ইসরায়েলের আপত্তি আছে। যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের অনেকেরও আপত্তি আছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দিন দুয়েক আগে ঘোষণা করে দিলেন, সৌদি আরবের আগ্রহে সাড়া দিয়ে তাদের কাছে এফ-৩৫ বিক্রি করবেন তিনি। সৌদি ক্রাউন প্রিন্স – এবং ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ বন্ধু – মোহাম্মদ বিন সালমানের যুক্তরাষ্ট্র সফরে এই এক এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান নিয়েই হয়েছে সবচেয়ে বেশি আলোচনা।
সৌদি আরব এফ-৩৫ পাবে কি না শেষ পর্যন্ত, তা এখনো নিশ্চিত নয়। যুক্তরাষ্ট্রের বড় যেকোনো সমরাস্ত্র বিক্রির চুক্তির ক্ষেত্রে শুধু দেশটির প্রেসিডেন্ট চাইলেই হবে না, কংগ্রেসের সেটি বাতিল করে দেওয়ার ক্ষমতা আছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত চুক্তিটি হলে মধ্যপ্রাচ্যের হিসাবনিকাশই বদলে যাওয়ার জোর সম্ভাবনা দেখছেন বিশ্লেষকরা।
হিসাবনিকাশ বদলে যাওয়ার এই সমীকরণে গেলেই বোঝা যাবে, কেন ইসরায়েল এই চুক্তি হতে দেখতে চায় না কিংবা হলেও এতে কিছু শর্ত আরোপিত হতে দেখতে চায়। মধ্যপ্রাচ্যে এখন পর্যন্ত শুধু ইসরায়েলের কাছেই এফ-৩৫ আছে। সৌদি আরবের হাতেও সেটি চলে গেলে সমস্যা কোথায়? এক, ইসরায়েল মনে করে, কোনোভাবে ভবিষ্যতে সৌদির ক্ষমতার সূত্র বদলে গিয়ে ইসরায়েল-বিরোধী কেউ ক্ষমতায় গেলে সেটা ইসরায়েলের জন্য হুমকির। কারণ সৌদি আরবের উত্তর-পশ্চিম সীমান্তের কাছে এয়ার বেইজ থেকে পাঁচ মিনিটেই এফ-৩৫ দিয়ে ইসরায়েলে হামলা করা যাবে। দুই, যুক্তরাষ্ট্রে অলিখিত নিয়মই আছে যে, তারা নিশ্চিত করবে, মধ্যপ্রাচ্যে অন্য সব দেশের যে সমরাস্ত্র বা সমরযান থাকবে, ইসরায়েলের কাছে তার চেয়ে বেশি মানসম্পন্ন অস্ত্র ও যান থাকবে (কোয়ালিটেটিভ মিলিটারি এজ)। কিন্তু ট্রাম্প এরই মধ্যে বলে দিয়েছেন, ইসরায়েলের কাছে যে মানের এফ-৩৫ আছে, সৌদি আরবকেও একই মানের যুদ্ধবিমানটি দেওয়া হবে।
ওদিকে যুক্তরাষ্ট্রে আপত্তির কারণ, সৌদি আরবের সঙ্গে এফ-৩৫ নিয়ে চুক্তির মধ্যে ইসরায়েলের সঙ্গে সৌদির সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের চুক্তি ‘অ্যাব্রাহাম অ্যাকর্ডে’ সই করার বাধ্যবাধকতা রাখার কথা ছিল, কিন্তু সেটা হয়নি। ফিলিস্তিন ইস্যুতে ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দিয়ে কোনো সমাধান না আসা পর্যন্ত তারা অ্যাব্রাহাম অ্যাকর্ডে সই না করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। ওদিকে সৌদির সঙ্গে চীনের সম্পর্কও বেশ ভালো। এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক দপ্তর পেন্টাগনকে পরামর্শ দেওয়া সংগঠন দ্য ডিফেন্স সায়েন্স বোর্ড ২০১৩ সালে জানিয়েছিল, চীনের হ্যাকাররা পেন্টাগনের অনেক প্রকল্পের তথ্য চুরি করেছে যার মধ্যে এফ-৩৫ নিয়ে তথ্যও ছিল। সৌদি আরবের কাছে এফ-৩৫ বিক্রি করলে এই যুদ্ধবিমানের প্রযুক্তির তথ্য কোনোভাবে চীনের হাতে চলে যেতে পারে বলেও শঙ্কা যুক্তরাষ্ট্রের অনেকের।
কী আছে এফ-৩৫-এ?
এক এফ-৩৫ নিয়ে চুক্তি থেকেই কত আলোচনা! কী আছে আসলে এফ-৩৫-এ? কেন এটি নিয়ে এত আগ্রহ সবার?
যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারোস্পেইস কোম্পানি লকহিড মার্টিনের তৈরি করা এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানটি এ সময়ে বিশ্বে সর্বাধুনিক প্রযুক্তির, পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমান। অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে ‘এফ৩৫ লাইটনিং টু’ নামে পরিচয় করিয়ে দেওয়া এই যুদ্ধবিমানকে বলা হয় ‘বিশ্বের সবচেয়ে আধুনিক ফাইটার জেট।’
এই যুদ্ধবিমানকে স্টেলথ ফাইটার বলা হয়। এই যুদ্ধবিমানের সবচেয়ে বড় ক্ষমতা বলা হয় প্রতিপক্ষের রাডার ফাঁকি দেওয়ার এই ক্ষমতাকেই (স্টেলথ কোটিং)। যুক্তরাষ্ট্রের ইসরায়েলপন্থী থিংকট্যাঙ্ক ‘ফাউন্ডেশন ফর ডিফেন্স অব ডেমোক্রেসিস’-এর সেন্টার অন মিলিটারি অ্যান্ড পলিটিক্যাল পাওয়ার বিভাগের উর্ধ্বতন পরিচালক ব্র্যাডলি বাওম্যান বলেছেন, ‘যে ক্ষমতাটা এফ-৩৫-কে দুর্দমনীয় করে তোলে সেটি হলো প্রতিপক্ষ এটিকে খুঁজে পেতেই যে ঝামেলায় পড়ে সেটি। আপনি যদি দেখতেই না পান, মারবেন কীভাবে!’
এই যুদ্ধবিমানটি একই মিশনে পাইলটকে শুধু বোম ফেলে যাওয়া থেকে শুরু করে আকাশপথে অন্য বিমানের সঙ্গে যুদ্ধও করে আসার সুযোগ সহজেই করে দেয়। যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের গবেষণা উইং কংগ্রেশনাল রিসার্চ সার্ভিসের তথ্য, স্টেলথ কোটিংয়ের পাশাপাশি এই যুদ্ধবিমানে সর্বাধুনিক রাডার ও সেন্সর আছে। বাওম্যান বলছেন, এই যুদ্ধবিমানে প্রতিপক্ষকে খুঁজে বের করার মতো আধুনিক সেন্সরের পাশাপাশি মিত্র অন্য বিমান ও মাটিতে থাকা সেন্টারের সঙ্গে যোগাযোগ করার নেটওয়ার্কিং দক্ষতাও সবচেয়ে এগিয়ে।
১৯৯০-এর দশকে প্রথম যখন এই যুদ্ধবিমানের প্রস্তাব করা হয়, তখন ভেবে নেওয়া হয়েছিল, এই যুদ্ধবিমানের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র এফ-১৬-এর মতো খেটে চলা যুদ্ধবিমানসহ পুরোনো সব বিমানকেই অবসরে পাঠাতে পারবে।
গাজা যুদ্ধ চলার মধ্যেই গত জুনে ইরানের বিরুদ্ধে ১২ দিনের যুদ্ধে ইসরায়েল এই যুদ্ধবিমান কাজে লাগিয়েছিল।
বিমানটির সমালোচনাও কম নয়
প্রথমত, এই বিমানের খরচ অনেক বেশি। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরার প্রতিবেদনে জানা যাচ্ছে, সংস্করণভেদে একেকটি এফ-৩৫ কিনতে ৮ থেকে ১১ কোটি ডলার লাগে। যুক্তরাষ্ট্রের রেডিও নেটওয়ার্ক এনপিআর-এর এক প্রতিবেদনে লেখা, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বিভাগের হিসাবই বলছে, পরিকল্পনা অনুযায়ী ২৪৭০টি বিমান তৈরি করা এবং প্রতিটির ৭৭ বছরের জীবনচক্র ধরে সবগুলো বিমান মেরামত ও পর্যবেক্ষণের পেছনে খরচ মিলিয়ে হিসাব করলে দেশের মোট খরচের অঙ্কটা দাঁড়াবে ২ ট্রিলিয়ন বা ২ লাখ কোটি ডলার!
এত খরচ করে বানানো যুদ্ধবিমানের পারফরম্যান্স নিয়ে অবশ্য প্রশ্ন উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ‘গভার্নমেন্ট অ্যাকাউন্ট্যাবিলিটি অফিস’ ২০২৩ সালে প্রমাণ পেয়েছে, এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান একটি মিশন ঠিকঠাকমতো শেষ করে আসতে পারার হার মাত্র ৫৫ শতাংশ, যা পরিকল্পনার চেয়ে অনেক কম। যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা সংস্কার প্রকল্পের সিনিয়র ফেলো ও ডিরেক্টর ড্যান গ্র্যাজিয়ের এ নিয়ে এনপিআর-এ বলেছেন, এফ-৩৫ প্রকল্পটাকে শেষ পর্যন্ত একটা ব্যর্থতা হিসেবেই দেখা হবে!
ড্যান গ্র্যাজিয়ের বলেছেন, যুদ্ধবিমানটির স্টেলথ কোটিংয়ের জন্য প্রচুর রক্ষণাবেক্ষণের প্রয়োজন পড়ে। তাছাড়া পরিস্থিতি চারিদিক থেকে পর্যবেক্ষণের জন্য যে ক্যামেরা সিস্টেম আছে, তাতেও ঝামেলা আছে বলে জানিয়েছেন তিনি। সব মিলিয়ে এফ-৩৫ নিয়ে তাঁর পর্যবেক্ষণ, এই যুদ্ধবিমান ‘অনেক কিছু মোটামুটি ভালো করে, তবে কোনোটাকেই অসাধারণ বলা যাবে না। তাছাড়া এর খরচও অনেক। তাই সব মিলিয়ে আপনি এমন একটা যুদ্ধবিমানের জন্য পকেট খালি করছেন যেটা সত্যি বলতে অনেক ক্ষেত্রে এর আগেকার যুদ্ধবিমানের চেয়েও কম দক্ষতাসম্পন্ন!’
এর নির্মাতা লকহিড মার্টিন অবশ্য ড্যান গ্র্যাজিয়েরের সমালোচনাকে উড়িয়ে দিয়েছে। ব্যাখ্যায় তারা বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রের ২০টি মিত্র দেশ এটি ব্যবহার করে, এখন পর্যন্ত ১২৫৫টি যুদ্ধবিমান বিভিন্ন দেশে কার্যকর এবং সব মিলিয়ে বিমানগুলো ১০ লাখ ঘণ্টা আকাশে ছিল।
এফ-৩৫ কোন কোন দেশের কয়টি করে আছে?
আল জাজিরার প্রতিবেদন থেকে জানা যাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এই এফ-৩৫ বানানোর প্রকল্পে অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, ইতালি, ডেনমার্ক, নেদারল্যান্ডস, নরওয়ে ও যুক্তরাজ্যও জড়িত। কোনো দেশ হয়তো এই বিমানের কোনো একটা অংশ বানায়, কোনো দেশে হয়তো এর অ্যাসেম্বল করার জায়গা আছে।
আল জাজিরার প্রতিবেদন জানাচ্ছে, এই মুহূর্তে ‘অংশীদার’দের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ১৭৬৩টি এফ-৩৫এ, ২৮০টি এফ-৩৫বি এবং ৪১৩টি এফ-৩৫সি আছে। যুক্তরাজ্যের আছে ১৩৮টি এফ-৩৫বি; অস্ট্রেলিয়ার ১০০টি এফ-৩৫এ; ইতালির ৭৫টি এফ-৩৫এ এবং ৪০টি এফ-৩৫বি; কানাডার ৮৮টি এফ-৩৫এ; নেদারল্যান্ডসের ৫৭টি এফ-৩৫এ; নরওয়ের ৫২টি এফ-৩৫এ এবং ডেনমার্কের কাছে ৪৩টি এফ-৩৫এ আছে।
এর বাইরে বিদেশি যেসব দেশের কাছে বিক্রি করা হয়েছে, তাদের মধ্যে আছে জাপান (১০৫টি এফ-৩৫-এ ও ৪২টি এফ-৩৫-বি), ইসরায়েল (৭৫টি এফ-৩৫-এ), ফিনল্যান্ড (৬৪টি এফ-৩৫-এ), সাউথ কোরিয়া (৬০টি এফ-৩৫-এ, সুইজারল্যান্ড (৩৬টি এফ-৩৫-এ), জার্মানি (৩৫টি এফ-৩৫-এ), বেলজিয়াম (৩৪টি এফ-৩৫-এ), পোল্যান্ড ৩২টি এফ-৩৫-এ), রোমানিয়া (৩২টি এফ-৩৫-এ), চেক প্রজাতন্ত্র (২৪টি এফ-৩৫-এ), গ্রিস (২০টি এফ-৩৫-এ) ও সিঙ্গাপুর (৮টি এফ-৩৫-এ, ১২টি এফ-৩৫-বি)।
সৌদি আরব এখন পর্যন্ত ৪৮টি এফ-৩৫ কেনার আগ্রহ দেখিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে।
এ/বি/সি – এত সংস্করণে কী?
সাধারণত তিনটি সংস্করণে বানানো হয় এই যুদ্ধবিমান। এফ-৩৫-এ হচ্ছে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত সংস্করণ। সাধারণ বিমান চলাচলের রানওয়েতে এটি টেইকঅফ ও ল্যান্ডিং করতে পারে। লুকোচুরি বা স্টেলথের দক্ষতার প্রয়োজনে এই সংস্করণের বিমানে অস্ত্র ও তেলের ট্যাঙ্ক বিমানের ভেতরেই রাখা হয়।
এফ-৩৫-বি বেশি ব্যবহার করছে জাপান, ইতালি, সিঙ্গাপুর, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্র। খুব ছোট রানওয়েতে টেইক অফ আর হেলিকপ্টারের মতো ল্যান্ডিং করতে পারে এই সংস্করণের যুদ্ধবিমান। এটা ‘এ’ সংস্করণের চেয়ে আকারে কিছুটা ছোট হলেও ওজনে ‘বি’ সংস্করণই বেশি ভারি, এর তেল ও অস্ত্র বহনের ক্ষমতাও তুলনায় কম।
এফ-৩৫-সি হচ্ছে একটা সুপারসনিক (শব্দের গতির চেয়েও দ্রুত যাওয়ার ক্ষমতাসম্পন্ন) যুদ্ধবিমান। মার্কিন নৌবাহিনী এটি লম্বা দৈর্ঘ্যের স্টেলথ অপারেশনের জন্য ব্যবহার করে।
এর বাইরে এফ-৩৫-আই (আডির) নামে একটা সংস্করণ আছে, যেটি শুধু ইসরায়েলের মালিকানাধীন। এটি মূলত এফ-৩৫-এ সংস্করণেরই একটি কাস্টমাইজড রূপ। যুক্তরাষ্ট্রের অনুমতি নিয়ে বিমানটির মূল অপারেটিং সিস্টেমে বদল এনে ইসরায়েলি অস্ত্র ব্যবহারের উপযোগী করেছে ইসরায়েল, এর বাইরে স্টেলথ দক্ষতা বাড়াতে জ্যামিং ও ডেকয় সিস্টেম যোগ করেছে। বাড়তি তেলের ট্যাঙ্কও যুক্ত করেছে ইসরায়েল।



