এ দেশে ঘটনার কোনো শেষ নেই। প্রতিদিন পত্রিকার পাতা খুললেই চোখে পড়ে শত শত ঘটনা। কেউ হয়তো সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যাচ্ছে, কেউ–বা আত্মহত্যা করছে, নতুবা নির্যাতন, সহিসংতায় মারা যাচ্ছে। প্রতিদিন মৃত্যুর খবরের ভিড়ে মানুষ হারিয়ে ফেলছে নিজেকে।
যেকোনো মৃত্যুই অপ্রত্যাশিত। তবে সবচেয়ে বেশি আহত করে বোধ হয়—কোনো তাজা প্রাণ আত্মহত্যার পথ বেছে নিলে। এই এক সিদ্ধান্তের সাথে জড়িয়ে থাকে হাজারটা প্রশ্ন। আত্মহত্যার কারণ খুঁজতে গিয়ে সামনে আসে নানা শব্দ—অভিমান, নির্যাতন, অপমান ইত্যাদি। একইসঙ্গে প্রশ্ন ওঠে—মানুষ কেন আত্মহত্যা করে? কেন এই মৃত্যু? অনেক সময়ই দেখা যায় আত্মহত্যা ও হত্যার পেছনে এক সূক্ষ্ম পর্দা ঝুলছে। শোনা যায়—আত্মহত্যায় প্ররোচনার মতো অভিযোগও।
এ তো জানা কথাই যে, যে পরিবারের কেউ আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়, বা যার নিকটজন হারায় সেই বোঝে হারানোর বেদনা। কিন্তু কিছু কিছু মৃত্যু আশপাশের সবাইকে নাড়িয়ে দিয়ে যায়। প্রশ্ন ওঠে—কোন পরিস্থিতিতে মানুষ এই ধরনের সিদ্ধান্ত নিতে পিছ পা হচ্ছেন না। বা আদৌ তিনি আত্মহত্যা করেছেন কিনা? নাকি তাঁর এই মৃত্যুর পেছনে অন্য কোনো কারণ লুকিয়ে আছে।
এমন একটি ঘটনা ঘটেছে গত ১৮ নভেম্বর টাঙ্গাইল শহরে। সেদিন ধর্ষণের মামলা করা এক কিশোরীর (১৭) ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পৌরসভার বোয়ালী এলাকার বাসা থেকে উদ্ধার করা হয় সেই মরদেহ। ঘটনা একটু খতিয়ে দেখলে জানা যায়, এলাকার প্রভাবশালী এক নেতার বিরুদ্ধে গত ৫ এপ্রিল সেই কিশোরী ধর্ষণের মামলা করে। মামলায় ভুক্তভোগী নিজেকে অন্তঃসত্ত্বা বলেও উল্লেখ করে। গত ১৮ নভেম্বর সেই ভুক্তভোগী কিশোরীর মৃত্যুর পর পরিবারের পক্ষ থেকে ভুক্তভোগীর বোন (লুনা মির্জা) একটি মামলা করেন।
এবার ঘটনার পেছনের দিকে ফিরে তাকানো যাক। মৃত্যুর আগে কিশোরীর করা মামলায় অভিযোগ করা হয়, ভাইয়ের সঙ্গে সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ হয়। এই বিরোধ বাড়তে থাকায়, সে সম্পর্কে ওই কিশোরী বিষয়টি এলাকার গোলাম কিবরিয়াকে জানায়। এতে কিবরিয়া বিষয়টি দেখবেন বলে আশ্বাস দেন। এই আশ্বাসের পরিপ্রেক্ষিতে কথা বলার জন্য গত ১৭ ডিসেম্বর শহরের আদালত পাড়ায় নিজের বাড়ির পাশের একটি ভবনে ওই কিশোরীকে আসতে বলেন কিবরিয়া। সেখানে তিনি কিশোরীকে ধর্ষণ করেন ও আপত্তিকর ছবি তুলে রাখেন। পরে আপত্তিকর ছবি অনলাইনে ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়েও বেশ কয়েকবার ধর্ষণ করেন। একপর্যায়ে সে অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়ে। বিষয়টি গোলাম কিবরিয়া জানার পর গর্ভপাতের জন্য চাপ দেন। এতে কিশোরী রাজি হয়নি।
এ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে গত ৬ এপ্রিল আদালতে ২২ ধারায় জবানবন্দি দেন ভুক্তভোগী। পরে গোলাম কিবরিয়ার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়। মামলায় গোলাম কিবরিয়া উচ্চ আদালত থেকে অন্তর্বর্তীকালীন জামিন পান। পরে নিম্ন আদালতে হাজির হলে আদালত তাঁকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।
ঘটনা এখানেই শেষ হয়নি। গত ৩০ জুন টাঙ্গাইল শহরের একটি বেসরকারি ক্লিনিকে ভুক্তভোগী নারী পুত্র সন্তানের জন্ম দেন। কিন্তু প্রমাণ না হওয়ায় আদালত গত ৯ অক্টোবর গোলাম কিবরিয়াকে ১১ জুলাই উচ্চ আদালতের দেওয়া জামিন বহাল রাখেন। এর পর গত ১৮ নভেম্বর সেই ভুক্তভোগী কিশোরীর মৃত্যু হয়।
এলাকার সূত্রে জানা যায়, গোলাম কিবরিয়া জেলা বাস–মিনিবাস মালিক সমিতির মহাসচিব। তিনি টাঙ্গাইল-২ আসনের সংসদ সদস্য তানভীর হাসান ওরফে ছোট মনিরের ভাই।
শুধু টাঙ্গাইলের ওই কিশোরীর ক্ষেত্রে এই ঘটনা ঘটেনি। নারী নির্যাতনের পরিসংখ্যান দেখলে জানা যায়, এ দেশে নারীরা প্রতিনিয়ত ধর্ষণের শিকার হচ্ছেন। মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) এক পরিসংখ্যানে জানা যায়, জানুয়ারি থেকে অক্টোবর মাস পর্যন্ত বাংলাদেশে ৫০৩টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে দলবদ্ধভাবে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ১১৬ জন, এবং ৩৩ জন নারীকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে।
এ ছাড়া বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, গত অক্টোবর মাসে ৯১ জন কন্যা এবং ১২০ জন নারী নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ২৭ কন্যাসহ ৪০ জন। এর মধ্যে ৮ কন্যাসহ ১০ জন দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন, যার মধ্যে এক কন্যাকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। এ ছাড়া ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে ৭ কন্যাসহ ১১ জনকে।
আসক আর মহিলা পরিষদের পরিসংখ্যান থেকে ধারণা করা যায়, ধর্ষণ এই সমাজে মহামারি আকার ধারণ করেছে। তাই বলা যায়, শুধু টাঙ্গাইলের একা কিশোরীই নয়। এ দেশে অহরহ ঘটছে ধর্ষণের ঘটনা। এসব ঘটনার ক্ষেত্রে অনেক সময় এলাকার প্রভাবশালীরা জড়িত থাকেন। তাই প্রাণের ভয়ে অনেকেই প্রতিবাদ করেন না। অথচ এ ধরনের ঘটনায় প্রয়োজন দিনাজপুরের ইয়াছমিন হত্যার বিরুদ্ধে আন্দোলনের মতো সামাজিক প্রতিরোধ। এতে অপরাধীরা ভয় পাবে। আর পরবর্তীতে এই ধরনের জঘন্য কাজের আগে দশবার ভাবনা–চিন্তা করবে। কিন্তু আমাদের দেশে এমন আন্দোলনের সংখ্যা খুব কম। তাই অপরাধীরা বারবার মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে।
বোনের মৃত্যুর পর ভুক্তভোগীর বোন বাদী হয়ে আত্মহত্যা প্ররোচনার অভিযোগ এনে আরেকটি মামলাটি করেন। মামলায় ভুক্তভোগীর ভাই ও সৌরভ নামের একজনকে আসামি করা হয়। ধর্ষণের এই মামলা টাঙ্গাইলের পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) তদন্ত করছে।
ভুক্তভোগীর বোন ইন্ডিপেনডেন্ট টেলিভিশনকে বলেন, ‘আমার বোনের সঙ্গে আসলে কী হয়েছে আমি সঠিকভাবে জানি না। আমি ঢাকায় থাকি। বোনের মৃত্যুর খবর শুনে গ্রামে গেছি। আমার বোনের এবং ভাইয়ের ঘরের আশপাশে অনেক সিসিটিভি (ক্যামেরা) ছিল। আমি গ্রামে পৌঁছানোর আগেই প্রশাসনের লোকেরা সব সিসিটিভি ক্যামেরা খুলে নিয়ে গেছে। আমি নিজের চোখে এই সিসিটিভির ফুটেজ দেখতে চাই। আমার বোন কি আসলেই আত্মহত্যা করেছে, নাকি তার সঙ্গে খারাপ কিছু ঘটেছে, তা আমি জানতে চাই। আমার বোনের পাঁচ মাসের ফুটফুটে একটা সন্তান আছে। তাকে ছেড়ে আমার বোন মরে যেতে পারে না।'
এই ঘটনায় ভুক্তভোগীর বোনের পক্ষ থেকে যে মামলা করা হয়, সেই মামলার এক আসামি ভুক্তভোগীর ভাই। ভাইকেও সন্দেহ করেন মামলার বাদী। ওই ভাই ঘটনার পর থেকে পলাতক। ভাইয়ের বিষয়ে ভুক্তভোগীর বোন বলেন, ‘এই ঘটনার পর আমার ভাই পলাতক। যে ভাইয়ের বোনের দুঃখের দিনে সবার আগে থাকা দরকার ছিল, সেই ভাই আজ পালিয়ে বেড়াচ্ছে। জানি না আমার বোনের সঙ্গে কী ঘটেছে। কেন আমার বোনের এমন মৃত্যু হলো। আমার বোনের সন্তানকে আমি মানুষ করব। যত সমস্যা হোক না কেন আমি তাকে বড় করব। আমি এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দোষীদের উপযুক্ত শাস্তি চাই।’
নির্যাতন-নিপীড়নের শিকার নারীরা যখন কারও কাছে সহযোগিতা পান না, তখন তারা জীবনের কঠিন সময় পার করেন। এ সময় পাশের মানুষকে মানবিক হতে হয়। তাহলে ভুক্তভোগীরা ভুল কোনো সিদ্ধান্ত নেয় না বলে মনে করেন সমাজ বিশ্লেষকেরা।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম বলেন, ‘মানুষের জীবনে অস্থিরতা বাড়ছে। বিষণ্ণতার চরম পর্যায়েও মানুষ আত্মহননের পথ বেছে নেয় কখনো কখনো। এই বিষণ্ণতা বাড়ার কারণ হলো, তার যে চাহিদা তা পূরণ হচ্ছে না। ব্যক্তি ও সমাজজীবনের অস্থিরতা মানুষকে ক্ষেত্রবিশেষে আত্মহননের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। জীবনের কোনো পরিস্থিতিতে এসে মানুষ এমন কঠিন সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, তা আরও ভালোভাবে চিহ্নিত করা দরকার। পাশাপাশি এও জানতে হবে যে, ঘটনাটি আদৌ আত্মহত্যা ছিল কিনা? নাকি অন্য কোনো কারণে এই মৃত্যু হয়েছে। এই আত্মহত্যা বা মৃত্যুর পেছনে যদি কেউ যুক্ত থাকেন, তবে তাকে আইনের আওতায় আনতে হবে।’
ডা. ফওজিয়া মোসলেম বলেন, নারী নির্যাতনের অনেক ঘটনায় প্রভাবশালীদের আধিপত্যের কারণে অপরাধীরা শাস্তি পাচ্ছে না। এ ক্ষেত্রে সামাজিক আন্দোলন বা প্রতিরোধ হলে অপরাধীরা ভয় পাবে। তা না হলে বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণে অপরাধীরা ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে যাবে। টাঙ্গাইলের ঘটনাটা আত্মহত্যা কিনা এখনো সঠিকভাবে বলা যাচ্ছে না। পোস্টমর্টেম রিপোর্ট এলে জানা যাবে—ভুক্তভোগীর সঙ্গে কী ঘটেছে। যদি আত্মহত্যা করে থাকে, তাহলে বলতে হবে সমাজের সামগ্রিক পরিস্থিতি তাকে আত্মহত্যা করতে প্ররোচিত করেছে। এই অপরাধ আর কাউকে খুন করার অপরাধের খুব একটা পার্থক্য নেই। প্রভাবশালীদের কারণে সমাজে মানুষ ন্যায়বিচার পাচ্ছে না। এর কারণ হচ্ছে এ দেশে সুশাসনের অভাব রয়েছে। এই সুশাসনের অভাবের কারণ হচ্ছে প্রভাবশালীদের প্রভাব আর ক্ষমতার অপব্যবহার। এই ধরনের ঘটনার ন্যায়বিচারের জন্য সামাজিক প্রতিরোধ বা আন্দোলন গড়ে তোলা ছাড়া বিকল্প কোনো রাস্তা নেই। এর পাশাপাশি আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। ক্ষমতা দখলের রাজনীতি থেকে বের হয়ে আসতে না পারলে সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হবে না। তা না হলে এই ধরনের ঘটনা ঘটতেই থাকবে।


বড় মনিরের বিরুদ্ধে ধর্ষণ মামলা: বাদীর মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় আরেক মামলা
বড় মনিরের বিরুদ্ধে ধর্ষণ মামলা করা নারীর মরদেহ উদ্ধার
যে কারণে নারীদের মধ্যে আত্মহত্যার ভাবনা আসে
শিক্ষার্থীদের মধ্যে আত্মহত্যা প্রবণতা বাড়ছে, কিন্তু কেন?
