বঙ্গোপসাগরে ডুবে যাওয়া বরগুনার পাথরঘাটার মাছ ধরার ট্রলার ‘এফবি বরকত’-এ চারটি মরদেহ ভাসছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। দুর্ঘটনার চার দিন পেরিয়ে গেলেও এখনো ট্রলারটি উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। সরকারি কোনো বিশেষায়িত উদ্ধারকারী নৌযান না থাকায় স্থানীয়ভাবে দুটি মাছ ধরার ট্রলার নিয়ে তিন দিন ধরে উদ্ধার অভিযান চালাচ্ছে ট্রলার মালিক সমিতি। তবে উত্তাল সাগরের কারণে অভিযান ব্যাহত হচ্ছে। নিখোঁজ জেলেদের মরদেহ উদ্ধারে সরকারি সহায়তা চেয়েছেন স্বজনরা।
জেলে ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত সোমবার দুপুরের দিকে বৈরী আবহাওয়ার কবলে পড়ে উপকূল থেকে প্রায় ১২০ কিলোমিটার দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরে ডুবে যায় পাথরঘাটার ‘এফবি বরকত’ নামের মাছ ধরার ট্রলারটি। এতে ১৩ জন জেলে ছিলেন। দুর্ঘটনার পর অন্য একটি মাছ ধরার ট্রলারের জেলেরা সাগরে ভাসমান অবস্থায় আটজনকে জীবিত উদ্ধার করেন। তবে ট্রলারটি উল্টে যাওয়ায় আরও পাঁচ জেলে নিখোঁজ হন।
নিখোঁজ জেলেদের উদ্ধারে সরকারি কোনো বিশেষায়িত উদ্ধারকারী নৌযান না থাকায় দুটি মাছ ধরার ট্রলার নিয়ে সাগরে অভিযান শুরু করে মৎস্যজীবী ট্রলার মালিক সমিতি। তিন দিন ধরে চেষ্টা চালিয়েও উত্তাল সাগরের কারণে ডুবে যাওয়া ট্রলারটির কাছে যেতে পারছেন না তারা। তবে ঢেউয়ের তোড়ে ট্রলারটির ভেতর থেকে বেরিয়ে আসা এক জেলের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।
এদিকে ট্রলারের ভেতরে থাকা নিখোঁজ জেলেদের ভাগ্যে কী ঘটেছে, তা নিয়ে উৎকণ্ঠায় রয়েছেন স্বজনরা। অন্তত চার জেলের মরদেহ উদ্ধার করে পরিবারের কাছে হস্তান্তরের দাবি জানিয়েছেন তারা। একই সঙ্গে দ্রুত নৌবাহিনীর জাহাজসহ সরকারি উদ্ধারকারী নৌযান পাঠিয়ে অভিযান জোরদারের দাবি জানিয়েছেন স্বজনরা।
নিখোঁজ নুর আলম মোল্লার বাবা জাহাঙ্গীর মোল্লা বলেন, ‘আমার বড় ছেলে সাগরে ট্রলার ডুবে নিখোঁজ রয়েছে। ধারণা করছি, ট্রলারের কেবিনের মধ্যে আটকে পড়ে মারা গেছে। যারা উদ্ধার করতে গেছে, তাদের মাধ্যমে জানতে পারছি, কেবিনটি এখনো অক্ষত আছে। তাই মরদেহ কেবিনের মধ্যেই আছে। সরকারের কাছে দাবি জানাই, নৌবাহিনী পাঠিয়ে আমার ছেলের মরদেহ উদ্ধার করে আমাদের কাছে হস্তান্তর করা হোক।’
স্থানীয় জেলেদের অভিযোগ, জীবন বাজি রেখে সাগরে মাছ শিকার করে দেশের মানুষের মাছের চাহিদা পূরণ করছেন তারা। এ খাত থেকে সরকারও বিপুল রাজস্ব পায়। অথচ সাগরে কোনো ট্রলার দুর্ঘটনার শিকার হলে উদ্ধারে সরকারি কোনো বিশেষায়িত নৌযান পাওয়া যায় না। বাধ্য হয়ে ঝুঁকি নিয়ে ছোট মাছ ধরার ট্রলার দিয়েই উদ্ধার অভিযানে নামতে হয় জেলেদের। এতে উদ্ধার করতে যাওয়া ট্রলার ও জেলেদের জীবনও নতুন করে ঝুঁকির মুখে পড়ে।
বরগুনার পাথরঘাটা এলাকার জেলে মো. আল আমিন, রহিম মাঝি, আজিজ হাওলাদার ও মোহাম্মদ কামাল হোসেনসহ অনেক জেলে জানান, বরগুনাসহ উপকূলীয় এলাকার লাখ লাখ জেলে বঙ্গোপসাগরে মাছ শিকার করেন। জেলেরা সরকারকে শত শত কোটি টাকা রাজস্ব দেন। অথচ তাদের জীবন সুরক্ষায় সরকারের উল্লেখযোগ্য কোনো কার্যক্রম নেই। সাগরে জেলেদের ট্রলার ডুবে গেলে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে নিয়মিত উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করা হয় না।
তারা আরও বলেন, প্রতিবেশী ভারতের কোনো জেলে বা ট্রলার সাগরে ডুবে গেলে দেশটির সরকার হেলিকপ্টার ও নৌবাহিনীর উদ্ধারকারী নৌযান দিয়ে উদ্ধার অভিযান চালায়। অথচ বাংলাদেশের জেলেদের উদ্ধারে সরকারের কার্যকর কোনো উদ্যোগ দেখা যায় না। তাহলে কি সরকার আমাদের মানুষই মনে করে না?
ট্রলার মালিক সমিতির নেতারা জানান, বঙ্গোপসাগরে প্রায়ই ট্রলারডুবির ঘটনা ঘটে। দুর্ঘটনার শিকার জেলে ও ট্রলার উদ্ধারে দীর্ঘদিন ধরে সরকারের কাছে একটি আধুনিক উদ্ধারকারী নৌযানের দাবি জানিয়ে আসছেন তারা। বিভিন্ন সময়ে আশ্বাস মিললেও এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। ফলে প্রতিবারই নিজেদের ট্রলার নিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ উদ্ধার অভিযানে নামতে হচ্ছে তাদের।
বাংলাদেশ মৎস্যজীবী ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি গোলাম মোস্তফা চৌধুরী বলেন, সাগরকেন্দ্রিক অর্থনীতির চাকা সচল রাখছেন জেলেরা। তাদের জীবন রক্ষায় বঙ্গোপসাগরে দ্রুত একটি আধুনিক ও বিশেষায়িত উদ্ধারকারী নৌযান মোতায়েন করা প্রয়োজন। তিনি বলেন, সম্প্রতি ডুবে যাওয়া ট্রলারটি উদ্ধারের জন্য ট্রলার মালিক সমিতি দুটি মাছ ধরার ট্রলার ঘটনাস্থলে পাঠিয়েছে। তিন দিন ধরে তারা ট্রলারটি উদ্ধারের চেষ্টা করছেন। তবে সাগর উত্তাল থাকায় ডুবে যাওয়া ট্রলারের কাছে ভিড়তে পারছেন না। তাই নিখোঁজ জেলেদের উদ্ধারে দ্রুত নৌবাহিনীর জাহাজসহ সরকারি উদ্ধারকারী নৌযান পাঠানোর দাবি জানিয়েছেন তিনি।
এ বিষয়ে জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ জিয়া উদ্দিন জানান, বরগুনার লক্ষাধিক জেলে সাগরে মাছ শিকার করেন। দুর্ঘটনা হলে তাদের উদ্ধারের জন্য অনেক আগেই জেলায় একটি উদ্ধারকারী নৌযান থাকা উচিত ছিল। তিনি বলেন, একটি উদ্ধারকারী নৌযানের জন্য খুব শিগগিরই মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হবে। পাশাপাশি, এখনো সমুদ্রে নিখোঁজ জেলেদের উদ্ধারে নৌবাহিনীর সহযোগিতা নিতে তাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হচ্ছে।



