যক্ষ্মা বা টিবি মাইকোব্যাকটেরিয়াম টিউবারকুলোসিস নামক ব্যাকটেরিয়া দ্বারা সৃষ্ট একটি সংক্রামক রোগ। বর্তমানে পৃথিবীতে যক্ষ্মা অসংক্রামক ব্যাধি হিসেবে মহামারিরূপে বিস্তার করছে। এ ছাড়া যক্ষ্মা একক ব্যাধি হিসাবে সর্বোচ্চ সংখ্যক মৃত্যুর কারণ হিসাবে পরিগণিত হচ্ছে। বিশ্বের উচ্চ যক্ষ্মা ঝুঁকিযুক্ত ৩০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম।
যক্ষ্মা একটি ছোঁয়াচে রোগ। অনেকেরই ধারণা, যক্ষ্মা শুধু ফুসফুসে হয়। প্রকৃতপক্ষে ফুসফুস ছাড়াও লসিকাগ্রন্থি, পরিপাকতন্ত্র, হাড়, মস্তিষ্ক ও তার পর্দা, ফুসফুসের আবরণী, কিডনি ইত্যাদি স্থানেও হতে পারে যক্ষ্মা। সাধারণত আক্রান্ত ব্যক্তির কাশির মাধ্যমে এ রোগটি ছড়িয়ে থাকে।
যক্ষ্মা রোগ বিষয়ে আমরা কম-বেশি জানি। তাই আজ জানাব, যক্ষ্মা নির্মূলে বর্তমানে অন্যতম বড় বাধা ওষুধ প্রতিরোধী যক্ষ্মা বিষয়ে। ওষুধ প্রতিরোধী যক্ষ্মা এবং বহু ওষুধ প্রতিরোধী যক্ষ্মা বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা বর্তমানে খুবই সময়োপযোগী ও গুরুত্বপূর্ণ একটি ক্ষেত্র। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও জাতীয় যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি—প্রত্যেকেই তাদের ভবিষ্যৎ কর্মসূচির অন্যতম লক্ষ্যমাত্রা হিসেবে বহু ওষুধ প্রতিরোধী যক্ষ্মার সংক্রমণ হার কমানোকে নির্ধারণ করেছে।
একটানা ৩ সপ্তাহের বেশি কাশি, জ্বর, ক্ষুধামন্দা, শরীরের ওজন হ্রাস পাওয়া এগুলো মূলত যক্ষ্মার লক্ষণ। কোন ব্যক্তি যদি উল্লিখিত সমস্যাগুলোতে আক্রান্ত হন, তাহলে তাঁর নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যোগাযোগ করতে হবে। দেশের সকল উপজেলা হাসপাতালে যক্ষ্মা রোগের নির্ণয়ে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার সুযোগ রয়েছে। রক্ত- কফ পরীক্ষা এবং বুকের এক্সরে পরীক্ষার মাধ্যমে ফুসফুসের যক্ষ্মা নির্ণয় করা হয়। শরীরের অন্যান্য স্থানের যক্ষ্মা নিরূপণের জন্য ভিন্ন ভিন্ন পরীক্ষা রয়েছে। রোগ নির্ণয় শেষে রোগীকে ওষুধ ও সরকারি খরচে বিনামূল্যে দেওয়া হয়। যক্ষ্মা শরীরের কোন অঙ্গে হয়েছে তার উপর ভিত্তি করে ৬ মাস হতে ২৪ মাস পর্যন্ত ওষুধ ব্যবহারের প্রয়োজন হয়ে থাকে। এই সুদীর্ঘ চিকিৎসাকালে রোগীকে নিয়মিত স্বাস্থ্যকর্মীর তত্ত্বাবধানে থাকতে হয় ঔষুধের কার্যকারিতা, পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ইত্যাদি বোঝার জন্য।
চিকিৎসার শুরুতে বা চলাকালীন রোগী ওষুধ প্রতিরোধী যক্ষ্মায় আক্রান্ত বলে শনাক্ত হয়ে থাকে। এই ওষুধ প্রতিরোধী যক্ষ্মা আবার কয়েক ধরনের হয়। যক্ষ্মা রোগটি মূলত যে ওষুধগুলোর সমন্বয়ে চিকিৎসা করা হয় সেগুলোকে ২ ভাগে ভাগ করা হয়। প্রথম শ্রেণীর ওষুধ এবং দ্বিতীয় শ্রেণীর ওষুধের বিভিন্ন বিন্যাস যক্ষ্মা প্রতিরোধ কাজ করে। তবে, সবচেয়ে ভয়ংকর হলো যখন কোনো রোগী প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণীর বহু ওষুধ প্রতিরোধী যক্ষ্মায় আক্রান্ত হয়। এ ধরনের রোগীদের চিকিৎসায় সম্পূর্ণ ভিন্ন মেয়াদে ভিন্ন ভিন্ন ওষুধের সমন্বয়ে চিকিৎসা করা হয়। তথাপি চিকিৎসায় সাফল্য সময় ও প্রশ্নসাপেক্ষ। এবং বহু–ওষুধ প্রতিরোধ যক্ষ্মা তাই যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি সাফল্যের অন্যতম প্রধান অন্তরায়।
ওষুধ প্রতিরোধী যক্ষ্মা আবির্ভূত হওয়ার মূল কারণ হল অনেক রোগী যক্ষ্মার ওষুধ শুরু করে নির্দিষ্ট মেয়াদ পূর্ণ না করেই ছেড়ে দেন। আক্রমণকারী ব্যাকটেরিয়া তখন উক্ত ওষুধগুলোর বিরুদ্ধে প্রতিরোধী হয়ে যায়। এই ব্যাকটেরিয়া যখন অন্য রোগীর শরীরে প্রবেশ করে, তখন এই রোগীর ক্ষেত্রে উক্ত ওষুধগুলো আর কাজ করে না। তাই ওষুধ প্রতিবোধী/ বহু ওষুধ প্রতিরোধী যক্ষ্মার আবির্ভাব ঠেকাতে হলে প্রত্যেক যক্ষ্মা রোগীকে নির্ধারিত মেয়াদের নির্দিষ্ট ওষুধ সেবন করতে হবে এবং সম্পূর্ণ চিকিৎসামেয়াদে স্বাস্থ্যকর্মীদের সাথে যোগাযোগ রাখতে হবে।
প্রতিবছরের ন্যায় এবারও ২৪ শে মার্চ বিশ্ব যক্ষ্মা দিবস পালিত হয়েছে। এ বছরে এ দিবসের প্রতিপাদ্য হচ্ছে-'হ্যাঁ, আমরাই টিবি শেষ করতে পারি'। মূলত যক্ষ্মা মহামারির বিরুদ্ধে জনসচেতনতা তৈরি এবং বিভিন্ন যক্ষ্মা নির্ণয় ও নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির সমন্বয় সাধনের উদ্দেশ্যে এই দিবস পালন করা হয়। অসংক্রামক ব্যধিগুলোর মধ্যে যক্ষ্মা এখনও প্রাণঘাতী হিসাবে শীর্ষে অবস্থান করছে। জনসচেতনতা ও বিভিন্ন সরকারি, বেসরকারি, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সমন্বিত প্রচেষ্টায় যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি সফল হবে বলে আশা করা যায়।
লেখক: মেডিসিন বিশেষজ্ঞ, খুলনা মেডিকেল কলেজ
আরও পড়ুন:


যক্ষ্মা হলে রক্ষা নেই, এই কথার ভিত্তি নেই
