আজ সেই ভয়াল কালরাত, ২৫শে মার্চ। ১৯৭১ সালের এই দিনে সকাল থেকেই রাজধানীতে ছিল গুমোটভাব। ধানমন্ডিতে বঙ্গবন্ধুর ৩২ নম্বরের বাড়ি ঘিরে নেতা-কর্মীদের আনাগোনা। শহরজুড়ে পাকিস্তানি সেনাদের টহল। যেন সকাল থেকেই সবাই আঁচ করতে পারছিল, কিছু একটা হতে চলেছে দেশজুড়ে। হয়েছিলও তাই। ২৫শে মার্চের সেই কালরাতে তৎকালীন সামরিক শাসক ইয়াহিয়ার নির্দেশে, লেফটেন্যান্ট জেনারেল টিক্কা খানের নেতৃত্বে ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামে সামরিক অভিযান চালায়। নির্বিচারে হত্যা করে সাধারণ মানুষকে। শুরু হয় ইতিহাসের এক জঘন্য জেনোসাইড।
পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী পূর্ণ সামরিক অস্ত্র নিয়ে রাত ১১টার পর দেশজুড়ে শুরু করে এই জঘন্যতম হত্যাযজ্ঞ। আর ২৫শে মার্চে হত্যাকাণ্ডের আক্রমণের প্রথম লক্ষ্য ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। কারণ, তারা এই বিশ্ববিদ্যালয়কে বাঙালির জাতীয়তাবাদের মূলকেন্দ্র বলে বিবেচনা করত।
২৫শে মার্চ, ১৯৭১–এর রাতে সমগ্র ঢাকা শহরে কারফিউ জারি করা হয়। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ক্যানটনমেন্ট থেকে সাঁজোয়া পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর কয়াকটি সুসজ্জিত দল ঢাকার রাস্তায় নেমে পড়ে। নির্বিচারে গুলি করে হত্যা করে সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-ছাত্র-কর্মচারীদের। আর এ হত্যাকাণ্ডে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিল ১৮ নং পাঞ্জাব, ২২ নং বেলুচ, ৩২ নং পাঞ্জাব রেজিমেন্ট এবং কিছু সহযোগী ব্যাটালিয়ন। এই বাহিনীগুলোর অস্ত্রসম্ভারের মাঝে ছিল ট্যাংক, স্বয়ংক্রিয় রাইফেল, রকেট লঞ্চার, ভারী মর্টার, হালকা মেশিনগান ইত্যাদি। এই সমস্ত অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে পাকিস্তানি বাহিনী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে অগ্রসর হয়। ইউনিট নং ৪১ পূর্ব দিক থেকে, ইউনিট নং ৮৮ দক্ষিণ দিক থেকে এবং ইউনিট নং ২৬ উত্তর দিকে থেকে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা ঘিরে ফেলে। চালানো হয় নারকীয় হত্যাকাণ্ড।
সেই ভয়াল রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হল পুরোপুরি ধ্বংস করা হয়। বহু ছাত্রকে হত্যা করা হয়। জগন্নাথ হলে পাকিস্তানি সেনারা মধ্যরাত থেকে হত্যাকাণ্ড শুরু করেছিল। সে হত্যাকাণ্ড চলে সকাল পর্যন্ত। হলের রুমগুলোতে তারা আগুন ধরিয়ে দেয়।

রাত বারোটার পর পাকিস্তানি সেনারা জগন্নাথ হলে প্রবেশ করে এবং প্রথমে মর্টার শেল ছোড়ে। সেই সাথে চলতে থাকে অবিরাম গুলি। পাকিস্তানিরা হলের উত্তর ও দক্ষিণের গেট দিয়ে ঢুকে নির্বিচারে ছাত্রদের হত্যা করতে থাকে, যা চলে পরদিন সকাল পর্যন্ত।
সবচেয়ে বড় হত্যাযজ্ঞটি হয়েছে জগন্নাথ হলে। এই গণহত্যার একটি ভিডিও চিত্র ধারণ করেছিলেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নূরুল উল্লাহ। তিনি তখন বুয়েটের অধ্যাপকদের জন্য তৈরি চারতলা ভবনে থাকতেন, যেখান থেকে জগন্নাথ হলের ছাত্রাবাস আর মাঠ সরাসরি দেখা যেত।
প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ওই শিক্ষককের ধারণকৃত ভিডিওটি আজও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশবিকতার সাক্ষী হয়ে আছে। তাঁর ধারণ করা ভিডিওচিত্রে দেখা যায়, হলের মাঠের পশ্চিম দিকে লাশ এনে জড়ো করা হচ্ছে। ছাত্রদের দিয়েই জগন্নাথ হলের মাঠে গর্ত খোঁড়া হচ্ছে, আহতদের গুলি করে মৃত্যু নিশ্চিত করা হচ্ছে। আবার সেই গর্তেই ছাত্রদের লাশ মাটিচাপা দেওয়া হচ্ছে। এভাবে কয়েকবার চলল। বুলডোজার দিয়ে মাটি খুঁড়ে গণকবর দেওয়া হয়েছিল। এভাবে তিনটি গণহত্যার দৃশ্য ধারণ করেছিলেন তিনি।
জগন্নাথ হলের তৎকালীন দারোয়ান সুনীল চন্দ্র দাসের স্ত্রী বকুল রানী দাস সে সময় কর্মচারীদের টিনশেডের বাসায় ছিলেন। তিনি বলেন, ‘রাত ১২টার দিকে হল-সংলগ্ন ইউওটিসির (বর্তমান বিএনসিসি) দেয়াল ভেঙে মিলিটারিদের সাঁজোয়া ট্যাংক হলের ভেতর ঢুকে পড়ে। এরপর শুধুই গুলির শব্দ। একপর্যায়ে এলাকার ভেতরে আগুন ধরিয়ে দেয় হানাদারেরা। বাসার পুরুষদের ধরে নিয়ে যায় মাঠের দিকে। সেখানেই তাদের গুলি করে হত্যা করা হয়।’
জগন্নাথ হল আক্রমণের সময় হলের প্রভোস্টের বাসাও আক্রমণ করা হয়। পাকিস্তানি বাহিনী ভূতপূর্ব-প্রভোস্ট এবং জনপ্রিয় শিক্ষক, দর্শণ শাস্ত্রের অধ্যাপক জি সি দেবকে হত্যা করে। এর পর তারা বিশ্ববিদ্যালয় কর্মচারী বাসভবনে আক্রমণ করে এবং সেখানে পরিসংখ্যান বিভাগের অধ্যাপক ড. মনিরুজ্জামানকে তাঁর পুত্র ও আত্মীয়সহ হত্যা করে। জগন্নাথ হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে মারাত্মকভাবে আহত হন এবং পরে হাসপাতালে মারা যান। হত্যা করা হয় অধ্যাপক সন্তোষচন্দ্র ভট্টাচার্য, অধ্যাপক অনুদ্বৈপায়ন ভট্টাচার্যকে।

জগন্নাথ হলের পূর্ব পাশে একটি চারতলা বাড়ির ২ তলায় পরিবার নিয়ে থাকতেন ঐতিহ্যবাহী মধুর ক্যান্টিনের মালিক মধুসূদন দে। ২৬ মার্চ সকালে এই বাড়িতেই মধুসূদন দের স্ত্রী যোগমায়া দে, ছেলে রনজিৎ কুমার দে, পুত্রবধূ রীনা রানী দেকে হত্যা করে হানাদাররা। পরে মধুসূদন দেকে জগন্নাথ হলের মাঠে নিয়ে গুলি করে হত্যা করা হয়। ১৯৭১ সালে বর্তমান মধুর ক্যান্টিনও পাকিস্তানি বাহিনীর রোষানলে পড়ে। তাঁর স্মরণে মধুর ক্যান্টিন প্রাঙ্গণেই নির্মিত হয় শহীদ মধুসূদন দের স্মৃতি ভাস্কর্য। ভাস্কর্যটির গায়ে লেখা রয়েছে ‘আমাদের প্রিয় মধুদা’।
জগন্নাথ হলে সেদিন যারা শহীদ হয়েছিলেন, তাঁদের মধ্যে ৬৬ জনের নামের তালিকা আছে হলের মাঠে গণকবরের জায়গায় তৈরি নামফলকে। ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গণহত্যা: ১৯৭১ জগন্নাথ হল’ বই থেকে জানা যায়, ওই রাতে সেখানে চারজন শিক্ষক, ৩৬ জন ছাত্র এবং ২১ জন কর্মচারী ও অতিথি শহীদ হয়েছিলেন। অন্যদিকে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিলপত্র অষ্টম খণ্ডে ৪১ জন ছাত্রের কথা উল্লেখ আছে, যারা জগন্নাথ হলে শহীদ হয়েছিলেন। ছাত্রদের কাছে আসা অনেক অতিথিও এই সময় প্রাণ হারান।
২৫শে মার্চের বিভীষিকাময় সেই রাতে জগন্নাথ হল প্রাঙ্গণে যেসব শিক্ষক-ছাত্র-কর্মচারী প্রাণ হারিয়েছিলেন, তাঁদের মধ্যে রয়েছেন-অধ্যাপক ড. গোবিন্দচন্দ্র দেব (জিসি দেব), অধ্যাপক ড. জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা, অধ্যাপক সন্তোষচন্দ্র ভট্টাচার্য, অধ্যাপক অনুদ্বৈপায়ন ভট্টাচার্য, মধুসূদন দে (মধুদা), অজিত রায় চৌধুরী, অমিতকুমার বসাক, অরুণ চন্দ, আনন্দকুমার দত্ত, উপেন্দ্রনাথ রায়, কার্তিকচন্দ্র শীল, কিশোরীমোহন সরকার, কেশবচন্দ্র হাওলাদার, গণপতি হালদার, জীবনকৃষ্ণ সরকার, দীনেশচন্দ্র শিকদার, ননীগোপাল ভৌমিক, নিরঞ্জন চন্দ, নিরঞ্জনপ্রসাদ সাহা, নিরঞ্জন হালদার, নির্মলকুমার রায়, পঙ্কজকুমার বসু, পল্টন দাস, প্রদীপ নারায়ণ রায়চৌধুরী, প্রবীর পাল, বরদাকান্ত তরফদার, বিধানচন্দ্র ঘোষ, বিমলচন্দ্র রায়, ভবতোষ ভৌমিক, মনোরঞ্জন বিশ্বাস, মুরারীমোহন বিশ্বাস, মৃণাল কান্তি বোস, রণদাপ্রসাদ রায়, রবীন রায়, রমণীমোহন ভট্টাচার্য, রাখালচন্দ্র রায়, শিবকুমার দাস, সত্যরঞ্জন নাগ, সন্তোষকুমার রায়, সন্তোষচন্দ্র রায়, সুজিত দত্ত, সুব্রত সাহা, সুভাষচন্দ্র ভট্টাচার্য, সুশীলচন্দ্র দাস, স্বপন কুমার চৌধুরী, হরিনারায়ণ দাস, দুখীরাম মণ্ডল, প্রিয়নাথ রায়, শিবপদ কুঢ়ী, শিবু মোদক, সুনীলচন্দ্র দাস, খগেন্দ্রচন্দ্র দে, জহরলাল রাজভর, দাসু রাম, মতিলাল দে, মনভরণ রায়, মিশ্রী রাজভর, সুশীল দে, বদরুদ্দোজা বাচ্চু, মাহতাব উদ্দিন ও লতিফুর রহমান।
২৫শে মার্চ রাতে জগন্নাথ হলের পাশাপাশি রোকেয়া হল ও জহুরুল হক হলসহ রাজারবাগ পুলিশলাইন, পিলখানার তৎকালীন ইপিআর ক্যাম্পে ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ চালায় পাকিস্তানি বাহিনী। এক রাতের মধ্যেই তারা ঢাকা শহরকে মৃত্যুপুরীতে পরিণত করে।
অসহযোগ আন্দোলন মূলত গড়ে ওঠে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জহুরুল হক হলের ‘স্বাধীন বাংলাদেশ ছাত্র আন্দোলন পরিষদ’কে কেন্দ্র করে। তাই, পাকিস্তানি বাহিনীর অপারেশন সার্চলাইটের প্রথম লক্ষ্যও ছিল এই হলটি।
আর্চার ব্লাডের লেখা ‘দ্য ক্রুয়েল বার্থ অব বাংলাদেশ’ থেকে জানা যায়, সে রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হলে আগুন ধরানো হয়েছিল এবং ছাত্রীরা হল থেকে দৌড়ে বের হওয়ার সময় মেশিন গান দিয়ে গুলি করে তাদের হত্যা করা হয়েছিল। ২৫শে মার্চের গণহত্যার (অপারেশন সার্চলাইট) প্রথম পর্যায়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০ জন শিক্ষককে হত্যা করা হয় বলে জানা যায়।
২৬শে মার্চ সকালের দিকে সেনাবাহিনীর কন্ট্রোল রুম ও ৮৮ ইউনিটের মধ্যে যে কথপোকথন হয়, তার রেকর্ড থেকে জানা যায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসেই অগণিত ছাত্র-ছাত্রী নিহত হয়েছিল।

জহুরুল হক হল আক্রমণের প্রথম পর্যায়েই ব্রিটিশ কাউন্সিলে পাহারারত ইপিআর গার্ডদের হত্যা করা হয়। তারপর হলের কর্মচারী সিরাজুল হক, আলী হোসেন, সোহরাব আলী গাজী ও আব্দুল মজিদকে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক লাউঞ্জে হত্যা করা হয়। রোকেয়া হল চত্বরে সপরিবারে হত্যা করা হয় আহমেদ আলী, আব্দুল খালেক, নমি, মো. সোলায়মান খান, মো. নুরুল ইসলাম, মো. হাফিজুদ্দিন ও মো. চুন্নু মিয়াকে। অগ্নিসংযোগ করা হয় শাঁখারিপট্টি ও তাঁতিবাজারের অসংখ্য ঘর-বাড়িতে।
সেই কালরাতের অন্ধকারে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী কাপুরুষের মতো পাশবিক হিংস্রতা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল ঘুমন্ত বাঙালির ওপর। সামরিক শাসক ইয়াহিয়ার নির্দেশে, আর টিক্কা খানের নেতৃত্বে ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামের সামরিক অভিযানে সংগঠিত হয় ইতিহাসের জঘন্যতম গণহত্যা। তাই অন্য যেকোনো দিনের চেয়ে এই দিনটি শুধু আমাদের কাছেই নয়, বিশ্বের জেনোসাইড ইতিহাসেরও এক উদাহরণযোগ্য কলংকিত দিন। ওই দিন পাকিস্তানিরা আমাদের শুধু হত্যাই করতে চায়নি, আমাদের বাঙালি জাতিসত্তাকে ধংস করার ষড়যন্ত্রে অপারেশনে নেমেছিল।


‘অপারেশন সার্চলাইটের’ নামে কী করতে চেয়েছিলেন রাও ফরমান আলী
আজ সেই ভয়াল পঁচিশে মার্চ, গণহত্যা দিবস
গণহত্যা নিয়ে ইতিহাসে রুয়ান্ডা-কম্বোডিয়ার উল্লেখ থাকলেও বাংলাদেশের নেই
‘গণহত্যার দায় যতোটা পাকিস্তানের ঠিক ততটাই আমেরিকা ও চীনের’
