এক্সিট পোল কতটা বিশ্বাসযোগ্য

আপডেট : ২৪ নভেম্বর ২০২৪, ০৯:১৩ পিএম

ভারতে বুথফেরত ভোটারদের মতামতের ভিত্তিতে সমীক্ষা বা এক্সিট পোলের ফল ইতিমধ্যে প্রকাশিত হয়েছে। এই হিসাব অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে বিজেপি তৃতীয়বারের মতো ভারতে সরকার গঠন করতে চলেছে। ভারতের সবকটি গণমাধ্যম ও তাদের সহযোগী জরিপকারী সংস্থা যেভাবে প্রায় একই ফল দিয়েছে, তাতে মোদি হারতে পারেন—এমন কথার ওপর আস্থা রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। তারপরেও এর মধ্যে এত এত ‘কিন্তু’ আছে।

এই জনমত জরিপ নতুন কিছু নয়। সারা বিশ্বে নিয়মিত হয়ে থাকে। প্রেসিডেন্ট বাইডেনের সর্দি হলে আমেরিকার অবস্থা কতটা গুরুতর হতে পারে, এ নিয়ে জরিপ চলে। এই জরিপকে আবার একটা বিজ্ঞানসম্মত হিসাব বা ধারণা বলে বেশ জোরেশোরে প্রচার চলে। পরে মিলল কী, না-মিলল এ নিয়ে কেউ খুব একটা মাথা ঘামায় না। এর কারণই হলো, আমরা সবাই অজানা ভবিষ্যৎ সম্পর্কে জানতে অতীব আগ্রহী। বিশেষ করে সেটা যদি অনতিদূরের হয়। যে কারণে কোনো ভবিষ্যৎ বক্তার খোঁজ পেলে আমরা মুহূর্তের মধ্যে হাতটা বাড়িয়ে দিতে কসুর করি না। আর যদি দু-একটা মিলে যায় তো কথাই নেই। তিনি তো তখন সাক্ষাৎ ধন্বন্তরী। মাতৃগর্ভে একটি ভ্রুণের জন্ম হলে আমরা তার লিঙ্গ পরিচয় জানতে উদ্‌গ্রীব হয়ে উঠি। আর জন্মানোর পর ডাক্তার-কবিরাজ-ইঞ্জিনিয়ার-পাইলট কী হবে, তা নিয়ে ভাবনার অন্ত থাকে না। এই ভবিষ্যৎ জানার উত্তুঙ্গ আগ্রহ থেকেই জরিপের রমারমা ব্যবসা। হাড়ির একটা ভাত টিপে দেখার মতো এক শ কোটি ভোটারের মধ্যে কয়েক হাজার বা হতে পারে লাখের মতামত জেনে গোটা দেশের ফল ঘোষণা করে দিচ্ছে এরা। মিলল, কী মিলল না এ নিয়ে কোনো মাথাব্যাথা নেই। রাজনৈতিক বিভাজনের আয়েশি বাজারে জরিপের ফল বিকোয় ভালো। টিভির সামনে দর্শক হা করে গিলতে থাকে সত্য-মিথ্যায় মেশানো ককটেল।

আসলে সত্য-মিথ্যা কেন বললাম? যদি এটা বিজ্ঞানসম্মত জরিপই হয়ে থাকবে, তাহলে ফল তো একই রকম হওয়া উচিত। আপনি পৃথিবীর যে কোণায় হাইড্রোজেন ও অক্সিজেন এক করেন, তা পানিই উৎপাদন করবে। কারণ, তার ধর্মই এটা। বিজ্ঞানই এর নিয়ন্ত্রক। কিন্তু আপনি যদি গতকালকের ভারতের এক্সিট পোলের দিকে তাকান, তাহলে দখতে পাবেন দৈনিক ভাষ্করের জরিপে বিজেপির নেতৃত্বাধীন এনডিএকে ২৮১টি আসন দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে চানক্য বা অক্সিস মাই ইন্ডিয়া এনডিএকে চার শ পার করে দিয়েছে। অমিত শাহও এই ধরনের সাহস দেখানো বন্ধ করে দিয়েছিলেন। বাকিরা ৩৫০-এর আশপাশেই আছে। তাহলে দেখুন একবার সবাই একই ভোটারদের মতামতের ভিত্তিতে জরিপ চালিয়েছে, কিন্তু পার্থক্য প্রায় ১২০। এটাকে কীভাবে বিজ্ঞানসম্মত বলা যাবে? তাহলে জরিপের ফলাফল মোদি সমর্থক গোদি মিডিয়ার পূর্ব নির্ধারিত। শুধু অগ্নি নিউজ সার্ভিস একটি প্রতিষ্ঠানের জরিপে এনডিএকে ২৪২ এবং ইন্ডিয়া জোটকে ২৬৪ আসন দেওয়া হয়েছে। এই বাজারে তারা কোত্থেকে এই সাহস পেয়েছে বলা কঠিন।

এই বিতর্ক ওঠার অনেকগুলো কারণ আছে। তার মধ্যে একটি হলো—গতকাল শনিবার ছিল বিজেপি-বিরোধী ইন্ডিয়া জোটের বৈঠক। এই বৈঠক শেষ হওয়ার পরপরই জানানো হয় যে, তারা এবারে ন্যূনতম ২৯৫টি আসন পেতে চলেছেন। এটা তাদের নিজস্ব হিসাব। আর এটা প্রকাশ হয় বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে এক্সিট পোলের হিসাব প্রকাশের এক ঘণ্টা আগে।

দুই, এক্সিট পোলের হিসাব না মেলার অতীত। ১৯৮০-র দশকের শেষ ভাগ থেকে শুরু হওয়া এই বুথফেরত ভোটার জরিপ বহুবার বিভ্রান্তি তৈরি করেছে। তাদের হিসাব মেলা–না মেলা না নিয়ে কেউ প্রশ্নও তোলেনি বা তারাও কোনো গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা দেয়নি কখনো। ২০০৪ সালে ভারতের ক্ষমতায় ছিলেন প্রয়াত অটলবিহারি বাজপেয়ি। তাঁর সরকারের ‘শাইনিং ইন্ডিয়া’র জোরে সবাই ধরে নিয়েছিলেন বাজপেয়ি আবার ক্ষমতায় আসতে চলেছেন। যে কারণে সব এক্সিট পোলের হিসাবে বিজেপিকে ২৪০-২৭৫ আসন পাওয়ার স্বপ্ন দেখানো হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে অটলবিহারী বাজপেয়ির বিজেপি পেয়েছিল মাত্র ১৩৮ আসন। সেবার সরকার গড়ে কংগ্রেসের নেতৃত্বে ইউপিএ। ২০০৯-এ একইভাবে কংগ্রেস সরকার উল্টে যাওয়ার দাবি করা হয়েছিল। কিন্তু মনমোহন সিং সরকার আরও বেশি আসন নিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো সরকার গঠন করে। ২০১৪ সালেও এনডিএকে ২৬১-২৮৯ আসন দিয়েছিল এই বুথফেরত জরিপ। কিন্তু বিজেপি একাই ২৮২ এবং এনডিএ ৩৩৬ আসন পেয়ে সরকার গড়ে। দেখা গেছে, ২০০৪ থেকে সব এক্সিট পোলে বিজেপির জয়জয়াকার দেখানো হয়েছে। কিন্তু তা খাটেনি। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। আগামী ৪ জুন মঙ্গলবার বোঝা যাবে আসলে এই ফলাফল কতটা এক্সিট পোলের কাছাকাছি।

২০১৭ সালে উত্তরপ্রদেশে ত্রিশঙ্কু বিধানসভা হওয়ার কথা জানিয়েছিল বুথফেরত সমীক্ষা। কিন্তু বিজেপি ৩২৫ আসন জিতে একক সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে সরকার গড়ে। আর ২০১৫ সালের বিহার বিধানসভা নির্বাচনে ত্রিশঙ্কু বিধানসভার কথা বলা হলেও রাষ্ট্রীয় জনতা দল-জনতা দল (ইউনাইটেড) ও কংগ্রেসের সরকার গঠন করে। ২০১৫ সালে দিল্লি বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি জিতছেই—এমনই আভাস ছিল সব প্রতিষ্ঠানের জরিপের ফলাফলে। অথচ ফল প্রকাশের পর দেখা গেল ৭০ আসনের বিধানসভায় একাই ৬৭টি আসন পেয়েছে আম আদমি পার্টি। সর্বশেষ ২০২১ পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে সব এক্সিট পোলে বিজেপিকে জিতিয়ে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ফল বেরোনোর পর দেখা গেল বিজেপি পেয়েছে ৭৭টি আসন, আর মমতা ব্যানার্জির তৃণমূল কংগ্রেস ২১৫টি আসন নিয়ে তৃতীয়বারের মতো সরকার গঠন করেছে। এ থেকে মোটামুটি ধরেই নেওয়া যায়, এক্সিট পোলের হিসাব ধ্রুব সত্য নয়।

এবারের ভোটে বহু রাজ্যে কংগ্রেসকে শূন্য আসন দেওয়া হয়েছে এক্সিট পোলে। অথচ এসব রাজ্যে ভালো করার কথা তাদের। তাহলে কী ভারতের ভোটাররা এতটাই সাবালক হয়ে উঠেছেন যে, বিধানসভায় একভাবে ভোট দেন; আর লোকসভায়; অর্থাৎ, কেন্দ্রীয় শাসক নির্বাচনে আরেক বিবেচনায় ভোট দিয়ে থাকেন। এই উত্তরের একাংশ হয়তো ৪ জুন জানা যাবে।

লেখক: নির্বাহী সম্পাদক, ডিজিটাল মিডিয়া, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন

[এই মতামত লেখকের নিজস্ব। এর সঙ্গে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পাদকীয় নীতিমালার কোনো সম্পর্ক নেই।]

আরও পড়ুন:

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি দীর্ঘদিন ধরেই একটি মৌলিক নীতির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। আর তা হলো ‘সব দেশের সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়।‘ কিন্তু বৈশ্বিক ভূরাজনীতির পরিবর্তন, ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে শক্তির...
আমি বলছি না যে সাক্ষাৎকার নেওয়া সাংবাদিক বা সংবাদমাধ্যমগুলো ঘুষ খেয়েছে। কিন্তু যে জনসংযোগ–লবিং প্রতিষ্ঠান এত নিখুঁতভাবে এই প্রচার অভিযান সাজিয়েছে, বর্ণনা নিয়ন্ত্রণ করেছে, তারা নিশ্চয়ই মোটা...
ভারতের সঙ্গে ৫৪টি আন্তঃসীমান্ত নদী ভাগাভাগি এ অঞ্চলের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ও ন্যায্য পানি–অধিকারের প্রশ্নকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। কিন্তু দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক টানাপড়েন, ক্ষমতার অসমতা এবং...
নেপালসহ দেশে দেশে সরকার পতন ও এরপরের ‘খিচুড়ি’ হয়ে যাওয়া পরিস্থিতিতে সেসব অভ্যন্তরীণ সমস্যাগুলো না হয় ‘ডাল’ আর ‘চাল’-এর ভূমিকা নিয়েছে। আগুন হিসেবে কাজ করেছে জেন জি-র ক্ষোভ। কিন্তু খিচুড়ি রান্নার...
পথসভায় জাতীয় নাগরিক পার্টির মূখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, সরকার অটো পাসের মতো করে সরকার চালাতে চায়। আবু সাঈদের রক্তের উপর দাঁড়িয়ে জনগণের সেবা না করে, বাংলাদেশে আর কাউকে অটো পাসের...
কারা অধিদপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক জান্নাত-উল-ফারহাদ জানান, গত বৃহস্পতিবার গাজীপুরের কাশিমপুর মহিলা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে মোছা. রিম্পা নামের এক নারী বন্দি পালিয়ে যান। রোববার তাকে মোহাম্মদপুর থেকে...
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে পাসপোর্ট থেকে বাদ দেওয়া ‘ইসরায়েল ব্যতীত’ (Except Israel) শব্দগুচ্ছ আবারও যুক্ত হচ্ছে। আজ রোববার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক আদেশে এ তথ্য জানা গেছে। এ ছাড়া নতুন...
আগামী বছর যেসব নতুন এয়ারক্রাফট যুক্ত হবে, সেগুলোতে থাকবে ওয়্যারলেস স্ট্রিমিং, ইন-ফ্লাইট ইন্টারনেট এবং প্রতিটি সিটে মোবাইল চার্জিং সুবিধা। পৃথিবীর অনেক এয়ারলাইন্স যেখানে এই সেবার জন্য অতিরিক্ত...
লোডিং...

এলাকার খবর