ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন বা ইভিএম ঘিরে বিতর্কগুলো আমাদের জনজীবনে ডালভাতের মতো সহজ ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রত্যেক ভারতীয় যেমন সকল চেনা-অচেনা রোগের ওষুধ দিতে জানেন, তেমনি যিনি এসএমএস টাইপ করতে জানেন, তিনিও ইভিএম সফটওয়্যার সম্পর্কে মতামত দেন। এ বিষয়ে শত শত ঘণ্টার জ্ঞানগর্ভ আলাপ শোনার পর আমার উপলব্ধি হয়েছে, গণতন্ত্রের প্রতি ভালোবাসা, অসহায়ত্বের প্রতি সহানুভূতি ও বিজ্ঞানের কল্পকাহিনীর প্রতি বিপুল আকাঙ্ক্ষা একটি দেশের রাজনৈতিক স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর।
বিগত ১৫ বছরে শুধু চরিত্রগুলোর অভিনেতা পরিবর্তিত হয়েছে। আর স্ক্রিপ্ট বদলায়নি। ভিভিপ্যাট মেশিন (ভোটার ভেরিফিয়েবল পেপার অডিট ট্রায়াল) আসার পরেও চিত্রনাট্য একই রয়ে গেছে। অর্থাৎ ইভিএম নিয়ে বিতর্কটি এখন পর্যন্ত শুধু নির্বাচনের পুরো প্রক্রিয়া সম্পর্কে সন্দেহের বীজ বপন করতে পেরেছে। আর নির্বাচনী অসৎ আচরণকে বিভ্রান্ত করেছে। তাই এখনই বিতর্কটি বন্ধ হওয়া উচিত। এ ছাড়া গণতান্ত্রিক সংস্কারসহ আরও গুরুত্বপূর্ণ বেশ কিছু বিষয় এগিয়ে নিতে পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য এখনই জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলা দরকার।
ইভিএম বিতর্ক আমাদের গণতান্ত্রিক স্বপ্নের শেষ বিন্দু। ১৯৬০ ও ৭০ এর দশকে আমরা পার্টি ব্যবস্থার সংস্কার, রাজনৈতিক ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ, ভোটের অনুপাতের ভিত্তিতে প্রতিনিধিত্ব নির্ধারণের মাধ্যমে গণতন্ত্রিক ব্যবস্থা কয়েম করা ইত্যাদি নিয়ে বিতর্ক করেছি। পরে অবশ্য ১৯৯০-এর দশকে বিতর্কগুলো নির্বাচনী সংস্কারের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছিল। শেষমেশ একটি স্বাধীন নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন পরিচালনার একটি মডেল দাঁড়ায়। ইদানীং নির্বাচনী প্রক্রিয়া নিয়ে যে বিতর্কটি দেখা দিয়েছে, সেটি হচ্ছে, ভোট গ্রহণ ও গোনার প্রক্রিয়ায় কীভাবে জালিয়াতি রোধ করা যায়। ইভিএম হচ্ছে সেই অ্যাজেন্ডা বাস্তবায়নের একটি ছোট অংশ।
এরই প্রেক্ষাপটে বলা যায়, বিগত লোকসভা নির্বাচন একটি অস্বাভাবিক সূচনা করে দিয়েছে। এর একটি আশ্চর্যজনক ফলাফল হচ্ছে, ইভিএমের মাধ্যমে যে অদৃশ্য কারচুপি হয় বা নির্বাচনী জালিয়াতি হতে পারে, সেই সন্দেহের অবসান হয়েছে। কারণ ক্ষমতাসীনেরা (মোদি সরকার) একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়েছে। এ থেকে বোঝা যায়, তারা নিজেদের মতো করে নির্বাচনী ফলাফল তৈরি করতে পারেনি। উত্তর প্রদেশ ও মহারাষ্ট্রের মতো রাজ্যে তারা অপমানজনকভাবে হেরেছে। অথচ এসব রাজ্যে তারা ক্ষমতায় ছিল।
এটা খুবই ছোট যুক্তি হলেও একেবারে উপেক্ষা করা যায় না যে, ইভিএম তার ন্যায্যতার ন্যূনতম শর্ত পূরণ করতে পেরেছে। তার মানে এই নয় যে, সামগ্রিক নির্বাচন ব্যবস্থা অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হয়েছে বা নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং গ্রাউন্ড ছিল। ইভিএম শুধু ভোটারদের চূড়ান্ত পছন্দকে প্রতিফলিত করতে পেরেছে।
যাইহোক, ইভিএম নিয়ে বিতর্কের ধরণ পরিবর্তন হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু দুঃজনকভাবে তা হয়নি। বর্তমান সরকার যেমন মানতে রাজি নয় যে নির্বাচনী রায় নম্র হতে শিক্ষা দিয়েছে, তেমনি বিরোধী দলও স্বীকার করতে নারাজ যে ভোটের ফলাফল ইভিএমের দৃঢ়তার প্রতি শ্রদ্ধা। নড়বড়ে হওয়ার জন্য বিরোধী দলকে বা গণতন্ত্রের তত্ত্বাবধায়কদের না-বলার জন্য দোষ দেওয়া সহজ। এ ক্ষেত্রে আসল সমস্যাটি হচ্ছে, নির্বাচন কমিশন। তারাই বিতর্কিত আচরণের মাধ্যমে নির্বাচনে কারচুপির ষড়যন্ত্রতত্ত্বকে বিশ্বাসযোগ্যতা দিয়েছে।
ষড়যন্ত্রতত্ত্বকে বিশ্বাসযোগ্যতা দেওয়ার পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে ভোট পড়ার চূড়ান্ত হার প্রকাশে নির্বাচন কমিশনের অত্যধিক বিলম্ব হওয়া। প্রথম পর্বের ভোটের পরেই অনেক নেতা-কর্মী ও পর্যবেক্ষক (বর্তমান লেখকসহ) প্রশ্ন তুলেছিলেন। নির্বাচন কমিশন এখন পর্যন্ত এর সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে পারেনি। ফলে অনেক বিবেকবান মানুষ পর্যন্ত সন্দেহ করেন যে, নির্বাচনে ব্যাপক জালিয়াতির ঘটনা ঘটেছে। অনেকে মনে করেন, ভোটগ্রহণ শেষ হয়ে যাওয়ার পরেও অন্তত ৬ শতাংশ ভোট পড়েছে।
ভোট ফর ডেমোক্রেমি ‘কনডাক্ট অব লোকসভা নির্বাচন ২০২৪’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। সেখানে তারা এমন চাঞ্চল্যকর সিদ্ধান্ত জানিয়েছে যে, ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার পরে প্রায় ৪ কোটি ৬৫ লাখ জাল ভোট পড়েছে। এটি বিজেপির নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোটকে অতিরিক্ত ৭৯টি আসন জিততে সহায়তা করেছে। এই অভিযোগ যদি ব্যাপকভাবে সত্য হয়ে থাকে, তবে এটি নির্বাচনী প্রক্রিয়ার বৈধতাকে অবশ্যই প্রশ্নবিদ্ধ করবে এবং ইসি তার ব্যর্থতা অস্বীকার করতে পারে না।
এ ছাড়া জরিপকৃত ভোট ও প্রকৃত ভোট গণনার মধ্যেও অদ্ভূত গরমিল দেখা গেছে। অ্যাসোসিয়েশন অফ ডেমোক্রেটিক রিফর্মস (এডিআর) ২০১৯ সালে অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে মাধ্যমে একই ধরনের অভিযোগ তুলেছিল। এডিআর বলছে, ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে প্রদত্ত ভোট ও গণনা ভোটের মধ্যে বড় ধরনের গরমিল দেখা গেছে। আনুষ্ঠানিকভাবে ইভিএমে ভোটের সংখ্যা এবং ইভিএমে গণনা করা ভোটের সংখ্যা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ৫৪৩টি আসনের মধ্যে ৫৩৭টিতেই ভোটের সংখ্যায় গরমিল রয়েছে। অন্যান্য ছোটখাটো ত্রুটি বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। প্রতিটি আসনে গড়ে এক হাজারের বেশি ভোটের ব্যবধান দেখা গেছে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, এসব ব্যাপারে ইসি এখন পর্যন্ত বিশ্বাসযোগ্য ব্যাখ্যা দিতে পারেনি। এসব কারণে গণতান্ত্রিক সংস্কারের প্রশ্নটি গভীরভাবে সামনে এসেছে।
ভারতীয় নির্বাচন পর্যবেক্ষণের একটি স্বাধীন প্যানেল (যেখানে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকও অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন) ‘ভারতে নির্বাচনী অখণ্ডতা, পরিবর্তনের অ্যাজেন্ডা: ২০২৪ সালের নির্বাচন থেকে শিক্ষা’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। ওই প্রতিবেদনেও নির্বাচনী ব্যবস্থার নানা অনিয়ম তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, নির্বাচনের সময়ে বিরোধী দলের চেয়ে ক্ষমতাসীন দল ব্যাপক অন্যায্য সুবিধা পেয়েছে। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা, অর্থ এবং গণমাধ্যমের পক্ষপাতমূলক আচরণ নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং গ্রাউন্ডের ধারণার জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। এসব বিষয়ে আরও বৃহৎ পরিসরে আলোচনা ও বিতর্ক হওয়া প্রয়োজন।
আর এটি শুরু করা যেতে পারে ইভিএম বিতর্ক বন্ধ করার জন্য জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলার মধ্য দিয়ে। প্রথমত, আমাদের ব্যালট পেপারের যুগে ফিরে যাওয়ার কথা ভাবা যাবে না। এতে সমাধানের চেয়ে সমস্যাকেই আমন্ত্রণ জানানো হবে। দ্বিতীয়ত, আমাদের অবশ্যই এমন একটি উপায় খুঁজে বের করতে হবে, যার মাধ্যমে ভোটারদের পছন্দের রেকর্ড সঠিকভাবে যাচাই ও প্রমাণ করা যায়। ভোটারদের হাতে স্লিপ হস্তান্তর না করেই এর জন্য ফুলপ্রুফ সমাধান তৈরি করতে হবে। আর সবশেষ বিষয়টি হচ্ছে, ভিভিপ্যাট–এ কাগজের স্লিপ (ইভিএম প্রদর্শন নয়) নির্বাচনের ‘অফিসিয়াল রেকর্ড’ হিসেবে গণনা বাধ্যতামূলক করতে হবে।
ইভিএমের এই সব পরিবর্তন ছাড়াও নির্বাচন কমিশনকে নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার আগে তথ্য প্রকাশের ব্যাপারে এডিআর-এর বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিতে হবে। কমিশনকে অবশ্যই একটি নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে প্রতিটি বুথ এবং নির্বাচনী এলাকার জন্য যোগ্য এবং প্রকৃত ভোটারদের চূড়ান্ত সংখ্যা প্রকাশ করতে হবে। প্রতিটি আশঙ্কা ও সন্দেহকে গুরুত্ব দিতে হবে এবং বাস্তব বিষয়গুলোর ওপর ফোকাস করতে হবে।
লেখক: স্বরাজ ইন্ডিয়ার সদস্য এবং ভারত জোড়ো যাত্রার জাতীয় আহ্বায়ক
(ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকায় প্রকাশিত এবং ইংরেজি থেকে অনুদিত)
নিবন্ধটি দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে অনুবাদ করেছেন মারুফ ইসলাম
[এই মতামত লেখকের নিজস্ব। এর সঙ্গে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পাদকীয় নীতিমালার কোনো সম্পর্ক নেই।]


‘এক দেশ, এক নির্বাচন’, এবারই বাস্তবায়ন করবেন মোদি!
জনগণের সঙ্গে এ কেমন বিশ্বাসঘাতকতা মোদির!
