দুপুর দেড়টার কিছু পর থেকেই বিভিন্ন সোর্স থেকে একটি দুর্ঘটনার খবর টুকরো টুকরো হয়ে চোখে, কানে আসছিল। নিউজরুমে বসে সেসব দেখতে দেখতে তখনও ঘুণাক্ষরেও কল্পনা করার উপায় ছিল না যে, ঠিক ঘণ্টা দুয়েক পর ওই ঘটনাই মনের ভেতরটাকে দুমড়ে‑মুচড়ে দেবে। মনের আয়নাটাকে ভেঙে টুকরো টুকরো করে দিয়ে প্রবল অপরাধী সাব্যস্ত করবে নিজেকেই!
রাজধানীর উত্তরায় মাইলস্টোন স্কুল ও কলেজ ক্যাম্পাসে বিমান বাহিনীর একটি বিমান বিধ্বস্তের ঘটনার শুরুটা এমনই ছিল। সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে বোঝা গেল, ক্ষয়ক্ষতি হবে অনেক। বিশেষ করে হতাহতের সংখ্যা। এর সাথে যখন নানা ধরনের তথ্য, ভিডিও ফুটেজ ও স্টিল ছবি নিউজের প্রয়োজনেই দেখতে হলো, তখন অভিজ্ঞতা জানাল–পুরো দেশ আসলে এক দুঃখজর্জর ট্র্যাজেডির সামনে দাঁড়িয়ে। বিষণ্ণতার সেই অনলে পুড়তে হবে খবর জানানোর দায়িত্বে থাকা এই ব্যক্তিকেও।
তথ্য, অপতথ্যের মধ্যে বাছাবাছির কাজ করতে করতেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে জানা গেল, নিজের এক সাবেক সহকর্মীর ছেলে নিখোঁজ। মাইলস্টোনের বিমান জ্বালানো আগুন মুহূর্তেই মনে প্রবল জ্বালা ধরাল যেন! এ দেশের অবস্থাটাই এখন এমন। যতক্ষণ নিজের কেউ বিপদে না পড়ে, ততক্ষণ মন কেমন যেন ভাবলেশহীন থাকে। কিন্তু যেই নিজে আক্রান্ত হই, অমনি পুরো আকাশ যেন মাথার উপর ভেঙে পড়ে। তখন বোঝা যায়–যার যায়, সেই বোঝে কেবল!
সাবেক সহকর্মীর ছেলেকে পাওয়া গেছে। শারীরিকভাবে ঠিক আছে। অন্যান্য সহকর্মীরা যখন সেই খবর একে একে জানাচ্ছিলেন, তখন বুক থেকে এক পাষাণ ভার নেমে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। কিছুটা স্বস্তি উঁকি দিয়েছিল সত্যিই। বাবুটাকে ভালোভাবে খুঁজে পাওয়া তো গেছে!

ঠিক সেই মুহূর্তেই মনের আয়নাটা ভেঙে টুকরো হয়ে সমূলে বিঁধে প্রশ্ন করল–‘আর অন্য বাবুরা? তাদের কী হলো?’ স্বার্থপর দুনিয়ার মিথ্যে খোলসটা মুছে গিয়ে এক লহমায় কেমন যেন নড়বড়ে হয়ে গেল সব। তবে কী, আমরা সবাই শুধুই নিজেদের জন্য?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে নিরাশার সাগরে ডুব দিতে হয়। আমরা এমনই এক সমাজ ও শহর তৈরি করেছি, যেখানে বড় রাস্তার মোড়ে মানুষের মাথা পাথর মেরে ভাঙলেও কেউ টুঁ শব্দটি করে না। রোগী মরিবার পর ডাক্তার আসিবার মতো, সবাই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করা পর্যন্ত অপেক্ষা করে। তা সে সাধারণ জনতাই হোক, বা আইন‑শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। অবশ্য একদম কিছুই যে আমরা করি না, তা না। ভিডিও করি, ছবি তুলি। হয়তো আগামীতে সেলফিও তুলব ব্যাকগ্রাউন্ডে লাশ রেখে।
এহেন রাজধানী নামসর্বস্ব মহানগরীতে (!), যেখানে শিশুদের পর্যাপ্ত খেলার মাঠ থাকে না, অ্যাম্বুলেন্সে রোগীকে হাসপাতালে নেওয়ার পথে যানজটেই কারও কারও মৃত্যু হয়, যেখানে রাতে পরিবার নিয়ে রেস্টুরেন্টে খেতে গিয়ে পরিবারসহ পুড়ে কয়লা হয়ে ফিরতে হয়, যেখানে রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় হুট করে আকাশ থেকে ইট পড়ে প্রাণ চলে যায় কোনো মায়ের বা বাবার বা সন্তানের, যেখানে ডেঙ্গু, ডায়রিয়া–সব রোগই ভয়ঙ্কর রূপে প্রাণহন্তারক হয়ে ওঠে ইত্যাদি ইত্যাদি, সেখানে শিশুদের সুস্থভাবে বেঁচে থাকাটাই একটা অনন্য ঘটনা বটে। তবে সেই অনন্য বিষয়টিকে এখন থেকে হয়তো ‘মিরাকল’ ভাবতে হবে। কারণ, স্কুল‑কলেজের শিশুগুলোকেও যে আমরা বাঁচাতে পারছি না। অপঘাতে তাদের মরতে দিতে হচ্ছে।
এখনও পর্যন্ত পাওয়া তথ্য বলছে, রাজধানীর উত্তরার দিয়াবাড়িতে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর উড়োজাহাজ বিধ্বস্তের ঘটনায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ১৯। আরও অন্তত ৪৮ জনের অবস্থা গুরুতর। এ ছাড়া এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত ১৬৪ জন আহত হয়েছে বলে জানা গেছে। হতাহতদের বেশির ভাগই শিশু। তারা নিজের বাড়ির পরই সবচেয়ে যে নিরাপদ স্থান, সেই স্কুল‑কলেজের ক্লাসরুমে ছিল। অথচ সেখানেই পুড়ে অঙ্গার হতে হলো তাদের।

আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) বলছে, বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর এফটি-৭ বিজিআই যুদ্ধবিমান বিধ্বস্তের আগে এর পাইলট ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মো. তৌকির ইসলাম বিমানটিকে ঘনবসতি এলাকা থেকে জনবিরল এলাকায় নিয়ে যাওয়ার সর্বাত্মক চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত বিমানটি ঢাকার দিয়াবাড়িতে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের দোতালা একটি ভবনে অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনায় বিধ্বস্ত হয়েছে।
এমন ঘটনা অনাকাঙ্ক্ষিত অবশ্যই। এই ঘটনা জনবহুল স্থানে ঘটলে তার ব্যাপকতা কত হবে, তা তৌকিরের চেয়ে ভালো কেউ জানতেন না নিশ্চয়ই। তৌকির নিশ্চয়ই এড়ানোর চেষ্টা করেছিলেন, পারেননি। এরপর আর কী থাকে, হাহাকার ছাড়া!
সেই হাহাকারে স্বর মেলাতে গিয়েই বারবার মনে হচ্ছে–এ কেমন মহানগরী বানালাম আমরা? উত্তর: এমনই এক রাজধানী শহর বানিয়েছি আমরা, যা বাসযোগ্যতার বিচারে বৈশ্বিকভাবে সবচেয়ে খারাপ তিনটি শহরের একটি। ইকোনোমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (ইআইইউ)‑এর ২০২৫ সালের গ্লোবাল লিভেবিলিটি ইনডেক্স অনুযায়ী বিশ্বের বাসযোগ্য শহরের তালিকায় ঢাকা এবার তিন ধাপ পিছিয়েছে, আছে ১৭১তম অবস্থানে। ঢাকার চেয়েও খারাপ অবস্থায় আছে কেবল যুদ্ধবিধ্বস্ত সিরিয়ার রাজধানী দামেস্ক ও লিবিয়ার ত্রিপলি।
অবশ্য, আজ, ২০২৫ সালের ২১ জুলাই যে ঘটনা ঢাকা শহরের বুকে ঘটে গেল, তা সূচকের সিদ্ধান্তকে আর কোনো অজুহাত বা ব্যাখ্যাতেই অস্বীকার বা খারিজ করার জন্য ‘যদি, কিন্তু’ হাজিরের সুযোগ রাখেনি। আমরা স্বাধীনতার ৫০ বছর পরে এসে বলতে বাধ্য হচ্ছি যে, এ দেশের রাজধানী শহর এমনই এক অপরিকল্পনায় সৃষ্ট, যেখানে সকল ধরনের দুর্ঘটনাই ঘটতে পারে। কর্মস্থলের উদ্দেশে বা অন্য কোনো কারণে বাসা থেকে বের হওয়াই যে আমাদের অপঘাতের শেষযাত্রা নয়, তা কোনো কর্তৃপক্ষই নিশ্চিত করতে পারে না। অথচ এই দেশ উন্নয়নের মহাসড়কে দৌড়াচ্ছে–এমন আপ্তবাক্য শুনতে শুনতে দীর্ঘকাল আমাদের কান পচেছে। ঢাকায় বসে সিঙ্গাপুরের গল্প আমরা আগেও শুনেছি, এখনও শুনছি। বলাও হচ্ছে দম্ভভরে। আর দিনশেষে প্রিয় বাবুটার লাশ কোলে নিয়ে এই আমরা, নগরবাসী, সময় গুণছি চোখের জলের অবিরাম বর্ষণ ঠেকানোর। আমাদের ল্যাক্রিমাল গ্ল্যান্ডগুলো শুকিয়ে কাঠ হয় না কেন! আর কত কাঁদব, বলুন দেখি? কতটা কাঁদলে, কতবার পায়ে পড়লে, আপনারা আমাদের, বিশেষ করে আমাদের বাচ্চাদের একটা বাসযোগ্য নগরী দেবেন, বলুন না?

জানি, উত্তর আসবে না। কারণ, ক্ষমতাসীনদের ধর্ম সব কালেই এক। রাজনীতিও এক। সাধারণ জনতা সেখানে খরচযোগ্য উপাদান মাত্র। জনতার কাছে ক্ষমতা থাকে না। থাকে শুধু অন্তহীন হাহাকার, আহাজারি।
বাবুরা, আমাদের মাফ করে দিও…শহর নামের এই নরকে আমরা তোমাদের রেখেছিলাম বলে!
লেখক: উপবার্তা সম্পাদক, ডিজিটাল বিভাগ, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন
[এই মতামত লেখকের নিজস্ব। এর সঙ্গে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পাদকীয় নীতিমালার কোনো সম্পর্ক নেই।]


ক্লাসরুমে বিকট শব্দে বিস্ফোরিত হয় উড়োজাহাজটি
বিধ্বস্ত উড়োজাহাজের পাইলট মারা গেছেন: আইএসপিআর
উড়োজাহাজ বিধ্বস্তে নিহত বেড়ে ১৯, গুরুতর আরও অন্তত ৪৮
