শৈশব, কৈশোর পেরোনোর পর আমরা মুখোমুখি হই জীবনের চরম বাস্তবতার। কাজের চাপে, দায়িত্বের ভিড়ে কত মানুষ এক জীবনে নিজেদের শখের কথাই ভুলে যান! স্বাস্থ্যের দিকেও তাকান না। একপক্ষ কেবল স্বপ্ন দেখে যান যে, একদিন অবসর নেবেন- সবকিছু থেকে, সমস্ত দায়দায়িত্ব থেকে। চলে যাবেন পাহাড় বা সমুদ্রের কোলে, যেখানে থাকবে না কোনো বেড়াজাল।
আবার অবসরের পরেও অনেকে পরিবারের বাইরে কিছু ভাবতে পারেন না। যেহেতু রুটিন করে তখন আর অফিসে যাবার তাড়া নেই, তাই এই পক্ষের মানুষ অবসরের পর পুরো সময়টুকু পরিবারের পেছনে ব্যয় করতে চান। নাতি-নাতনিদের সঙ্গে সময় কাটানো এসময় তাদের প্রিয় শখ হয়ে ওঠে।
‘রিটায়ার্ড’ বা অবসরগ্রহণকারী ব্যক্তিদের নিয়ে আমাদের সবার মানসপটে অনেকটা এমন ছবিই আঁকা। কিন্তু এসব ছবির সঙ্গে কোনোভাবেই মেলানো যাচ্ছে না যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা এবং সাউথ ক্যারোলাইনার এক বিশেষ জনগোষ্ঠীকে। ‘ল্যাটিচিউড মার্গারিটাভিল’ নামের এই দলের সবার বয়স মোটামুটি পঞ্চান্নের ঊর্ধ্বে। এদের কাছে অবসরের সংজ্ঞা মানে প্রকৃতির কোলে ডুবে যাওয়া নয়, বরং আবারও কলেজজীবনে ফিরে যাওয়া! অবসর-পরবর্তী জীবন তাঁদের তাই কাটে লাইভ ব্যান্ড শো, টোগা পার্টি আর বিভিন্ন গেট-টুগেদারে অংশ নিয়ে।
এ কথা সবাই মানবেন যে, বর্তমান তরুণ প্রজন্ম বা জেন জিরা তাদের অগ্রজদের তুলনায় বেশি বাস্তববাদী। নেটমাধ্যমে তথ্যের অবাধ প্রবাহ তাঁদের করে তুলেছে অনেক বেশি ফোকাসড, সতর্ক এবং স্বতঃস্ফূর্ত। তাঁদের বিপরীতে মার্গারিটাভিলের এই প্রবীণেরা অবসরের পর ফিরে গেছেন উদ্দামতায় পূর্ণ জীবনযাপনে! তাঁরা অবাধে মদ খাচ্ছেন, পার্টি করছেন, আবার অসতর্ক যৌন সম্পর্কও গড়ে তুলছেন।

এতে ছড়িয়ে পড়ছে গনোরিয়ার মতো যৌনবাহিত বিভিন্ন রোগ। বিশ্বখ্যাত জনস্বাস্থ্য ও চিকিৎসা সাময়িকী ল্যানসেট-এর নিবন্ধে উঠে এসেছে, ২০১০ সালের পর ৫৫ বছরের বেশি বয়সী আমেরিকানদের মধ্যে গনোরিয়ার প্রাদুর্ভাব বেড়েছে ছয়গুণ! জন্মনিরোধকবিহীন (কনডম) শারীরিক সম্পর্ক, ‘হুকআপ’ সংস্কৃতি এবং প্রবীণদের মধ্যে ডেটিং অ্যাপের বর্ধিত ব্যবহারকে এর জন্য দায়ী করা যেতে পারে।
আমেরিকার মতো একই রকম চিত্র চোখে পড়ছে ইংল্যান্ডেও। ২০২৩ সালের আগে আগে শহরটির তরুণদের মধ্যে সিফিলিস সংক্রমণের হার কিছুটা কমলেও ৬৫ বছরের বেশি বয়সীদের ক্ষেত্রে তা ৩১% বৃদ্ধি পেয়েছে!
মদপানেও এগিয়ে বুড়োরা!
অতীতে বিপ্লবী ও বেপরোয়া তরুণসমাজকে রাজনীতিবিদদের মাথাব্যথার কারণ হয়ে উঠতে দেখা যেত। এখন যেন সে ভার অর্পিত হয়েছে বয়জ্যেষ্ঠদের কাঁধে! প্রথম বিশ্বে ৬৫ বছরের বেশি বয়স্ক মানুষের সংখ্যা ক্রমশ বেড়ে চলেছে; ব্রিটেনে তরা মোট জনসংখ্যার এক-পঞ্চমাংশেরও বেশি।
এই বিপুল জনগোষ্ঠী এখন জীবনটাকে নতুন করে উপভোগ করতে চান, তাঁরা ‘ফান’ চান! তাঁদের সবার বয়স ৫৫ থেকে ৭৫ এর মধ্যে। অনেকের ভাষ্যে এরা তাই পরিণত হয়েছেন নতুন এক ‘প্রবলেম জেনারেশন’ বা সমস্যা সৃষ্টিকারী প্রজন্মে!
অ্যালকোহল, ড্রাগ এবং পার্টির সঙ্গেও ক্রমশ জড়াচ্ছে বয়স্ক ব্যক্তিদের নাম! বিভিন্ন জরিপে দেখা গেছে যে, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া এবং ফ্রান্সের মতো দেশগুলোতে অল্পবয়সীরা মদ্যপানের হার কমালেও ৫৫ বছরের বেশি বয়সীদের মধ্যে পানাসক্তি অধিক! গত বিশ বছরে আমেরিকার বয়স্কদের মধ্যে অ্যালকোহল সেবনের হার ৪৯% থেকে ৫৯%-তে পৌঁছেছে।

একই অবস্থা ড্রাগসের ক্ষেত্রেও। বয়স্ক আমেরিকানদের মধ্যে গাঁজা সেবন বেড়েছে। এর একটি কারণ গাঁজার বৈধতা এবং অন্যটি জনপ্রিয়তা। তাঁদের শৈশবে নিশ্চয়ই গঞ্জিকা সেবনে এখনকার মতো আবেদন ছিল না!
স্পেনের কথা শুনলে তো চোখ কপালে উঠতে বাধ্য! দেশটিতে ৫৫-৬৪ বছর বয়সীদের মধ্যে গত আট বছরে কোকেইনের ব্যবহার বেড়েছে আটগুণ। এভাবে প্রতিনিয়ত স্টেরিওটাইপ বা ছাঁচবদ্ধ সংজ্ঞা ভেঙে বয়সকালের নতুন সংজ্ঞা দাঁড় করাচ্ছেন প্রবীণেরা।
প্রসঙ্গক্রমে বিবাহ-বিচ্ছেদের কথাও চলে আসে। উন্নত বিশ্বে ডিভোর্সের হার কিছুটা কমেছে; এটি অবশ্য ভিন্ন বিষয় যে, লোকে এখন বিয়েতে আগ্রহই পাচ্ছে না! বিয়ে করলে পরে তো বিচ্ছেদের প্রশ্ন!
২০২২ সালে জাপানে বিবাহ-বিচ্ছেদের নতুন এক রেকর্ড তৈরি হয়, যেখানে আবেদনকারীদের বেশিরভাগেরই বিবাহের বয়স ছিল ২০ বা তার অধিক। অন্যদিকে, ষাটোর্ধ্ব আমেরিকানদের এক-চতুর্থাংশেরও বেশি একাকী বাস করেন।
অবশ্য এতে যৌন কার্যকলাপের মাত্রা কিছু কমেনি! নেদারল্যান্ডের জরিপে দেখা গেছে, ২০১৪ সালে ৭৫ এর অধিক বয়সীদের মধ্যে যৌন সক্ষম ছিলেন ১৪% ব্যক্তি, এক দশকের মাথায় যা এখন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৭%-এ।
কিন্তু ‘গুরুজনদের’ এমন আচরণের কি কোনো ব্যাখ্যা আছে!
আসলে এতক্ষণ যাদের কথা বললাম, তারা মোটা দাগে সবাই বেবি বুমারস প্রজন্মের সদস্য। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী ১৯৪৬ থেকে ১৯৬৪ সালের মধ্যে জন্ম নেওয়া প্রজন্মই হলো বেবি বুমারস। এদের বর্তমান বয়স ৫২ থেকে ৭০ বছরের মধ্যে।
যুদ্ধের পর বিশ্বজুড়ে যে সামাজিক বিশৃঙ্খল অবস্থা তৈরি হয়, এরা তার প্রত্যক্ষদর্শী। ফলে স্বাভাবিকভাবেই ওই সময়ে জন্ম নেওয়া প্রজন্মের মধ্যে বৈশিষ্ট্যগত কিছু তফাত রয়েছে। ‘পেসিমিস্ট’ বা হতাশাবাদী হিসেবেও এদের বিশেষ পরিচিতি রয়েছে।
অপর কারণ হতে পারে, অর্থনৈতিক। আজকের অবসরপ্রাপ্তরা আগেকার সময়ের চেয়ে বেশি সম্পদশালী। ব্রিটেনের উদাহরণ দিয়ে বোঝানো যেতে পারে। ১৯৯৩ সালে দেশটিতে অবসরগ্রহণকারীদের ৫০ শতাংশের নিজের নামে বাড়ি ছিল, এখন তা ২৫% বেড়ে হয়েছে ৭৫ শতাংশ। অর্থাৎ চার ভাগের মধ্যে তিন ভাগ মানুষেরই অবসর শেষে মাথা গোঁজা নিয়ে ভাবনা নেই।
সম্পদ বেড়েছে তবে কমেছে আর্থিক, পারিবারিক ও সামাজিক দায়বদ্ধতা। এই অতিরিক্ত স্বাধীনতাই হয়তো অবাধ মদ্যপানের মতো আচরণগুলোকে ‘উসকে’ দিয়েছে।
পাবলিক হেলথ ক্যাম্পেইনগুলোও গড়ে উঠছে তরুণদের কথা ভেবে। মদ্যপান, জুয়া, ধূমপান থেকে শুরু করে শিক্ষামূলক যেকোনো ক্যাম্পেইনের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে তরুণেরা। বুড়োদের নিয়ে ভাবার কেউ নেই! লাগামছাড়া জীবনযাপন বয়স্কদের শুধু যুক্ত করছে এইচআইভি, এসটিডির মতো ক্যাম্পেইনে!
বয়স্ক প্রাপ্তবয়স্করা অপরাধের সঙ্গেও ক্রমবর্ধমানভাবে জড়িত হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রে ১৯৯২ সালে ৫০ বছরের বেশি বয়সী পুরুষদের মধ্যে গ্রেপ্তারের হার ছিল মাত্র ৫ শতাংশ, ২০২২ সালে যা তিনগুণ বেড়ে দাঁড়ায় ১৫ শতাংশে। রাজনৈতিক সহিংসতাও বেড়েছে প্রবীণদের মধ্যে। ২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যাপিটল দাঙ্গা এবং গত বছর ইংল্যান্ডে অভিবাসন বিরোধী দাঙ্গায় গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যেও বয়স চল্লিশ পেরোনো অনেককে দেখা গেছে।
তথ্যসূত্র: দ্য ইকোনোমিস্ট



