১৫ মাসের লড়াই শেষে যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হলো ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাস। আগামী ১৯ জানুয়ারি থেকে এই চুক্তি কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ যুদ্ধবিরতি ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে স্মরণকালের সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী ও বিধ্বংসী লড়াইয়ের অবসান ঘটাতে পারে। কিন্তু এখন প্রশ্ন হলো, যুদ্ধ শেষের পর যুদ্ধক্ষেত্র গাজার কী অবস্থা হবে? কার হাতে থাকবে এর নিয়ন্ত্রণ?
বার্তা সংস্থা এএফপি জানায়, গাজার বর্তমান মানবিক পরিস্থিতি ভয়াবহ। সেখানে যুদ্ধের আগেই ইসরায়েলি অবরোধ ছিল এবং যেখানে দারিদ্র্য ও বেকারত্ব প্রবল ছিল।
জাতিসংঘ বলছে, গাজা ভূখণ্ড পুনর্গঠনে ১৫ বছরের বেশি সময় লাগবে। এতে খরচ হবে ৫০ বিলিয়ন ডলার। এই যুদ্ধে গাজার পানি বিতরণ নেটওয়ার্কসহ গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামো ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ইসরায়েলের হামলায় প্রায় ২৫ লাখ গাজাবাসী বাস্তচ্যুত হয়েছে। তারা ভুগছে তীব্র খাদসংকটে। গাজায় বেশিরভাগ শিশু এক বছরেরও বেশি সময় ধরে স্কুলের বাইরে রয়েছে এবং মাত্র কয়েকটি হাসপাতাল আংশিকভাবে চালু রয়েছে।
২০০৬ সাল থেকে গাজা নিয়ন্ত্রণ করছে হামাস। এর প্রতিদ্বন্দ্বী হলো ফিলিস্তিন অথরিটি (পিএ)।
ফ্রান্সভিত্তিক প্রতিষ্ঠান নরিয়া রিসার্চের ফিলিস্তিন বিষয়ক গবেষক জেভিয়ার গুইগার্ড বলেন, পিএর সম্পদের অভাব রয়েছে এবং তারা বাইরের দাতাদের ওপর নির্ভর করবে। গাজার পুনর্গঠনের পরিকল্পনাগুলো প্রায়ই উপসাগরীয় রাজতন্ত্রের ওপর নির্ভর করে, বিশেষ করে সৌদি আরব আর্থিক সহায়তায় পদক্ষেপ নেয়। কিন্তু এই দেশগুলো ক্রমশ জোর দিয়ে বলছে যে নিঃশর্ত অর্থায়নের যুগ শেষ।
স্বাধীনতাকামী গোষ্ঠীটি ইঙ্গিত দিয়েছে, তারা সংঘর্ষ-পরবর্তী গাজাকে শাসন করবে না। গত বছর এক সাক্ষাৎকারে হামাসের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বাসেম নাইম বলেন, আমাদের গাজা ভূখণ্ডে শাসন করার ইচ্ছা নেই।
বিশ্লেষকরা বলছেন, হামাস চাইছে, ফিলিস্তিনি কারও কাছে গাজার শাসনভার তুলে দিতে। গোষ্ঠীটি বলছে, ইসরায়েলে তাদের ৭ অক্টোবরের হামলার লক্ষ্য ছিল, ফিলিস্তিনিদের দুর্দশা ও স্বাধীনতার ইস্যুকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টিগোচরে নিয়ে আসা। সেইসঙ্গে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে অব্যাহত দখলদারি চালিয়ে যাওয়ায় ইসরায়েলকে শাস্তি দেওয়া ও দেশটির কারাগারে বন্দী নিরীহ ফিলিস্তিনিদের ফিরিয়ে আনা।
ফিলিস্তিনের রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ ইয়াসে আবু হাইন বলেন, ‘এর আগের যুদ্ধগুলোর পর হামাস সরাসরি গাজার পুনর্গঠনে নিজেকে জড়িত করেনি এবং একটি বহিরাগত কমিটিকে এই সুযোগ দিয়ে নমনীয়তা দেখিয়েছিল।’
ফিলিস্তিনি নেতারা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন যে, গাজার ভবিষ্যত নিয়ে তাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে, বাইরের কোনো হস্তক্ষেপ তারা প্রত্যাখ্যান করবে।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুও জানিয়েছেন, যুদ্ধের পর গাজা শাসনে হামাসের কোনো ভূমিকা থাকবে না।
কায়রোতে আলোচনার সময়, হামাস এবং ফাতাহর প্রতিনিধিরা একমত হয়েছিলেন যে, গাজা পিএ-র অধীনে নিরপেক্ষ ব্যক্তিদের একটি কমিটি দ্বারা পরিচালিত হতে পারে। গত মঙ্গলবার মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেন বলেন, গাজায় অন্তর্বর্তী প্রশাসন প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনায় সহায়তা করার জন্য আন্তর্জাতিক অংশীদারদের আমন্ত্রণ জানানো উচিত।
কাতার সরকার জানিয়েছে, গাজার যুদ্ধবিরতি মধ্যস্থতাকারীরা কায়রোভিত্তিক একটি সংস্থার মাধ্যমে যুদ্ধবিরতি পর্যবেক্ষণ করবে। ইসরায়েল ১৯৬৭ সাল থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত গাজা দখল করে রেখেছিল। তবে বর্তমানে এই ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে তাদের সুনির্দিষ্ট অবস্থান নেই। গত নভেম্বরে পদত্যাগ করা ইসরায়েলের সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্ট বলেছিলেন, ইসরায়েল গাজা চালাতে চায় না। কিছু ইসরায়েলি গণমাধ্যম বলছে, গাজা প্রশাসন চালাতে সাহায্য করার জন্য একটি আন্তর্জাতিক বাহিনী সেখানে নিযুক্ত হতে পারে।
তথ্যসূত্র: বিবিসি,এএফপি, আল জাজিরা, স্কাই নিউজ,এপি
আরও পড়ুন:
- 'পানি নিতে ১২-১৩ কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে আসতে হয়'
- গাজার অর্ধেক মানুষ অনাহারে: জাতিসংঘ
- লেবাননের পরিণতি হবে গাজার মতো, হুমকি নেতানিয়াহুর
- গাজায় ১০৪ মসজিদ ধ্বংস করেছে ইসরায়েল
- যুদ্ধ পরিস্থিতিতেও ফিলিস্তিনিরা ভোলেনি প্রিয় পোষা প্রাণির কথা
- এক দিনে গাজার ৪৫০ জায়গায় হামলা করেছে ইসরায়েল
- গাজার স্কুলে ইসরায়েলের হামলা, নিহত ২৫
- ‘ভাইয়ের সাথে আমাকেও কবর দিয়ে দাও’
- গাজায় হাজারো মানুষের জন্য একটি টয়লেট
- গুলিবিদ্ধ ফিলিস্তিনিকে গাড়ির সামনে বেঁধে নিয়ে গেল ইসরায়েলি বাহিনী
- গাজায় ২৪ ঘণ্টায় পাঁচ সাংবাদিক নিহত



