আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ট্যারিফ আরোপ এবং সে দেশের ৫১তম রাজ্য হবার আহ্বানে কানাডার বিদায়ী প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো ও প্রাদেশিক প্রিমিয়ারদের থরহরিকম্প শুরু হয়েছে! যদিও কানাডার অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সমস্যার কারণেই প্রধানমন্ত্রী ট্রুডো শেষাবধি অভিবাসীদের একটি বড় অংশের মনে আঘাত হেনে পদত্যাগে বাধ্য হয়েছেন। তবু অনেকেই মনে করেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের হুমকিতে সেটা দ্রুততর হয়েছে। কারণ গোপনে শোনা যায়, কানাডার প্রধানমন্ত্রীকে তিনি খুব একটা পছন্দ করেন না! তো দেখা যাক, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কি করেছেন, বা কি বলেছেন!
প্রথমত, ট্রাম্প নির্বাচনের আগে থেকেই বলেছেন, নির্বাচিত হলে তিনি কানাডা-মেক্সিকো থেকে আমদানি করা সকল পণ্যের ওপর ২৫% শতাংশ ট্যারিফ আরোপ করবেন। গত ১ ফেব্রুয়ারি থেকে তা কার্যকরও করেছেন। হোয়াইট হাউসের নিয়মিত প্রেস বিফ্রিংয়ে হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলাইন লাভিট সাংবাদিকদের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। যদিও এই তিনটি দেশের মধ্যে একটি নখদন্তহীন নাফটা (যার বর্তমান নাম CUSMA) চুক্তি আছে। এ প্রসঙ্গে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের আগের মেয়াদে গৃহীত পদক্ষেপ স্মরণ করতে পারেন। তাঁর মতে, ট্যারিফ আরোপের কারণ, এই দুটি দেশ যুক্তরাষ্ট্রে অবৈধ অধিবাসী ও অবৈধ ড্রাগ পাচার করে এবং কানাডা থেকে পণ্য আমদানীর কারণে যুক্তরাষ্ট্র অনায্যভাবে বিপুল পরিমাণ অর্থ লোকসান দিয়ে থাকে।
দ্বিতীয়ত, ভোটের ফলাফল ঘোষণার পরপরই ব্রিটিশ রাজত্বে স্বেচ্ছাধীন রাজকীয় কানাডার প্রধানমন্ত্রী ট্রুডো খুব উচ্চ প্রত্যাশা নিয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ব্যক্তিগত বাসভবনে ছুটে গিয়েছিলেন যে, ২৫% ট্যারিফ মওকুফে কোনো আশ্বাস পাওয়া যায় কিনা! কিন্তু সে রকম আশ্বাস তো দূরের কথা, বরঞ্চ সেই সাক্ষাৎকার থেকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প প্রধানমন্ত্রী ট্রুডোর লেজে নতুন করে আগুন লাগিয়ে দিলেন, তা হলো কানাডা "সে দেশের ৫১তম রাজ্য হিসাবে যোগদান করতে পারে, তাতে কানাডার অনেক সুবিধা হবে।" প্রাথমিকভাবে কানাডার রাজনৈতিকমহল বিষয়টাকে কৌতুক হিসাবে গণ্য করছিলেন! কিন্তু প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ক্রমাগত আক্রমণাত্মক ভাষায় বিষয়টি নিয়ে বলে চলেছেন! প্রেসিডেন্ট পদে শপথ গ্রহনের দিনেও বলেছেন!
তৃতীয়ত, সম্প্রতি দাভোস সম্মেলনের বিশ্বমঞ্চে অনলাইন বক্তব্যে কানাডার ওপর ট্যারিফ ও ৫১তম রাজ্য হওয়ার বিষয়টিকে আন্তর্জাতিক রূপ দিয়েছেন! এমনকি কানাডা-'মেরিকার (হরেদরে ২০০ বছরের পুরনো) সীমান্তকে 'একটি কৃত্রিমভাবে টানা লাইন' বলে আক্রমন করেছেন। বলেছেন, তিনি আর্থিক চাপ প্রয়োগ করে কানাডাকে আমেরিকার অন্তর্ভুক্ত করবেন! তার বক্তব্য, ৫১তম রাজ্য হলে ট্যারিফ আরোপ করবেন না, কানাডার বাণিজ্য ঘাটতি বলে কিছু থাকবে না, স্বাস্থ্য ব্যবস্থা উন্নততর হবে।
এখানে স্মর্তব্য যে, উত্তর আমেরিকার দেশগুলোর ব্যবসায়িক চুক্তি CUSMA-এর সদস্য ছাড়াও কানাডা আমেরিকা পরিচালিত NATO-এর অন্যতম মিত্রশক্তি। এখন দেখা যাক, পরাশক্তি আমেরিকার একজন শক্তিধর প্রেসিডেন্টের বলা এই অযাচিত ও অপ্রত্যাশিত প্রস্তাব নিয়ে কানাডায় কি ঘটছে বা ভবিষ্যতে আরও কি ঘটতে পারে! কানাডা সাধারণ মানুষকে মোটাদাগে মূলত তিনটি ধারায় ফেলা যায়। প্রথম ধারাটি আদিবাসী সম্প্রদায়। দ্বিতীয় ধারায় কয়েক শ বছরের পুরনো ইউরোপিয়ান অভিবাসী ও দাস ব্যবসার সূত্রে যুক্ত হওয়া আফ্রিকান বংশোদ্ভুত অভিবাসী। তৃতীয় ধারায়, কয়েক দশকব্যাপী কানাডায় আসা এশিয়াসহ সারা পৃথিবীর নব্য অভিবাসী সম্প্রদায়!
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এই আক্রমণে প্রথম দুই ধারার মানুষের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া আছে। সদ্য ঘরছাড়া তৃতীয় ধারার মানুষের মধ্যে এ নিয়ে খুব বেশি মাথাব্যথা আছে বলে মনে হয় না! একাধিক জরিপের ফলাফলে দেখা গেছে, ব্রিটিশ রাজত্বের অধীনস্ত এ দেশের খুব স্বল্পসংখ্যক সাধারণ কানাডাবাসী আমেরিকায় বিলীন হওয়ার পক্ষে আছে!
কিন্তু কানাডার রাজনৈতিক দলগুলো, রাজনৈতিক তাত্ত্বিক-বিশ্লেষক শ্রেণী, ও ক্ষমতাসীন দল ও সরকারী মহলে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এই বক্তব্য নিয়ে তীব্র বিরোধী প্রতিক্রিয়া রয়েছে! সব মহলই দ্ব্যর্থহীন ভাষায় তাঁর বক্তব্য একবাক্যে খারিজ করে দিয়েছে! তবে তারা কোনরকম সমালোচনা বা আক্রমণাত্মক বক্তব্য প্রদানে বিরত আছে। প্রধানমন্ত্রী ট্রুডো তো মনে হয় এক প্রকার বাধ্য হয়ে অবশেষে একটি ফর্মাল বক্তব্য দিয়েছেন যে, কানাডা একটি রাষ্ট্র থেকে রাজ্যে পরিণত হতে চায় না।
এর বাইরে আমার কাছে খুব যে কৌতুহলোদ্দীপক একটি বিষয় তা হলো, ব্রিটেনের পক্ষ থেকে উপহার পাওয়া সংবিধান সম্মতভাবে এ দেশের রাষ্ট্রপ্রধান কিন্তু ব্রিটেনের রাজা। সেই মাননীয় রাজা কিন্তু তাঁর অধীনস্ত সার্বভৌম একটি দেশকে যে অপর একটি দেশ দখল বা কেড়ে নিতে চায়, তা নিয়ে একটি শব্দ আজ অবধি উচ্চারণ করেননি, এবং এটি যে একটি আশ্বর্য হওয়ার মতো বিষয়, তাও মনে করেননি! এ বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নে তিনি কোন জবাব দেননি! এমনকি কানাডায় তাঁর নিয়োগ করা বর্তমান গভর্নর জেনারেল মেরী সিমন পর্যন্ত বিষয়টি রাজনৈতিক বিষয় বলে কোনো মন্তব্য প্রদানে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।
এতক্ষণ গেল, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মন্তব্য নিয়ে কানাডার রাজনৈতিক তাপ-উত্তাপ প্রসঙ্গ। এখন দেখা যাক, ২৫% ট্যারিফ আরোপ হলে কানাডার অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের জীবনে কি রকম প্রভাব তৈরি হবে। বস্তুত এই একটি মাত্র বিষয়ে বর্তমানে ফেডারেল ও প্রভিন্সিয়াল সরকারের সকল পর্যায়ে যে ভূমিকম্প উপস্থিত হয়েছে, তা কোনভাবেই লুকিয়ে রাখা যায়নি। ২৫% শতাংশ ট্যারিফ কি কি প্রভাব বিস্তার করবে, তার বিচার-বিশ্লেষণ-আলোচনা, তথ্য-উপাত্ত ঘাটাঘাটি নিয়ে সরকারি-বেসরকারি ব্যবসায়ী ও পণ্ডিত মহল ভীষণ জেরবার! কানাডার সরকারও কম যায় না! তারাও ইতোমধ্যে আমেরিকার বিপক্ষে ট্যারিফ বসানোর প্রস্তুতি সেরে রেখেছে। আমেরিকা ও কানাডার আমদানি-রপ্তানী বাণিজ্যের চিত্রটা একটু দেখে নেওয়া যাক। ২০২২ সালের উপাত্ত মোতাবেক কানাডার মোট পণ্য-পরিষেবা মিলিয়ে রপ্তানির প্রায় ৮০% শতাংশ গেছে আমেরিকাতে। এই রপ্তানির অংক বিগত পাঁচ বছর ধরে ক্রমাগত বৃদ্ধি পেয়ে এসেছে। অন্যদিকে ওই বছরে কানাডাতে আমেরিকার মোট পণ্য রপ্তানি ছিল ১৭.৩% ও পরিষেবা রপ্তানি ছিল ২৪.৮%। বছর বছর এই তথ্য একটু ওঠা-নামা করে। এখন একটি দেশের রপ্তানির ৮০ শতাংশ যদি এ রকম উচ্চহারের ট্যারিফ-হুমকির সম্মুখীন হয় বা বন্ধ হয়ে যায়, তখন কি হয় বা হতে পারে, তা ব্যাখা করে বলার অপেক্ষা রাখে না।
বেশির ভাগ বিশেষজ্ঞ মনে করছেন, কানাডা একটি মারাত্মক অর্থনৈতিক মন্দায় আক্রান্ত হবে! সারা কানাডা জুড়ে ১৫ লাখেরও বেশি চাকুরিচ্যূতি ঘটবে। শুধুমাত্র অন্টারিও প্রদেশেই ৫ থেকে ১০ লাখ লোকের চাকরি থাকবে না! কানাডার প্রচুর ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হবে, নয়তো-বা আমেরিকায় স্থানান্তরিত হবে। কানাডা চেম্বার অব কমার্স মনে করছে, এ দেশের জিডিপি ২.৬% শতাংশ সংকুচিত হবে। দেশ জুড়ে লাগাম ছাড়া দ্রব্য মূল্যস্ফীতি ও মুদ্রাস্ফীতি ঘটবে। অর্থনীতির পণ্ডিতেরা অর্থনৈতিক মন্দার মাত্রা নিয়ে শিউরে উঠছেন! ব্যবসার দিক দিয়ে ক্ষতিগ্রস্থ হবে প্রায় সকল খাতই। তবে এনার্জি (তেল-গ্যাস, বিদ্যুৎ), যানবাহন (গাড়ি, ট্রেন, বিমান, অস্ত্র), খনিজখাত, ফার্মাসিউটিক্যাল, ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। ১ ফেব্রুয়ারি থেকে এনার্জি খাতে ১০% রেখে বাকি সব খাতে ২৫% ট্যারিফ আরোপের ঘোষণা দিয়েছেন। তবে গত টার্মের মত তিনি পরে ট্যারিফ রহিত কিংবা ব্যবসায়ীদের চাপে হ্রাস করতেও পারেন।
সব মিলিয়ে বলা যায়, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যদি এই ট্যারিফ রহিত না করেন বা পুনর্বিন্যাস না করেন, তবে কানাডার সামনে একটি দুঃসহ কাল! সেই অনির্দিষ্টকালের জন্য এখন কানাডার অপেক্ষার পালা!
অখিল সাহা: কানাডা প্রবাসী লেখক
[এই মতামত লেখকের নিজস্ব। এর সঙ্গে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পাদকীয় নীতিমালার কোনো সম্পর্ক নেই।]


কানাডা কখনো যুক্তরাষ্ট্রের অঙ্গরাজ্য হবে না: ট্রুডো
মেক্সিকোর অর্ধেক দখলে নিয়েছিল আমেরিকা, এবার কি কানাডার পালা?
