ভারতের মহারাষ্ট্রের চন্দ্রপুর জেলার সীতারামপেঠ গ্রাম। গ্রামটি ঘন জঙ্গলে ঘেরা, যেখানে বাঘের আনাগোনা নিত্যদিনের ঘটনা। বাঘের ভয় সঙ্গী করেই এখানে বাস করেন বাসিন্দারা। গ্রামের চারপাশে তারের বেড়া থাকলেও আতঙ্ক পিছু ছাড়ে না তাদের।
গ্রাম থেকে সবচেয়ে কাছের বাসস্ট্যান্ডে যাওয়ার জন্য প্রায় আধা কিলোমিটারের একটি কাঁচা রাস্তা আছে। যার একদিকে জঙ্গল, আর রাস্তায় নেই কোনো আলোর ব্যবস্থা। এই পথে প্রায়ই বাঘ দেখা যায় এবং গবাদি পশুর ওপর আক্রমণের ঘটনাও ঘটে। ফলে এই রাস্তা দিয়ে যাতায়াত গ্রামবাসীর জন্য চরম আতঙ্কের।
গ্রাম থেকে শিশুদের স্কুলের দূরত্ব প্রায় ৭ কিলোমিটার। স্কুলে যাওয়ার একমাত্র পথটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় শিশুদের জীবন নিয়ে সব সময় শঙ্কায় থাকতে হয় অভিভাবকদের। এই শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অনন্য এক দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছেন গ্রামের চার সাহসী নারী। হাতে মশাল, টর্চ আর লাঠি নিয়ে শিশুদের রক্ষা করেন কিরণ গেডাম, বেণু রান্দায়ে, রীনা নাট এবং সীমা মাদাভি।
প্রায় ২০০ জনসংখ্যার এই গ্রামে শিক্ষার্থী আছে ১১ জন। তাদের বাসে করে স্কুলে যেতে হয়, আর বাসস্ট্যান্ডে পৌঁছাতে পাড়ি দিতে হয় সেই বিপজ্জনক আধা কিলোমিটার পথ। দশম শ্রেণির ছাত্র সুশান্ত নাট জানায়, গত মাসেই স্কুলে যাওয়ার পথে তারা একটি বাঘ দেখেছে। বাঘটি একটি গরুকে তাড়া করছিল। ভয়ে চিৎকার করে তারা গ্রামে পালিয়ে আসে।
শিশুদের এই আতঙ্কের কথা ভেবেই এগিয়ে আসেন চার নারী। প্রতিদিন সকাল পৌনে ১০টায় বাস আসার আগে শিশুরা এক জায়গায় জড়ো হয়। এরপর এই চার নারী শিশুদের মাঝখানে রেখে চারপাশ থেকে নিরাপত্তা বেষ্টনী তৈরি করে বাসস্ট্যান্ডে নিয়ে যান। বাস না আসা পর্যন্ত সেখানেই অপেক্ষা করেন তারা। আবার সন্ধ্যা পৌনে ৭টায় যখন শিশুরা ফিরে আসে, তখন লাঠি আর টর্চ নিয়ে আগেভাগেই বাসস্ট্যান্ডে হাজির থাকেন কিরণ, বেণু, রীনা ও সীমা।
অন্ধকার পথে বাঘ বা সাপ তাড়াতে তারা লাঠি দিয়ে শব্দ করেন এবং জোরে জোরে কথা বলেন। কিরণ গেডাম বলেন, ‘বাচ্চাদের নিতে যাওয়ার সময় প্রায়ই বাঘ দেখি, কিন্তু ওদের বলি না। আমরা বন বিভাগের কাছে প্রহরীর আবেদন করেও ফল পাইনি, তাই নিজেরাই সন্তানদের রক্ষার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’ তিনি আরও জানান, বিদ্যুতের ব্যবস্থা না থাকায় তাদের ১৫ মিনিটের এই পথটুকু পার হওয়া অত্যন্ত বিপজ্জনক।
এ বিষয়ে স্থানীয় বন কর্মকর্তা সন্তোষ থিপে জানান, তারা এই উদ্যোগ সম্পর্কে অবগত এবং এটি বন্যপ্রাণী সংঘাত রোধের বড় উদাহরণ। তিনি ঘোষণা করেন, তাডোবা ব্যাঘ্র সংরক্ষণের অধীনে ১০৫টি গ্রামে এই পদ্ধতি প্রয়োগ করা হবে। ওই নারীদের কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ প্রতি মাসে চার হাজার টাকা সম্মানীর পাশাপাশি জ্যাকেট, টর্চ এবং ইলেকট্রিক স্টিক দেওয়া হবে।



