দুই-একদিন আগের কথা। শীতের শীতল বাতাস কাঁপিয়ে দিচ্ছিল সবে। রিকশায় বাতাসের কারণে ঠান্ডা একটু বেশিই লাগে এ দেশের মধ্য ও নিম্নবিত্ত মানুষের। কিন্তু রাজধানীর ব্যস্ততম একটি সড়কে জট না থাকা সত্ত্বেও এই অধমকে বহনকারী রিকশাটি হুট করে থমকে গিয়ে কিছুটা স্বস্তি দিয়েছিল। কারণ সামনে পথ আগলে ছিল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি গাড়ি!
ওয়ান ওয়ে রোডেও দিব্যি উল্টো পথে চলছিল সরকারি সেই গাড়িটি। আটকে দিয়েছিলেন সরকারি ট্রাফিক পুলিশেরই একজন সদস্য। অনেকটা ফ্রেন্ডলি ফায়ারের মতো। ট্রাফিক পুলিশের ওই সদস্য তাঁরই বাহিনীর একজন সহকর্মী, অর্থাৎ গাড়িটির চালককে শুধাচ্ছিলেন, ‘আপনি উল্টা ঢুকাইসেন কেন? এখন পুরা রোডে জ্যাম হবে। এদিকে আসতে চান তো ঘুরে আসেন!’ ওদিকে সরকারি গাড়ির চালক অনুচ্চারে কিছু কারণ দেখানোর চেষ্টা করছিলেন বোধহয়। কিন্তু রিকশা চলা শুরু করায় বচসার পুরোটা আর শোনা যায়নি। তবে ওই গাড়িতে চালক স্বভাবতই ছিলেন পদক্রমে অনেক নিচে। তাঁর তুলনায় উচ্চপদস্থরাও গাড়িতে ছিলেন। সংক্ষিপ্ত দৃষ্টিসীমায় তাঁদের চেহারায় কোনো হেলদোল চোখে পড়েনি।
একটি বিষয় অনুমিতই যে, ওই সরকারি গাড়িতে থাকা তুলনামূলক উচ্চপদস্থরা চালকের উল্টো পথে গাড়ি চালানোয় বাধা নিশ্চয়ই দেননি। বাহিনীতে সব সময়ই পদস্থদের নির্দেশ পালিত হয় আদেশের মতো করে। তার অনুপস্থিতি নিশ্চয়ই ছিল। নইলে তো আর সরকারি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গাড়ি নিজেদেরই আইন ভেঙে উল্টো পথে চলে না! কিন্তু এতে আইন ভাঙার অজুহাত তৈরিতে উৎসাহিত হয় সাধারণ জনতা। কারণ তারা যখন দেখে আইন যাদের প্রয়োগ করার কথা, তারাই তা অবলীলায় ভাঙে, তখন এই উৎসাহ, তুমুল কার্যে পরিণত হয় বৈকি।

সেটি কেমন? এর উত্তর পাওয়া গেল পরদিনই। বিশেষ কাজে রাজধানী থেকে এক বিভাগীয় শহরে যেতে হয়েছিল। হাইওয়েতে বাসে ওঠার পরই দেখা গেল বিচিত্র দৃশ্য। যে রাস্তায় শুধু গাড়ি, বিশেষ করে বাস, ট্রাক, লরি বা ব্যক্তিগত গাড়ি চলার কথা, তাতে বিচরণ করছে অগণিত যান। এসবের মধ্যে পায়ে টানা রিকশা আছে, আছে ব্যাটারিচালিত ভ্যান থেকে শুরু করে সিএনজিচালিত যানের মতো দেখতে বাহন, আবার নিখাদ সিএনজিচালিত অটোরিক্সা আছে, আছে তার উন্নত সংস্করণ হিসেবে প্রচলিত ডিজেলচালিত বড় আকারের স্কুটি বা অটোরিক্সাও। এসবে যাত্রী বহন করা হয়, মালামালও হয়। এর বাইরে যাত্রী বহনকারী বাস, মিনি বাস, ব্যক্তিগত গাড়ি ইত্যাদি তো আছেই। আরও থাকে মালামাল বহনকারী ট্রাক-লরিও। এবার বুঝুন তবে, অবস্থাটা আসলে কেমন!
নিজের অভিজ্ঞতা একটু ভাগাভাগি করে নেওয়া যাক। এই অধম সিট পেয়েছিল বাসের একেবারে সামনে। ফলে বাসের সুবিশাল গ্লাস দিয়ে সামনের রাস্তা একেবারে মূর্ত হয়ে উঠেছিল। বেশ কয়েকবারই দেখা গেল, রাস্তার বাম পাশের ব্যাটারিচালিত যানের ধীর গতির কারণে এবং সাইড না পাওয়ায় একেবারেই থমকে যাচ্ছিল বাস। আরও সুন্দর (!) দৃশ্য দেখা গেছে। যেমন: মহাসড়কে এক ব্যাটারিচালিত যানকে গতিতে টপকে যাওয়ার জন্য আরেক ব্যাটারিচালিত যান প্রায় রাস্তার মাঝামাঝি চলে এসেছে! এমন কাজ করছে সিএনজি বা ডিজেলচালিত অটোরিক্সাগুলোও। আর উল্টো পথে এসে রাস্তা আটকে দেওয়ার ঘটনা ঘটছে অহরহ। মাঝে মাঝেই দেখা গেল, মহাসড়কে উল্টো পথে এসে এসব ধীর গতির যানবাহন কোনক্রমে চলছে, রাস্তার একেবারে কিনারে যেতে যেতে প্রায় নেমে যায় আর কি! এই সবগুলো যানই যাত্রী বা মালামালে ভর্তি। এবার একবার চোখ বন্ধ করে কল্পনা করে দেখুন যে, ওই মহাসড়কে ভারী বাস, ট্রাক, লরি বা ব্যক্তিগত যান চলছে তুলনামূলক ঢের বেশি গতিতে। কি, দুর্ঘটনার শঙ্কায় শরীর হিম হয়ে আসছে না?
অথচ পুরো আট-নয় ঘণ্টার যাত্রায় এই অধম প্রায় সময়ই এমন দৃশ্য প্রত্যক্ষ করেছেন। কখনও বাঁচতে ওই ধীর গতির যানগুলো রাস্তার একপাশে জড়োসড়ো হয়ে দাঁড়িয়ে গেছে, আবার কখনও ওদের বাঁচাতে বাসের চালক স্টিয়ারিং ঘুরিয়েছেন মরিয়া হয়ে। এ যেন বাঁচা-মরার খেলা! যদিও মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে সাইনবোর্ডে বড় বড় করে লেখা ছিল, ‘উল্টো পথে বাহন, দুর্ঘটনার কারণ’। তবে তা কেউ দেখেছে বা পড়েছে বলে মনে হয় না।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের হিসাবে, সড়কে দুর্ঘটনায় সবচেয়ে বেশি প্রাণহানির দিক থেকে দ্বিতীয় অবস্থানে আছে তিন চাকার যানবাহন। সরকার নিবন্ধন দেয় না বলে এগুলোকে অবৈধ যানবাহন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। গত জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সড়ক দুর্ঘটনায় তিন চাকার যানবাহন সিএনজিচালিত অটোরিকশা, ইজিবাইক, নছিমন, অটোভ্যান ইত্যাদির দুর্ঘটনায় ১ হাজার ৯৭ জন মারা গেছে, যা মোট নিহতের ১৯ দশমিক ৫৯ শতাংশ।

এদিকে জাতীয় দৈনিক প্রথম আলোয় প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও অন্যান্য অবৈধ তিন চাকার যানবাহনের প্রকৃত হিসাব সরকারের কোনো দপ্তরেই নেই। বিআরটিএ, যাত্রী অধিকার সংগঠন, পুলিশ ও অন্যান্য অংশীজনের হিসাবে, ব্যাটারি ও যন্ত্রচালিত তিন চাকার অবৈধ যানবাহন এখন ৬০ লাখের বেশি। এর মধ্যে ঢাকার বাইরে আছে প্রায় ৫০ লাখ। আর ঢাকায় আছে ১০ লাখের মতো। কেউ কেউ মনে করেন, ব্যাটারি ও যন্ত্রচালিত রিকশার সংখ্যা ১৫ লাখের কম হবে না।
ওপরে বর্ণিত অভিজ্ঞতা ও দুর্ঘটনার হিসাবের মেলবন্ধন ঘটালে বলতেই হয় যে, মহাসড়ক কিংবা রাজধানীর প্রধান সড়ক–সবখানেই আছে উল্টো পথে চলার অসুখ। সরকারি কিংবা সাধারণ জনতা–সবাই এই অসুখে আক্রান্ত। একই সাথে সরকারের বা প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদধারী ব্যক্তিদেরও এমন উল্টো যাত্রার অসুখের ছবি-ভিডিও গণমাধ্যমের কল্যাণেই আমরা প্রত্যক্ষ করেছি। এভাবে এ দেশের সড়কগুলোতে তৈরি হচ্ছে প্রবল বিশৃঙ্খলা। কিন্তু সেদিকে কারও যেন নজরই নেই!
সড়কে বিশৃঙ্খলার প্রধান কারণই হলো বিদ্যমান আইনের সঠিক প্রয়োগ না হওয়া। সেই সঠিক প্রয়োগের অভাবেই প্রতি বছর সড়ক দুর্ঘটনায় হাজার হাজার মানুষের প্রাণ যাচ্ছে। একটা মানুষের প্রাণ চলে যাওয়া কখনোই স্রেফ সংখ্যায় একক নয়। বরং পরিবার-পরিজন ও বন্ধু-স্বজন মিলিয়ে আরও অনেক মানুষের জীবনকে উল্টে-পাল্টে দেয়। কিন্তু তারপরও, এসব জেনে-বুঝেও এ দেশের সড়কে আর শৃঙ্খলা ফেরে না।
আইনের সঠিক প্রয়োগের অভাবজনিত বিষয়টিকে তুলে এনে সরকার ও প্রশাসনের ব্যর্থতার প্রতি আঙুল তোলাই যায় এবং তোলা যৌক্তিকও। তবে এই দেশের রাস্তাঘাটে চলা সাধারণ মানুষের প্রতিও দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগটি আনা প্রয়োজন। আইন মেনে চলাও কিন্তু সুনাগরিকের কর্তব্য। অথচ সেটি এ দেশে লঙ্ঘিত হয় হরহামেশা।
সুতরাং, সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে এবং নিজের নিরাপত্তার পাশাপাশি অন্যকে নিরাপদে রাখতে আমাদের সবাইকেই দায়িত্বশীল হওয়া প্রয়োজন। নইলে এ দেশের সড়ক-মহাসড়কে ক্ষণে ক্ষণে হওয়া মৃত্যুর মিছিল দৈর্ঘ্যে কেবল বাড়তেই থাকবে। তার আঁচ একদিন হয়তো আমার বা আপনার জীবনেও এসে লাগবে। প্রিয়জনের অনাকাঙ্ক্ষিত প্রস্থান শোকের গনগনে আগুন হয়ে পোড়াবে আমাদের। তখন তা সইতে পারবেন তো?
লেখক: উপবার্তা সম্পাদক, ডিজিটাল বিভাগ, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন
[এই মতামত লেখকের নিজস্ব। এর সঙ্গে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পাদকীয় নীতিমালার কোনো সম্পর্ক নেই।]


ব্যাটারি রিকশা বন্ধের নির্দেশের বিরুদ্ধে আপিল করবে সরকার
ব্যাটারি রিকশা বনাম ব্যক্তিগত গাড়ি–কোনটি বেশি অপকারী?
রাতের ঢাকায় দাপিয়ে বেড়াচ্ছে ব্যাটারিচালিত রিকশা
চালকের এত! তাহলে পরিচালকের কত?
