বাবু ট্রাম্প গাজার জমিটুকুও লইবে কিনে!

আপডেট : ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৫, ০৫:১৪ পিএম

রবি ঠাকুরের সেই দুই বিঘা জমি কবিতার অংশ অনুকরণে শিরোনাম। বাবুর শখের দায়ভার মেটাতে হবে দরিদ্র সেই প্রতিবেশীকে, যার শেষ সম্বল সেই দুই বিঘা জমি। তাকে সেই জমি ছেড়ে দিতে হবে বাবুর বাগান বাড়ির সৌন্দর্য বর্ধনের জন্য। সেটা ছিল কবিতা, তবে বাস্তবেও আন্তর্জাতিক পরিসরে যে এ ধরনের ঘটনা ঘটতে পারে, তা কেউ কি চিন্তা করতে পারে। কিন্তু তার চেয়েও নির্মম এই আবদার আর উদ্ভট প্রস্তাব এসেছে প্রথমে জামাই তারপর শ্বশুরের পক্ষ থেকে। আরেকটু খুলে বলি, প্রস্তাবটা মার্কিন প্রেসিডেন্টের জামাই কুশনার, তারপর স্বয়ং ডোনাল্ড ট্রাম্প এই আবদার ব্যক্ত করেছেন যে গাজা ভূখণ্ড তাদের ছেড়ে দিতে হবে। তারা এটাকে পুনর্গঠন করবেন এবং আন্তর্জাতিক মানের একটা পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলবেন।

আগেকার দিনের রাজা-বাদশাহদের অনেক অদ্ভুত কাণ্ডকারখানা আর শখ ছিল, যা এখনো শুনলে অবাক লাগে। অনেক অত্যাচারী রাজরাজড়া অকথ্য নির্যাতন চালাত তার প্রজার ওপর, বিশেষ করে যারা কোনোভাবে তাদের বিরাগ ভাজন হতো। অনেকে আবার প্রজাদের অনেক উপকারেও আসত। যদিও এখন আর সেই রাজাও নেই, নেই সেই রাজত্ব। এক সময় ভারতবর্ষের ইংরেজ শাসকদের অনুগত হিসেবে অনেক রাজা পরিচিত ছিলেন। সেই সময় এই উপমহাদেশে বহু রাজা-মহারাজা অত্যন্ত দাপটের সাথে রাজত্ব করে গেছেন। তাদের মধ্যে কেউ কেউ ছিলেন বেহিসাবি, ভোগবিলাসে মত্ত। কেউবা ইচ্ছেমতো প্রজাদের ওপর হুকুম  চালাতেন। আবার এদের কারো কারো ছিল নানা অদ্ভুত বাতিক। যেমন, পাতিয়ালার এক রাজার বাতিক ছিল বছরের একদিন খালি পায়ে প্রকাশ্যে রাজপথে হেঁটে বেড়ানো। আবার রাজার মর্জি হয়েছিল তার প্রিয় কুকুরের বিয়ে দেওয়া। যেমন তেমন বিয়ে নয়, প্রিয় কুকুরের বিয়ে হয়েছিল রাজকীয় মর্যাদায়। সেখানে উপস্থিত ছিলেন রাজা, মহারাজা, বড়লাটসহ বহু গণ্যমান্য অতিথি। রামগড়ের রাজার নিয়ম ছিল প্রতিদিন ভোরে ঘুম থেকে উঠে চোখ খুলেই গরুর মুখ দেখা। গরুর মুখ দেখে ঘুম থেকে উঠলে রাজার নাকি দিন ভালো যায়। রাজাদের এসব আজব খেয়ালের কথা বলে শেষ করা যাবে না। 

পৃথিবী অনেক এগিয়ে গেছে। মানবাধিকার, রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব, গণতন্ত্র এসব বিষয় এখন আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। এছাড়া এর দেখভালের জন্য রয়েছে জাতিসংঘ। রয়েছে সহযোগী আরও অনেক সংস্থা। তাই এখন এমন কাণ্ড করা থেকে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকার প্রধানেরা বিরত থাকার চেষ্টা করেন। এখনকার রাষ্ট্র বা সরকার প্রধানেরা যে ধোয়া তুলসী পাতা বা পরহেযগার তা কিন্তু না। তা সত্ত্বেও এখন যা ইচ্ছে করা যায় না। কিন্তু তার ব্যতিক্রম দেখা গেল এক শ্বশুর-জামাইয়ের আবদারে। আবদারটা হলো সমস্ত ফিলিস্তিনিদের গাজা ভূখণ্ড ছেড়ে চলে যেতে হবে। আর সেই ভূমিতে তারা বড় বড় হোটেল, ক্যাসিনো আর বিলাসী পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তুলবেন। সমুদ্র পারের এই নয়নাভিরাম সৈকত বদলে যাবে ভুবন বিখ্যাত পর্যটন কেন্দ্রে। জামাই-শ্বশুরের পকেটে আসবে না কোনো ডলার। প্রথমে জামাই, পরে শ্বশুর সাহেব খোলাখুলি তার হাউস ব্যক্ত করেন। তবে ইহুদীদের পরিকল্পনা আরও সুদূর প্রসারী। সেই কথায় পরে আসছি।  

গাজায় ইসরায়েলি হামলা চলছেই। ছবি: রয়টার্সসাম্প্রতিককালে হৃদয় বিদারক মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে গাজায়। নারী, পুরুষ, শিশুসহ হাজার হাজার মানুষকে নির্বিচারে বোমা মেরে পুরো গাজা শহরটাকে একেবারে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করে ফেলা হল বিশ্ববাসীর চোখের সামনে। উদ্দেশ্য ছিল এখানকার অধিবাসীদের উচ্ছেদ করে মিশরে পাঠিয়ে দেওয়া। হামাস যোদ্ধাদের সাথে যখন পেরে ওঠা কঠিন হলো তখন তারা মিশরকে অনুরোধ করে তাদেরকে যেন সাময়িকভাবে মিশরে আশ্রয় দেওয়া হয়। মিশর মতলব বুঝতে পেরে প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখান করে। ইসরায়েল জানে, একবার যদি কোনোভাবে এখান থেকে গাজাবাসীকে বের করে দেওয়া যায়, তবে বিশ্ববিবেককে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে গাজা ভূখণ্ড স্থায়ীভাবে ইসরায়েলের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে। ছেলে ভোলানোর মতো বলে যাচ্ছে, তারা সাময়িকভাবে চলে গেলেও আবার ফিরে আসতে দেওয়া হবে। আরও মজার কথা, জায়গাটা নাকি প্রচণ্ড বোমা বর্ষণের ফলে আর বাসযোগ্য অবস্থায় নেই। তাই তারা জায়গাটা আবার তাদের মতো করে বাসযোগ্য করে তুলবে। এমনকি যদি কোনো চুক্তিও হয় যে ওদের আবার নিজ ভূমিতে ফিরে আসতে দেওয়া হবে তার বিন্দুমাত্র নিশ্চয়তা নেই। ঐতিহাসিক ভাবেই ইহুদিদের চুক্তি ভঙ্গের নজির বোধ হয় সবচেয়ে বেশি। 

বিন্দুমাত্র লজ্জাশরম, নীতি-নৈতিকতার বালাই নেই, বিনা কারণে লাখ লাখ নিরীহ নারী, পুরুষ, শিশুকে হতাহত করার পর আবার তাদের আবাস ভূমি মেরামত করে দেওয়ার আবদার। এটাকে যে কীভাবে ব্যাখ্যা কয়রা যায় তার কোনো খেই খুঁজে পাচ্ছি না। আমেরিকা মূল লক্ষ্য হলো মধ্যপ্রাচ্যের এই জায়গাটা দখল করে ইসরায়েলিদের নিরাপদ আবাস গড়ে দেওয়া। সেই সাথে তার লাভের ভাগটা বড় করা। এই লক্ষ্যেই ইলন মাস্কসহ ইহুদি ব্যবসায়ী গোষ্ঠী শ্বশুরসাহেব মানে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে অকুণ্ঠ সমর্থন দিয়েছিল। এই শ্বশুরসাহেব আবার ভূমি ব্যবসায়ী। সম্ভবত তার মতো, এত নির্লজ্জ সমর্থন, কথাবার্তা আর কর্মকাণ্ড চালানো কারও পক্ষে সম্ভব নয় বলেই তাকে বেছে নেয় ইহুদিরা। তার বিজয়ে ইলন মাস্ক রীতিমতো আবেগতাড়িত হয়ে নাৎসি কায়দায় সালাম ছুড়ে দেন সমবেত জনতার উদ্দেশে। যেটা নিয়ে অনেক সমালোচনাও হয়েছে। নাৎসি জার্মানির হাতে ইহুদিরা কী পরিমাণ নির্মমতা আর হেনস্থার শিকার হয়েছে তা পৃথিবীবাসী, বিশেষ করে ইহুদিরা ভুলে যায়নি। তবে একটা জিনিস স্পষ্ট, মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার লক্ষ্য হলো কোনো না কোনোভাবে অশান্তি জিইয়ে রেখে মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানিসম্পদ লুট করা আর তার বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র ব্যবসা চালু রাখা। সেই লক্ষ্যে তার মধ্যপ্রাচ্য সমস্যা বাঁচিয়ে রেখেছে। 

যদিও জামাই-শ্বশুরের এই আবদারে মুসলিম দেশগুলো তীব্র ক্ষোভ ব্যক্ত করে চলেছে। তবে যতই প্রতিবাদ হোক ইহুদিরা এত সহজে গাজা দখলের পরিকল্পনা পরিত্যাগ করবে, এটা আশা করা বোকামি। কেননা গাজা যদি দখলে নেওয়া যায় তবে ফিলিস্তিনিদের স্বাধীন রাষ্ট্র পাওয়ার আশা সুদূর পরাহত থেকে যাবে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মধ্যপ্রাচ্যের হতভাগ্য সম্বলহীন দিশাহারা ও ইউরোপ থেকে বিতাড়িত ইহুদিদের এইখানে পুনর্বাসিত করার কাজে সর্বাত্মক সহায়তা করে পশ্চিমা দেশগুলো। তাই তারা খুব বেশি কিছু করবে এমনটা মনে করার কারণ নেই। অন্যদিকে ফিলিস্তিনিরা যুগের পর যুগ রক্ত দিয়ে যুদ্ধ করে, অনাহারে থেকে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। তাদেরকে মাতৃভূমি থেকে উচ্ছেদ করা এত সহজ নয়। এটা ইসরায়েল ও আমেরিকা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে। আরব মুসলিম দেশগুলোর উচিত হবে, ডলার দিয়ে লেনদেন বন্ধ করা। আর একযোগে তেল সরবরাহ বন্ধ করা। শুধু প্রতিবাদ আর মায়াকান্নায় কোনো কাজ হবে না। ফিলিস্তিন একদিন স্বাধীন হবে। ইতিহাস বলে অর্থলোভী আর অহংকারিদের পরিণতি ভালো হয় না। 

ফেরাউন, নমরুদ থেকে হিটলার–সবার পরিণতি কি হয়েছিল তা কারো অজানা নেই। আর পরিণতি ইসরায়েল ও আমেরিকার শাসকদের পাশাপাশি কিছু মানুষকেও হয়তো ভোগ করতে হবে। সময় বলে দেবে, কী হবে।

লেখক: প্রবাসী শিক্ষক ও গবেষক 

[এই মতামত লেখকের নিজস্ব। এর সঙ্গে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পাদকীয় নীতিমালার কোনো সম্পর্ক নেই।] 

একদিক থেকে দেখলে একে যুদ্ধ বলা যায় কি না, তা-ই প্রশ্নসাপেক্ষ। আক্রমণ যেখানে বলতে গেলে একপাক্ষিক, সে তো যুদ্ধের চেয়ে বরং নিপীড়িতের ওপর নিপীড়কের আগ্রাসনের সংজ্ঞায় পড়ে। ২০২৩ সালের অক্টোবরে হামাসের...
গাজা যুদ্ধের দুই বছর হতে চলল। জাতিসংঘে সাধারণ পরিষদের অধিবেশন সামনে রেখে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, কানাডার মতো জি৭ জোটভুক্ত তিন দেশ ও অস্ট্রেলিয়া ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতির বিষয়ে ঘোষণা দিয়ে রেখেছে। এই ঘোষণা...
ফিফা রাশিয়াকে নিষিদ্ধ করেছে ২০২২ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি, রাশিয়া ইউক্রেনে হামলা চালানোর চার দিনের মাথায়। উল্টোদিকে ইসরায়েল দুই বছর ধরে গাজায় হত্যাযজ্ঞ চালানোর পরও ফিফায় তারা বহাল-তবিয়তে। রাশিয়ার...
ইউরোপীয় মিত্ররা ইউক্রেনের প্রতিরক্ষায় অর্থায়ন ও সমর্থন বাড়াতে, সহায়তা ও সামরিক সমর্থন বৃদ্ধি করতে এবং নিষেধাজ্ঞা বাড়াতে সচেষ্ট হয়েছে। ইউরোপ ও কানাডা বনাম আমেরিকার ভিন্ন ভিন্ন অগ্রাধিকারের...
পথসভায় জাতীয় নাগরিক পার্টির মূখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, সরকার অটো পাসের মতো করে সরকার চালাতে চায়। আবু সাঈদের রক্তের উপর দাঁড়িয়ে জনগণের সেবা না করে, বাংলাদেশে আর কাউকে অটো পাসের...
কারা অধিদপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক জান্নাত-উল-ফারহাদ জানান, গত বৃহস্পতিবার গাজীপুরের কাশিমপুর মহিলা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে মোছা. রিম্পা নামের এক নারী বন্দি পালিয়ে যান। রোববার তাকে মোহাম্মদপুর থেকে...
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে পাসপোর্ট থেকে বাদ দেওয়া ‘ইসরায়েল ব্যতীত’ (Except Israel) শব্দগুচ্ছ আবারও যুক্ত হচ্ছে। আজ রোববার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক আদেশে এ তথ্য জানা গেছে। এ ছাড়া নতুন...
আগামী বছর যেসব নতুন এয়ারক্রাফট যুক্ত হবে, সেগুলোতে থাকবে ওয়্যারলেস স্ট্রিমিং, ইন-ফ্লাইট ইন্টারনেট এবং প্রতিটি সিটে মোবাইল চার্জিং সুবিধা। পৃথিবীর অনেক এয়ারলাইন্স যেখানে এই সেবার জন্য অতিরিক্ত...
লোডিং...

এলাকার খবর