বিশ্বকাপের মঞ্চে যখনই এই দুটি দল মুখোমুখি হয়, তখন ফুটবল-রোমান্টিকদের মনে একটি নামই ভেসে ওঠে—জিকো। ২০০৬ বিশ্বকাপে জাপানের ডাগআউটে দাঁড়িয়ে যিনি ব্রাজিলের জাতীয় সংগীত গেয়েছিলেন, সেই কিংবদন্তি জিকো নিজেই এবার বলছেন, এই জাপান যেকোনো পরাশক্তিকে গুঁড়িয়ে দিতে প্রস্তুত। সোমবার রাত ১১টায় নকআউটের এক হাইভোল্টেজ ম্যাচে মুখোমুখি হচ্ছে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল এবং ফুটবলের নতুন পাওয়ারহাউস জাপান। একদিকে সাম্বার ছন্দ, অন্যদিকে সামুরাইয়ের গতি। আসলেই কি এবার ইতিহাস বদলে দেবে জাপান? নাকি হেক্সা মিশনের পথে আরও একবার এশিয়ান বাধা অনায়াসে পার হবে সেলেসাওরা? আজকের আলোচনা এই দুই দলের শক্তি আর ট্যাকটিক্যাল যুদ্ধ নিয়ে।
জাপান কেন ‘এশিয়ার ব্রাজিল’
জাপানকে কিন্তু শুধু শুধু ‘এশিয়ার ব্রাজিল’ বলা হয় না। ১৯৯১ সালে যখন ব্রাজিলের কিংবদন্তি জিকো জাপানি ফুটবল লিগে যোগ দেন, তখন থেকেই জাপানি ফুটবলে লাতিন শৈলীর বীজ বপন করা হয়েছিল। আজ ৩৬ বছর পর, জাপানের ফুটবল এমন এক পর্যায়ে গিয়েছে, যা অনেকটাই ব্রাজিলের সোনালী অতীতের ‘জোগো বোনিতো’র মতো। তিউনিশিয়ার বিপক্ষে ৪-০ গোলের জয় কিংবা সবশেষ সুইডেনের বিপক্ষে ১-১ ড্রয়ের ম্যাচে দাইজেন মায়েদার গোলটা খেয়াল করেছেন? রিতসু দোয়ান এবং আয়াসে উয়েদার সেই ব্যাকহিল আর নিখুঁত ওয়ান-টু পাসের কম্বিনেশন—এ যেন হুবহু সাম্বা ফুটবলের এশিয়ান সংস্করণ। পরিসংখ্যান বলছে, কাতার বিশ্বকাপ থেকেই জাপান নিজেদের ট্যাকটিকসে এক অবিশ্বাস্য পরিবর্তন এনেছে। তারা এখন শুধু রক্ষণাত্মক ফুটবল খেলে কাউন্টার অ্যাটাক করে না; তারা ইউরোপের বড় দলগুলোর বিপক্ষে গড়ে ৫৫ থেকে ৬০ শতাংশ বল পজেশন ধরে রেখে ম্যাচ ডমিনেট করে।
ইউরোপীয় বিপ্লব বনাম ব্রাজিলের ঐতিহ্য
চলুন সরাসরি অফিশিয়াল ডেটায় চোখ ফেরানো যাক। ২০০৬ সালের বিশ্বকাপে যে জাপানি দলটা ব্রাজিলের কাছে ৪-১ গোলে হেরেছিল, সেই দলের সাথে এই দলের আকাশ-পাতাল তফাত। কেন? ২০০৬ সালে জাপানের স্কোয়াডের সিংহভাগ খেলোয়াড় খেলতেন ঘরোয়া জে-লিগে। আর ২০২৬ বিশ্বকাপের এই দলে থাকা ২৬ জন খেলোয়াড়ের মধ্যে ২৩ জনই খেলছেন ইউরোপের শীর্ষ লিগগুলোতে! বুন্দেসলিগা, সেরি-এ কিংবা ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের মতো কঠিন মঞ্চে প্রতি সপ্তাহে তাঁরা খেলছেন।
জিকোর মতে, জাপানের প্রধান ঘাটতি ছিল মনস্তাত্ত্বিক। কিন্তু এখনকার স্কোয়াড সম্পূর্ণ আলাদা। কাতার বিশ্বকাপে জার্মানি এবং স্পেনের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের বিপক্ষে পিছিয়ে পড়েও তারা ম্যাচ জিতেছে। এমনকি গত কয়েক বছরে তারা জার্মানি, স্পেন, ইংল্যান্ডের মতো দলগুলোকে হারিয়ে প্রমাণ করেছে—জাপান এখন জায়ান্ট কিলার! ২০১৮ সাল থেকে জাপানের ডাগআউটে থাকা কোচ মোরিয়াসু জে-লিগে জিকোর বিপক্ষে খেলেছেন। তিনি খুব ভালো করেই জানেন লাতিন ট্যাকটিকস কীভাবে ভাঙতে হয়। কাতার বিশ্বকাপের পর চুক্তি নবায়ন করা প্রথম জাপানি কোচ তিনি, যাঁর অধীনে জাপান দল একটি সুশৃঙ্খল মেশিনে পরিণত হয়েছে।
ব্রাজিলের এক্স-ফ্যাক্টর
কিন্তু প্রতিপক্ষের নাম যখন ব্রাজিল, তখন যেকোনো হিসাব উল্টে যেতে বাধ্য। কার্লো আনচেলত্তির অধীনে সেলেসাওরা এখন অনেক বেশি বাস্তববাদী এবং ঘাতক। আনচেলত্তি এবং জাপানের কোচ মোরিয়াসু—দুজনেই কিন্তু খেলোয়াড় জীবনে রক্ষণাত্মক মিডফিল্ডার ছিলেন। তাই মাঠের দাবার বোর্ডে দুজনের চাল হবে দেখার মতো। ব্রাজিলের সবচেয়ে বড় শক্তি তাদের উইং-প্লে এবং কাউন্টার-প্রেসিং। জাপান যেখানে বল পজেশন ধরে রেখে আক্রমণ সাজাতে পছন্দ করে, ব্রাজিলের গতিশীল ফরোয়ার্ড লাইন সেখানে যেকোনো মুহূর্তে জাপানের ডিফেন্সিভ লাইন ভেঙে দিতে পারে। বিশেষ করে ট্রানজিশন পিরিয়ডে ব্রাজিলের উইঙ্গারদের গতি হবে জাপানের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। সোমবারের ম্যাচে জাপানের ডিফেন্স যদি একটুও লিকেজ তৈরি করে, তবে সেলেসাওরা সেকেন্ডের ভগ্নাংশে ম্যাচ নিজেদের পকেটে পুরে নেবে।
ইতিহাস কি বদলাবে?
বিশ্বকাপের মঞ্চে এর আগে মাত্র একবারই এই দুই দল মুখোমুখি হয়েছিল, ২০০৬ সালে। সেবার ব্রাজিল জিতেছিল ৪-১ গোলে। দীর্ঘ ২০ বছর পর আবার নকআউটের মহারণ। জাপান সারা বছর ধরে চিৎকার করে বলছে—তারা এবার বিশ্বকাপ জিততে এসেছে। আর নিজেদের সেই দাবির সত্যতা প্রমাণ করার জন্য ব্রাজিলের চেয়ে বড় পরীক্ষা আর কী হতে পারে? হাই রিস্ক, হাই রিওয়ার্ড—জাপান যদি তাদের স্বভাবজাত আক্রমণাত্মক ও নির্ভীক ফুটবল খেলে, তবে সোমবার টেক্সাসের স্টেডিয়ামে আমরা শতাব্দীর অন্যতম সেরা ম্যাচ দেখতে যাচ্ছি।



