বাংলাদেশ ষড়ঋতুর দেশ হলেও বেশ কয়েক বছর ধরে নিদিষ্ট সময়ে নিদিষ্ট ঋতুর দেখা মিলছে না। জলবায়ুর পরিবর্তনের প্রভাব পড়ছে ছয় ঋতুর উপর। তাই ঋতুগুলো নিজেদের স্বমহিমায় প্রকাশিত হতে পারছে না। ফলে অসময়ে দেখা মিলছে বৃষ্টি কিংবা অত্যধিক গরম অথবা শীতের। এতে কোনো বছর হয়ত বেশি শীত পড়ছে, আবার আরেক বছরে অত্যধিক গরমে নাজেহাল হচ্ছে দেশের মানুষ।
গ্রীষ্মকালে গরম পড়বে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু বিগত কয়েক বছর ধরে গ্রীষ্মকাল দীর্ঘায়িত হয়েছে। এ বছরও ক্রমবর্ধমান তাপপ্রবাহের সম্মুখীন হয়েছে দেশের মানুষ। চলতি বছর গণমাধ্যমে প্রকাশিত একটি সংবাদের শিরোনাম দেখলে এই বছরের তাপপ্রবাহ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যাবে।
এ বছরের ৩০ এপ্রিলে প্রকাশিত একটি খবরের শিরোনাম ছিল ‘সারা দেশে হিট স্ট্রোকে ৮ জনের মৃত্যু’। এই শিরোনামের খবরের অংশবিশেষ ছিল, ‘‘দেশের ওপর দিয়ে মৃদু থেকে অতি তীব্র তাপপ্রবাহ অব্যাহত রয়েছে। আজ মৌসুমের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা যশোরে ৪৩ ডিগ্রি ৮ ডিগ্রি। যা ৩৫ বছরের মধ্যে দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা। অসহনীয় গরমে দেশের বিভিন্ন স্থানে হিট স্ট্রোকের মতো ঘটনা ঘটছে। সারা দেশে হিট স্ট্রোকে এখন পর্যন্ত রাজশাহী, সিরাজগঞ্জ, ঝিনাইদহ, নাটোর, সাতক্ষীরা ও মুন্সিগঞ্জে ৮ জনের মৃত্যু হয়েছে।’’
চলতি বছরের এপ্রিল মাসে দেশের ওপর দিয়ে বয়ে গিয়েছিল প্রচণ্ড তাপপ্রবাহ। এ মাসে টানা যে কয়দিন তাপপ্রবাহ ছিল, তা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ তাপপ্রবাহ। যে কারণে বিভিন্ন স্তরের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখতে হয়েছিল। আবার আবহাওয়া অধিদপ্তর সারা দেশে দফায় দফায় হিট অ্যালার্টও জারি করেছিল।
এ বছর অত্যধিক তাপপ্রবাহের কারণে বিপর্যস্ত ছিল জনজীবন। শিশু থেকে বৃদ্ধ কেউ এই অসহনীয় গরমের হাত থেকে রক্ষা পায়নি। বিশেষ করে শ্রমজীবী মানুষেরা বেশি ভোগান্তিতে পড়েন।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে এপ্রিলের শেষ ১৮ দিন থেকে মে মাসের প্রথম ৫ দিন পর্যন্ত টানা ২৩ দিন তাপপ্রবাহ ছিল। আর চলতি বছরের ৩১ মার্চ থেকে শুরু করে ২৬ এপ্রিল পর্যন্ত, দেশের কোথাও না কোথাও তাপপ্রবাহ চলমান ছিল। এ সময় টানা তাপপ্রবাহ ছিল ২৭ দিন।
২০২৪ সালে প্রচণ্ড তাপপ্রবাহের একটি মারাত্মক দিক ছিল ‘হিট স্ট্রোক’। কারণ হিট স্ট্রোকের ক্ষেত্রে ঠিক সময়ে চিকিৎসা না নিলে মৃত্যুও ঘটতে পারে। এছাড়া গরম বাড়লে উচ্চরক্তচাপ, হৃদ্রোগ, হাঁপানি ইত্যাদি রোগের তীব্রতাও বাড়ে। আবার অত্যধিক গরমে মানসিক স্বাস্থ্যেরও অবনতি ঘটে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও চিকিৎসক ড. লেলিন চৌধুরী মনে করেন, বৈশ্বিক তাপমাত্রা ক্রমাগতহারে বাড়ছে। ২০২৪ সাল পৃথিবীর ইতিহাসের উষ্ণতম বছর। জীবাশ্ম জ্বালানির অতি ব্যবহার, নির্বিচারে বৃক্ষনিধন ও বন উজাড়, জলাধার, নদী বিনষ্টকরণ ইত্যাদি কারণে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বাড়ছে। আবার বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির জন্য প্রাকৃতিক দুর্যোগ, যেমন: ঝড়, জলোচ্ছ্বাস, বন্যা, খরা ইত্যাদি বাড়ছে। এর ফলে মানুষের জীবনহানি, স্বাস্থ্যহানি ও রোগের মাত্রা বেড়ে যাচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, ৬৫ বছরের বেশি বয়সের মানুষের গরমজনিত কারণে মৃত্যুর হার ২০০০-২০০৪ সালের তুলনায় ২০১৭-২০২১ সালে ৮৫ শতাংশ বেড়ে গেছে।
এই জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের মতে, ‘উষ্ণতা বৃদ্ধির সূচককে থামাতে না পারলে জীবন ও সভ্যতা বিপন্ন হবে। বৈশ্বিক জলবায়ু সম্মেলন কার্বন নিঃসরণ কমাতে একমত হয়েছে। কিন্তু সেখানে কর্মকৌশল, নকশা এবং অর্থ বরাদ্দের ক্ষেত্রে মতভিন্নতা রয়ে গেছে। জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমিয়ে, বন, বৃক্ষ, জলাধার রক্ষা করে বৈশ্বিক তাপমাত্রা কমিয়ে আনার একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া হাতে নিতে হবে। জলবায়ু বদলে যাচ্ছে, বৈশ্বিক তাপমাত্রা বাড়ছে। আমাদেরকে এ অবস্থার সঙ্গে অভিযোজিত হয়ে বা খাপ খাইয়ে সুস্থভাবে বেঁচে থাকতে হবে। এ কারণে জীবনযাপনের ধরনে পরিবর্তন আনতে হবে এবং সম্মিলিতভাবে বৈশ্বিক তাপমাত্রার উর্ধ্বগতিকে নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টায় অংশগ্রহণ করতে হবে।’

আবহাওয়া অধিদপ্তরের গত ১০ বছরের তথ্য থেকে দেখা যায়, বছরের প্রথম কয়েক মাসের মধ্যে এপ্রিল মাসেই অত্যধিক তাপপ্রবাহ থাকে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য থেকে জানা যায়, ২০১৫ সালে ২২ মে চুয়াডাঙ্গায় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছিল ৩৯ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস, ২০১৬ সালে ২৯ এপ্রিল রাজশাহীতে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছিল ৪১ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস, ২০১৭ সালের ৩ এপ্রিল চুয়াডাঙ্গায় ৩৮ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস, ২০১৯ সালের ২৯ এপ্রিল রাজশাহীতে ৪০ ডিগ্রি, ২০২০ সালের ১০ এপ্রিল রাজশাহীতে ৩৯ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস, ২০২১ সালের ২৫ এপ্রিল যশোরে দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছিল ৪১ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং ২০২২ সালের ১৫ এপ্রিল রাজশাহীতে দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছিল ৪১ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য থেকে আরও জানা যায়, ২০২৩ সালের ১৭ এপ্রিল ঈশ্বরদীতে দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ৪৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আর চলতি বছর দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে যশোরে। ৩০ এপ্রিল জেলাটিতে তাপমাত্রা ছিল ৪৩ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের রেসিডেন্ট চিকিৎসক ডা. প্রদীপ্ত চৌধুরী। তিনি উষ্ণতম বছর ২০২৪ সম্পর্কে বলেন, ‘এ বছর পেশাগত কারণে বহির্বিভাগে যেসব রোগীদের চিকিৎসা দিতে হয়েছে, তার একটা উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ছিল তাপমাত্রাজনিত কারণে অসুস্থ হয়ে আসা রোগী। অন্যান্য বছরের তুলনায় এ বছর এ সংখ্যাটা অনেক বেশিই ছিল। এর কারণ হতে পারে দুইটি। প্রথমত দীর্ঘদিন ধরে তাপপ্রবাহ, আর দ্বিতীয়ত সর্বোচ্চ তাপমাত্রার রেকর্ড। এ বছর অপেক্ষাকৃত বেশি অল্প বয়সীরা পানিশূন্যতার উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসা নিতে এসেছিলেন, যার বেশির ভাগ ছিল প্রতিরোধযোগ্য।’
চিকিৎসক ডা. প্রদীপ্ত চৌধুরী মনে করেন, ২০২৪ সালের গ্রীষ্মকালীন আবহাওয়া একেবারেই অন্যরকম ছিল। আপাতদৃষ্টিতে এ বছর গরম শেষ মনে হলেও, সামনের বছরের মার্চ হতেই গরম শুরু হয়ে যাবে। তাই আগামী গরমে যেন সুস্থ থাকা যায়, সে চেষ্টা করতে হবে। বৈশ্বিক উষ্ণায়নের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাড়তে থাকা তাপপ্রবাহ হয়ত দু-এক বছরের মধ্যেই কমে আসবে না। তাই পরিবর্তিত উষ্ণ আবহাওয়ায় নিজেদের সুস্থ রাখতে সচেষ্ট থাকতে হবে।



