এবারের আন্তর্জাতিক নারী দিবসের প্রতিপাদ্য ‘নারীর সমঅধিকার,সমসুযোগ এগিয়ে নিতে হোক বিনিয়োগ।’ এই বিনিয়োগ শুধু শিক্ষা বা ব্যবসা ক্ষেত্রে নয়, নারীর স্বাস্থ্য ক্ষেত্রেও যেন সমভাবে প্রয়োগ হয়, সেদিকে খেয়াল রাখা প্রয়োজন। ডিমেনশিয়া বা অ্যালঝাইমার্স অথবা স্মৃতিভ্রষ্টতায় বিশ্ব স্বাস্থ্যসংস্থার মতে প্রতি ৩ সেকেন্ডে একজন করে আক্রান্ত হচ্ছেন। কিন্তু এদের দুই–তৃতীয়াংশই নারী। অর্থাৎ, পুরুষদের তুলনায় নারীদের আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা দ্বিগুণ।
এর কারণ হিসেবে উঠে এসেছে, নারীরা পুরুষদের থেকে দীর্ঘজীবী। গবেষণা বলছে, ২০১৯ সালে যত কন্যা শিশুর জন্ম হয়েছে, একই বছরে জন্ম হওয়া ছেলে শিশুর তুলনায় কন্যারা পাঁচ বছর বেশি বাঁচবে। অর্থাৎ, নারী–পুরুষের আয়ুর অনুপাত ৮১ বছর বনাম ৭৬ বছর। ফলে নারীর বয়স যত বাড়বে স্মৃতিভ্রষ্টতায় আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা তত বাড়বে।
গবেষণালব্ধ উপাত্ত বলে প্রতিবছর—
৬৫ থেকে ৭৪ বছরের মধ্যে ১ হাজার জনের প্রতি ৪ জন,
৭৫ থেকে ৮৪ বছরের মধ্যে ১ হাজার জনের ৩২ জন,
৮৫ বছরের বেশি বয়স হলে প্রতি ১ হাজার জনে ৭৬ জন ডিমেনশিয়া রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা বিদ্যমান।
ডিমেনশিয়ার লক্ষণ
১. সদ্য ঘটে যাওয়া কোনো ঘটনা ভুলে যাচ্ছেন।
২. জিনিসপত্র হারিয়ে ফেলছেন অথবা এক জায়গার জিনিস অন্য জায়গায় রাখছেন।
৩. হাঁটতে বা গাড়ি চালাতে গিয়ে রাস্তা হারিয়ে ফেলছেন।
৪. পরিচিত জায়গায় গিয়েও বিভ্রান্ত হচ্ছেন।
৫. সময়ের সঙ্গে তাল মেলাতে পারছেন না।
৭. সিদ্ধান্ত নিতে বা সমস্যা সমাধানে মুশকিলে পড়ছেন।
৮. আলাপচারিতা বা কথা বলার সময় শব্দ খুঁজে বেড়াচ্ছেন।
৯. দুশ্চিন্তাগ্রস্ত, ভয় অথবা রেগে যাচ্ছেন। নিজেকে সামাজিক কার্যক্রম থেকে গুটিয়ে ফেলছেন।
১০. ব্যক্তিত্বে ধীরে ধীরে বদল আসছে।
চিকিৎসা ও যত্ন
এই রোগের নিরাময় নেই। ফলে এই রোগে আক্রান্ত হলে আরোগ্যনির্ভর চিকিৎসার পেছনে না ছুটে প্যালিয়েটিভ কেয়ার প্রয়োজন—এটা বোঝা দরকার। এ ছাড়া—
১. নিয়মিত হাঁটাচলা করুন।
২. মাথা খাটাতে হয়—এমন কাজ করুন।
৩. আপনার পছন্দের শখের কাজগুলো নিয়মিত করুন।
৪. চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। চিকিৎসক আপনার উপসর্গ বিশ্লেষণ করে প্রয়োজনীয় ওষুধ দেবেন।
৫. নিজের যত্ন নিজে নিন। নিজের প্রতিদিনকার কাজগুলো লিখে রাখুন।
৬. পারিবারিক সময় কাটান। যে মানুষগুলোকে আপনি বিশ্বাস করেন, তাদের সাহায্য নিন।
৭. প্রয়োজনে বন্ধু এবং পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের কাছে সাহযোগিতা চান। আপনার নিকটস্থ কোনো সাপোর্ট গ্রুপের সঙ্গে যুক্ত হোন।
৮. যদি পুরোপুরি স্মৃতিভ্রষ্টতায় আক্রান্ত হন, তখন আপনাকে নিয়ে কী করা হবে, অগ্রিম সেটা লিখে রাখুন এবং আপনার পরিচিতজনদের তা জানিয়ে রাখুন।
৯. বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় আপনার ব্যক্তিগত পরিচয়পত্র, ঠিকানা এবং বিপদে পড়লে কার সঙ্গে যোগাযোগ করা হবে সেই নম্বরটি সঙ্গে রাখুন।
১০. প্যালিয়েটিভ সেবা প্রদান করে এমন সংস্থার স্বেচ্ছাসেবক এর কাজে সংযুক্ত হন। আক্রান্ত ব্যক্তিকে সাহায্য করুন।
আজ যদি আপনি, অন্যের প্রয়োজনে তাঁর প্রতি সাহায্যের হাত বাড়ান, যেদিন আপনার প্রয়োজন হবে সেদিন, অন্য কেউ হয়তো আপনার দিকে হাতটি বাড়াবেন। অন্যের বিপদে পাশে দাঁড়ানো প্রত্যেকটি মানুষের কর্তব্য। মমতাময় সমাজ গঠনে জনস্বাস্থ্য তত্ত্বের এটি মূল কথা। কাজেই এ বছরের আন্তর্জাতিক নারী দিবসের প্রতিপাদ্যের সঙ্গে তাল মিলিয়ে, অনাগত ভবিষ্যতের কথা ভেবে আসুন আমরা সচেতন হই, একটি মমতাময় সমাজ গঠনের জন্য নারীর স্বাস্থ্যসেবায় সমঅধিকার নিশ্চিত করি।
লেখক: চিকিৎসক, কাউন্সিলর, সাইকোথেরাপি প্র্যাকটিশনার, ফিনিক্স ওয়েলনেস সেন্টার, বাংলাদেশ



