টেসলার বহুল-প্রতীক্ষিত স্বয়ংচালিত গাড়ি (সেলফ-ড্রাইভিং কার) রোবোট্যাক্সি উন্মোচিত হয়েছে গত ১০ অক্টোবর। ‘উই, রোবোট’ নামের জমকালো এক ইভেন্টে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ইলন মাস্ক নিজেই উন্মোচন করেছেন ‘সাইবারক্যাব’ নামের রোবোট্যাক্সিটি। ২০২৬ সালে রোবোট্যাক্সিটির বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হতে পারে এবং এর দাম ৩০ হাজার ডলারের নিচে রাখা হবে বলে জানিয়েছেন ইলন মাস্ক।
আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের ওয়ার্নার ব্রাদার্স স্টুডিওতে আয়োজিত ‘উই, রোবোট’ ইভেন্টের শুরুতেই চামড়ার জ্যাকেট পরিহিত ইলন মাস্ক মঞ্চে আসেন ‘সাইবারক্যাব’ রোবোট্যাক্সিতে চড়ে। প্রযুক্তি বিশ্বে অনেকদিন ধরেই আলোচনায় রোবোট্যাক্সি। মাস্কের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ হচ্ছে স্বয়ংচালিত বৈদ্যুতিক গাড়ি তৈরির প্রজেক্ট রোবোট্যাক্সি।
উল্লেখ্য, টেসলার রোবোট্যাক্সি উন্মোচনের ইভেন্টে আরও দুটি আলোচিত প্রোডাক্ট দর্শকদের সামনে তুলে ধরেছেন ইলন মাস্ক। একটি হলো ২০ জন যাত্রী ধারণক্ষমতার বড় একটি স্বয়ংচালিত (সেলফ-ড্রাইভিং) গাড়ি যেটিকে মাস্ক ‘রোবোভ্যান’ নামে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন। এছাড়া টেসলার মানবসদৃশ বা হিউম্যানয়েড রোবোট অপ্টিমাসকেও সকলের সামনে উপস্থাপন করেছেন তিনি।
যেসব ফিচার থাকবে ‘সাইবারক্যাব’ রোবোট্যাক্সিতে
‘সাইবারক্যাব’ রোবোট্যাক্সি স্বয়ংচালিত একটি বৈদ্যুতিক গাড়ি। অর্থাৎ এটি চালানোর জন্য কোনো চালকের প্রয়োজন পড়বে না। ফলে স্টিয়ারিং হুইল বা প্যাডেলও থাকছে না ‘সাইবারক্যাব’-এ। তবে আছে গাল-উইং দরজা (বা ফলক্যান-উইং দরজা)।
‘সাইবারক্যাব’ নিয়ে ইলন মাস্কের উচ্চাশা প্রতিফলিত হয়েছে মঞ্চে বলা তাঁর প্রতিটি কথায়। মাস্কের দাবী, সাধারণ মানব-চালিত গাড়ির তুলনায় স্বনিয়ন্ত্রিত যান (অটোনোমাস ভেহিকল) ১০ গুন বেশি নিরাপদ এবং মানুষের চেয়ে ৫ থেকে ১০ গুন বেশি সময় চালাতে সক্ষম।
মাস্ক বলেন, ‘আমরা এখন মানব নির্দেশিত (সুপারভাইজড) পূর্ণাঙ্গ স্বয়ংচালিত গাড়ি থেকে মানব নির্দেশনা ব্যতীত (আনসুপারভাইজড) পূর্ণাঙ্গ স্বয়ংচালিত গাড়ির দিকে এগোচ্ছি- যেখানে আপনি গাড়িতে ঘুমিয়ে পড়বেন এবং গন্তব্যে পৌঁছনোর পর জেগে উঠবেন।’
মাস্ক আরও জানিয়েছেন, শহরে যেখানে একটি বাস চালানোর জন্য খরচ হয় মাইল প্রতি ১ ডলার, সেখানে সময়ের সাথে সাথে সাইবারক্যাব চালানোর খরচ নেমে আসতে পারে পাঁচ ভাগের এক ভাগে- অর্থাৎ ২০ সেন্টে। পাশাপাশি ‘ইনডাকটিভ চার্জিং’ এর সুবিধা থাকবে রোবোট্যাক্সিতে। ফলে গাড়িটি চার্জ দেওয়ার জন্য কোনো কিছুতে প্লাগ-ইন করার প্রয়োজন পড়বে না। শুধু ইনডাকটিভ চার্জারের উপর নিলেও গাড়িটি চার্জ হবে।
সাইবারক্যাব রোবোট্যাক্সিটিকে ইলন মাস্ক ‘ইন্ডিভিজ্যুয়ালাইজড ম্যাস ট্রানজিট’ হিসেবে উপস্থাপন করেছে। ফলে নিজের মতো করে কাস্টমাইজ করার সুবিধাও পেতে পারেন ব্যবহারকারীরা।
মাস্ক আরও বলেছেন, ‘স্বনিয়ন্ত্রিত (অটোনোমাস) যানই হচ্ছে ভবিষ্যৎ। স্বনিয়ন্ত্রিত যানের কল্যাণে আপনি আপনার সময় ফিরে পাবেন।’ অর্থাৎ, গাড়ি চালানোর ঝক্কি না থাকায়, যাত্রীরা যাত্রাকালীন সময়ে নিজের কোনো কাজ করতে পারবেন, কিংবা বিশ্রাম নিতে পারবেন।
রোবোট্যাক্সি মূলত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তি ও ক্যামেরার উপর নির্ভর করে থাকে। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠানের গাড়িতে ব্যবহৃত দামী কোনো হার্ডওয়্যার এতে ব্যবহার করা হয় না। তবে বিনিয়োগকারী ও বিশ্লেষকদের অনেকেই এআই ও ক্যামেরার উপর রোবোট্যাক্সির অতিনির্ভরশীল হয়ে পড়ার বিষয়টি নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। মূলত প্রযুক্তিগত ও রেগুলেটরি বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন হতে পারে বৈদ্যুতিক গাড়িটি।
মাস্কের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা
পূর্ণাঙ্গ স্বয়ংচালিত (সেলফ-ড্রাইভিং) গাড়ি নিয়ে ইলন মাস্কের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা হচ্ছে স্বয়ংচালিত (সেলফ-ড্রাইভিং) টেসলা ট্যাক্সির একটি প্যাসেঞ্জার সার্ভিস পরিচালনা করা, যেখানে যাত্রীরা অ্যাপের মাধ্যমে সেলফ-ড্রাইভিং টেসলা ট্যাক্সি ভাড়ায় ব্যবহার করতে পারবেন। শুধু তাই নয় রোবোট্যাক্সির মালিকরা চাইলে অ্যাপটিতে নিজেদের গাড়ি তালিকাভুক্ত করে ভাড়ায় চালাতে দিতে পারেন। এভাবে অর্থ উপার্জনেরও সুযোগ তৈরি হবে তাদের জন্য।
এআই প্রযুক্তির উপর নির্ভরশীল হওয়ায় রোবোট্যাক্সির উৎপাদন খরচ তুলনামূলকভাবে কম হবে। পাশাপাশি পূর্ণাঙ্গ স্বয়ংচালিত (সেলফ-ড্রাইভিং) হওয়ায় যাত্রীদের সময় বাঁচবে। মাস্কের দাবী অনুযায়ী সাধারণ গাড়ির তুলনায় এটি অনেক বেশি নিরাপদ হবে, ফলে গাড়িটির বীমা খরচও অনেকাংশে কম হওয়ার কথা। পাশাপাশি, এর অপারেটিং খরচও অনেক কম হবে বলেই জানা গেছে।
সার্বিকভাবে, এই বিষয়গুলো বিবেচনা করলে রোবোট্যাক্সির মতো পূর্ণাঙ্গ স্বয়ংচালিত (সেলফ-ড্রাইভিং) গাড়ি পর্যায়ক্রমে সারা বিশ্বেই জনপ্রিয় হবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু এখানে মনে রাখতে হবে, স্বনিয়ন্ত্রিত যান (অটোনোমাস ভেহিকল) থেকে পূর্ণাঙ্গ স্বয়ংচালিত গাড়ি (সেলফ-ড্রাইভিং কার) পর্যন্ত যাওয়ার রাস্তাটা এতোটা সহজ নয়। বিশেষ করে যাত্রীদের নিরাপত্তার বিষয়টি এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্বাভাবিকভাবেই এই ধরণের গাড়ি বাণিজ্যিক উৎপাদনে যাওয়ার আগে অনেকগুল রেগুলেটরি ধাপ পেরোতে হবে। তাই সাইবারক্যাবের মতো রোবোট্যাক্সির রাস্তাটা এখনও বেশ লম্বা।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স, দ্য ভার্জ, বিবিসি



