
একদিকে বিয়ের কাজ চলছে। অন্যদিকে হারিয়ে গেছে বন্দুক। পুলিশ চলে এসেছে বাসায়। এখন বিয়ের কাজ আগে হবে, নাকি বন্দুক খুঁজতে হবে? এভাবে এক দোটানার মধ্যেই শুরু হয় গল্প। আর এরপর ক্রমে এক রহস্যাবৃত আবহে ঢুকে পড়তে হয় দর্শকদের। পরতে পরতে চমকে দিয়ে এমন এক সত্য উদঘাটিত হয় শেষে, যখন বলতেই হয় যে—‘যে সত্য কোনো কাজে আসে না, তাকে জ্বলে-পুড়ে শেষ হতে দাও!’
বলা হচ্ছে ‘কিষ্কিন্ধা কান্দাম’ নামের একটি সিনেমার কথা। ভারতের মালায়লম ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির এই ছবিটি চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে মুক্তি পায় স্থানীয় সিনেমা হলগুলোতে। সম্প্রতি এটি ওটিটি প্ল্যাটফর্ম ডিজনি প্লাস হটস্টার-এ মুক্তি পেয়েছে। সিনেমাটির দৈর্ঘ্য প্রায় ১২৫ মিনিট। এর পরিচালক দীনজিথ আয়াথান। আর গল্প লিখেছেন বাহুল রমেশ।

আগেই জেনেছেন যে, বিয়ে আর বন্দুক খোঁজার কাজ পাশাপাশি চলছিল। আসলে বিয়ের আনন্দে কিছুটা বাদ সেধেছিল হারিয়ে যাওয়া বন্দুক। বিয়ে হচ্ছিল অজয়চন্দ্রনের, দ্বিতীয় বিয়ে। স্বাক্ষর করে বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করার ঠিক আগেই চলে আসে পুলিশের ফোন। স্থানীয় নির্বাচনের আগেই লাইসেন্স করা বন্দুক জমা দেওয়ার নির্দেশ আসে। আবার ওই দিনই ছিল শেষ দিন। ফলে পুলিশেরও ছিল তাড়াহুড়ো। সেই তাড়ায় নিজেরাই বন্দুক সংগ্রহ করতে অজয়ের বাসায় চলে যায় তারা। কিন্তু বাসায় একা ছিলেন বন কর্মকর্তা অজয়ের বাবা আপ্পু পিল্লাই। এই চরিত্রটি আবার বেশ বদমেজাজীও। একসময় সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা ছিলেন, শৃঙ্খলাও কঠোর, মেজাজও সেরকম। ফলে পুলিশের সঙ্গে কী করে বসে বাবা, সেই দুশ্চিন্তাতেই কোনো রকমে বিয়ে সেরে বাড়ির পথ ধরে অজয়। কিন্তু ফেরার পথে বাবার সাথে টেলিফোন কথোপকথনেই স্পষ্ট হয়ে যায়, বেশ কিছুদিন হয় হারিয়ে গেছে বন্দুক! কিন্তু পুলিশকে তা জানানো হয়নি ইচ্ছে করেই।
এভাবেই ‘কিষ্কিন্ধা কান্দাম’ সিনেমার প্রথম রহস্যাবৃত বিষয়টি সামনে আসে। কীভাবে হারিয়েছে বন্দুক? কেন সেই বন্দুক হারানোর খবর বাবা-ছেলে লুকিয়ে রাখতে চায়? কেন বাবার অদ্ভুত আচরণ নিয়ে কথা বলতে চায় না ছেলে? দ্বিতীয় স্ত্রীকে পরিবারের সবকিছু কি খুলে বলছে না অজয়? কেন নিজের প্রথম সন্তানের হারিয়ে যাওয়া নিয়ে নীরবে কেঁদে যাওয়া ছাড়া ঠিকঠাক অনুসন্ধানে কিছুটা অনীহা অজয়ের?

সময়ের সাথে সাথে গল্প যত এগিয়েছে, এসব প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত হয় আরও আরও প্রশ্ন। তাতে অরণ্য, পরিবার, বন্দুক ও বানর একাকার হয়ে যায়। বানর কেন? কারণ গাছে গাছে ঝোলা এক বন্য বানরের হাতে বন্দুক বা পিস্তল থাকার ছবি দেখেই যে বাবা-ছেলের ওপর পুলিশ ও প্রশাসনের চাপ আরও বাড়ে। তাদের সন্দেহ হয় বাবা-ছেলের হারিয়ে যাওয়া পিস্তলের গল্পে। শুরু হয় তল্লাশি, অনুসন্ধান। আর এতেই বেরিয়ে আসে এমন এক সত্য, যা অজয়ের নববধূকে এক নিদারুণ বাস্তবতার মুখোমুখি করে।
পুরো সিনেমাতে আসলে গল্পই মূল নায়ক। মালায়লম ভাষার বেশির ভাগ সিনেমাতেই এই গুণ দারুণভাবে উপস্থিত থাকে। ‘কিষ্কিন্ধা কান্দাম’-এও এর ব্যতিক্রম হয়নি। এর সঙ্গে ছিল দুর্দান্ত সিনেমাটোগ্রাফি। এত সবুজ পর্দায় দেখলে সত্যি ভালোই লাগে। আলাদা করে বলতে হয় সিনেমার আবহসংগীতের কথা। বিশেষ করে ক্লাইম্যাক্সে এর ব্যবহার একেবারে নিখুঁত হয়েছে।
অভিনয়ের ক্ষেত্রে মূলত দুজন অভিনয়শিল্পীর উল্লেখ করতেই হয়। অজয় চরিত্রে আসিফ আলী ও আপ্পু পিল্লাইয়ের ভূমিকায় বিজয় রাঘবন। আসিফ স্বভাবতই দারুণ অভিনয় করেছেন। বাবা ও ছেলের প্রতি একজনের আবেগ, ভালোবাসা ও নিখাদ অসহায়ত্ব বোঝাতে পেরেছেন কতটা অবলীলায়! অন্যদিকে বিজয় রাঘবন অভিনয় দক্ষতার এক প্রদর্শনী আয়োজন করেছিলেন যেন! এতটা সাবলীল অভিনয় সচরাচর দেখা যায় না।
‘কিষ্কিন্ধা কান্দাম’ আসলে একটি নিখুঁত চিত্রনাট্যের সিনেমা। চিত্রনাট্যে খুঁত না থাকায় পরিচালনা ও অভিনয়েও লেটার মার্ক পাবে এই ছবি। শেষটায় দর্শকদের চোখ ভিজিয়ে দেবে পর্দার বাবা-ছেলের আবেগময় রসায়ন। আর কানে বাজবে ওই একটি কথাই—‘যে সত্য কোনো কাজে আসে না, তাকে জ্বলে-পুড়ে শেষ হতে দাও!’


রঙিলা কিতাব কতটা রঙিন ?
পুলিশ কর্মকর্তার বাড়ির ছাদে এ কার বস্তাবন্দী লাশ?
