বিশ্বকাপের প্রথম সেমিফাইনাল আজ। ম্যাচের আগে কোথায় ম্যাচের কৌশল, খেলোয়াড়দের ফর্ম - এসব নিয়ে আলোচনা হবে – তা নয়, কথা হচ্ছে পিচ নিয়ে। শুধু পিচ নিয়ে বলাটা ভুল হবে, নিজেদের সুবিধামতো পিচ বদলে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে নামছে ভারত – এমন অভিযোগে টালমাটাল ক্রিকেট বিশ্ব।
মুম্বাইয়ের ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামে সম্পূর্ণ নতুন এক পিচে খেলার কথা ভারত-নিউজিল্যান্ডের। কিন্তু সেটা হচ্ছে না। আইসিসি’র নিয়মের তোয়াক্কা না করে এমন এক পিচে ভারত ম্যাচটা খেলছে, যেখানে আগেও দুটো ম্যাচ হয়েছে, এবং দুই ম্যাচ হওয়ার পর যে পিচ যথেষ্টই স্পিনবান্ধব ও ধীরগতির হয়ে গিয়েছে। কিন্তু কেন এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে ভারত?
সে প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে সবার প্রথমে জানতে হবে ওয়াংখেড়ে পিচের আচরণ সম্পর্কে। এর আগে এই বিশ্বকাপে এই পিচে যে দুটি ম্যাচ হয়েছে, সে দুই ম্যাচে আগে ব্যাটিং করা দল বিপুল রানে জিতেছে। ইংল্যান্ড-দক্ষিণ আফ্রিকা ম্যাচে প্রোটিয়ারা জিতেছে ২২৯ রানে, ভারত শ্রীলঙ্কাকে হারিয়েছে ৩০২ রানে। অর্থাৎ, এ পিচে প্রথমে ব্যাট করতে নামলে মোটামুটি জয় সুনিশ্চিত।
বছরের এই সময়ে প্রথমে ব্যাট করে পরে বল করা এই পিচে কেন সুবিধাজনক? ওয়াংখেড়ের সাবেক এক কিউরেটরের কথায় সে ব্যাপারটা একটু হলেও আঁচ করা যায়। ‘ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নাদিম মেমন নামের সাবেক এই কিউরেটর দিয়েছেন চমক জাগানো এক তথ্য, ‘আপনি যদি মুম্বাইয়ে বিকেল-সন্ধ্যার দিকে ব্যাট করতে নামেন, প্রথম দশ ওভার একটু দেখেশুনে খেলুন। ওই সময় পাশে থাকা আরব সাগর থেকে সান্ধ্যকালীন বাতাস বয়ে যায় স্টেডিয়াম দিয়ে। ওই বাতাসকে সম্মান করুন। না হয় যেকোনো ব্যাটসম্যান উইকেট হারাতে পারেন।’
‘ইন্ডিয়া টুডে’কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ভারতের সাবেক ব্যাটসম্যান সুরেশ রায়নাও একই কথা বলেছেন, ‘ম্যাচ যেহেতু দুটোয় শুরু হচ্ছে (বাংলাদেশ সময় আড়াইটায়), দ্বিতীয় ইনিংস শুরু হবে পৌনে ছ’টার দিকে (বাংলাদেশ সময় সোয়া ছ’টা)। ওই সময় পাশের মেরিন ড্রাইভ থেকে ঠাণ্ডা বাতাস স্টেডিয়াম দিয়ে বয়ে যায়, যা পেসারদের সুইং করানোর জন্য সহায়ক।’
অর্থাৎ কোনো ভালো পেসার ওই সময়ে বল করতে নামলে বাতাস ব্যবহার করে সুইং করাতে পারবেন। শুরুতে ব্যাট করতে নামলে ওয়াংখেড়ের ব্যাটিংবান্ধব পিচ ব্যাটসম্যানদের অনেক সহযোগিতা করবে, যা দ্বিতীয় ইনিংসের শুরুতে – অন্তত প্রথম পাওয়ারপ্লে’তে - করবে না। যে কারণে প্রথম পাওয়ার প্লে তে দলগুলো উইকেটও হারাচ্ছে বেশ। এবং সেই জেরে ম্যাচও হারছে। ভারতের যশপ্রীত বুমরা, মোহাম্মদ শামি, মোহাম্মদ সিরাজরা যেমন দুর্দান্ত ফর্মে আছেন – তাতে প্রথম পাওয়ারপ্লে’র সুবিধা ব্যবহার করে টপাটপ উইকেট তুলে নিতে কোনো সমস্যাই হবে না তাঁদের। শ্রীলঙ্কা-ভারত ম্যাচে সেটাই দেখা গেছে। প্রথম পাওয়ারপ্লে’তে এ ম্যাচে শ্রীলঙ্কা কোনোরকমে ১৪ রান তুলেছিল, সেটা তুলতে গিয়ে হারিয়েছিল ৬ উইকেট। অন্যান্য ম্যাচেরও একই অবস্থা। দ্বিতীয় ইনিংসের প্রথম পাওয়ারপ্লে’তে ব্যাট করতে নেমে দলগুলোর স্কোর – ৬৭/৪, ৩৫/৩, ১৪/৬ ও ৫২/৪। আফগানিস্তানের বিপক্ষে গ্লেন ম্যাক্সওয়েল অতিমানব না হয়ে বসলে ওয়াংখেড়েতে হওয়া সেই ম্যাচেও দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাট করতে নামা অস্ট্রেলিয়া হেরে যায়!
কিন্তু এ তথ্য তো ভারত যেমন জানে, জানে নিউজিল্যান্ডও। টস যে জিতবে, সে যে ব্যাটিংই নেবে, এটা নিয়ে আশ্চর্যের কিছু নেই। ইংল্যান্ডের জস বাটলার আর শ্রীলঙ্কার কুশল মেন্ডিসের মতো অধিনায়কেরা টস জিতে শুরুতে বোলিং নেওয়ার যে ভুল করেছেন, সে ভুল নিশ্চয়ই করবেন না কেইন উইলিয়ামসন বা রোহিত শর্মা।
প্রশ্ন উঠতে পারে, নিউজিল্যান্ডের পেসাররাও তো পরে বোলিং করে প্রথম পাওয়ারপ্লে’র সেই সুবিধা নিতে পারেন। অবশ্যই পারেন। তাঁদের শিবিরে আছেন ট্রেন্ট বোল্টের মতো বাঁহাতি পেসার, সতীর্থ ম্যাট হেনরির সঙ্গে ২০১৯ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ওল্ড ট্রাফোর্ডের ঠাণ্ডা বাতাসের সঙ্গে সুইংয়ের বিষ মিশিয়ে যিনি ভারতের টপ অর্ডারে ধস নামিয়েছিলেন। তাই ভারত দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাট করতে নামলে বোল্টেরও খুশিই হওয়ার কথা। কিন্তু আর কে থাকবেন বোল্টের সঙ্গে? বুমরার সঙ্গে শামি আছেন, আছেন সিরাজ। বোল্টের সঙ্গী ম্যাট হেনরি তো আগেই চোটের কারণে বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে গিয়েছেন! এই ম্যাট হেনরিই সুইংবান্ধব পিচে রোহিত শর্মা, লোকেশ রাহুল আর দিনেশ কার্তিককে আউট করে ভারতের বিদায়ের সূচনা করে দিয়েছিলেন।
কাগজে-কলমে তাই বলা যেতে পারে, ওয়াংখেড়ের বাতাসের সুবিধা নিয়ে দ্বিতীয় ইনিংসের প্রথম পাওয়ারপ্লে’তে সুইং করানোর জন্য যে পেস-শক্তি থাকার দরকার, নিউজিল্যান্ডের চেয়ে ভারতের অনেক বেশিই আছে সেটা। তবে ভারত সম্ভবত সে কথা ভেবে স্বস্তিতে থাকতে রাজি নয়। লকি ফার্গুসন, টিম সাউদি বা কাইল জেমিসনের মতো পেসাররা যে ওই সময়ে বোল্টের পাশাপাশি জ্বলে উঠবেন না, তার নিশ্চয়তা কি? টস জিতে প্রথমে ব্যাটিং করলে তাই এই সুবিধাটা পাওয়া যাবে। কিন্তু টস হেরে যদি পরে ব্যাটিং করতে হয়? ঠিক এ কারণেই পিচ নিয়ে কারসাজির যে অভিযোগ ভারতের বিরুদ্ধে করা হচ্ছে, তার একটা ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। কারণ, দ্বিতীয় ইনিংসে উইকেট যদি ধীরগতির হয়, সেখানে ফার্গুসন-বোল্টদের সুবিধা পাওয়ার সম্ভাবনা সামান্যই।
বলা হচ্ছে, আইসিসি’র নিয়মের তোয়াক্কা না করে ভারত যে পিচটা বেছে নিয়েছে, সেটা বেশ স্পিনবান্ধব। অর্থাৎ টস হেরে পরে ব্যাটিং করলেও অতটা সমস্যা হবে না। আর নিউজিল্যান্ডের স্পিন শক্তিও ভারতের মতো নয়, যে পিচে ব্যবহার করে খুব বেশি সুবিধা করতে পারবে তারা। ভারত কোনো ঝুঁকি নিতে চায়নি। প্রাণবন্ত উইকেট নয়, তারা সেমিফাইনালে চায় ধীরগতির উইকেট। যে উইকেটে ভারত রান তুলতে পারলেও বাইরের দেশগুলোর কষ্ট হবে রান পেতে। বিশ্বকাপে ভারতের অন্য ম্যাচগুলোতেও দেখা গেছে স্লো উইকেটে ভারত ভালো করলেও অন্যরা মানিয়ে নিতে পারছে না।
অর্থাৎ প্রথমে ব্যাট করলেও ভারতের সুবিধা – শুরুতে ব্যাট করলে ওয়াংখেড়ের প্রথাগত ব্যাটিংবান্ধব পিচ সাহায্য করবে। পরে ব্যাট করলেও তাই – উইকেট একটু ধীরগতির বলে অন্যান্য যেকোনো দেশের চেয়ে ভারত ভালো মানিয়ে নিতে পারবে!



