স্বাধীনতা শব্দটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি শব্দ। তবে আমাদের দেশে এই শব্দটি হরেদরে ব্যবহার হয়। এবং ব্যবহারের ক্ষেত্রে শব্দের অর্থ আদৌ ব্যবহারকারীদের মাথায় থাকে বলে মনে হয় না। এ কারণেই এই দেশে প্রায়ই বলতে শোনা যায় যে, ‘স্বাধীনতা মানে এই নয় যে…’, এরপরই চলে আসে আদতে পরাধীনতার শৃঙ্খলকে হাতে‑পায়ে ও গলায় গলানোর আয়োজন! প্রশ্ন হলো, স্বাধীনতা মানে এই নয় যে, মানে কী নয় যে?
স্বাধীন মানে স্ব‑এর অধীন। এই ‘স্ব’ মানে নিজ। অর্থাৎ, একজন মানুষ যখন তার নিজের অধীন থাকেন, তখন তিনি স্বাধীন। এই স্বাধীনতা যখন দেশ বা রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হয়, তখন একটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক অঞ্চলের গোষ্ঠীবদ্ধ মানুষের স্বাধীনতার কথা বোঝায়। অন্যদিকে তা যখন ব্যক্তির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হয়, তখন ব্যক্তির নিজ সম্পর্কিত সকল বিষয়ে ওই ব্যক্তির নিজের স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকারের বিষয়টি বোঝায়। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভ করে। এবং ওই সময়ে রচিত ও পরবর্তীকালে নানাভাবে সংশোধিত স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধানই এই দেশের আপামর জনসাধারণের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা নিশ্চিত করেছে।
কিন্তু, এ দেশের ক্ষমতাকাঠামো কি কখনোই এ দেশের সাধারণ মানুষগুলোর স্বাধীনতা স্বীকার করে নিয়েছে?
এই প্রশ্নটির নিখুঁত উত্তর দেওয়া বেশ কঠিন। আমরা যদি দেশের গত ৫৩ বছরের ইতিহাস পর্যালোচনা করি, তবে সব সরকারের আমলেই একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য দেখতে পাওয়া যাবে। সেটি হলো–স্বাধীনতা বলতে আসলে কী কী বোঝায় না, সেসবের বিস্তারিত নসিহত। এ ধরনের প্রায় সময়ই শাসকদের বা শাসকদের প্রতিভূদের কাছ থেকে আমরা আমজনতারা শুনতে পাই। বিভিন্ন ধরনের স্বাধীনতার বিষয়ে নানাবিধ বিধি‑নিষেধ আরোপ করে ক্ষমতাকাঠামো কেবল বলতেই থাকে, ‘স্বাধীনতা মানে এই নয় যে…’। এভাবেই একের পর এক ‘যদি’, ‘কিন্তু’ ও ‘তবে’ জনমানুষের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়।
উদাহরণস্বরূপ বাকস্বাধীনতা ও মত প্রকাশের স্বাধীনতার দিকেই দৃষ্টি নিবদ্ধ করা যাক। বাংলাদেশের সংবিধানে এই দুই ধরনের স্বাধীনতার বিষয়টি নিশ্চিত করা হলেও এ দেশে তার সুলক্ষণ পুরোমাত্রায় পরিলক্ষিত হয় না। তাই স্বাধীনভাবে কথা বলতে গেলেই, আবার বলা হয়, এটিও নাকি স্বাধীনতা নয়! তখন নসিহত দেওয়া ক্ষমতাবানেরা আমাদের বোঝাতে থাকেন যে, এটা বলা যাবে না, ওটা বলা যাবে না। এবং এত এত ‘না’ দিয়ে পরিবেষ্টিত হয়ে আমরা যদি ফুল‑লতা‑পাতা ছাড়া অন্যকিছু নিয়ে কথা বলতে নাও পারি, সেটিই নাকি বাক বা মত প্রকাশের স্বাধীনতা!
এমনতর কথিত স্বাধীনতার উদাহরণ খোঁজার জন্য বেশি অস্থির হওয়ার দরকার নেই। কিছুদিন আগে গণঅভ্যুত্থানে সাবেক হয়ে যাওয়া সরকারকাঠামোতে অনেক উদাহরণ পাওয়া যাবে। তার আগের আমলে পাওয়া যাবে। এমনকি তার আগের আমলেও মিলবে। এভাবে খুঁজলে সব আমলেই পাওয়া যাবে দেদারসে। এমনকি বর্তমান আমলেও! সবখানেই স্বাধীনতার নতুন নতুন সংজ্ঞা জনতাকে গেলানোর চেষ্টা দেখা যায়। আর এভাবেই আমরা এক আমলে এক ধরনের ‘না’ মানি, আরেক আমলে আসে অন্য ধরনের ‘না’। আর স্বাধীনতার এক গোঁজামিলের রূপ আমাদের মানসিকতায় গেঁড়ে বসে। আমরা হয়ে পড়ি দিক্ভ্রান্ত ও পুরোপুরি বিভ্রান্ত।

অবশ্য নারী স্বাধীনতার ক্ষেত্রে এত ঝামেলা নেই। বাক ও মত প্রকাশের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে একেক পক্ষের একেক তরিকা থাকে। কিন্তু নারী স্বাধীনতার বিষয়ে প্রায় সব পক্ষই ঘুরে‑ফিরে একই অবস্থানে চলে যায়। এবং দুঃখজনকভাবে এই অবস্থানটি হয় সার্বিকভাবে নারীবিরোধী। নারী অভিযোগ করলে, ইনিয়ে‑বিনিয়ে নারীকেই তুলে ফেলা হয় কাঠগড়ায়। নিপীড়নের শিকার হলেও উঠে আসে নানামাত্রিক প্রশ্ন। যেমন: কিছুটা রাতে রাস্তায় বের হয়ে নির্যাতনের শিকার হলে প্রশ্ন ওঠে, ‘এত রাতে বের হলো কেন?’ কোনো পুরুষ খারাপ কথা শোনানোর পর প্রতিবাদ করলেও শুনতে হয়, ‘আরও সুন্দরভাবে সমাধান করা কি যেত না?’ যেন সব সৌন্দর্য রক্ষার দায় নিয়ে বসে আছে এ দেশের আপামর নারীরা!
এ ছাড়া আরেকটি বিষয়ও টেনে আনা হয় কর্তৃপক্ষীয় উদ্যোগে। সেটি হলো, নারীর সঙ্গে ঘটে যাওয়া অপরাধমূলক ঘটনাকে পুরোপুরি লিঙ্গ নির্বিশেষে একেবারে সাধারণীকরণ করে ফেলা। এই যেমন সাম্প্রতিক সিগারেট খাওয়া সংশ্লিষ্ট ঘটনাটিকেও কর্তৃপক্ষের তরফেই সাধারণীকরণ করে ফেলার চেষ্টা চলেছে। এভাবে নারীর প্রতি নিপীড়ন বা অপরাধ বা বৈষম্যকে এক ধরনের বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা চলে এবং এরই ফাঁকে ফাঁকে চলে নসিহত–স্বাধীনতা মানে এই নয় যে, ওই নয় যে…!
এমনই এক সকরুণ ত্রিশঙ্কু পরিস্থিতি আমাদের। এর উন্নতি তো দূরের কথা, দিন দিন যেন নিত্য‑নতুন অবনতিই সেখানে চোখ রাঙাচ্ছে কেবল। এসব প্রতিরোধের বদলে ইদানীং কেমন যেন আশকারা দেওয়া হচ্ছে আরও। ভয়ের কথা হচ্ছে, সেই আশকারা মিলছে দায়িত্বশীলদের তরফ থেকেই। যদিও এমন কাজে আশকারা দেওয়ারা আসলেই দায়িত্বশীল কিনা, সেই সন্দেহ উঠেই যায়।
অথচ এই দেশের মানুষের আরও ৫০ বছর আগেই সত্যিকারের স্বাধীন হওয়ার সাধ ছিল। তাই ১৯৭১ সালে লাখ লাখ মানুষের আত্মাহুতি হয়েছিল। অসংখ্য মানুষ নিজের বুকের তাজা রক্ত ঢেলে স্বাধীনতা অর্জন করেছিল। অথচ, এর পর থেকে প্রজন্মের পর প্রজন্ম শুনে যাচ্ছে কেবল স্বাধীনতা মানে কী কী নয়, সেসবের বৃত্তান্ত, তথা স্বাধীনতাকে পরাধীনতায় রূপান্তরের তরিকাসমূহ।
কবি রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায় একদা লিখেছিলেন, ‘স্বাধীনতা-হীনতায় কে বাঁচিতে চায় হে, কে বাঁচিতে চায়? দাসত্ব-শৃঙ্খল বল কে পরিবে পায় হে, কে পরিবে পায়।’ কবিতার এই লাইন নিয়ে আমরা অনেকেই নানা ভাবসম্প্রসারণ বা রচনা লিখেছি বটে। যদিও তাতে লাভ কিছু হয়নি। উল্টো স্বাধীনতা শব্দের সঠিক অর্থটিই কখনো আর মোদের সামনে মূর্ত হতে পারল না। সেটি জানার চেষ্টাও বিপজ্জনক হচ্ছে দিনকে দিন। জানতে গেলেই যে, ক্ষমতার পূজারীরা বলে ওঠেন—‘স্বাধীনতা মানে এই নয় যে…!’
লেখক: উপবার্তা সম্পাদক, ডিজিটাল বিভাগ, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন
[এই মতামত লেখকের নিজস্ব। এর সঙ্গে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পাদকীয় নীতিমালার কোনো সম্পর্ক নেই।]
মতামত থেকে আরও পড়ুন:


ছাএ–মাএ নিয়ে যেভাবে বাংলা বাঁচে!
ভাষা সংগ্রামী নারীদের অকথিত ইতিহাস
রাষ্ট্রভাষা বাংলা, রাষ্ট্রের ভাষা হোক
