মহাকাল অ্যাসাঞ্জদেরই মনে রাখবে 

আপডেট : ২৪ নভেম্বর ২০২৪, ০৯:০৯ পিএম

দীর্ঘ ১৪ বছর পর নিজ দেশ অস্ট্রেলিয়ায় ফিরে গেছেন জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ, উইকিলিকসের প্রতিষ্ঠাতা। দেশ ছাড়ার আগে যারা ছিল না, এখন তারা আছে। স্ত্রী ও দুই মেয়ে। অর্থাৎ, পরিবারের কাছে ফিরে গেছেন তিনি। আসাঞ্জের মুক্তি যেমন বহু মানুষকে, বিশেষ করে যারা বাকস্বাধীনতা ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতায় বিশ্বাসী, তাদের স্বস্তি দিয়েছে, তেমনি জন্ম দিয়েছে অনেক প্রশ্নেরও। যে কারণে তাঁর এই দীর্ঘ লড়াই, তা কী শুধু পরিবারের কারণে বা নিজেকে রক্ষার তাগিদে আত্মসমর্পণ করতে পারে? মহাশক্তিধর দেশের গোপন নথি প্রকাশকে অ্যাসাঞ্জ বা তাঁর সমর্থকেরা কোনো অন্যায় বলে মনে করেননি। তাঁরা সব সময় একে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা হিসেবেই দেখেছেন। সেই অ্যাসাঞ্জ কিনা ২০২৪ সালের মধ্যভাগে এসে বোঝাপড়ার ভিত্তিতে মার্কিন আদালতে দোষ স্বীকার করে নিজেকে মুক্ত করার ব্যবস্থা করলেন! ফলে নানা প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক। 

কিন্তু যিনি লড়াই চালাচ্ছিলেন, তাঁর দিকটাও দেখতে হবে। অস্ট্রেলিয়ার নাগরিক ও পেশায় কম্পিউটার বিজ্ঞানী অ্যাসাঞ্জ প্রথম থেকে প্রমাণ দিয়েছেন, তিনি একজন ভিন্ন গোত্রের ব্যক্তিত্ব। সমর্থকেরা তাঁকে বাকস্বাধীনতার লড়াইয়ে চ্যাম্পিয়ন এবং স্বচ্ছতার প্রশ্নে নায়ক হিসেবে দেখেন। ভাবেন, মহাক্ষমতাধরের চোখে চোখ রেখে কথা বলতে পারেন। আর বিরোধিতাকারীরা তাঁকে একজন বেপরোয়া ব্যক্তি হিসেবে দেখেন, যিনি অন্যের জীবন ও জাতীয় নিরাপত্তা বিপন্ন করার পক্ষে যথেষ্ট। ফলে অ্যাসাঞ্জ কতটুকু দোষী আর কতটা নির্দোষ, তা নিক্তি মেপে হিসাব করা অত্যন্ত জটিল। এর সাথে আইন, নীতি-নৈতিকতা এবং ভূ-রাজনৈতিক বিবেচনা জড়িয়ে। সে কারণে এক কথায় উত্তর দেওয়া সম্ভব না। 

জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ ২০০৬ সালে প্রতিষ্ঠা করেন উইকিলিকস। তাঁর উদ্দেশ্যই ছিল ক্ষমতাধর রাষ্ট্র, প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির চেপে যাওয়া তথ্য জনসমক্ষে আনা, যাতে মানুষ তাদের প্রকৃত স্বরূপ জানতে পারে। বিশ্বের প্রায় সকল সংবাদমাধ্যমে যে ধারা চলে আসছে, তা সরকারি বয়ানে প্রচার মাত্র অথবা সরকার যতটুকু অনুমোদন করে তারই প্রতিফলন। মোদ্দা কথা বিনা বাক্য ব্যয়ে সবকিছু মেনে নেওয়া। ক্ষমতাকে প্রশ্ন না করা। যার যত বেশি ক্ষমতা, সে তত প্রশ্নহীন আনুগত্যের অধিকারী। কিন্তু বিশ্বের সব মানুষ তো এখনো ওই কাতারে চলে যায়নি। কিছু ‘বেয়াড়া’ লোকজন সব সময় ছিল, আছে, থাকবে। অ্যাসাঞ্জ তেমনই একজন। রাষ্ট্রীয় মিথ্যার অবগুণ্ঠন খুলে তাকে কাপড়হীন করে তোলাই তাঁর অপরাধ।

জুলিয়ান অ্যসাঞ্জের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল রাষ্ট্রের গোপন নথি প্রকাশের। নথি সরবরাহকারী নাম প্রকাশে অস্বীকৃতি জানানো। কিন্তু এটাই তো সাংবাদিকতার প্রাথমিক পাঠ। ক্ষমতাধর রাষ্ট্র/ সরকার/ প্রতিষ্ঠান/ ব্যক্তি যা গোপন করতে চায় সংবাদমাধ্যমের দায়িত্ব সেটাই প্রকাশ করা। অ্যাসাঞ্জ সেই কাজটি করছেন। তিনি কোনোখান থেকে তথ্য চুরি করেছেন, এ অপবাদ তাঁকে কেউ দিতে পারবে না। এই কাজ তো ১৯৭০-এর দশকে ওয়াশিংটন পোস্টের দুই সাংবাদিক বব উডওয়ার্ড ও কার্ল বার্নস্টেইন করেছেন, যা আজও ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারি নামে পরিচিত। পেন্টাগন পেপার্স ফাঁস করে দিয়েছিল নিউইয়র্ক টাইমস। কই, তাদের তো কেউ কাঠগড়ায় দাঁড় করায়নি।

তাহলে অ্যাসাঞ্জ যখন আমেরিকার ক্ল্যাসিফায়েড ডকুমেন্টস বা অপ্রকাশিত গোপন নথিপত্র ফাঁস করে দেন তাঁর ওয়েবসাইটে, সেটা বাক স্বাধীনতার স্বঘোষিত রক্ষকেরা মানতে পারেন না কেন? সেখানে ইরাক ও আফগানিস্তানের যুদ্ধের লগ, গুয়ানতানামো বে কারাগারে বন্দীদের সাথে আচরণের তথ্য এবং আমেরিকার বিভিন্ন দূতাবাস থেকে পাঠানো তারবার্তা ছিল বলে? ব্র্যাডলি ম্যানিং নামে এক তরুণ মার্কিন সেনাসদস্যের কাছ থেকে এসব তথ্য তিনি পেয়েছিলেন। যদিও অ্যাসাঞ্জ হাজারো বিপদের মধ্যে কখনো তাঁর নাম বলেননি। ম্যানিং না স্বীকার করলে কেউ হয়তো সহজে জানতে পারত না এই সাহায্যের কথা। (এখানে বলে রাখা দরকার, ব্র্যাডলি ম্যানিং পরে লিঙ্গ পরিবর্তন করে পুরুষ থেকে নারী হয়েছেন। এখন তিনি চেলসি ম্যানিং নামে পরিচিত। লেখার পরের অংশে তাঁকে চেলসি নামে উল্লেখ করা হবে।)

২০১০ সালে উইকিলিকসে আমেরিকার গোপন নথি ফাঁস হওয়ার পরে নড়েচড়ে বসে বড় বড় সংবাদমাধ্যম। ব্রিটেনের গার্ডিয়ান, ফ্রান্সের লে মদেঁ, স্পেনের এল পাইস, জার্মানির ডের স্পাইজেল ও আমেরিকার নিউইয়র্ক টাইমসের মতো গণমাধ্যম ছিল এই কাতারে। তারা উইকিলিকসের তথ্য যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে প্রকাশ করে। কিন্তু যখনই অ্যাসাঞ্জ বুঝতে পারেন, কোনো বিষয় একটু রেখেঢেকে প্রকাশ করা হচ্ছে, তখনই তিনি ওই সংক্রান্ত সব নথি তাঁর সাইটে উন্মুক্ত করে দেন। একই অভিযোগে অ্যাসাঞ্জ বা চেলসির বিরুদ্ধে আমেরিকা অভিযোগ আনলেও এই বড় বড় সংবাদমাধ্যমের ব্যাপারে টু শব্দটিও করা হয়নি। ফলে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা বা বাকস্বাধীনতা কার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে আর কে বাদ যাবে, এ নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তখনই ছিল, এখনো আছে। সবাইকে ভিন্ন ভিন্ন পাল্লায় মাপতে গিয়ে আমেরিকা নিজেকে প্রশ্নের মুখে ফেলে দিয়েছে।

এবার দেখা যাক এই ‘অপরাধ’-এর জন্য গত ১৪ বছরে অ্যাসাঞ্জকে কতটা মূল্য দিতে হয়েছে। ২০১০ সালে প্রথম তিনি আটকে যান যুক্তরাজ্যে। সেখানে যখন তাঁকে কোনো অপরাধে কারাগারে পাঠানো যাচ্ছিল না, তখনই সুইডিশ কর্তৃপক্ষ অ্যাসাঞ্জের বিরুদ্ধে দুজন নারীর সাথে যৌন অসদাচরণের অভিযোগের জন্য গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে। অ্যাসাঞ্জ অভিযোগ অস্বীকার করেন এবং দাবি করেন, এ অভিযোগ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। এই অভিযোগে সুইডেনে প্রত্যর্পণ এড়াতে অ্যাসাঞ্জ লন্ডনে ইকুয়েডর দূতাবাসে আশ্রয় চান। এ নিয়েও চলতে থাকে আইনি লড়াই। শেষ পর্যন্ত ২০১২ সালে ইকুয়েডর তাঁকে তাদের দূতাবাসে আশ্রয় দেয়। ছয় বছর ছিলেন সেখানে। সাংবাদিক গ্লেন গ্রিনওয়ার্ল্ড তখন অ্যাসাঞ্জের থাকার জায়গা নিজেই দেখে এসেছিলেন। তাঁর কথায়, এই ছয় বছরে অ্যাসাঞ্জের শরীরে কখনো সূর্যের আলো লাগেনি। কারণ যে দুই কক্ষের মধ্যে তিনি ছিলেন তার চারপাশে সর্বক্ষণ ছিল ব্রিটিশ পুলিশের কড়া পাহারা। ২০১৯-এ ট্রাম্প প্রশাসনের চাপে নত হয়ে ইকুয়েডর বের করে দেয় অ্যাসাঞ্জকে।

ব্রিটিশ পুলিশ গ্রেপ্তার করে উইকিলিকসের প্রতিষ্ঠাতাকে। ঠাঁই হয় বেলমার্শ কারাগারে, যাকে কিনা গুয়াতানামো বে কারাগারের সাথে তুলনা করা হয়। আসলেই অ্যাসাঞ্জ কত দুর্ধর্ষ অপরাধী ছিলেন বুঝুন! এই কারাগারে পাঁচ বছর থাকাকালে অধিকাংশ সময় তাঁর কেটেছে একক নির্জন কারাকক্ষে। এর সাথে তাঁর মাথার ওপর সব সময় খড়্গ হয়ে ঝুলছিল আমেরিকার হাতে তাঁকে তুলে দেওয়ার চাপ। আর একবার সেখানে গেলেই আজীবনের জন্য কারাবাস, এমনকি মৃত্যুদণ্ড হতে পারত। একটা মানুষ, যার অপরাধ নিয়ে বিতর্ক আছে, সে আসলে কত দিন এই ধরনের চাপ নিতে পারে।

অ্যাসাঞ্জের সৌভাগ্য তিনি কোনো তৃতীয় বিশ্বের দেশের নাগরিক নন। এ কারণে মার্কিন আদালতে দোষ স্বীকারের মুচলেকা দিয়ে তিনি অস্ট্রেলিয়া ফিরে যেতে পেরেছেন। বিশ্বের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ গত ১৪ বছর ধরে অ্যাসাঞ্জের পাশে ছিলেন। তবে অস্ট্রেলিয়ার বর্তমান সরকার দেশের জনমতের চাপে আমেরিকা ও যুক্তরাজ্যকে সমঝোতার মাধ্যমে মুক্তি দিতে বাধ্য করতে পেরেছে। অন্য কোনো দেশ পারত কিনা, জোর দিয়ে বলা কঠিন।

ইন্টারনেটের মুক্ত জগতে মানুষের মত ও পথের বাধাহীন প্রবাহের অন্যতম নজির জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ ও উইকিলিকস। মানব ইতিহাস জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জকে দেখবে বহুদিক থেকে। সেখানে সাহসের সাথে থাকবে শঠতা; নৈতিকতার পাশে নীতিহীনতা; আইন ও বে-আইনের সহাবস্থান। যেভাবেই দেখুক না কেন, যুগে যুগে অ্যাসাঞ্জরা এসেছেন এবং আসবেনও। প্রবল প্রতাপের বিরুদ্ধের বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বরের জন্য নিন্দিতের চেয়ে নন্দিতই হবেন বেশি। মহাকাল তাঁদেরই মনে রাখবে। 

লেখক: নির্বাহী সম্পাদক, ডিজিটাল মিডিয়া, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন

[এই মতামত লেখকের নিজস্ব। এর সঙ্গে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পাদকীয় নীতিমালার কোনো সম্পর্ক নেই।]

​সম্প্রতি ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে আটক এবং পরবর্তী ঘোষণা অনুযায়ী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণের বিষয়টি আন্তর্জাতিক রাজনীতির ইতিহাসে এক নজিরবিহীন ও...
আরেকটি সাধারণ আশঙ্কা হলো–এআই দিয়ে তৈরি লেখা, ছবি ও কণ্ঠস্বর জনমত ও নির্বাচনে প্রভাব বিস্তারকারী অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে। এই উদ্বেগগুলো যৌক্তিক। তবুও এসব উদ্বেগ আদতে আরও অস্বস্তিকর ও মৌলিক...
গাজা যুদ্ধের দুই বছর হতে চলল। জাতিসংঘে সাধারণ পরিষদের অধিবেশন সামনে রেখে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, কানাডার মতো জি৭ জোটভুক্ত তিন দেশ ও অস্ট্রেলিয়া ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতির বিষয়ে ঘোষণা দিয়ে রেখেছে। এই ঘোষণা...
গাজা যুদ্ধের দুই বছর হতে চলল। জাতিসংঘে সাধারণ পরিষদের অধিবেশন সামনে রেখে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, কানাডার মতো জি৭ জোটভুক্ত তিন দেশ ও অস্ট্রেলিয়া ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতির বিষয়ে ঘোষণা দিয়ে রেখেছে। এই ঘোষণা...
পথসভায় জাতীয় নাগরিক পার্টির মূখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, সরকার অটো পাসের মতো করে সরকার চালাতে চায়। আবু সাঈদের রক্তের উপর দাঁড়িয়ে জনগণের সেবা না করে, বাংলাদেশে আর কাউকে অটো পাসের...
কারা অধিদপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক জান্নাত-উল-ফারহাদ জানান, গত বৃহস্পতিবার গাজীপুরের কাশিমপুর মহিলা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে মোছা. রিম্পা নামের এক নারী বন্দি পালিয়ে যান। রোববার তাকে মোহাম্মদপুর থেকে...
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে পাসপোর্ট থেকে বাদ দেওয়া ‘ইসরায়েল ব্যতীত’ (Except Israel) শব্দগুচ্ছ আবারও যুক্ত হচ্ছে। আজ রোববার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক আদেশে এ তথ্য জানা গেছে। এ ছাড়া নতুন...
আগামী বছর যেসব নতুন এয়ারক্রাফট যুক্ত হবে, সেগুলোতে থাকবে ওয়্যারলেস স্ট্রিমিং, ইন-ফ্লাইট ইন্টারনেট এবং প্রতিটি সিটে মোবাইল চার্জিং সুবিধা। পৃথিবীর অনেক এয়ারলাইন্স যেখানে এই সেবার জন্য অতিরিক্ত...
লোডিং...

এলাকার খবর