আজ জাতীয় কন্যাশিশু দিবস। প্রতি বছর কন্যা শিশুদের প্রতি বৈষম্য দূরীকরণের পাশাপাশি জনসচেতনতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্য এই দিবস পালিত হয়। এ বছর এই দিবসের প্রতিপাদ্য ‘কন্যাশিশুর স্বপ্নের গড়ি আগামীর বাংলাদেশ’।
একটি সত্য ঘটনা দিয়ে শুরু করা যাক। মেয়েটির নাম যমুনা (ছদ্মনাম)। যমুনা বর্তমানে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। যমুনার ছোটবেলার সময়টা খুব একটা সুখের ছিল না। যেমনটা এ দেশের আর দশটা মেয়ের বেলায় হয়ে থাকে, যমুনার ক্ষেত্রেও তেমনটি হয়েছিল।
যমুনারা ছিলেন চারবোন। ছোটবেলা থেকেই যমুনা তাঁর মায়ের মুখ থেকে শুনে এসেছে, তাদের বাবা চার সন্তান নিয়েছেন কারণ, তিনি ছেলে সন্তান চান। আর তাই যমুনাদের এই পৃথিবীতে আসা। রক্ষণশীল পরিবারে মেয়ে হিসেবে বেড়ে উঠতে গিয়ে আত্মীয়-স্বজনদের মুখে শতবার শুনেছেন ‘তোমরা সবাই মেয়ে?’ ‘আহারে ঘরে কোনো ছেলে নাই?’–এমন অনেক কটু কথা।
ধীরে ধীরে যমুনা বড় হতে থাকে। আর সমাজে স্রোতের বিপরীতে টিকে থাকতে গিয়ে বুঝতে পারেন, নারী ও পুরুষের মধ্যকার যে বৈষম্য, তা কৃত্রিম। সমাজ, তথা রাষ্ট্র এই বৈষম্যের কারিগর। এই কথা বোঝার পর থেকেই তাঁর মধ্যে নারী হওয়ার কারণে আর কোনো আক্ষেপ কাজ করে না। যমুনা মনে করেন, তিনি কোনোভাবেই একজন ছেলের চেয়ে জন্মগতভাবে কম যোগ্য নন।
যমুনার বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শুরু হওয়ার আগেই বিয়ের প্রস্তাব আসে। এবং তাঁর বাবা স্বভাবতই মেয়ের মতামত না নিয়েই পাত্র ঠিক করেন। নিজের মতের বিরুদ্ধে এহেন আচরণে ক্ষুব্ধ হয়ে যমুনা অন্য উপায় না দেখে বাসা থেকে বেরিয়ে পড়েন।
প্রায় এক মাস বাবার সঙ্গে কোনো ধরনের যোগাযোগ করেন না। বন্ধু-বান্ধবদের সহায়তায় টিউশনি করে নিজেই নিজের খরচের যোগান দেন। কিন্তু তাঁর বাবা মেয়ে বিয়েতে রাজি না হওয়াতে যমুনার মায়ের গায়েও হাত তোলেন। প্রায় প্রতিদিনই অন্য মানুষদের দিয়ে যমুনাকে ফোন করে তটস্থ করে তোলেন। এ অবস্থায় যমুনা থানায় বাবার নামে জিডি করেন।
জিডি করার ক্ষেত্রেও থানায় নানা বাধা বিপত্তি ঘটে। ‘একা মেয়ে বাবার নামে জিডি করবে’, ‘প্রেম করে পালিয়েছ নাকি’, ‘বাবা কি সন্তানের খারাপ চায়?’–এ জাতীয় বহু প্রশ্নের সম্মুখীন হন তিনি। পরবর্তী সময়ে ‘শান্তিবাড়ি’ নামক সংগঠনের মধ্যস্থতায় বাবা এবং মেয়ের মধ্যে লিখিত সিদ্ধান্ত হয়, বাবা হয়ে মেয়ের ওপর তাঁর কোনো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিতে পারবেন না।
নিজের জীবনের তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে যমুনা বুঝতে পারেন, নারী পরিচয়ের সকল সংকটের মূলে রয়েছে এই রাষ্ট্রকাঠামো। এই সমাজে রাষ্ট্র যতদিন লিঙ্গ বৈষম্যের ঊর্ধ্বে যেতে পারবে না, ততদিন এই সমস্যা থেকে নারীরা বের হয়ে আসতে পারবে না। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে পুরুষতন্ত্র ক্যানসারের মতোই বিকাশ লাভ করছে। যে কারণে ছেলে সন্তান ও কন্যা সন্তানের মধ্যে এত বৈষম্য।

যমুনা মনে করেন, পুরুষতান্ত্রিক সমাজ নারীর অর্থনৈতিক মুক্তি চায় না, ফলে ধরে নেওয়া হয়, কন্যা সন্তান সংসারের হাল ধরতে পারবে না। এই চিন্তারই বহিঃপ্রকাশ ঘটে বেশির ভাগ নারীর জীবনে।
এ শুধু যমুনার একার কথা নয়। এ দেশের হাজার হাজার পরিবারের কন্যা সন্তানদের মনের কথা। তাই বলতে হয়, এ দেশের কন্যা শিশুরা মোটেও ভালো নেই। যমুনারা জন্মের পর থেকে সমাজের প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যে বড় হন। আর সেখানে প্রতি পদে ভুগতে থাকেন নিরাপত্তাহীনতায়। এই নিরাপত্তাহীনতায় কিন্তু পরিবারের ছেলে সন্তানদের সম্মুখীন হতে হয় না। সমাজে এমন অনেক পরিবার আছে, যেখানে এ যুগেও নতুন অতিথি হয়ে কন্যা সন্তানের জন্ম হলে সেই পরিবারের সদস্যরা মন থেকে খুশি হন না। কিন্তু ছেলে সন্তান হলে তারা খুশিতে আত্মহারা হয়ে পড়েন।
কন্যাশিশুর প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণের পরিবর্তন কি আদৌ সম্ভব? বৈষম্যহীন সমাজের জন্য কন্যারা আর কতকাল অপেক্ষা করবে? অথচ শিশু অধিকার সনদ অনুযায়ী প্রতিটি শিশুর বিকাশ এবং সুস্থতার নিশ্চয়তা দেওয়া আমাদের সকলের দায়িত্ব।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম ইনডিপেনডেন্ট ডিজিটালকে বলেন, ‘কন্যাশিশুর প্রতি সমাজের যে দৃষ্টিভঙ্গি, সেটার একটা বড় কারণ হলো–আমাদের সমাজে এখনো পর্যন্ত ক্ষমতার অংশিদারত্ব নারীদের হাতে নেই। সেটার প্রতিচ্ছবি একটা সময়ের পরে গিয়ে আমাদের কন্যাদের ওপর পড়ে। এ কারণে সম্পদ‑সম্পত্তিতে নারী পুরুষের সম-অধিকার নিশ্চিত করা প্রয়োজন। যদি সম্পত্তিতে পুত্র সন্তান আর কন্যা সন্তানের মধ্যে পার্থক্য না থাকে, তবে পরিবারে কন্যা শিশুর আগমনে কেউ দুঃখিত হবে না। অথবা সেই কন্যাকে সমাজ অবজ্ঞার চোখেও দেখবে না। সেটা সম্ভব হবে, যখন সম্পত্তিতে সমান অধিকার থাকবে। তখন নারীর শিক্ষার বিষয়টিও সমান গুরুত্ব পাবে। আর পরিবার থেকে কন্যা ও পুত্র সন্তানকে সমভাবে গড়ে তোলারও চেষ্টা থাকবে।’
ডা. ফওজিয়া মোসলেমের মতে, সম্পত্তি উত্তরাধিকারের যে আইন আছে, তা পরিবর্তন করে ধর্ম‑বর্ণ‑লিঙ্গ নির্বিশেষে সম্পত্তিতে সম‑অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। এতে কন্যার প্রতি দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন হবে। এর মধ্যে দিয়ে বাল্যবিবাহ, নারীর প্রতি সহিংসতা, নিপীড়ন বন্ধ হবে। সমাজ বা পরিবার নারীর অধিকারকে গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করবে। আসল কথা হলো, পরিবারে কন্যাদের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে। পরিবারে যদি কন্যাদের অধিকার প্রতিষ্ঠিত না হয়, সমাজ কিন্তু কন্যাদের অধিকার দেবে না। সেজন্য উত্তরাধিকার আইন পরিবর্তন করে সকল ক্ষেত্রে নারীদের সম অধিকার নিশ্চিত করতে পারলেই এই সমস্যা থেকে মুক্ত হওয়া যাবে।
জাতীয় কন্যাশিশু অ্যাডভোকেসি ফোরামের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ৮ মাস (জানুয়ারি‑আগস্ট) মোট ২৮ জন কন্যাশিশু যৌন হয়রানি ও নির্যাতনের শিকার হয়েছে, ২২৪ জন কন্যাশিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে, অপহরণ ও পাচারের শিকার হয়েছে ১৯ কন্যাশিশু, ১০ কন্যা গৃহশ্রমিক নির্যাতনের শিকার হয়েছে, ১৩৩ কন্যাশিশু আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছে, ৮১ কন্যাশিশুকে হত্যা করা হয়েছে, ২০ কন্যাশিশুর রহস্যজনক মৃত্যু হয়েছে এবং ১৮৭ কন্যাশিশু পানিতে পড়ে মারা গেছে।
গত ২৪ সেপ্টেম্বর জাতীয় প্রেসক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলন এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। জাতীয় কন্যাশিশু অ্যাডভোকেসি ফোরাম ৭০টি দৈনিক পত্রিকা (২৪টি জাতীয় দৈনিক, ৪৫টি স্থানীয় পত্রিকা, ৫টি অনলাইন) থেকে এ তথ্য সংগ্রহ করে।
আবার ইউনিসেফের জুন মাসের পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, বাংলাদেশে ১ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে উদ্বেগজনকভাবে প্রতি ১০ শিশুর মধ্যে ৯ শিশু প্রতি মাসে সহিংস পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছে। এতে প্রতি মাসে সাড়ে চার কোটি শিশুর ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
অনেকেই বলেন, সন্তান ছেলে বা মেয়ে হোক না কেন, মানুষ হওয়াটাই বড় কথা। কিন্তু কথা হলো, কন্যা সন্তানের আগমনে যে পরিবার আনন্দিত হয়, সেই পরিবারের সদস্যরা কি সত্যিই কন্যা সন্তান নিয়ে গর্বিত থাকে? সেই পরিবার কি পুত্র সন্তানের আশায় বেশি সন্তান নেয় না? লেখার শুরুর ঘটনা কিন্তু ইতিবাচক কিছু ভাবতে দিচ্ছে না।এ কথা সত্য যে, বেশির ভাগ পরিবার কন্যা শিশুদের বোঝা মনে করে। এমন অনেক পরিবার আছে, যেসব পরিবার কন্যাদের পড়ালেখা পর্যন্ত শেখাতে চায় না। কারণ, সেসব পরিবার মনে করে স্কুল‑কলেজে পড়ালেখা করাতে গেলে তার জন্য অর্থের প্রয়োজন। সেই অর্থ পড়ালেখায় খরচ না করে মেয়ের বিয়েতে খরচ করাকে যুক্তিযুক্ত মনে করে তারা। এসব পরিবারের চিরসত্য বক্তব্য হলো–বিয়ে দিতে পারলেই মেয়ের বোঝা কাঁধ থেকে নামনো যাবে। এ কারণে এসব পরিবার মেয়েদের বাল্যবিবাহ দিতেও পিছপা হয় না।
পরিবারে ছেলে সন্তানের যে অধিকার, সে অধিকার কন্যা সন্তানেরও হওয়া প্রয়োজন। সমতাপূর্ণ সমাজ গঠনের মাধ্যমে নিশ্চিত হবে কন্যা ও নারীর অধিকার।


পৃথিবী কি স্বপ্ন দেখাতে ব্যর্থ?
সব ধরনের অসমতার বিরুদ্ধে লড়াই জোরদার হোক
৮ মাসে ১৮৭ কন্যাশিশুর পানিতে ডুবে মৃত্যু, ধর্ষণের শিকার ২২৪
