যুক্তরাষ্ট্রের পরমাণু অস্ত্র কৌশলে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে সম্প্রতি একটি অনুমোদনে স্বাক্ষর করেছেন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। এ থেকে বোঝা যায়, সারা বিশ্বে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব মোকাবিলা ও নিজেদের নিরাপত্তা বাড়ানোর দিকে অপেক্ষাকৃত বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র।
যুক্তরাষ্ট্রের এই কৌশলগত পরিবর্তন নতুন কিছু নয়। নিরাপত্তা হুমকি বিবেচনায় রেখে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী তাদের কৌশল নির্ধারণ, বাজেট ও পরিকল্পনায় প্রায়ই পরিবর্তন আনে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, নাইন‑ইলেভেনের পরে রাশিয়ার সঙ্গে শীতল যুদ্ধ থেকে সরে এসেছিল আমেরিকা। এর পরিবর্তে ছোট ছোট সন্ত্রাসী ও বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রতি মনযোগী হয়েছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের গত এক দশকের কর্মকাণ্ডের দিকে তাকালে বোঝা যায়, রাশিয়া ও চীনের শক্তি প্রতিযোগিতার দিকে মনযোগ দিয়েছে পেন্টাগন। তারা নব্য শক্তি হিসেবে পরিচিতি পাওয়া চীন ও রাশিয়াকে প্রতিরোধ করার ওপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।
সামরিক কৌশলের পুরোনো পদ্ধতি হচ্ছে প্রতিরোধ। এটি প্রতিপক্ষকে এমন ধারণা দেয় যে, তারা কখনোই সামরিক শক্তির মাধ্যমে তাদের লক্ষ্য অর্জন করতে পারবে না। কারণ, এর প্রতিক্রিয়া হবে অপ্রতিরোধ্য।
২০২২ সালের অক্টোবরে প্রকাশিত ন্যাশনাল ডিফেন্স স্ট্র্যাটেজিতে যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী দুই বছরের জাতীয় লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ও সম্পদ বরাদ্দের কথা তুলে ধরা হয়েছে। ওই কৌশলপত্রে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, চীনের সঙ্গে উত্তেজনা ও প্রকাশ্য সংঘর্ষে জড়ানোর প্রবল শঙ্কা ও ঝুঁকি রয়েছে। এসব সংঘর্ষ সমন্বিতভাবে প্রতিরোধের আহ্বানও জানানো হয়েছে ওই কৌশলপত্রে। এর অর্থ হলো মার্কিন সামরিক, গোয়েন্দা ও কূটনৈতিক সংস্থাগুলো সম্মিলিতভাবে ঝুঁকি প্রতিরোধ করবে।
যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক সহকারী প্রতিরক্ষা সচিব এবং পেন্টাগন চিফ অব স্টাফ এরিক রোজেনব্যাচ বলেন, ‘চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে সংঘাত এড়ানোর জন্য মার্কিন সামরিক বাহিনী তিনটি লক্ষ্যের ওপর দৃষ্টি দিয়েছে।’
নতুন কর্ম‑পরিকল্পনা
সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান থেকে দূরে সরে এসে যুক্তরাষ্ট্র এখন নতুন কৌশলের আশ্রয় নিয়েছে। তারা বুঝে গেছে চীন, রাশিয়া কিংবা অপরাপর ছোট ছোট সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোকে মোকাবিলা করতে হলে জলে, স্থলে, আকাশে, মহাকাশে এমনকি অনলাইনেও লড়াই করতে হবে।
পেন্টাগনের প্রথম কৌশল হচ্ছে, বিশ্বজুড়ে যত দ্রুত সম্ভব মার্কিন সেনাবাহিনী মোতায়েন করা। এটির নাম দিয়েছে তারা ‘গতিশীল শক্তির কর্মসংস্থান’। এতে যুক্তরাষ্ট্রের যেসব মিত্রদেশ চীন ও রাশিয়ার কাছ থেকে হুমকি পাচ্ছে, তারা আশ্বস্ত বোধ করবে।
উদাহরণ হিসেবে পোল্যান্ডের কথা বলা যায়। দেশটিতে যুক্তরাষ্ট্র এরই মধ্যে ১০ হাজার মার্কিন সেনা মোতায়েন করেছে। এই সৈন্যরা পূর্ব ইউরোপে অপেক্ষাকৃত দুর্বল অবস্থায় থাকা ন্যাটো মিত্রদের মনোবল বাড়াবে। একই সঙ্গে রাশিয়াকেও একটি শক্ত বার্তা দেওয়া যাবে।
দ্বিতীয় কৌশল হচ্ছে, কর্মী ও ক্ষমতার হস্তান্তর, আমেরিকা যার নাম দিয়েছে ‘মাল্টি ডোমেইন অপারেশন’। এই কৌশলের মধ্যে রয়েছে জল, স্থল, আকাশ, মহাকাশ ও সাইবার স্পেসে কীভাবে লড়াই করা যায়, তা নিয়ে বিভিন্ন দেশের দূতাবাস ও ইউনিটগুলোর সঙ্গে বিশদ পরিকল্পনা করা।
এই কৌশলের মাধ্যমে আমেরিকার নিরাপত্তা সুরক্ষিত হবে এবং বিভিন্ন দেশের হুমকি মোকাবিলা সহজ হবে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, মার্কিন নৌবাহিনীর প্রতি যেসব চ্যালেঞ্জ রয়েছে, সেগুলো সরাসরি মোকাবিলা না করে বরং সাইবার হামলা ও মহাকাশ থেকে উত্তর দেওয়া যাবে। এতে সবেচেয়ে উপকার যেটি হবে, সেটি হচ্ছে–আমেরিকার মিত্র তাইওয়ানে সামরিক অভিযান চালাতে চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মি অন্তত দুবার চিন্তা করবে। আর চীন যদি অভিযানের পরিকল্পনা করেও থাকে, যুক্তরাষ্ট্র সাইবার হামলা ও মহাকাশ থেকে হামলা চালিয়ে চীনের সামরিক যোগাযোগ ব্যবস্থাগুলোকে ধ্বংস করে দিতে পারবে।
আধুনিকায়নে বিনিয়োগ
সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, চীনের সেনা, নৌ, বিমান ও পারমাণবিক বাহিনীর কর্মীদের সক্ষমতা আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাদের সক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্রের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে বলে অনুমান করা হচ্ছে। চীনাদের এই উন্নতি নিঃসন্দেহে যুক্তরাষ্ট্রের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলে দিয়েছে। তাই যুক্তরাষ্ট্র এখন তাদের বাহিনীকে আরও আধুনিক করতে উঠেপড়ে লেগেছে। চলতি বছরের বাজেটে মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগের জন্য ২৩৪ দশমিক ৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এটি আগের বছরের বাজেটের তুলনায় ১০ শতাংশ বেশি।
এই বিপুল বরাদ্দের কিছু অংশ দিয়ে এফ‑৩৫ ফাইটার জেট তৈরি ও পরমাণুচালিত সাবমেরিন তৈরির সিদ্ধান্ত নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। সাবমেরিনগুলো জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও অস্ট্রেলিয়ার মতো প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে মোতায়েন করা হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এসব সাবমেরিন মোতায়েনের মাধ্যমে শত্রুপক্ষের সামনে নিজেদের শক্তিমত্তা প্রদর্শন এবং একই সঙ্গে কিছুটা ভয় সৃষ্টি করতে চায় আমেরিকা।
তবে গত দশ বছরে চীন যেভাবে পরমাণু অস্ত্র বাড়িয়েছে, তাতে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন মার্কিন নীতিনির্ধারকেরা। এই উদ্বেগ থেকেই ২০২২ সালে প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রশাসন আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, সাবমেরিন থেকে উৎক্ষেপণ করা ক্ষেপণাস্ত্র এবং দূরপাল্লার পারমাণবিক বোমারু বিমান সমন্বিত ‘একটি আধুনিক ও স্থিতিস্থাপক পারমাণবিক ত্রয়ীক্ষেত্র’ তৈরির আর্থিক প্রতিশ্রুতি পুনর্নবায়ন করেছে।
প্রযুক্তির অগ্রগতি
২০১৯ সালে সশস্ত্র বাহিনীর একটি আলাদা শাখা হিসবে ‘মাহাকাশ বাহিনী’ তৈরি করেছ যুক্তরাষ্ট্র, যাকে মার্কিন মহাকাশভিত্তিক সম্পদ রক্ষার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তখন থেকে এই বাহিনী যুক্তরাষ্ট্রকে যাবতীয় সাইবার হামলা থেকে রক্ষা করা, হ্যাকারদের প্রতিহত করা, প্রয়োজন অনুযায়ী ইন্টারনেট সংযোগকে ব্যাহত করাসহ নানা বিষয় নিয়ে নিবিড়ভাবে কাজ করছে।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, চীনের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডগুলো পর্যালোচনা করলে বোঝা যায়, তারা যেকোনো সময় বৈদ্যুতিক গ্রিডসহ মার্কিন অভ্যন্তরীণ গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোগুলোতে ধ্বংসাত্মক সাইবার হামলা চালাতে পারে। এসব হামলা প্রতিহত করার জন্য যুক্তরাষ্ট্র তার শক্তিমত্তা বাড়াচ্ছে।
মিত্র ও অংশীদারদের নিয়ে জোট
মার্কিন সামরিক বাহিনী গত চার বছরে বিশ্বের বিভিন্ন মিত্র দেশের সঙ্গে জোট জোরদারের চেষ্টা করেছে। এ ছাড়া ২০২২ সালে রাশিয়া ইউক্রেনে যুদ্ধ শুরু করার পর ন্যাটোর সদস্য পদ বাড়িয়েছে এবং ন্যাটোর সৈন্য সংখ্যাও বাড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ন্যাটোর প্রতি তার সমর্থন আরও বাড়িয়েছে এবং পূর্ব ইউরোপে ন্যাটোতে মার্কিন সেনা মোতায়েন বাড়িয়েছে। শুধু তাই নয়, ইউরোপীয় প্রতিরক্ষা উদ্যোগের জন্য যুদ্ধবিমান ও যুদ্ধাস্ত্র কেনার প্রয়োজনে ৩ বিলিয়ন ডলার দিয়েছে।
এদিকে এশিয়ায় ভারত মহাসাগরের চারপাশে এবং প্রশান্ত মহাসাগরজুড়ে প্রায়ই সামরিক মহড়া চালাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। এ ছাড়া জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও ফিলিপাইনের সঙ্গে যৌথভাবে নিয়মিত সামরিক মহড়া চালাচ্ছে। বলার অপেক্ষা রাখে না, চীনা সামরিক প্রভাব ও রাজনৈতিক প্রভাব মোকাবিলার জন্যই যুক্তরাষ্ট্র এসব মহড়া চালাচ্ছে।
এ ছাড়া যুক্তরাজ্য ও অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গেও জোটগত সম্পর্ক উন্নয়নে মনোযোগী হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। অস্ট্রেলিয়ার নৌবাহিনীর কাছে ২০৩০ সালের মধ্যে পাঁচটি পরমাণুচালিত সাবমেরিন বিক্রির কথাও জানিয়েছে।
সার্বিকভাবে এই সবগুলো উদ্যোগ বিশ্লেষণ করলে সহজেই বোঝা যায়, যুক্তরাষ্ট্র তার সন্ত্রাসবাদবিরোধী নীতি থেকে সরে এসেছে। দেশটি এখন চীন, রাশিয়াসহ সারা বিশ্বের শত্রুপক্ষের সঙ্গে প্রকাশ্য সংঘাত এড়িয়ে কৌশলগত লড়াইয়ের দিকে গুরুত্ব দিয়েছে। কিন্তু পৃথিবীর ভূ‑রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জগুলো তো সরলরৈখিক নয়। ক্ষণে ক্ষণে নতুন নতুন নিরাত্তা চ্যালেঞ্জ আবির্ভূত হচ্ছে। সেসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে যুকরাষ্ট্রকে হয়তো বর্তমান কৌশলগুলো থেকেও সরে আসতে হতে পারে।
তথ্যসূত্র: দ্য কনভারসেশন, বিবিসি, রয়টার্স ও আল জাজিরা



