মা, সন্তানের প্রথম শিক্ষক

আপডেট : ১২ মে ২০২৪, ১২:১৭ পিএম

পৃথিবীতে কোনো মানুষের প্রথম বন্ধনটি হয় তার জন্মদাত্রীর সাথে। মায়ের জঠরে বেড়ে উঠতে থাকা ভ্রুণটি অস্তিত্ব জানান দেওয়ার ক্ষণ থেকেই এক অচ্ছেদ্য বাঁধনে আবদ্ধ হয় দুটি প্রাণ। সেই ক্ষণটি থেকেই মা প্রতিনিয়ত আগলে রাখা শুরু করেন। একটা সময়ে এসে মাতৃগর্ভে শিশু হাত পা নাড়তে শেখে। মায়ের আনন্দ–বেদনা সে সময় থেকেই না জন্মানো প্রাণটিকে আলোড়িত করে। মা কথা বলতে শুরু করেন অনাগতের সাথে।

মানুষের কঠিনতম শারীরিক যন্ত্রণা নাকি প্রসবের বেদনা। সেই কঠিনতম বেদনাটি সহ্য করে নতুন প্রাণটি দেখলেই মা সব ভুলে যান। হৃদয় ভরে ওঠে আনন্দে—চোখে জল, আর অধরে হাসি। কী যে পরিতৃপ্তি, আর শান্তি সন্তান বুকে জড়িয়ে, তা শুধু একজন মা-ই জানেন।

আবার শুধু জন্ম দিলেই কি মা হয়? কত মা আছেন সারা বিশ্বে, যিনি সন্তান জন্ম না দিয়েও মা শব্দের প্রতীক হয়ে উঠেছেন। যেমন—মাদার তেরেসা কিংবা শ্রীকৃষ্ণের মা যশোধা। অনেক নিঃসন্তান মা শিশু দত্তক নিয়ে, বা আত্মীয়-স্বজনের সন্তানকে বা কোনো মা–হারা শিশুকে এমন যত্নে লালন-পালন করে বড় করে তোলেন যে, তিনি জন্ম দিয়েছেন কি–না, সে প্রশ্ন তখন অবান্তর হয়ে যায়। জীবনের চলার পথে সেই শিশুটি জন্মদাত্রী সম্পর্কে আবেগ লালন করলেও অভাব বোধটা থাকে না।

নারীর ভেতরে মায়ের সত্তা জন্মগত। নারী শিশুটির সকলকে ভালোবাসায় ভরিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা যেন জন্মগত। পুতুল সন্তানকে বা ছোটো ভাইবোনকে আগলে রাখতে কেউ শিখিয়ে দিতে হয় না। সমাজ নারীকে শৈশব থেকে পেলব হতে, নরম হতে শেখায়। কিন্তু মা সন্তানকে রক্ষা করতে কতটা কঠোর আর হিংস্র হতে পারে, তার প্রমাণ আমরা প্রাণী জগতে খুব দেখতে পাই। একটি বিড়ালের বা কুকুরের নবজাতককে ধরতে গেলে কোথা থেকে যেন মা বিড়াল বা কুকুরটি চলে এসে ছানাদের আগলে রাখে আর গরগর করে ভয় দেখাতে শুরু করে ধরতে আসা মানুষ বা প্রাণীটিকে। কোনো পাখির বাসায় হাত দেওয়ার চেষ্টা করলেই দেখা যাবে মা পাখি এসে চিল চিৎকার জুড়ে দিয়ে, ঠোকর দিয়ে আক্রমণ  করে। মানবকূলেও ঘরে ঘরে এমন মা আছেন হাড়ির শেষ অন্নটুকু সন্তানের পাতে তুলে দিয়ে নিজে জল পান করে তৃপ্তির ঢেকুর তোলেন।

মা ডাকটি বড় অদ্ভুত! পৃথিবীর বহু ভাষায়, বোধ করি সব ভাষায় মা, ডাকটি কাছাকাছি শব্দের দ্যোতনা দেয়। বাংলায় বলি মা, মামনি, আম্মা; ইংরেজিতে বলে মাদার, মম; কোনো ভাষায় মাম্মা; কোনো ভাষায় মাই... আরও কত কিছু; কিন্তু অন্য ভাষাভাষির এই ডাকটি চিনতে অসুবিধা হয় না কোনো। তাই তো রবীন্দ্রনাথ বলেন শিশু নামের নেশায় মাকে ডাকে। শিশু মায়ের নামে ছড়া কাটে। যখন আধো আধো বলতে শেখে, তখন খামোখাই মাকে বারবার ডেকে ব্যতিব্যস্ত করে তোলে। মাও হাসি মুখে ডাকে সাড়া দেন, কোলে তুলে নেন।

মা, শিশুর প্রথম শিক্ষক। তাই তো নেপোলিয়ন একটি শিক্ষিত জাতি তৈরির জন্য, একজন শিক্ষিত মা চেয়েছিলেন। মা যদি সামাজিক ও আদর্শিক শিক্ষায় শিক্ষিত হন, তাহলেও সন্তান লালনে তার প্রভাব পড়ে। গ্রাম বাংলায় বহু মা আছেন, যিনি নিজে স্কুল কলেজে যেতে না পারার আক্ষেপটি পূরণ করতে এবং সন্তানকে শিক্ষিত করতে পরিবারের সাথে যুদ্ধ করে কন্যাটিকে স্কুলে পাঠান। নিজে ঘরে বসে একটু বাড়তি আয় করে সন্তানের পড়ার খরচ চালান।

অনেকে মনে করেন ঘরে থাকা মা সন্তানকে বেশি সময় দিতে পারেন বলেই তাঁর সন্তান ভালো হবে। কর্মজীবী মা অনেকটা সময় বাইরে থাকেন বলে তাঁর সন্তান অবহেলায় বড় হয়। আসলে ব্যাপারটি তেমন নয়। অনেক সময়ের চেয়ে, মানসম্পন্ন সময় দেওয়া জরুরি। যেটুকু সময় সন্তানকে দেওয়ার, তার প্রতিটি পল যেন সন্তানের জীবনে একটা সুন্দর শৈশবের স্মৃতি হয়ে হৃদয়ে স্থান করে নেয় সারা জীবনের জন্য। মা যে ভদ্রতা, ভব্যতা, সততার, সত্যবাদিতার মতো আদর্শিক শিক্ষা দেন, সে শিক্ষা বড় হতে হতে সামাজিক, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় আরও শাণিত হয়। একজন দেশপ্রেমী মায়ের সন্তান সবসময়ই জন্মভূমিকে মায়ের সম্মানেই মাতৃতুল্য ভালোবাসে। সেই সন্তান জ্ঞানে–অজ্ঞানে কখনোই দেশের কোনো ক্ষতি করতে পারে না। মায়ের শিক্ষা প্রতিটি সন্তানের জীবন গঠনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

একটা সময় ছিল, যখন মা নিজের সন্তানের প্রশংসা সন্তানের সামনে কখনো করতেন না। লোকে যখন সন্তানের প্রশংসা করতেন, তখন বেশ গরবিনীর মতো তা শুনতেন। এ ব্যাপারটা ভালো কি মন্দ, সে বিচারে যাব না। তবে আমার মনে হয় এ যুগে আমরা অহেতুক নিজের সন্তানকে শ্রেষ্ঠ জাহির করে অহেতুক সন্তানের মাথাটা বিগড়ে দিই। যার ফল—সেই সন্তান নিজেকে শ্রেষ্ঠ মনে করতে শুরু করে এবং নিজের যোগ্যতা উৎকর্ষতা বাড়ানোর চেষ্টা বন্ধ করে দেয়, যা আখেরে ক্ষতিই করে। সন্তানের ভালো কাজের প্রশংসা আমরা অবশ্যই করব। কিন্তু সে প্রশংসা যেন কোনোভাবেই তাকে অহংকারী করে না তোলে। নিজেকে যেন শ্রেষ্ঠ ভাবতে শুরু না করে।

সন্তানের প্রথম সবকিছু যেমন মা-ই জানেন, তার সাফল্য–ব্যর্থতার কথাও মা জানবেন। সাফল্যে যেমন প্রশংসা করে আবার এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা দেবেন, তেমনি বড় হতে হতে কিছু নম্র হওয়ার পাঠও দেবেন। ব্যর্থতায় ধৈর্য্যধারণ করতেও মা শেখাবেন। আশ্রয় হবেন। গুরুজনদের সম্মান আর ছোটোদের ভালোবাসার শিক্ষা মা-ই দিয়ে থাকেন।। পরিবারের গঠনমূলক এবং প্রকৃত সমালোচনা হলে সেই পাথেয় হয়ে থাকে আজীবন। কোন শিশুকালে শিখেছিলাম, গুরুজনদের চটি হাত দিয়ে এগিয়ে দিতে হয়। খাবার সময় মুখে শব্দ করতে হয় না। পা ঘষে আওয়াজ করে হাঁটতে হয় না। বয়সে বড়দের ‘তুমি তুই’ বলা যাবে না, তিনি রিকশাচালক কিংবা বাড়িতে সহায়তাকারী যে-ই হোন না কেন। এমন কত কিছু ছোটবেলা থেকে শুনে শুনে মনে এমন গেঁথে গেছে যে, সন্তান কিংবা শিক্ষার্থীদের মধ্যে এই শিক্ষা প্রবাহিত করে চলেছি।

মায়ের কাছে সন্তান পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সম্পদ। সন্তানের কাছে তেমনটাই হওয়া উচিত। কিন্তু সন্তানের জীবনের পথে মা অনেক দূরে হয়তো ছিটকে যান। সন্তান কভু হারায় না তাঁর নয়নতারা থেকে। তাই তো বলা হয়—কুপুত্র যদি বা হয়, কুমাতা কদাপি নয়।

লেখক: শিক্ষক, লেখক ও সংস্কৃতিকর্মী

আরও পড়ুন:

সমাজের চোখে শিক্ষার্থী কী? এক কথায়, ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ। একদিন তারা সমাজ গড়বে, রাজনীতি বলুন, অর্থনীতি বলুন, কিংবা চিকিৎসা-সশস্ত্রবাহিনী-প্রশাসন বলুন… পুরো সমাজের নেতৃত্ব দেবে, এই স্বপ্ন দেখে বলেই তো...
নারীদের ছাড়া এ দেশে কোনো আন্দোলন হয়নি। সর্বশেষ চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানেও নারীরা সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন, লড়েছেন। কিন্তু তারপর? রাজনীতিতে আসা নারীকে লক্ষ্যবস্তু করে কুরুচিকর সব বক্তব্য দেওয়া কি...
এখনও যদি ভিন্নমত দমন, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, সামাজিক বিভাজন ও সম্প্রীতি নষ্টের মতো গুরুতর প্রশ্ন ওঠে, তাহলে ফ্যাসীবাদী সরকারের পতন হলেও রাষ্ট্রযন্ত্রের চরিত্রে কতটা ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে? তবে...
পৃথিবীর জনসংখ্যার মোট ওজনের সমান প্লাস্টিক প্রতিবছর উৎপাদিত হয় (সূত্র: আর্থডে)। যদি বিশ্বব্যাপী প্লাস্টিক ব্যবহারের ধারা অব্যাহত থাকে, তবে ২০৫০ সালের ভেতর ১,১০০ মিলিয়ন টন প্লাস্টিক উৎপাদিত হবে।...
অবশেষে লুইস দে লা ফুয়েন্তের হাত ধরে ১৬ বছর পর আরেকবার বিশ্বজয়ের খুব কাছে চলে গিয়েছে ব্রাজিল। তবে স্পেনের দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জয়ের পথে একমাত্র বাধা এখন আর্জেন্টিনা। নিউজার্সির মেটলাইফে আজ রাত ১টায় সেই...
গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত সারা দেশে হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হয়েছে মোট ৬৯৩ শিশুর। আর হামে আক্রান্ত হয়ে আরও ৯৫ শিশু প্রাণ হারিয়েছে। অর্থাৎ হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে এই সময়ে মোট ৭৮৮ শিশুর মৃত্যু...
বিশ্বকাপ ফাইনাল ম্যাচ মানেই জমজমাট প্রতিদ্বন্দ্বিতা। তবে আর্জেন্টিনা-স্পেনের এবারের ফাইনাল শুধু মাঠের লড়াই নয়, গড়েছে নতুন বাণিজ্যিক রেকর্ডও। টিকিটের আকাশছোঁয়া দামে এটি এখন ক্রীড়া ইতিহাসের...
ভারী বৃষ্টিতে রেললাইন ডুবে যাওয়ায় গত ৭ জুলাই থেকে ১১ জুলাই পর্যন্ত চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রুটে ট্রেন চলাচল পুরোপুরি বন্ধ ছিল। ফলে এই রুটে অগ্রিম কেটে রাখা ১১ হাজার ৩৩৭টি টিকেট ফেরত নিতে হয়েছে রেল...
লোডিং...

এলাকার খবর