স্বর্ণলঙ্কায় সাতদিন (পর্ব ৪)

পিনওয়ালায় হাতির অনাথাশ্রম ও ক্যান্ডি শহর ঘুরে

আপডেট : ২৪ ডিসেম্বর ২০২৪, ০৬:১৮ পিএম

পরদিন সকাল সাড়ে ছয়টায় আমরা একটি ট্যাক্সি ভাড়া করে ক্যান্ডির অদূরে পিনাওয়ালা নামক স্থানে যাত্রা শুরু করি। শ্রীলঙ্কার পুরোনো রাজধানী ক্যান্ডি এবং কলম্বোর ঠিক মাঝামাঝিতে পিনাওয়ালা। কলম্বো থেকে পিনাওয়ালার দূরত্ব ৯৪ কিলোমিটার, ট্যাক্সিতে সময় লাগে প্রায় আড়াই ঘণ্টা।

আমরা পথে একটি দোকানে শ্রীলঙ্কার ঐতিহ্যবাহী খাবার খাই। হপার, পরোটা, ডিম, ডাল, বিভিন্ন কারি, ভর্তা, আচার, পিঠাসহ নানা রকম আইটেম। পিনাওয়ালায় যেখানে আমরা যাব সেটা হাতিদের একটি আশ্রম। প্রায় ২৫ একর জায়গা নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ‘পিনাওয়ালা এলিফ্যান্ট অরফ্যানেজ।’ ৭০ দশকের শুরুর দিকে যখন শ্রীলঙ্কার অবকাঠামোর উন্নতি হওয়া শুরু করল তখন প্রচুর পরিমাণে বনজঙ্গল উচ্ছেদ করে স্থানীয় সরকার। তখন প্রায়শই হাতি ও মানুষের মধ্যে হতো লড়াই। এতে প্রচুর মানুষের যেমন জীবন গেছে, ঠিক তেমনি হাতিরও প্রাণ গেছে। সমস্যা সমাধানের জন্য স্থায়ী উদ্যোগ নেয় শ্রীলঙ্কা। এটা মূলত আহত এবং পরিত্যক্ত হাতিদের অনাথাশ্রম। যার পোশাকি নাম ‘এলিফ্যান্ট অরফানেজ’। ১৯৭৫ সালে নির্মিত হাতির এই অনাথাশ্রমে প্রায় ষাটটি হাতি রয়েছে।

পিনাওয়ালার সকল হাতি একসঙ্গে গোসলে আসে মা-ওয়ে নদীতে। ছবি: লেখক

আম, তাল, নিম, জামরুল গাছ দিয়ে ঘেরা এই হাতি-আশ্রম। শাবক হাতির যত্নের জন্য রয়েছে আলাদা ব্যবস্থা। এখানকার সব থেকে আকর্ষণীয় দিক হচ্ছে হাতিদের গোসল দেখা। প্রতিদিন দুবার হাতিদের গোসল করা হয়। সকাল ১০টা থেকে ১১টা এবং দুপুর ২টা থেকে ৩টা। মাহুতের সঙ্গে হাতির পিছনে পিনাওয়ালার সকল হাতি একসঙ্গে গোসলে আসে মা-ওয়ে নদীতে। শাবকগুলো জলে নেমেই মজা করে। শরীর ভেজাতে জলে গড়াগড়ি করে তারা।
 
এলিফ্যান্ট অরফানেজ থেকে বেরিয়ে পাশেই রোদ্দুরমাখা তিরতিরে নদীতে দেখতে গেলাম হাতিদের স্নান। প্রায় ত্রিশ-পঁয়ত্রিশটি হাতি নাইতে নেমেছে। দেখার মতোই রোমাঞ্চিত দৃশ্য। অনেক পর্যটক হাতিদের জন্য বিভিন্ন খাবার নিয়ে এসেছে। কেউ কেউ হাতির পিঠে চড়ে ছবি তুলছে। এ জন্য অবশ্য আলাদা করে রূপি গুনতে হয়!

পিনাওয়ালায় হাতিদর্শন শেষে আমরা ক্যান্ডি যাব। অ্যাপে ট্যাক্সি কল করে দেখি আমাদের সেই সকালের ট্যক্সিওয়ালাই এসেছে। সাড়ে আট হাজার রুপির বিনিময়ে আমরা এবার রওনা হলাম ক্যান্ডির উদ্দেশে। পিনাওয়ালা থেকে ক্যান্ডির দূরত্ব ৫০ কিলোমিটার, সময় লাগে প্রায় দেড় ঘণ্টা।

পথের দুপাশে অপরূপ সব দৃশ্য দেখতে দেখতে আমরা ভালোই চলছিলাম। কিন্তু ক্যান্ডি থেকে আট কিলোমিটার দূরে আমাদের গাড়িটি বিকল হয়ে গেল। চালক লাথিস অনেক চেষ্টার পরও সেটাকে সচল করতে পারল না। অগত্যা সে আমাদের চারজনের জন্য জন্য দুটো টুকটুক ভাড়া করে দিল। আমরা কড়া রৌদ্রের মধ্যে টুকটুকে চেপে টুথ টেম্পেলের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করলাম।

ক্যান্ডি হলো শ্রীলঙ্কার মধ্য প্রদেশে অবস্থিত অন্যতম বৃহত্তম ঐতিহাসিক শহর। ছবি: লেখক

পাহাড়ের ঢালে ছিমছাম গোছানো শহর ক্যান্ডি। রেস্তোরাঁ, পানশালা, দোকান, বাড়িঘর কিংবা রাস্তাঘাট সবকিছুতেই উপনিবেশ আমলের ছোঁয়া। এখানে গেলে মনে হয়, যেন কয়েক দশক আগে ফিরে গেছি। ক্যান্ডি হলো শ্রীলঙ্কার মধ্য প্রদেশে অবস্থিত অন্যতম বৃহত্তম ঐতিহাসিক শহর। রাজধানী কলম্বোর পর দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর। শহরটি শ্রীলঙ্কার প্রাচীন রাজাদের সর্বশেষ রাজধানী ছিল। চা উৎপাদনকারী অঞ্চল হিসেবে পাহাড়ের পাদদেশে এই শহরটি গড়ে উঠেছে।

ষোড়শ শতক নাগাদ উপকূল এলাকায় পর্তুগিজদের কলোনি গড়ে ওঠে। ধীরে ধীরে ডাচ, ব্রিটিশরা ঢুকে পড়ে এই দেশে বাণিজ্য করতে। ১৮০৩ সালে ব্রিটিশরা প্রথম ক্যান্ডি যুদ্ধের পর অনায়াসে ক্যান্ডি রাজ্য দখল করে নেয়। ১৮১৫ সালে দ্বিতীয় ক্যান্ডি যুদ্ধের পর পরাক্রমশালী ব্রিটিশদের হাতে শ্রীলঙ্কার স্বাধীনতার সূর্য হয় অস্তমিত। ব্রিটিশরা এদেশে চা, কফি, রাবার এইসব চাষের জন্য পাহাড়ের ঢালগুলোয় অনুকূল পরিবেশ খুঁজে পায়। ফলে ভারতবর্ষের মতোই এখানেও বাগিচা ফসল ফলিয়ে সারা পৃথিবীতে একচেটিয়া বাণিজ্য করে মুনাফা লুটতে থাকে। এ কাজের জন্য ভারতের তামিলনাড়ু থেকে শ্রমিকদের নিয়ে আসা হয়। তারপর চলে শোষণ আর নিপীড়নের রাজনীতি। তখন এ দেশের জনসংখ্যার দশ শতাংশই ভারত থেকে আনা শ্রমিক। ১৯৪৮ সালের ৪ঠা ফেব্রুয়ারি এদেশ স্বাধীন হয়।

বৌদ্ধধর্মাবলম্বীদের কাছে অন্যতম তীর্থস্থান হিসেবেও পরিচিত এই শহরে টুথ রেলিক। ছবি: লেখক

প্রশাসনিক এবং ধর্মীয় কারণে এই শহরের বিশেষ পরিচিতি রয়েছে। বিশ্বের বৌদ্ধধর্মাবলম্বীদের কাছে অন্যতম তীর্থস্থান হিসেবেও পরিচিত এই শহরে টুথ রেলিক বা শ্রী দালাদা মালিগায়া মন্দির। এই মন্দিরে প্রবেশ করতে গেলে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে শরীর ঢেকে প্রবেশ করতে হয়। ১৯৮৮ সালে ইউনেস্কো কর্তৃক বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থানের মর্যাদা লাভ করেছে শহরটি। সর্বমোট ২৪টি ওয়ার্ড নিয়ে ক্যান্ডি শহর গঠিত। শহরের অধিকাংশ লোকই সিংহলী। তবে মুর ও তামিল জাতিগোষ্ঠীর লোকজনেরও আনাগোনা আছে।

ইতিহাস থেকে জানা যায়, ঔপনিবেশিক আমলে সিংহলীজ কান্দা উদা রাতা বা কান্দা উদা পাস রাতা থেকে ইংরেজি নাম ক্যান্ডি হয়েছে। যার অর্থ পর্বতের উপর ভূমি। পর্তুগিজরা সংক্ষেপে ক্যান্ডিয়া রেখেছিল যা রাজ্য এবং এর রাজধানী উভয় ক্ষেত্রেই ব্যবহৃত হতো। সিংহলী ভাষায় ক্যান্ডিকে মহা নুওয়ারা নামে ডাকা হয় যার অর্থ মহান শহর বা রাজধানী।

এখানে পাহাড়চূড়ায় অনেক মন্দির রয়েছে। ছবি: লেখক

কলম্বো থেকে ১১৫ কিলোমিটার দূরের এই শহরটিকে পর্যটকদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। আগে এখানে পাহাড়-নদী ঘেঁষে অনেক ঘরবাড়ি থাকলেও পর্যটকদের কথা বিবেচনা করে সেই বাসিন্দাদের অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এটি শ্রীলংকার সাংস্কৃতিক রাজধানী। ক্যান্ডি শহরটি সমুদ্রপৃষ্ঠের ১ হাজার ৫২৬ ফুট ওপরে উচ্চতায় অবস্থিত। একটি কৃত্রিম হ্রদ ছাড়াও এখানে পাহাড়চূড়ায় অনেক মন্দির রয়েছে। কলম্বো থেকে সরাসরি বাসে বা অন্য যানবাহনে আড়াই-তিন ঘণ্টার মতো সময় লাগে ক্যান্ডি যেতে।

আমরা টুকটুকে করে সরাসরি যাই সুবিশাল টুথ রেলিক টেম্পলে। শ্রীলঙ্কার অন্যতম পবিত্র ধর্মস্থান। গৌতম বুদ্ধের দাঁত এনে এই মন্দিরে স্থাপন করেছিলেন রাজকন্যা হেমামালী ও তার স্বামী যুবরাজ দন্ত। তার পরে কত যুদ্ধ! বিদেশি শক্তির লাল চোখ দেখেছে এই মাটি, তার চিহ্ন রয়েছে মন্দিরের আনাচে-কানাচে। রয়েছে তথাগতের বোধিবৃক্ষও। ইতিহাস বাদ দিলেও ভারী সুন্দর, নিপুণ ভাস্কর্যের সাক্ষী এই মন্দির।

শহরের অধিকাংশ লোকই সিংহলী। ছবি: লেখক

ক্যান্ডিতে আজ ভীষণ গরম। সকাল থেকে জার্নি আর হাঁটাহাঁটি করে আমরাও ক্লান্ত। খিদেও পেয়েছিল খুব। টুথ রেলিক টেম্পল থেকে বের হয়ে লেকের ধারে এক হোটেল গিয়ে দুপুরের খাবার খেলাম। ভেজ-পোলাও। অসাধারণ স্বাদের। খাবার খেয়ে লেকের পাড়ে গিয়ে বসলাম। অসংখ্য গাছগাছালি ও বিচিত্র পাখির সমারোহ ঘেরা এই লেক। পরিচ্ছন্ন, পরিপাটি করে সাজানো। আমাদের দেশে সাজানো-গোছানো পরিচ্ছন্ন টলটলে জলের এমন একটা লেক কল্পনাও করা যায় না! অসম্ভব শান্তির একটা জায়গা। কতক্ষণ যে সেখানে কাটল! এখানকার অভিজাত সব স্থাপনা দেখে ‘হরিপদ কেরানি’র প্রাণেও বেশ একটা ‘বড়োলোক-বড়োলোক’ ভাব জেগে ওঠে। স্বপন যদি মধুর এমন, হোক সে মিছে কল্পনা!

এখান থেকে আমরা দুই ভাগ হয়ে যাই। আমার সাবেক সহকর্মী নাজিয়া ও ফাহমিদা কলম্বো চলে যাবে। পরদিন থেকে ওদের একটা রিজিওনাল সেমিনার হবে। ওরা মূলত সেই সেমিনারে যোগদানের জন্যই এসেছে। মাঝখানে একটু রথ দেখা! আমি আর আমার বউ ববি এখান থেকে যাব শীতের শহর নুওয়ারা এলিয়ায়। সেখান থেকে এল্লা। এল্লা থেকে কলম্বো এসে আবার ওদের সঙ্গে একত্র হয়ে দেশে ফিরব।

প্রতিবছর আগস্টে ইউরোপের দেশ স্পেনে দেখা মেলে বিরল এক পূর্ণ সূর্যগ্রহণ। আর এই সূর্যগ্রহণ দেখতে দেশটিতে আগামী ১২ আগস্টে নামতে পারে লাখ নয়, কোটি পর্যটকের ঢল। স্পেন সরকার মনে করছে, এই মহাজাগতিক ঘটনা...
বিমানে বসে যাত্রীদের চাওয়া থাকে বেশি জায়গা আর একটু আরাম। সেই চাওয়াকে পুরণ করতে আবারও আলোচনায় এসেছে দুই স্তরের আসনের ধারণা। নতুন রূপে এই নকশা নিয়ে হাজির হয়েছেন ডিজাইনার আলেহান্দ্রো নুনিয়েজ ভিসেন্তে।...
বৈশাখ মানেই একসময় ছিল পান্তা-ইলিশ। সাথে কাঁচা মরিচ আর পেঁয়াজ। সময় বদলেছে, বদলেছে মানুষের জীবনযাপন, অর্থনৈতিক বাস্তবতা আর খাদ্যরুচিও। এখন পহেলা বৈশাখের টেবিলে শুধু পান্তা-ইলিশ নয়, যোগ হয়েছে নানা...
রাজধানীর গুলশানের পর এবার মোহাম্মদপুরে আউটলেট চালু করেছে জনপ্রিয় ফাস্ট ফুড ব্র্যান্ড টিফিনবক্স। সম্প্রতি মোহাম্মদপুরের নুরজাহান রোডে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে আউটলেটটির উদ্বোধন করা হয়।
এক মাস পর পণ্য রপ্তানি আবার কমল। গেল মে মাসে আগের বছরের একই মাসের তুলনায় রপ্তানি হ্রাস পেয়েছে ৭ শতাংশ। বুধবার রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর হালনাগাদ প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়।
এডিসের মারাত্মক ঝুঁকিতে দেশের চার জেলা- ঢাকা, বরিশাল, নরসিংদী ও কক্সবাজার। এখানে ব্রুটো ইনডেক্সে এডিসের লার্ভার ঘনত্ব ৭৬ থেকে ৯৩ পর্যন্ত মিলেছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাবে গবেষণায় মিলেছে...
নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভী কারামুক্ত হয়েছেন। বুধবার রাত ১০টা ১০ মিনিটে তিনি গাজীপুরের কাশিমপুর কারাগার থেকে মুক্তি পান।
ঈদুল আজহা উপলক্ষে মুক্তিপ্রাপ্ত নির্মাতা মেজবাউর রহমান সুমনের চলচ্চিত্র ‘রইদ’ এবার মুক্তি পাচ্ছে অস্ট্রেলিয়ার ৬টি শহরে। আগামী ৫ জুন থেকে দেশটির বিভিন্ন প্রেক্ষাগৃহে এ চলচ্চিত্রের প্রদর্শনী শুরু...
লোডিং...

এলাকার খবর