যুক্তরাজ্যের এবারের নির্বাচন বেশ চিত্তাকর্ষক। এমন নজিরও খুব একটা নেই। ভোটগ্রহণ শুরুর আগেই কোনো শাসক দল এভাবে হার স্বীকার করতে পারে, তা ঋষি সুনকের কনজারভেটিভ পার্টিকে না দেখলে জানা যেত না। হার ঘোষণার যেন একটা প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গিয়েছিল এই দলের নেতাদের মধ্যে। যদিও প্রধানমন্ত্রী ঋষি সুনাক হঠাৎই নির্বাচনের ঘোষণা দেওয়ার পর থেকেই বলা হচ্ছিল তাঁর দল গো-হারা হারবে। বাস্তবে হয়েছেও তাই।
কিয়ার স্টারমারের নেতৃত্বে লেবার পার্টি দীর্ঘ ১৪ বছর পর আবার ক্ষমতার স্বাদ পেতে চলেছে। হাউস অব কমন্সের ৬৫০ আসনের মধ্যে ইতিমধ্যে তারা ৪১২টিতে জিতেছে। এই সংখ্যা গতবারের তুলনায় ২১৪টি বেশি। এখনো দুটি আসনের ফল ঘোষণা বাকি। ফলে বোঝাই যাচ্ছে খ্যাতিমান আইনজীবী স্যার কিয়ার স্টারমার তাঁর দলকে কী বিরাট জয় এনে দিয়েছেন। ভাবী প্রধানমন্ত্রী কিয়ার জয়ের পর ঘোষণা করেছেন, ব্রিটিশদের কাঁধ থেকে একটা বোঝা নেমে গেল। এখন থেকে পরিবর্তন শুরু হবে।
পরিবর্তন তো অনেক আগে থেকেই শুরু করেছেন কিয়ার। তাঁর লেবার পার্টি চিরকালই মধ্য-বাম ধারার দল হিসেবে পরিচিত। কিন্তু কিয়ার দায়িত্ব নেওয়ার পর ‘মধ্য’-র পরে ‘বাম’টা মুছে ফেলেছেন। ঠিক যেমনটা করেছিলেন টনি ব্লেয়ার। যে কারণে ব্লেয়ারের সময় দলের নাম একপ্রকার বদলে হয়ে গিয়েছিল নিউ লেবার পার্টি। পূর্বসুরি জেরমি করবিন ও অন্যান্য বামধারার নেতাদের দল থেকে তাড়িয়ে কিয়ার এই পরিবর্তনের কাজটা আগেই শুরু করেছিলেন। দলের আর্থিক নীতি ও পররাষ্ট্রনীতিতে পরিবর্তন এনেছেন তিনি। সমলোচিত হয়েও অন্যান্য পশ্চিমা নেতাদের মতো কিয়ারও ইসরায়েলকে অন্ধ সমর্থন দিয়ে এসেছেন। ব্রিটেনের মুসলমান অনেকেই বিষয়টি ভালোভাবে নেয়নি। এ কারণে তাঁর ছায়া মন্ত্রিসভায় সংস্কৃতিমন্ত্রী থাঙ্গাম ডেবোনাইয়ার এই লেবার-তুফানের মধ্যেও গ্রিন পার্টির প্রার্থীর কাছে হেরে গেছেন। এই ঘটনা থেকে স্যার কিয়ার কিছু শিখবেন, এমনটা আশা করা যায় না।

তাহলে কীসের পরিবর্তন? যুক্তরাজ্য এক সময় ওয়েলফেয়ার স্টেট বা জনকল্যানমুখী দেশ হিসেবে পরিচিত ছিল। কিন্তু গত শতকের আশির দশক থেকে প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচার এই চরিত্র পাল্টে দেওয়ার কাজটা শুরু করেন। পরে আর কোনো দল বা প্রধানমন্ত্রী এই চরিত্র ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেননি। উল্টে বেসরকারিকরণের ধাক্কায় সে দেশের মানুষের ত্রাহি মধুসুদনের মতো অবস্থা। এমনিই মূল্যস্ফীতি ছিল। করোনার পর থেকে সবকিছুর দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়েছে। কমেছে সরকারের সহায়তা। অর্থনীতির এই বেহাল অবস্থায় ক্ষুব্ধ ব্রিটিশরা কনজারভেটিভ বা টোরিদের শিক্ষা দিয়েছে। সেখান থেকে কিয়ার কী শেখেন, সেটাই দেখার।
তবে কিয়ারের জন্য সুবিধার হলো বিপুল গরিষ্ঠতা থাকায় শক্তিশালী সরকার পরিচালনায় তিনি অনেক দূর এগিয়ে থাকবেন। কঠিন সিদ্ধান্ত নিলেও পার পেয়ে যাবেন। আরও সুবিধা হলো প্রতিপক্ষ টোরিরা একেবারে বিধ্বস্ত। সাবেক প্রধানমন্ত্রী লিজ ট্রস টোরিদের ঘাঁটি বলে পরিচিত নিজের আসনে হেরেছেন। সুনাক মন্ত্রিসভার যতজন সদস্য এই নির্বাচনে হেরেছেন, তা গত ২৫ বছরে হয়নি। ইতিমধ্যে ওই দলে নতুন নেতা খোঁজার প্রস্তুতি শুরু হয়ে গেছে। সব মিলিয়ে বেশ কিছু দিন বেশ রসে-বশেই থাকতে পারবেন নতুন লেবার নেতা। কিন্তু বাস্তবতা কী তাই?
ইউরোপের দেশে দেশে যখন ডানপন্থী ও কট্টর ডানপন্থীদের জোয়ার চলছে, তখন যুক্তরাজ্যে মধ্য-বাম ধারার একটি দলের এই বিপুল বিজয় কী বিস্ময়কর নয়? না। গত মাসে অনুষ্ঠিত ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) পার্লামেন্টের নির্বাচনে ডানপন্থীদের জয়-জয়াকার দেখেছে বিশ্ব। এই ফল দেখে আর থাকতে পরেননি ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমান্যুয়েল ম্যাখোঁ। তিনি তড়িঘড়ি করে পার্লামেন্টের মধ্যবর্তী নির্বাচন ডেকে দিলেন। নির্বাচনের পর বুঝতে পারছেন উগ্র ডানপন্থী লো পেনের সমর্থকেরা কীভাবে তাঁকে গিলে খেতে আসছে। নেদারল্যান্ডসের শাসনভার এখন ডানপন্থীদের হাতে। আর বলা হচ্ছে, ইতালিতে মুসোলিনির পর এত কট্টর ডানপন্থী শাসক আর আসেনি। পশ্চিম ইউরোপের দেশে দেশে ক্ষয়িষ্ণু অর্থনীতি ও অভিবাসন প্রত্যাশীদের স্রোত মোকাবিলায় মধ্যপন্থী দলগুলোর ব্যর্থতাই জন্ম দিচ্ছে লোকরঞ্জনবাদী ডানপন্থীদের। যুক্তরাজ্যও কি এর ব্যতিক্রম? মোটেও না। বরং রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থীদের রুয়ান্ডার মতো আফ্রিকার দেশে ঠেলে দিয়ে যুক্তরাজ্য প্রমাণ করেছে, তারা কতটা কঠোর হতে পারে। স্যার কিয়ারের কাছে এর কোনো বিকল্প আছে? থাকলে ভালো, না হলে টোরিদের গোত্রে নামতে হবে।
আসলে যুক্তরাজ্যে লেবার পার্টি জিতেছে ঠিকই, একই সাথে উত্থান হয়েছে নাইজেল ফারাজের কট্টর ডানপন্থী ইউকে রিফর্ম পার্টির। ব্রেক্সিটের পক্ষে জান লড়িয়ে দেওয়া ফারাজ সাতবার নির্বাচনে ফেল করার পর এবার অষ্টমবারে জিতেছেন। এখন পর্যন্ত তাঁর দল আটটি আসন পেয়েছে। ৬৫০ আসনের পার্লামেন্টে এই সংখ্যা একেবারে ধর্তব্যের মধ্যে আনার কথা না। কিন্তু ফারাজের ইতিহাস অন্য কথা বলে। এক যুগের বেশি সময় ধরে ইইউ থেকে যুক্তরাজ্যের বেরিয়ে আসা নিয়ে তিনি নিরন্তর প্রচার চালিয়ে গেছেন। এই প্রচারের সাথে ব্রিটিশ জাত্যাভিমান মিশিয়ে এমন এক ককটেল তিনি জাতিকে উপহার দিয়েছিলেন যে, তা থেকে ব্রিটিশরা আর বেরোতেই পারেনি। দেশের দুই প্রধান দল টোরি ও লেবার পার্টির নেতারা একজোট হয়েও ব্রেক্সিট ঠেকাতে পারেননি।
সেজন্য নাইজেল ফারাজ এক অশনি সংকেত। বৃহস্পতিবারের নির্বাচনে দেখা গেছে, ২০১৯ সালের তুলনায় লেবার পার্টির ভোট বেড়েছে অতি অল্প। কিন্তু আসন বেড়েছে দ্বিগুনেরও বেশি। এখানেই নাইজেল ফারাজের দলের কৃতিত্ব। তিনি টোরিদের বাড়া ভাতে ছাই দিয়েছেন। টোরিরা নিজেদের ঘাঁটিতে একের পর এক আসন হারিয়েছে রিফর্ম পার্টির প্রার্থীদের কারণে। এ জন্য ব্রিটেনের সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও কট্টর টোরি নেত্রী সুয়েলা ব্র্যাভারম্যান হারের পরে নিজ সমর্থকদের কাছে বলেছেন, ‘আমি দুঃখিত যে আমার দল আপনাদের কথা শোনেনি। কনজারভেটিভ পার্টি আপনাদের হতাশ করেছে। আপনারা, মহান ব্রিটিশ জনগণ, ১৪ বছর ধরে আমাদের ভোট দিয়েছেন এবং আমরা আমাদের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করিনি।’ মনে করা হচ্ছে, সুয়েলা পরবর্তীতে টোরি দলের হাল ধরতে পারেন।
তবে সুয়েলা হাল ধরলে দলের অবস্থা কতটা বদলাবে, তা নির্ভর করছে নাইজেল ফারাজের ওপর। ফারাজের দল টোরিদের ভোটে ভাগ বসিয়েছে। আসন কম পেলেও ভোট বেড়েছে। জিতেই ফারাজের ঘোষণা, টোরিদের পর এবার তাঁর দলের লক্ষ্য লেবাররা। তাদের ভোটে ভাগ বসাতে কোনোভাবেই কিয়ার সরকারকে শান্তিতে থাকতে দেবে না ফারাজের দল। তাঁর লক্ষ্য ২০২৯ সালের সাধারণ নির্বাচন। ফারাজের দাবি, ‘লেবার সরকার খুব দ্রুত সমস্যায় পড়বে এবং আমরা এখন লেবার পার্টির ভোটকে টার্গেট করব। আমরা কাজ করার জন্য এসেছি, এতে কোনো সন্দেহ নেই।’ এ থেকে স্পষ্ট লেবার পার্টির প্রধান প্রতিপক্ষ আসলে কে হবে, তা ঠিক করতে টোরিদের এখন থেকে ফারাজের দলের নীতির দিকে তাকিয়ে থাকতে হবে। রিফর্ম পার্টি যে অবস্থান নেবে, টোরিরা তারচেয়ে কঠোর অবস্থান না নিলে ভোট ফারাজের দলের কাছেই যাবে। ব্রিটেনের ডানপন্থী রাজনীতিতে নাইজেল ফারাজ ক্রমে নিজেকে কেন্দ্রীয় চরিত্রের দিকে নিয়ে যাচ্ছেন। সে কারণে ব্রিটেনে ডানপন্থার পরিরর্তে মধ্য-বাম ধারার যে জয়ের কথা বলা হচ্ছে, তা আসলেই একটা বিভ্রম মাত্র।
ভাবী প্রধানমন্ত্রী কিয়ারের জন্য আরেক সমস্যা হবে যুক্তরাজ্যের পশ্চিমা মিত্ররা। ইতালি, নেদারল্যান্ডসের পর প্রতিবেশী ফ্রান্সেও যদি ডানপন্থীরা জেতে, তাহলে সম্পর্ক ভালো রাখার কাজটা কঠিন হবে। অভিন্ন ইউরোপের স্বপ্ন ক্রমে মরিচীকা হওয়ার পথে যেতে পারে। আর মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা-র মতো আছে পরবর্তী মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের জিতে আসার সম্ভাবনা। ফারাজের বন্ধু ট্রাম্প হোয়াইট হাউসে ঢোকার অধিকার পেলে অন্য ইউরোপীয় দেশের মতো যুক্তরাজ্যেও শান্তি থাকার কোনো কারণ নেই।
ফলে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে লেবার নেতা কিয়ার স্টারমার বিরাট কিছু করে ফেলবেন, এমনটা আশা করা বোকামি। কিন্তু পরিবর্তনের আশা নিয়েই যুক্তরাজ্যের ভোটাররা লেবার পার্টিকে বিপুল গরিষ্ঠতায় জিতিয়েছেন। সেই আশা না পূরণ করতে পারলে ভবিষ্যতের জন্য নাইজেল ফারাজদের পথ আরও মসৃণ হবে।
লেখক: নির্বাহী সম্পাদক, ডিজিটাল মিডিয়া, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন
[এই মতামত লেখকের নিজস্ব। এর সঙ্গে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পাদকীয় নীতিমালার কোনো সম্পর্ক নেই।]