ডেঙ্গু প্রতিরোধে করণীয় কী হতে পারে

আপডেট : ২৩ ডিসেম্বর ২০২৪, ০৯:৪৭ এএম

ডেঙ্গুতে এখন সারা বছর মানুষ আক্রান্ত হচ্ছেন। ডেঙ্গু বাংলাদেশে একটি অন্যতম প্রধান জনস্বাস্থ্য সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং দেশের স্বাস্থ্য ও অর্থনীতিতে এর নেতিবাচক প্রভাব দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। চলতি বছর ঢাকাসহ সারা দেশে এখন পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে ১ লাখ ১৯৪ রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়েছেন ৯৮ হাজার ৫৬৭ জন।

গত বছর ৩ লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। আর ১ হাজার ৭০৫ জনের মৃত্যু হয়। চলতি বছর এখন পর্যন্ত এডিস মশাবাহিত রোগটিতে ৫৬৩ জনের মৃত্যু হয়েছে।

বাংলাদেশে ডেঙ্গুর চারটি সেরোটাইপই শনাক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে ২০০২ সাল পর্যন্ত ডেন-৩ ছিল প্রধান সেরোটাইপ। পরবর্তীতে ২০১৩-২০১৬ সময়কালে প্রধান সেরোটাইপ ছিল ডেন-২ এবং কিছু ডেন-১ সেরোটাইপও পাওয়া যায়। ২০১৭ সালে ডেন-৩ এর পুন:আবির্ভাব ঘটে যা ২০১৯ এবং ২০২২ সালের প্রাদুর্ভাবে প্রধান সেরোটাইপ ছিল। এর পাশাপাশি ডেন-৪ এর আবার আবির্ভাব ঘটে যেটি শেষ শনাক্ত হয়েছিল ২০০২ সালে। ২০২৩ সালে ডেন-২ পুনরায় প্রধান সেরোটাইপ (৭০.২%) হিসেবে আবির্ভূত হয়। ২০২৩ সালের ডেঙ্গু প্রাদুর্ভাবের তীব্রতা আংশিকভাবে এই সেরোটাইপ প্রতিস্থাপন দ্বারা ব্যাখ্যা করা যেতে পারে কারণ এটি একটি প্রতিষ্ঠিত সত্য যে ভিন্ন সেরোটাইপের দ্বা্রা পুনরায় সংক্রমণ গুরুতর রোগের ঝুঁকি বাড়ায়।

ডেঙ্গুর চারটি সেরোটাইপের (ডেনভি-১, ডেনভি-২, ডেনভি-৩ ও ডেনভি-৪) মধ্যে, একজন মানুষের একটি সেরোটাইপের দ্বারা একবারই সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। ডেনভি-১ ধরনে একবার আক্রান্ত হলে ওই ব্যক্তি আর কখনো একই ধরনে আক্রান্ত হবেন না। কারণ, তাঁর শরীরে ডেনভি-১ প্রতিরোধী ব্যবস্থা (অ্যান্টিবডি) গড়ে ওঠে। কিন্তু তাঁর অন্য ধরন দিয়ে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে, অর্থাৎ একজন ব্যক্তির মোট চারবার ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি আছে। ডেঙ্গুর ভিন ভিন্ন সেরোটাইপের দ্বারা, একাধিকবার আক্রান্ত হলে জটিলতা বাড়ে।

এ বছর ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ৭০ শতাংশই ডেনভি-২। ডেনভি-৩ ও ডেনভি-৪ দিয়ে আক্রান্ত হচ্ছেন যথাক্রমে ২০ শতাংশ ও ৯ শতাংশ। বাকি ১ শতাংশ আক্রান্ত হচ্ছেন ডেনভি-১ ধরণে।

২০২৪ সালের জুলাই মাসে আইইডিসিআর এর প্রকাশিত একটি প্রবন্ধ থেকে জানা যায়, বাংলাদেশে ডেঙ্গুর মৌসুম পরিবর্তন হয়েছে। ২০২২ সাল থেকে শুরু হয়ে ২০২৩ সালেও ডেঙ্গু সংক্রমণের মৌসুম পরিবর্তিত হয়ে জুলাই/ আগস্ট থেকে সেপ্টেম্বর/ অক্টোবর এ হয়েছে। এছাড়াও একটা বড় সংখ্যক রোগী নভেম্বর এবং ডিসেম্বর মাসেও পাওয়া যায়। এর পিছনে নানাবিধ কারণ থাকতে পারে, যার মাঝে বৃষ্টির ধরণ পরিবর্তন ও অপেক্ষাকৃত উষ্ণ তাপমাত্রা অন্যতম।

Graphএই ডিসেম্বর মাসেও ডেঙ্গুতে এত মৃত্যুর পেছনে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সম্মিলিত ব্যর্থতাই দায়ী। যেমন মশকনিধনের ব্যর্থতা, যার কারণ, যেসব ওষুধ দেওয়া হচ্ছে, সেগুলোর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন আছে। সেগুলো যথাযথভাবে প্রয়োগ এবং এগুলোর কার্যকারিতাও দেখা হচ্ছে কি না, তা প্রশ্নসাপেক্ষ। বিক্ষিপ্তভাবে কিছু কীটনাশক ছিটানো ছাড়া সংঘবদ্ধভাবে কোনো কাজ নেই।

এ প্রসঙ্গে ঢাকায় এ বছর নভেম্বরে আইইডিসিআরের পরিচালিত জরিপে দেখা যায়, রাজধানীর ৯৯টি ওয়ার্ডের মধ্যে ৫৬টিতে এডিসবাহী মশার ঘনত্ব বা ব্রুটো ইনডেক্স ২০-এর বেশি। এর মানে দাঁড়ায়, ঢাকার বেশিরভাগ এলাকাতেই এডিস মশার উপস্থিতি চরম ঝুঁকিপূর্ণ স্তরে। এমনকি কোনো কোনো এলাকায় এডিসের ঘনত্বের মাত্রা ৭০।

এই পরিস্থিতি উত্তরণে বর্তমানে খুব দ্রুত কীটতত্ত্ববিদ দিয়ে দল গঠন করে এডিস মশার প্রজননস্থল (বংশবৃদ্ধির হট স্পট) চিহ্নিত করে মশার লার্ভা ধ্বংস করার ব্যবস্থা নিতে হবে। এই কাজে প্রতিটি ওয়ার্ডে কীটতত্ত্ববিদদের সাথে শিক্ষার্থীদের কাজে লাগানো যেতে পারে।

পরবর্তী বছর ডেঙ্গু সংক্রমণ মোকাবেলায় ২০২৫ সালের শুরু থেকেই উদ্যোগ নিতে হবে। ডেঙ্গুর টিকা আমদানি করে তা প্রদানের উদ্যোগ নিতে হবে। এখন পর্যন্ত কিউডেঙ্গা এবং ডেংভাক্সিয়া নামে ২ টি ডেঙ্গু ভ্যাক্সিন কিছু দেশে অনুমোদিত এবং প্রয়োগ করা হয়েছে।

কিউডেঙ্গা (জাপানি টাকেদা ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি দ্বারা প্রস্তুত) একটি লাইভ অ্যাটেনুয়েটেড ভ্যাকসিন। এটি প্রাপ্তবয়স্ক, কিশোর এবং ৪ বছরের বেশি বয়সী শিশুদের জন্য নির্দেশিত। ভ্যাকসিনের দুটি ডোজ ০ এবং ৩ মাসে দিতে হয়। ইন্দোনেশিয়ার এফডিএ আগস্ট, ২০২২ এ ৬-৪৫ বছর বয়সী ব্যক্তিদের কিউডেঙ্গা ব্যবহারের জন্য অনুমোদন দিয়েছে। এই ভ্যাকসিনটি ৪ ডিসেম্বর, ২০২২ এ ইউরোপীয় ইউনিয়ন দ্বারা অনুমোদিত হয়েছে। ২০২৩ সালে ব্রাজিলে ডেঙ্গু সংক্রমণ বৃদ্ধির কারণে ব্রাজিল সরকার জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে এবং ১০-১৪ বছর বয়সী শিশু এবং কিশোর-কিশোরীদের জন্য মার্চ, ২০২৩ সালে কিউডেঙ্গা ভ্যাকসিন অনুমোদন দেয়।

ডেংভ্যাক্সিয়া হল প্রথম ইউএস-এফডিএ অনুমোদিত (মে ১, ২০১৯ তারিখে) ডেঙ্গুর ভ্যাকসিন যা সানোফি পাস্তিউর কোম্পানি দ্বারা প্রস্তুতকৃত। এই কোয়াড্রিভ্যালেন্ট ভ্যাকসিনটি ৩ টি ডোজে ০, ৬ এবং ১২ মাসে দিতে হয়। এটি একটি লাইভ অ্যাটেনুয়েটেড ভ্যাকসিন যা বর্তমানে ৬-১৬ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে এবং যার পূর্বে পরীক্ষাগারে ডেঙ্গু সংক্রমণ নিশ্চিত হয়েছে তাদেরকে ব্যবহারের জন্য অনুমোদিত। সুতরাং, এটির সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এটি প্রয়োগের আগে বয়স নির্ধারণ এবং পূর্ববর্তী সংক্রমণের প্রয়োজনীয় প্রমাণ নিশ্চিত করতে হয়।

ডেংভ্যাক্সিয়া ২০১৬ সাল থেকে ১১ টি দেশে বাণিজ্যিকভাবে পাওয়া যায়: মেক্সিকো, ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া, ব্রাজিল, এল সালভাদর, কোস্টারিকা, প্যারাগুয়ে, গুয়েতেমালা, পেরু, থাইল্যান্ড এবং সিঙ্গাপুর। এটি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রয়োজনীয় ওষুধের তালিকায় রয়েছে।

বায়োলজিক্যাল কন্ট্রোল পদ্ধতিতে এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ করার ব্যবস্থা করতে হবে। যেমন উলবেকিয়া ব্যাকটেরিয়া এডিস মশায় প্রবেশ করিয়ে উক্ত মশা পরিবেশে ছেড়ে দেয়া হলে এডিস মশার বংশবৃদ্ধি রোধ করা যায়। এই পদ্ধতিতে এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ করে ডেঙ্গু মোকাবিলা করেছে সিঙ্গাপুর, ব্রাজিল, মেক্সিকো, অস্ট্রেলিয়া, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও ফিজি।

একটি সুসমন্বিত নজরদারি ব্যবস্থার মাধ্যমে ডেঙ্গু টিকা দেয়া, ভেক্টর (মশা) নিয়ন্ত্রণে শক্তিশালী ব্যবস্থা এবং পরবর্তী বছরের শুরু থেকেই একটি শক্তিশালী ও স্থিতিশীল পরিকল্পনা, ডেঙ্গুর ভাইরাস নিয়ে গবেষণার ব্যবস্থা, করা হলে, এই জনস্বাস্থ্য হুমকিকে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে এবং ২০২৫ সালে ডেঙ্গুর প্রকোপ অনেক কমে আসবে।

লেখক: জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, পরিচালক, বিজিসি ট্রাস্ট মেডিকেল কলেজ হসপিটাল, চট্টগ্রাম

গত ১৫ মার্চ থেকে সারা দেশে নিশ্চিত হাম রোগীর সংখ্যা ১০ হাজার ৫৯ জন। আর হামের উপসর্গ দেখা গেছে ৮৩ হাজার ১৩৯ জনের দেহে। এ পর্যন্ত হাম সন্দেহে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৬৮ হাজার ৫৬ জন। আর হাসপাতাল থেকে...
দেশের মানুষ নিজ অবস্থান থেকে সচেতন না হলে ডেঙ্গু মোকাবিলা সহজ হবে না বলে মন্তব্য করেছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন।
ডেঙ্গু মোকাবিলায় নাগরিকরা সহযোগিতা না করলে প্রয়োজনে আইনি ব্যবস্থার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন। আজ শনিবার রাজধানীতে ডেঙ্গু প্রতিরোধে তিন মাসব্যাপী বিশেষ অভিযান উদ্বোধন...
ডেঙ্গু প্রতিরোধে সরকার প্রথমে মাইকিং সচেতনতা বাড়াবে। কিন্তু জনগণ সচেতন না হলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন। 
আদ-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল মোটেই সঠিক সিদ্ধান্ত হয়নি বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ড. শফিকুর রহমান। বৃহস্পতিবার নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে এক বিবৃতিতে তিনি এ মন্তব্য...
প্রস্তাবিত বাজেটে আপাতত কালো টাকা বৈধ করার সুযোগ না রাখায়, সরকারকে সতর্ক সাধুবাদ জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। একইসঙ্গে, সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন পে-স্কেল বিষয়ে...
২০২৬–২০২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটকে উচ্চাভিলাষী ও বাস্তবতা বিবর্জিত বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও সংসদ সদস্য নাহিদ ইসলাম। বৃহস্পতিবার রাতে বাজেট নিয়ে এক প্রতিক্রিয়ায়...
বাংলাদেশ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে জ্বালানি খাতের দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতা জোরদার, বৈশ্বিক সরবরাহ চেইনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা এবং প্রযুক্তিগত অংশীদারত্ব বৃদ্ধির লক্ষ্যে এক উচ্চপর্যায়ের দ্বিপক্ষীয়...
লোডিং...

এলাকার খবর