বর্তমান প্রজন্ম নিয়ে এ প্রশ্ন অনেকের ভেতরে। বিশেষ করে সন্তানের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের চিন্তায় উদ্বিগ্ন মা-বাবারা এই প্রশ্নের মধ্যে আবর্তিত হতে থাকেন। বিষয়টি এমন নয় যে এই প্রজন্মের মা-বাবাই শুধু এমনটা ভাবছেন। তাঁদের মা-বাবারাও একই ভেবেছিলেন। ওই সেই ঈশ্বরী পাটনীর প্রার্থনা: আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে। এদের জন্য আশি বছরেরও আগে একটা দাওয়াই দিয়েছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন ডি. রুজভেল্ট। তাঁর বক্তব্য ছিল: আমরা সব সময় আমাদের তরুণদের ভবিষ্যৎ তৈরি করে দিয়ে যেতে পারব না, তবে ভবিষ্যতের জন্য আমাদের তরুণদের প্রস্তুত করে দিয়ে যেতে পারব। এ কথাটা মনে রাখলে সমাজের অনেক মুশকিল আসান হয়ে যায়।
এই লেখায় বর্তমান প্রজন্ম বলতে জেনারেশন জেডকে বোঝানো হয়েছে। যাদের জন্ম ১৯৯৭-২০১২-এর মধ্যে। অর্থাৎ, এদের বয়স ১২ থেকে ২৭ বছর। এরা কেউ কিশোর, কেউ তরুণ। কেউ লেখাপড়া তো কেউ কাজের সাথে যুক্ত। এই প্রজন্মকে অনেকেই সংক্ষেপে জেন জেড বা জুমার বলে থাকেন। যে কেউ বলতেই পারেন গরমের চোটে টিকতে পারি না, দেশ-বিদেশের যুদ্ধ-সংঘাত-সংকট-সমস্যা শুনতে শুনতে কান ঝালাপালা হওয়ার অবস্থা, এর মধ্যে আবার জেন জেড নিয়ে উদ্বেলিত হওয়ার কী হলো?
আসলেই। একটু বয়স্ক যারা, অনেক লড়াই-সংগ্রামের পর সংসারে একটু থিতু হয়েছেন, তাঁরা বর্তমান প্রজন্মকে ঈর্ষা করেন। করেন এই কারণে যে, তাঁরা শৈশবে-কৈশোরে-তারুণ্যে পাননি, আজ তাঁদের সন্তানেরা বলার আগেই সবকিছু পেয়ে যাচ্ছে। সবাই পাচ্ছে এমনটা না। তবে কথাটা অসত্যও না। আর দুই প্রজন্মের মধ্যেকার চিন্তার ব্যবধান চিরকালই ছিল, আছে, থাকবে। তোরা একেবারে উচ্ছন্নে গেছিস—এমন কথা বাবার মুখ থেকে শোনেননি, এমন বয়স্ক মানুষের সংখ্যা খুবই কম, বিশেষত পুরুষেরা। এখন অনেক মা-বাবাই নিজের সন্তানকে বুঝতে পারছেন না বলে অভিযোগ করেন। আসলে দোষটা তাঁদের না। সমস্যাটা হলো, তাঁরা তাঁদের মা-বাবার দৃষ্টি দিয়ে নিজের সন্তানকে দেখছেন। পদ্মা নদীতে তো প্রতি সেকেন্ডে ১৫ লাখ ঘনমিটার পানি প্রবাহিত হয়, আর সময় দৌড়াচ্ছে তো আরও অনেক বেশি গতিতে। তাহলে নিজের সন্তানের মধ্যে নিজেকে খুঁজতে গিয়ে মিলের চেয়ে অমিলই বেশি পাবেন—এটাই স্বাভাবিক।
প্রজন্মের ব্যবধান একসময় ধরা হতো ২৫-৩০ বছর। এই ব্যবধান মূলত তরুণ ও বয়স্ক প্রজন্মের মধ্যে ভেদ রেখা টেনে দেয়। এই ভেদ বা ব্যবধান দুটি ভিন্ন প্রজন্মের মানুষের চিন্তা, বিশ্বাস ও কাজের মাধ্যমেই সংজ্ঞায়িত হয়েছে। আর ধারণাটি নৈতিক মূল্যবোধ বা সংস্কৃতির সীমিত পরিমণ্ডলে বেঁধে রাখার বিষয় নয়। তবে দুই প্রজন্মের ব্যবধান এখন ১৫ বছরে নেমে এসেছে বলে কেউ কেউ মনে করেন। এর পেছনে প্রযুক্তির উৎকর্ষতা ছাড়াও ছোট পরিবার, পরিবারের দায়িত্বশীল সদস্যদের কর্মজীবন, সামাজিক অনিশ্চয়তা এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কল্যাণে বিশ্বগ্রামের বাসিন্দা হওয়াও দায়ী।
এখনকার ছেলেমেয়েরা খুব স্বার্থপর, নিজের ছাড়া কিছু বোঝে না—এই অপবাদ খুব সহজেই দেগে দেওয়া হচ্ছে বর্তমান প্রজন্মের সাথে। আসলেই কি তাই? যদি কেউ হয়েও থাকে, তার জন্য দায়ী তো পরিবারে তার বেড়ে ওঠার ধরন। কিন্তু বলুন তো, নিরাপদ সড়ক, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ফি-র ওপর ভ্যাট প্রত্যাহার—এসব প্রতিবাদ কারা শুরু করেছিল। আজ গাজায় ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর গণহত্যা এবং আমেরিকা ও তার বন্ধুদের এতে সহায়তা দেওয়ার বিরুদ্ধে আমেরিকার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা কীভাবে ফুঁসে উঠেছে। গ্রেপ্তার, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার—কোনো কিছুই তাদের থামাতে পারছে না। এরা কারা? এরাই তো বর্তমান প্রজন্ম। এদের মধ্যে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরাও আছে। আমেরিকার মতো বিত্তশালী ও পরাক্রমশালী রাষ্ট্রের সুখময় ভবিষ্যৎ জীবনকে হেলায় উড়িয়ে দিয়ে এরা অন্যায়ের প্রতিবাদে শামিল হয়নি? একে আপনি কোন স্বার্থপরতা দিয়ে ব্যাখ্যা করবেন?
আরে বয়স্ক ‘বুদ্ধিমানেরা’ বুঝতে পারছে না, এদের হাতেই ভবিষ্যৎ পৃথিবীর ভার থাকবে। এজন্য তারা তপ্ত ধরিত্রী, অসাম্যে ভরা মানবসংসার, কথা ও কাজে অমিলসহ সব বিষয়ে শুধু সচেতনই নয়, প্রতিবাদে মুখর। বেশ কয়েক বছর আগে আমেরিকার কিশোর-তরুণদের মধ্যে চালানো এক জরিপে প্রশ্ন করা হয়েছিল, তারা এত রাজনীতি বিমুখ কেন? নতুন প্রজন্মের প্রতিনিধিদের জবাব ছিল, তাঁরা যেহেতু আমাদের নিয়ে ভাবেন না, তাই আমরাও তাঁদের নিয়ে ভাবি না। একটু খেয়াল করলে দেখবেন, বিশ্ব যারা চালায় বলে ধরে নেওয়া হয়, সেসব দেশের অধিকাংশ সরকার বা রাষ্ট্রপ্রধানের বয়স সত্তরের ওপরে। বাইডেনের মতো কেউ কেউ তো আশি পার করে ফেলেছেন। এঁদের তো রাজনৈতিক সন্ন্যাস নেওয়ার সময় এখন। কিন্তু এরা বিশ্বের দণ্ডমুণ্ডের কর্তা সেজে বসে আছেন।
জলবায়ু পরিবর্তনের কথাই ধরা যাক। বৈশ্বিক উষ্ণায়ণ প্রাক-শিল্পযুগের তাপমাত্রার চেয়ে দেড় ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে সীমিত রাখার আন্তর্জাতিক চুক্তিতে আমেরিকাও শামিল ছিল। কিন্তু ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হয়ে ঘোষণা দিলেন, বিশ্ব উত্তপ্ত হচ্ছে—এটা তিনি বিশ্বাসই করেন না। ফলে এ–সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক তহবিলে অর্থ সরবরাহ বন্ধ। এরপর বাইডেন এসে আবার চালু করলেন। এটা তো গেল একটা সামান্য উদাহরণ। দেশে দেশে এমন হাজারো উদাহরণ পাওয়া যাবে যে, কুর্সী বদল হলেই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত পাল্টে যায়। এই রাজনীতিকদের ওপর যদি বর্তমান প্রজন্ম আস্থা না রাখতে পারে, তাহলে কী খুব দোষ দেওয়া যাবে? ইকোনমিস্টের তথ্য অনুযায়ী, আমেরিকায় এই সময় এক হাজারের বেশি জুমার বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের পদে আছে। দেশে দেশে তারা আরও বেশি করে ক্ষমতার অংশীদার হতে চায়। সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রভাব রাখতে ইচ্ছুক। সেটাই হওয়া উচিত। কারণ, ভবিষ্যৎ পৃথিবীটা তো তাদেরই। ফলে এই প্রজন্ম রাজনীতি বিমুখ বা রাজনীতি সম্পর্কে অসচেতন—এটা একেবারে যথার্থ নয়।
সাম্প্রতিক কিছু জরিপ বলছে, আমাদের তরুণেরা বিদেশে যেতে অনেক বেশি আগ্রহী। এর মধ্যে দোষ খুঁজতে যাওয়ার কোনো অর্থ হয় না। পড়ালেখার জন্য তারা বিদেশের ভালো বিশ্ববিদ্যালয় যেতে চায়। কেউ কাজের জন্য যেতে চায় বিদেশে। এখন কেউ একটু বেশি আয়ের জন্য, পরিবারকে ভালো রাখার জন্য দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে ঢাকায় আসতেই পারে। এতে যদি দোষ না হয়ে থাকে, তাহলে বর্তমান প্রজন্মের বিদেশে গিয়ে কাজ করার ইচ্ছায় সমস্যা কোথায়?
আমাদের ই-কমার্স, এফ-কমার্স সাইটগুলো দেখুন। দেখবেন তরুণ প্রজন্মের শত শত প্রতিনিধি সেখানে পসরা নিয়ে হাজির। তারা কারও মুখাপেক্ষী হয়ে বসে নেই। দেশে বসে অনেক তরুণ বাইরের দেশের কাজ করছেন। আমেরিকায় নাকি এই মুহূর্তে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ছয় হাজারের বেশি প্রধান নির্বাহী বা সিইও আছে, যারা বর্তমান প্রজন্মের বা জুমার। আমাদের এখানেও যদি পরিসংখ্যান সংগ্রহ করা সম্ভব হতো, তাহলে সংখ্যাটা একেবারে কম হতো না।
অনেক ভালো কথার মধ্যে সমস্যাও অবশ্যই কিছু থাকে। নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের সোশ্যাল সাইকোলজিস্ট জোনাথন হায়ডট ‘দ্য অ্যাংশাস জেনারেশন’ নামে একটা বই লিখেছেন। জুমারদের নিয়ে লেখা। আসলে বর্তমান প্রজন্মের একটা অংশ উদ্বেগ ও বিষণ্নতায় ভোগে। এর জন্য জোনাথন সোশ্যাল মিডিয়ার অপ্রতিরোধ্য ব্যবহারকে দায়ী করেছেন। ইন্টারনেট ও স্মার্টফোন সহজলভ্য হওয়ার কারণে তারা নানামুখী সংকটে পড়ছে। এর মধ্যে একটি হচ্ছে আত্মপরিচয়। আর সে পরিচয় লৈঙ্গিক। অর্থাৎ, আমি কে? ছেলে না মেয়ে, না উভয়ই, না কেউ না? তাদের অনেকের ভাবনার পরিসরকে সীমিত করে দিচ্ছে এই ইন্টারনেট। ইউটিউব, ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, টিকটকে সংক্ষিপ্ত সময়ের ভিডিওর ব্যাপক জনপ্রিয়তা প্রমাণ করে এই প্রজন্মের অনেকেই অল্প সময়ে সবকিছু পেতে চায়। ফলে বই বা ওয়েবে বড় লেখা পড়ার অনীহা প্রকট।
এই সমস্যা আমাদের তৈরি এবং আমাদেরকেই এর সমাধান করতে হবে। কারণ, এই বিশ্বকে শিশুর বাসযোগ্য করে যাওয়ার অঙ্গীকার রাখতে হলে, এর কোনো বিকল্প নেই। আর বর্তমান প্রজন্ম বা জুমাররা যে সফল হবে, সে ব্যাপারে সন্দেহের কোনো আলামত আপাতত নেই।
লেখক: নির্বাহী সম্পাদক, ডিজিটাল বিভাগ, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন


বিকট শব্দে বেপরোয়া বাইক চালিয়ে এ কেমন মজা!
এ দেশের তরুণদের মনে এত সুখ কোথা থেকে আসে?
আমরাই হয়তো শেষ জেনারেশন… সত্যিই কি তাই?
