শেষ হাসি কে হাসবে মোদি না আরএসএস?

আপডেট : ২৪ নভেম্বর ২০২৪, ০৯:১৫ পিএম

আর এক বছর বাদে রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘ (আরএসএস) এক শ বছরে পা দেবে। তবে আরএসএসের প্রধান মোহন ভগবত বলেছেন, শতবর্ষ পালনে তাঁরা ঢাকঢোল পিটিয়ে কোনো অনুষ্ঠান করবেন না। কী আশ্চর্য, এই সুদীর্ঘ সময় পাড়ি দেওয়ার পরে সংঘ প্রধানের মুখে এত বিমর্ষ বাণী কেন? অথচ এমন সুদিন তো গত এক শ বছরে তাদের আসেনি। তাদের রাজনৈতিক শাখা বলে পরিচিত বিজেপি গত ১০ বছর ধরে ভারতের ক্ষমতায়। আর একদা সংঘের প্রচারক নরেন্দ্র মোদি দোর্দণ্ড প্রতাপের সাথে রাজত্ব করে আসছেন ভারতে। বিরোধীরা, এমনকি দলে বা জোটে কোথাও কোনোভাবে কলকে পাচ্ছে না।

আরএসএসের প্রেসক্রিপশন মতো কাশ্মীরে ৩৭০ ধারা বিলোপ করেছে মোদি সরকার। অযোধ্যায় বাবরি মসজিদের জায়গায় রামমন্দির হয়ে গেছে (যদিও নির্মাণ সম্পূর্ণ হয়নি)। আরও কত কিছু সামনে আছে। এ সময় বিজেপির পিতৃসংগঠন আরএসএস এমন গোস্বা করে বসে আছে কেন? নরেন্দ্র মোদির তৃতীয়বারের মতো ক্ষমতায় আসাটা কি আরএসএস নেতৃত্বের ভালো লাগেনি বা লাগছে না?

আসলে শুধু লোকসভার ভোট হলেও চলছে নানা হিসাব-নিকাশ। বিশেষ করে বিজেপি ও আরএসএস-এর মধ্যে। কারণ এখন তাদের সবটাই প্রাপ্তি। বিজেপি ২০২৪-এর লোকসভা নির্বাচনের আগে কী কী করেছে দেখা যাক: এক. নির্বাচনে জয়ী হওয়া তিন রাজ্যে (রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ, ছত্তিশগড়) নতুন মুখ্যমন্ত্রী নিয়োগ দিয়েছে। বাদ দেওয়া হয়েছে পরীক্ষিত নেতাদের। এর মধ্যে হরিয়াণার মুখ্যমন্ত্রী মনোহর লাল খট্টরও আছেন। এদের জায়গায় যাদের নিয়ে আসা হয়েছে, তাঁরা ‘করে নাকো ফোঁসফাঁস, মারে নাকে ঢুসঢাস’। আরএসএস-এর কারও সাথে এ নিয়ে কোনো আলোচনা করা হয়নি।

মোদি-নড্ডা-শাহ–এই ত্রয়ী সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। দুই. গত ১০ বছরে মোদি আরএসএসের কর্মকর্তাদের সাথে আলোচনার বা সংগঠনের সদর দপ্তর নাগপুরে যাওয়ার সময় পাননি। অর্থাৎ, পুরোটা সময়জুড়েই ছিল উপেক্ষা। তিন. এবারের লোকসভা নির্বাচনে এক-তৃতীয়াংশকে টিকিট দেওয়া হয়নি। এর মধ্যে বহু পরীক্ষিত আরএসএস কর্মী আছেন, যারা নিজের জোরে এলাকা থেকে জিতে আসতে পারতেন। এদেরকে দ্বিতীয় ধাক্কায় ছেঁটে ফেলে আরএসএস-এর শক্তি দলে সীমিত করার ব্যবস্থা করা হয়েছে। চার. অন্য দল (পড়ুন ৮০ শতাংশ কংগ্রেস) থেকে আসা নেতাদের প্রধান্য দিয়ে নির্বাচনে টিকেট দেওয়া হয়েছে। এটা কখনোই আরএসএস-এর কাছে কাঙ্ক্ষিত না। কারণ ১৯৮০ সালে যখন প্রথম বিজেপি নাম দিয়ে নতুন দল খোলার সিদ্ধান্ত নেয় আরএসএস, তখন এর স্লোগান ছিল পার্টি উইথ এ ডিফারেন্স বা অন্য দলের চেয়ে আলাদা। দিয়েছিলেন কে আর মালকানি। আসলেই আলাদা ছিল বিজেপি, অনেকটা বামপন্থীদের মতো। ঢুকেই এ দলে নেতা হওয়া যেত না। নিচ থেকে উঠে আসতে হতো। মোদি-শাহ জমানায় সে পাট লাটে উঠেছে। এ নিয়েও বিজেপিতে হতাশা আছে, বিশেষ করে যারা আরএসএসে কাজ করে ধীরে ধীরে বিজেপিতে জায়গা করে নিয়েছিলেন। 

এবারের নির্বাচনে বড় কোনো ইস্যু না থাকা সত্ত্বেও বিজেপি এসব বড় বড় সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যার সম্পর্কে তাদের পিতৃসংগঠন আরএসএস কিছুই জানে না। বাজপেয়ি-আদবানি জমানার বিজেপি যে সাহস দেখাতে পারেনি, সেটাই করেছেন নরেন্দ্র মোদি। কেন মোদির এই সাহস, এটা বুঝতে হলে আরএসএস-এর গঠনটা একটু জানা দরকার। আরএসএস সারা ভারতের হিন্দুদের কথা বললেও এটা মূলত মহারাষ্ট্র-ভিত্তিক একটি সামাজিক ও ধর্মীয় সংগঠন।

১৯২৫ সাল থেকে এ পর্যন্ত আরএসএস-এর যারা প্রধান হয়েছেন, তাঁদের প্রায় সবাই মারাঠা ব্রাহ্মণ। শুধু রাজেন্দ্র সিং বা রাজ্জু ভাইয়া ছিলেন উত্তর প্রদেশের এবং ঠাকুর সম্প্রদায়ের। ফলে ওই সংগঠনে মারাঠি একাধিপত্য ভাঙতে মোদি-শাহরা সক্রিয়—অবস্থাদৃষ্টে এমনটাই মনে হচ্ছে। না হলে বিজেপি সভাপতি জেপি নড্ডা বলতে পারতেন না যে, বিজেপি এখন যথেষ্ট সাবালক হয়েছে, নির্বাচনে জিততে তাদের আরএসএস-এর কোনো প্রয়োজন নেই। এটা নড্ডার মুখ ফসকে বেরোনো কোনো কথা বলে ভাবাটা ঠিক হবে না।

মোদি জমানায় বিজেপি যেভাবে চলেছে, আর কখনোই সেভাবে দলটি চলেনি বা চালানো হয়নি। বিজেপির সর্বোচ্চ কার্যনিবাহী পরিষদের সভায় নিয়মিত তর্ক-বিতর্ক হতো। মন খুলে কথা বলতে কেউ দুবার ভাবতেন না। কারণ, সবাই জানতেন তর্ক-বিতর্ক ভালোর জন্যই হচ্ছে এবং একটা সিদ্ধান্ত হলে তা সবাই মেনে নেবেন। সেক্ষেত্রে বৈঠকের এই বিষয়-ভিত্তিক বিবাদের কথা কেউ মনে রাখতেন না। রাম এখন অযোধ্যায় অধিষ্ঠিত হয়েছেন, কিন্তু সেসব দিন মোদি জমানায় অস্তমিত। সম্প্রতি দলের জাতীয় কার্যনির্বাহী পরিষদের দুদিনের বৈঠক বসে। মোদি দুদিনই বক্তব্য রাখেন।

আর বৈঠকে দলের পক্ষ থেকে ১১ পৃষ্ঠার যে রাজনৈতিক প্রস্তাব নেওয়া হয়, সেখানে ৮৪ বার মোদির নাম উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ, পুরোটাই মোদিময়। মোদি যে বিজেপিকে ছাপিয়ে গেছেন, সে অনেক পুরোনো কথা। ভারতে এখন দল বিজেপির চেয়ে ব্যক্তি মোদির মহিমা অনেক উজ্জ্বল। সেখানে আর সবই ম্রিয়মান। আরএসএস ছিল এর সর্বশেষ সংযোজন। মোহন ভগবতের নেতৃত্বে আরএসএসের ক্ষয় আসলেই ছিল চোখে পড়ার মতো। মোদির ক্রমবর্ধমান প্রচারের ঔজ্জ্বল্যে, মহিমায় তাঁরা ঢাকা পড়ে গেছেন। রামমন্দিরের উদ্বোধনে মোদি আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন বলেই মোহন ভগবত অনুষ্ঠানে থাকতে পেরেছিলেন। কিন্তু পূজার কোনো আনুষ্ঠানিকতায় তাঁর স্থান হয়নি। আসলে মোহন ভগবত বুঝতেই পারেননি কবে যে হিন্দুত্বের সদর দপ্তর নাগপুর থেকে দিল্লিতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে স্থানান্তর হয়ে গেছে। 

সে কারণে মোদি ও তাঁর আস্থাভাজন নেতারা মোহন ভগবতকে এটা ঠারে ঠারে বুঝিয়ে দিতে ব্যস্ত যে, অনেক হয়েছে আপনি আপনার জায়গায় থাকুন। এক্ষেত্রে বিজেপি সভাপতি জেপি নড্ডার কথা বলা দরকার। সভাপতি হিসেবে তাঁর বর্ধিতকাল চলছে। এ জন্য আরএসএসের কোনো অনুমতি নেওয়া হয়নি। নড্ডা নিজের রাজ্য হিমাচল প্রদেশে দলকে হারিয়েছেন। তাঁকে মেয়াদের বেশি সভাপতি রাখাটা দলের অতীতের সাথে মেলে না। নাগপুর চেয়েছিল, রাজনাথ সিংকে সভাপতি করতে। কিন্তু মোদি-শাহর ইচ্ছা যেখানে শেষ কথা, সেখানে অন্য কিছু তো খাটে না। আরএসএস-এর ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত মারাঠি নেতা নিতিন গড়কড়িকে দলে ও সরকারে একঘরে করে রাখা হয়েছে। গড়কড়ির দুটি দোষ—আরএসএ-এর পছন্দের এবং মারাঠা হওয়া।

এ অবস্থায় জেপি নড্ডা যখন বলেন, বিজেপি এখন স্বাধীন। বাবার হাত ধরে চলার কোনো দরকার নেই। তখন এ মন্তব্য বিস্ফোরক বলেই মনে হয়। কারণ আর কেউ নন, কথাটা বলছেন বিজেপি সভাপতি। যে দলটাকে ১৯৮০ সাল থেকে কোলেপিঠে বড় করে তুলেছে আরএসএস। পাশাপাশি কথা বলার সময়টা খেয়াল করুন। ২০২৪-এর লোকসভা নির্বাচন চলার মাঝে এবং যখন অভিযোগ উঠেছে, আরএসএস-এর মাঠপর্যায়ের নেতা-কর্মীরা বিজেপির হয়ে মাঠে নামেননি। আরও অভিযোগ ছিল, আরএসএস মোদিকে আর পছন্দ করছে না। তখনই নড্ডা মুখ খুলে দলের লায়েক হওয়ার কথা জানালেন। 

আসলে নড্ডার এই ঘোষণাকে অনেকে ভার্চ্যুয়াল স্বাধীনতা ঘোষণা বলে বর্ণনা করছেন। আসল ঘোষণা তো আসবে ৪ জুনের পর। তবে তিনি এই ঘোষণার মধ্য দিয়ে চলমান মিথ ভেঙে দিয়েছেন যে, বিজেপি ও আরএসএস এক সুতোয় গাঁথা। হয়তো ছিল। কিন্তু এখন দাবি করা শক্ত। হবেই তো। ২০১৩ সালের সেপ্টেম্বরে মোদিকে বিজেপির প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী হিসেবে অনুমোদন দিয়েছিল আরএসএস। অথচ প্রধানমন্ত্রী হয়ে আরএসএস সদর দপ্তরে গিয়ে সংগঠনের প্রয়াত নেতাদের প্রতি সম্মান জানানোর সৌজন্য পর্যন্ত তিনি দেখাননি। ছিল না কোনো কতৃজ্ঞতা। ছিল ও আছে শুধুই উদাসীনতা। 

আরএসএসের প্রধান মোহন ভগবত। ছবি: রয়টার্সমোদি আরএসএস-এর হিন্দুত্ববাদী অনেক এজেন্ডা বাস্তবায়ন করেছেন। তাতে সংগঠনটির খুশি থাকার কথা। কিন্তু সংগঠনের মূল আদর্শগত কাঠামো ধরে টান দেওয়ায় এই খুশি আর খুশি থাকছে না তাদের কাছে। যে কারণে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকায় জেপি নড্ডার সাক্ষাৎকার ছাপার পরপরই মুখ খোলেন মোহন ভগবত। নাগপুরে এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ভারত যে আজ এত দূর এসেছে, তার পেছনে জওহরলাল নেহরু, ইন্দিরা গান্ধীসহ কংগ্রেস নেতাদের অনেক অবদান আছে। এর মধ্য দিয়ে মোহন ভগবত বুঝিয়ে দিয়েছেন মোদি ও তাঁর সতীর্থরা উন্নয়নের রামায়ণ থেকে যতই কংগ্রেসকে বাদ দিন না কেন, তিনি সেটা মানছেন না।

আসলে মানা–না মানা সবকিছু নির্ভর করছে ৪ জুন নির্বাচনের ফলের ওপর। যদি একক প্রচেষ্টায় মোদি আবার ক্ষমতায় আসতে পারেন, তাহলে বিজেপি ও আরএসএস-এর মধ্যে বিচ্ছেদ পাকাপাকি হয়ে যাবে। অন্যদিকে মোদি ক্ষমতায় ফিরতে না পারলে, শেষ হাসি আরএসএসই হাসবে। বিজেপিও ফিরবে তার নিয়ন্ত্রণে। এখন দেখা যাক, কূটচালে নরেন্দ্র মোদি ও মোহন ভগবত–কে কাকে হারাতে পারেন।

লেখক: নির্বাহী সম্পাদক, ডিজিটাল মিডিয়া, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন

[এই মতামত লেখকের নিজস্ব। এর সঙ্গে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পাদকীয় নীতিমালার কোনো সম্পর্ক নেই।]

আরও পড়ুন:

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি দীর্ঘদিন ধরেই একটি মৌলিক নীতির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। আর তা হলো ‘সব দেশের সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়।‘ কিন্তু বৈশ্বিক ভূরাজনীতির পরিবর্তন, ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে শক্তির...
আমি বলছি না যে সাক্ষাৎকার নেওয়া সাংবাদিক বা সংবাদমাধ্যমগুলো ঘুষ খেয়েছে। কিন্তু যে জনসংযোগ–লবিং প্রতিষ্ঠান এত নিখুঁতভাবে এই প্রচার অভিযান সাজিয়েছে, বর্ণনা নিয়ন্ত্রণ করেছে, তারা নিশ্চয়ই মোটা...
ভারতের সঙ্গে ৫৪টি আন্তঃসীমান্ত নদী ভাগাভাগি এ অঞ্চলের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ও ন্যায্য পানি–অধিকারের প্রশ্নকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। কিন্তু দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক টানাপড়েন, ক্ষমতার অসমতা এবং...
নেপালসহ দেশে দেশে সরকার পতন ও এরপরের ‘খিচুড়ি’ হয়ে যাওয়া পরিস্থিতিতে সেসব অভ্যন্তরীণ সমস্যাগুলো না হয় ‘ডাল’ আর ‘চাল’-এর ভূমিকা নিয়েছে। আগুন হিসেবে কাজ করেছে জেন জি-র ক্ষোভ। কিন্তু খিচুড়ি রান্নার...
পথসভায় জাতীয় নাগরিক পার্টির মূখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, সরকার অটো পাসের মতো করে সরকার চালাতে চায়। আবু সাঈদের রক্তের উপর দাঁড়িয়ে জনগণের সেবা না করে, বাংলাদেশে আর কাউকে অটো পাসের...
কারা অধিদপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক জান্নাত-উল-ফারহাদ জানান, গত বৃহস্পতিবার গাজীপুরের কাশিমপুর মহিলা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে মোছা. রিম্পা নামের এক নারী বন্দি পালিয়ে যান। রোববার তাকে মোহাম্মদপুর থেকে...
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে পাসপোর্ট থেকে বাদ দেওয়া ‘ইসরায়েল ব্যতীত’ (Except Israel) শব্দগুচ্ছ আবারও যুক্ত হচ্ছে। আজ রোববার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক আদেশে এ তথ্য জানা গেছে। এ ছাড়া নতুন...
আগামী বছর যেসব নতুন এয়ারক্রাফট যুক্ত হবে, সেগুলোতে থাকবে ওয়্যারলেস স্ট্রিমিং, ইন-ফ্লাইট ইন্টারনেট এবং প্রতিটি সিটে মোবাইল চার্জিং সুবিধা। পৃথিবীর অনেক এয়ারলাইন্স যেখানে এই সেবার জন্য অতিরিক্ত...
লোডিং...

এলাকার খবর