আপনি যেভাবেই হোক আমার সন্তানকে বাঁচান। ভাবতেও পারছি না, কেন সে আত্মহত্যা করতে গেল! গাড়ি, বাড়ি, টাকা, পয়সা কিছুর অভাব নেই আমাদের। ওর নিজের প্রাইভেসিকে মূল্য দেওয়া হয়। তাহলে কেন এমন হলো? এ কথা বলতে বলতে ভদ্রমহিলা চোখ মুছলেন। তাঁর সঙ্গে আসা ভদ্রলোক চুপচাপ বসে আছেন।
আমাদের দেশে পুরুষ মানুষ কাঁদতে শেখে না। কারণ তাতে কাপুরুষ আখ্যা পেতে হয়। অথচ কান্না মানুষের একটি আদিমতম মৌলিক আচরণ।
ভদ্রলোককে আস্তে আস্তে প্রশ্ন করলাম, কী হয়েছে?
আমার ছেলে... বলেই ভদ্রলোক একটু থমকালেন। একটু পর আবার শুরু করলেন, 'আমাদের ছেলের বয়স ১৭ বছর। সে আত্মহত্যা করার চেষ্টা করেছে। আমরা দুজনেই তখন বাসায় ছিলাম। ছেলেকে ঘরের দরজা ভেঙে বের করি। এরপর দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যায়। হাসপাতাল যেহেতু নিজেদের প্রতিষ্ঠান। তাই লোক জানাজানি হতে দেই নি। ৩ দিন ভর্তি ছিল। এখন ছেলেকে বাসায় নিয়ে আসবো। কিন্তু ওর কাউন্সেলিং প্রয়োজন। তাই আপনার কাছে আমরা কথা বলতে এসেছি।'
ভদ্রলোকের একটা শব্দ আমার কানে খট করে লাগলো। 'আমার ছেলে' যদিও আমার চোখাচোখি হওয়াতে তিনি শব্দটি পাল্টে বলেন, 'আমাদের ছেলে'। স্পষ্ট অনুভব করলাম স্বামী-স্ত্রীর ভাষাবিহীন আচরণে দারুণ আশ্বস্তি। বসার ভঙ্গি, হাতের নড়াচড়া, পরস্পরের দিকে না তাকানো ইত্যাদি প্রকট। জানতে চাইলাম, আপনাদের কি একটিই সন্তান? দুজনেই মাথা ঝাঁকালেন। আমার সন্দেহ আস্তে আস্তে সিদ্ধান্তের দিকে এগোতে থাকল। স্থির গলায় নীচু স্বরে প্রশ্নটা করলাম, আপনাদের দাম্পত্য সম্পর্ক কেমন?
পর্যায়ক্রমে স্বামীর দিকে স্থির চোখে তাকাতেই তিনি চোখ সরিয়ে নিলেন। স্ত্রীর দিকে তাকাতেও একই অবস্থা। অনেকক্ষণ চুপচাপ থাকলেন দুজনেই। খেয়াল করলাম ভদ্রলোকের ঘাড়ের একটি রগ ফুলে উঠেছে। ভদ্রমহিলা নখ খুঁটতে লাগলেন। মাথার উপরে ফ্যানের শব্দ ছাড়া চারপাশ স্তব্ধ।
আমি বললাম, আপনাদেরকে বিব্রত করার জন্য এই প্রশ্নটি করিনি। আশা করি সেটা বুঝতে পেরেছেন। একটা মানুষের শারীরিক আর মানসিক স্বাস্থ্যের পাশাপাশি তার পারিবারিক স্বাস্থ্যের ব্যকরণটাও বুঝতে পারা খুব জরুরি। আমি সেই জায়গা থেকেই প্রশ্নটি করেছি। আশা করি আমাকে ভুল বুঝবেন না।
কথা বলতে বলতে উঠে এলো বাবা–মায়ের সম্পর্কে প্রচণ্ড তিক্ততার কাহিনি। একক পরিবারের সন্তান ধীরে ধীরে বড় হয়েছে দামি আয়ার কাছে। কিন্তু প্রতিদিন প্রতি মুহূর্তে শুনেছে বাবা-মায়ের ঝগড়া। পরস্পরকে জঘন্য ভাষায় দোষারোপ। সন্তান স্পষ্ট করে বুঝে যায়, বাবা-মায়ের বাইরে সোশ্যাল ইমেজ আর পারিবারিক চেহারার মুখোশগুলো খুব আলাদা। ছোটবেলায় তাদের মারামারি করতেও দেখেছে। অথচ দাম্পত্য সম্পর্ক এবং সন্তানের মানসিক বিকাশ অঙ্গাঙ্গিকভাবে জড়িত।
দাম্পত্য একটি দ্বৈরথ বটে। এর দ্বারা দুটি মানুষের ও পরিবারের আন্তঃসম্পর্ক সংজ্ঞায়িত হয়। সন্তানের কাছে বাবা-মা হলেন পৃথিবীতে প্রথম নিরাপদ মানুষ। যে কোনো দম্পতির বিবাহ–বিচ্ছেদ হতেই পারে। কিন্তু বাবা মায়ের সঙ্গে সন্তানের সম্পর্ক আজীবনের। এই সম্পর্কে টানাপোড়ন, দ্বন্দ্ব, আনন্দ, বেদনা, সবই থাকতে পারে। বিচ্যুতি থাকতে পারে, ব্যত্যয় থাকতে পারে। কিন্তু বিচ্ছেদ কখনোই নয়। এই ভূমিকায় অন্য কেউ প্রক্সি দিতে পারেনা। সন্তানের মানসিক বিকাশে বাবা–মা দুই জনেরই ব্যক্তিগত ভূমিকা অপরিসীম।
একই মানুষের বাবা-মা আর স্বামী-স্ত্রীর ভূমিকা আলাদা। স্বামী-স্ত্রীর দ্বন্দ্ব ব্যক্তিগত। কিন্তু বাবা-মা ভূমিকা যৌথ। প্রথম সন্তানের ক্ষেত্রেও যা দায়িত্ব, তিন নম্বর সন্তানের ক্ষেত্রেও একই দায়িত্ব। বাবা-মায়ের দাম্পত্যে বনিবনা না থাকলে, তারা সন্তানের দিকে মনোযোগ দিতে পারেন না। কারণ নিজেদের রাগ, দুঃখ, ভয় এই তিনটা মৌলিক অনুভূতির বৃত্তে বাবা-মা এত বেশি ঘুরপাক খান যে তখন তারা নিজেরাও খুব অসহায়বোধ করেন। ফলে সন্তানের সঙ্গে মানসিক যোগাযোগ কমে যায়। নিজেকেই সামাল দিতে পারেন না, তো সন্তানকে কীভাবে সময় দেবেন?
এর প্রভাব সন্তানের উপর যে শুধু ছোটবেলায় পড়ছে তা কিন্তু নয়। প্রাপ্তবয়স্ক হলেও সন্তানের আচার–আচরণে তার প্রভাব থাকে। বাবা মায়ের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক এবং খোলামেলা কথা বলার পরিবেশ থাকলে সন্তান বয়ঃসন্ধিকাল চমৎকারভাবে নিজেকে উতরে নিতে পারে। কিন্তু আলোচ্য শিশুর ক্ষেত্রে বাবা-মা না করছেন পরস্পরকে বিশ্বাস, না করছেন শ্রদ্ধা। উপরন্তু তাঁরা সন্তানকে নিজের দলে টানতে গিয়ে সম্মান, শ্রদ্ধা, বিশ্বাস কোনোটাই দেখাতে পারছেন না।
লেখক: চিকিৎসক, কাউন্সিলর, সাইকোথেরাপি প্র্যাকটিশনার, ফিনিক্স ওয়েলনেস সেন্টার, বাংলাদেশ


শিশুর সকালের খাবারে কী দেবেন
আপনার সন্তানকে গল্পের বই পড়া শেখাবেন কীভাবে
শিশু খেতে না চাইলে যা করবেন
