আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের রায় মানা বাধ্যতামূলক। আমার বিশ্বাস, সকল পক্ষই এ রায় মেনে চলবেন।’
জাতিসংঘ মহাসচিবের মন্তব্য আংশিক সত্য। আইসিজের রায় মানার ব্যাপারে বাধ্যবাধকতা থাকলেও রায় বাস্তবায়নের সক্ষমতা নেই এই আদালতের। এর আগে বিশ্ববাসী দেখেছে, ইউক্রেনে হামলা বন্ধ করতে রাশিয়াকে নির্দেশ দিয়েছিল আইসিজে। রাশিয়া সেই নির্দেশ মানেনি এবং সেই নির্দেশ অমান্য করায় আইসিজে রাশিয়ার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থাও নিতে পারেনি।
সুতরাং ইসরায়েলের বিরুদ্ধে দেওয়া এ রায়ও শেষ পর্যন্ত একটি কাগুজে রায়ই হয়ে থাকবে, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। ইসরায়েল এ রায় কখনোও মেনে নেবে না। এরই মধ্যে ইসরায়েলের শীর্ষ কর্তাদের পক্ষ থেকে সেরকমই বক্তব্য শোনা যাচ্ছে।
গতকাল ইসরায়েলের আইনজীবীরা দক্ষিণ আফ্রিকার মামলাটিকে ‘বাস্তবতাবিবর্জিত’ বলে আখ্যা দিয়েছেন এবং ১৯৪৮ সালের গণহত্যা আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ নিয়ে বিদ্রূপ করেছেন। ইসরায়েলের শীর্ষ আইনজীবী গিলাদ নোয়াম বলেন, ‘কোনো বিষয়কে বারবার গণহত্যা বললে, তা গণহত্যা হয়ে যায় না। মিথ্যার পুনরাবৃত্তি করলে, তা সত্য হয়ে যায় না। একটা মর্মান্তিক যুদ্ধ চলছে তবে কোনো গণহত্যা হচ্ছে না।’
সুতরাং যুদ্ধটা ‘মর্মান্তিক’ হলেও যেহেতু ‘গণহত্যা’ হচ্ছে না, তাই এ যুদ্ধ ইসরায়েল অব্যাহত রাখবে, তাতে সন্দেহ নেই। আইসিজের রায়ে গাজার যুদ্ধ পরিস্থিতির কোনো হেরফের হচ্ছে না, তা হলফ করে বলাই যায়।
সূত্র: আল জাজিরা, বিবিসি, এএফপি ও আনাদোলু এজেন্সি
আরও পড়ুন:
- রাফাহতে ইসরায়েলি অভিযান বন্ধের নির্দেশ আইসিজের
- আইসিজের নির্দেশের পর পরই রাফাহতে ইসরায়েলি হামলা
- গাজায় দুই সপ্তাহে ৯ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত
- 'পানি নিতে ১২-১৩ কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে আসতে হয়'
- গাজার অর্ধেক মানুষ অনাহারে: জাতিসংঘ
- লেবাননের পরিণতি হবে গাজার মতো, হুমকি নেতানিয়াহুর
- গাজায় ১০৪ মসজিদ ধ্বংস করেছে ইসরায়েল
- যুদ্ধ পরিস্থিতিতেও ফিলিস্তিনিরা ভোলেনি প্রিয় পোষা প্রাণির কথা
- এক দিনে গাজার ৪৫০ জায়গায় হামলা করেছে ইসরায়েল
- আহত ফিলিস্তিনিদের সেবা করছেন ইসরায়েলি এক নারী
- ইসরায়েল-ইউক্রেনের সহায়তা বিল আটকে গেল মার্কিন কংগ্রেসে
- হামাস নেতাদের হত্যার পরিকল্পনা করছে ইসরায়েল
- গাজার স্কুলে ইসরায়েলের হামলা, নিহত ২৫
- গাজায় যে শিশুদের পরিবারের কেউ বেঁচে নেই
- ইসরায়েলি কারাগার ফেরত ফিলিস্তিনি তরুণ শোনালেন নির্মম নির্যাতনের কথা
- ‘ভাইয়ের সাথে আমাকেও কবর দিয়ে দাও’



