
একই সিরিজে আছেন মাহফুজ আহমেদ ও অপি করিমের মতো অভিনেতা-অভিনেত্রী। শুধু কি তাই? পরিচালক হিসেবে শাফায়েত মনসুর রানার নামও দেখা গেল বেশ খানিকটা বিরতির পর। এর পাশাপাশি ছিল অনেক জাঁদরেল অভিনয়শিল্পীর নাম। ফলে দর্শকদের মধ্যে আগ্রহ সৃষ্টি হওয়াটাই স্বাভাবিক। এখন কথা হলো, সেই আগ্রহ কি সন্তুষ্টিতে রূপ নিল?
স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম হইচই-তে সদ্যই মুক্তি পেয়েছে নতুন ওয়েব সিরিজ ‘অদৃশ্য’। আট পর্বের সিরিজ। কোনো পর্বই ২৫-৩০ মিনিটের বেশি দৈর্ঘ্যের নয়। ওটিটি মাধ্যমের হিসাবে বেশ আদর্শ দৈর্ঘ্যের কনটেন্টই বলা চলে। যদিও সাম্প্রতিককালের আন্তর্জাতিক ওটিটি কনটেন্টের দৈর্ঘ্যে বেশ পরিবর্তন এসেছে। বিভিন্ন ওয়েব সিরিজে ঘণ্টাব্যাপী এপিসোড প্রায়ই দেখা যায়। তবে বাংলা ওয়েব সিরিজ এখনও ২৫/৩০ মিনিটেই আটকে আছে। এ ক্ষেত্রে গল্পও একটি কারণ বটে।
গল্পের প্রসঙ্গ যখন উঠলই, তখন ‘অদৃশ্য’ সম্পর্কে জানিয়েই দেওয়া যাক। ওটিটি প্ল্যাটফর্ম হইচই বলছে—‘আনিস, এক সফল ব্যবসায়ী এবং উচ্চাকাঙ্ক্ষী রাজনীতিবিদ হঠাৎ অপহৃত হলে তাঁর জীবন এক গোলকধাঁধায় আটকে পড়ে। ভাগ্যের পরিহাস থেকে বাঁচতে অক্ষম আনিস ক্রমশ জড়িয়ে পড়তে থাকে একরাশ প্রতিহিংসা, বিশ্বাসঘাতকতা ও স্বার্থের খপ্পরে। সে কি আসল ষড়যন্ত্রকারীর মুখোশ উন্মোচন করতে পারবে?’

এই আসল যড়যন্ত্রকারীকে ধরার দৌড়টা ‘অদৃশ্য’ ওয়েব সিরিজের শেষ পর্ব পর্যন্ত জারি ছিল। পরিচালক তা ধরে রাখতে পেরেছেন। অন্তত শেষ পর্ব পর্যন্ত দর্শকদের পরিপূর্ণ কোনো সিদ্ধান্তে তিনি আসতে দেননি। শেষ পর্বের শেষটাও আকর্ষণীয় বটে। পরিচালককে এর কৃতিত্ব দিতেই হচ্ছে, কারণ এই সিরিজের গল্প এবং চিত্রনাট্যও তাঁর।
‘অদৃশ্য’ সিরিজের শুরুটা বেশ তড়িৎ। দ্রুতই ব্যবসায়ী আনিসের উচ্চাভিলাষ দেখিয়ে রাজনীতির মাঠ ঘুরিয়ে ঢুকে যাওয়া হয়েছে অপহরণে। এরপরই ষড়যন্ত্র ও এর কুশীলবদের খোঁজা হয়েছে লম্বা সময় ধরে। জনরার সঙ্গে তাল মিলিয়ে সিরিজের ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোরও ভালো ছিল। ফলে আবহটা ছিল একেবারে টানটান।
তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে বেশি টানতে গিয়ে গল্পের সুতো ছিঁড়েও গেছে। ‘অদৃশ্য’-এর ৮টি পর্বেরই প্রয়োজন ছিল কিনা, সেটি একটি বড় প্রশ্ন। হয়তো গল্পের খেই হারানো আটকাতে সিরিজটি ৬ পর্বে শেষ করলেও মন্দ হতো না। এতে সুতোর টানটাও বজায় থাকত দারুণ।
‘অদৃশ্য’ সিরিজে মানুষের উধাও হয়ে যাওয়ার কথাই বলা হয়েছে। সেই অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার গল্প বলতে গিয়ে, বর্তমানের বাস্তব নানা ঘটনাকেও টেনে আনা হয়েছে। কোথাও কোথাও তা প্রাসঙ্গিক হয়েছে অবশ্যই। আবার কোথাও হালের ভাইরাল কোনো ঘটনাকে সরাসরি দৃশ্যায়ন করা হয়েছে। এমনকি এ দেশের মানুষের মোবাইলে হরদম চলা বা ট্রোলের বিষয়বস্তুকেও হুবহু দৃশ্যে আনা হয়েছে, একেবারে বক্তব্যসহ। এতে সব সময় যে গল্পের প্রবাহমানতা অক্ষুণ্ণ থেকেছে, তা কিন্তু নয়। ওটিটিতে সব সময়ই নতুন কিছু দেখাতে হয়, এটিই এই মাধ্যমের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। কয়েক বছর ধরে মানুষের মোবাইলে মোবাইলে ঘোরা কোনো রাজনৈতিক মোনাজাতের ‘কপি’ যদি আবার কোনো সদ্য মুক্তিপ্রাপ্ত ওয়েব সিরিজেও দেখতে হয়, তবে তা কি খুব একটা নতুনত্ব দাবি করে?
অদৃশ্য যেমন মানুষ হয়েছে, তেমনি হুট করে চরিত্র আমদানির ঘটনাও ঘটেছে শাফায়েত মনসুর রানার ওয়েব সিরিজে। এমনভাবে ষড়যন্ত্রতত্ত্ব দেওয়া ‘মুশকিল আসান’ চরিত্র নিয়ে আসা হয়েছে, যার কোনো ন্যূনতম অতীত সূত্র আগের কোনো পর্বেই পাওয়া যায়নি। আর তাতেই যেন মূল চরিত্র আনিসের চোখ খুলে গেল! তাও আবার সেই চোখ খোলা হলো শুধু কললিস্টের সূত্র ধরেই। সাতটি পর্ব ধরে জম্পেশ সমাপ্তির অপেক্ষায় থাকা দর্শকের জন্য এ সত্যিই অনাকাঙ্ক্ষিত। কেন জানি মনে হচ্ছিল, রহস্যের ছড়ানো জাল গুটিয়ে আনা হচ্ছে পরিকল্পনা ছাড়াই!
অভিনয়শিল্পীরা অবশ্য চেষ্টা করেছেন ঢের। ব্যবসায়ী আনিসের চরিত্রে মাহফুজ আহমেদ অনবদ্য ছিলেন। তাঁর অভিনয়ের ধার কমেনি একটুও। মাহফুজের যোগ্য প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন অপি করিম। আপাত কোমল চরিত্রের কঠিন হয়ে ওঠার যাত্রায় তিনি ছিলেন অসাধারণ। আরও ছিলেন শম্পা রেজা, শহীদুজ্জামান সেলিম, তানিয়া আহমেদ, সুমন আনোয়ার, আহমেদ রুবেল প্রমুখ। রাজনীতিবিদদের চরিত্রে শম্পা রেজা ও শহীদুজ্জামান সেলিম ছিলেন যথার্থ। তবে তাঁদের আরও জায়গা ছাড়া উচিত ছিল। একই মন্তব্য খাটে তানিয়া আহমেদ ও আহমেদ রুবেলের ক্ষেত্রেও। এত ফ্ল্যাট চরিত্রে এই দুজন অভিনয়শিল্পীকে নেওয়ার কোনো অর্থ নেই। কারণ তাঁদের অভিনয় করার সুযোগই ছিল একেবারে কম। একে মেধার অপচয় তাই বলা যেতেই পারে। তবে যে যেখানে যতটুকু পেরেছেন, চেষ্টার কোনো কমতি রাখেননি। তাঁদের অভিনয়ই ‘অদৃশ্য’ ওয়েব সিরিজের সবচেয়ে উপভোগ্য বিষয়।

‘অদৃশ্য’ ওয়েব সিরিজের শেষ পর্বে নতুন লড়াইয়ের আভাস মিলেছে। ষড়যন্ত্রের গোড়াও বোঝা গেছে বেশ। অর্থাৎ, নতুন সিজনের ইঙ্গিত আছে ভালোমতোই। প্রত্যাশা একটাই, সেখানে যেন গল্পের সুতোটা বেশি টানটান রাখতে গিয়ে ছিঁড়ে না যায়!


নিশোর ‘সাড়ে ষোলো’ কি ষোলো আনাই খাঁটি?
হাশমি-প্রভাসের পর শাকিবের বিপরীতে, কে এই সোনাল
