ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি কি তৃতীয়বারের মতো ক্ষমতায় আসতে পারবেন? এই মুহূর্তে এটা লাখ না, কোটি টাকার প্রশ্ন। আজ ২০ মে ভারতের ছটি রাজ্য ও দুটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের ৪৯টি আসনে ভোটগ্রহণ হবে। আর বাকি থাকবে ১০ দিন ও দুটি পর্ব। ৪ জুন ফল ঘোষণা।
কিন্তু এই ভোট ভোট খেলার যে রেফারি সেই নির্বাচন কমিশন বা ইসি নিয়ে সবার মধ্যে সন্দেহ তৈরি হয়েছে ও হচ্ছে। এর কারণও তারা। গোটা ভোট প্রক্রিয়া নিয়ে একটি সন্দেহ ইতিমধ্যে তৈরি হয়ে গেছে। সে আলোচনায় আমরা পরে আসব। তবে এটি নিশ্চিতভাবে বলা যায়, মোদি সরকার যেভাবে বিরোধীদের দমনে, দলনে ও দলত্যাগের জন্য সিবিআই, ইডি, আয়কর বিভাগ, এনআইএ-সহ রাষ্ট্রের একাধিক যন্ত্র ব্যবহার করেছে, তাতে ইসি নিয়ে সন্দেহ গভীর হয়েছে। সেই সন্দেহে ঘৃতাহুতি দিয়েছে নির্বাচন কমিশন আইন পরিবর্তন করে, যেখানে সরকারকে ইচ্ছামতো কমিশনার নিয়োগ দেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে নিয়োগ প্রক্রিয়া থেকে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতিকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। তিনজনের কমিশনের দুজনই এই নতুন আইনে নিয়োগ দেওয়া। সেজন্য বিরোধীদের অনেকেই একে মোদি-কমিশন বলে আখ্যায়িত করেছেন।
যার কেউ নেই তাঁর জন্য ঈশ্বর আছেন- ধর্মবিশ্বাসী সব মানুষই কম বেশি এ কথা শুনেছেন এবং তা বিশ্বাসও করেন। তবে কি ২০২৪-এর নির্বাচনে বিজেপির বড় ভরসার জায়গা হয়ে উঠেছে নির্বাচন কমিশন। দেশে দেশে এমন নজির কম নেই। ৯৭ কোটি ভোটারের সংখ্যাটা সামান্য এদিক-ওদিক করে দিলেই মসনদের দিক সেই দল/ জোটের দিকে চলে যাবে। ভারতের অশোকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সব্যসাচী দাস গত বছর জুলাইতে এক গবেষণাপত্রে এটা প্রমাণ করে দিয়েছেন। ‘ডেমোক্র্যাটিক ব্যাকস্লাইডিং ইন দ্য ওয়ার্ল্ডস লার্জেস্ট ডেমোক্রেসি’ শিরোনামে ওই গবেষণাপত্রটি প্রকাশের পর চাকরিও খোয়ান তিনি। পুলওয়ামা-বালাকোট-পাকিস্তান-হিন্দু জাতীয়তাবাদী ঝড়-কে ২০১৯-এ মোদির জয়ের জন্য কৃতিত্ব দিয়ে থাকেন অনেকে। এর উল্টো পথে হেঁটে ভোটকেন্দ্র ধরে ধরে ইসির দেওয়া হিসাব ধরে সব্যসাচী দেখিয়েছেন কীভাবে মুসলমান ভোটারদের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে, তাদের ভোট দিতে বাধা দেওয়া হয়েছে। আর এসব কাজ সব আসনে করা হয়নি, হয়েছে সেইসব কেন্দ্রে যেখানে দুই দল বিজেপি ও কংগ্রেসের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। এ কারণে প্রায় ৪০টি আসনে বিজেপি জিতেছে খুব কম ভোটের ব্যবধানে। ২০১৯-এর লোকসভায় এই ৪০টি আসন বাদ দিলে বিজেপির আসন সংখ্যা দাঁড়ায় ২৬৩, যা একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার (২৭৩) চেয়ে কম। অন্যদিকে কংগ্রেসের আসন দাঁড়াত ৮৪। তাহলে ক্ষমতার ভারসাম্য কীভাবে বদলে যেত আপনিই বলুন। হিন্দু হৃদয়পুরুষ হিসেবে মোদিকে নিয়ে গত ৫ বছরে যে রূপকল্প তৈরি করা হয়েছে তা-ও সম্ভব হতো না। এবারেও সে আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
ভারতের নির্বাচন কমিশন নিয়ে একটা হ্যাশট্যাগ সোশ্যাল মিডিয়া বা সমাজ মাধ্যমে ঘুরে বেড়াচ্ছে। শুধু বিজেপি-বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতারা নন, সুশীল সমাজসহ সমাজের বিভিন্ন স্তর থেকে এই কথা উঠে আসছে। কথা না বলে দাবি বলাই ভালো। হ্যাশট্যাগের এই দাবি হচ্ছে- গ্রো অ্যা স্পাইন অর রিজাইন অর্থাৎ মেরুদণ্ড শক্ত কর অথবা পদত্যাগ কর। ভারতের নির্বাচন কমিশনের ওপর সে দেশের মানুষের যে আস্থা ছিল সেখান থেকে এটা বিরাট পরিবর্তন। ২০০৪ সালেও (বাজপেয়ি সরকারের সময়) ৮০ ভাগ মানুষের আস্থা ছিল ইসির ওপর, এখন এই সংখ্যা ২৮-এ নেমে এসেছে। মেরুদণ্ড শক্ত করার দাবি তো এমনি এমনি ওঠে না।
রাজীব কুমার নামের সাবেক আমলার নেতৃত্বাধীন ইসির গত চার পর্বের ভোট নিয়ে মোটা দাগে কয়েকটা উদাহরণ দেওয়া যাক।
এক. ৩৯ আসনের তামিলনাড়ুতে ভোট হয়েছে এক দিনে। অন্যদিকে ৪০ আসনের বিহার বা ৪২ আসনের পশ্চিমবঙ্গে ভোট নেওয়া হচ্ছে সাত পর্বে; অর্থাৎ, সাত দিনে। অথচ এই দুই রাজ্যে দেখুন কোনো ধরনের গোলমাল ছাড়াই ভোট হয়েছে। সারা দেশের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গে রেকর্ডসংখ্যক ভোট পড়েছে। এই দুই রাজ্য বিজেপির কাছে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, বিহারে ৩৯ আসন ধরে রাখা এবং পশ্চিমবঙ্গে ১৮ থেকে যতটা সম্ভব নিজেদের আসন বাড়ানো তাদের লক্ষ্য। ফলে গোটা নির্বাচনের সময়সূচির দিকে তাকিয়ে বিজেপি-বিরোধীরা যখন বলেন, বিশেষ একজনের (পড়ুন মোদি) এটা সাজানো হয়েছে, তখন তা অনেকটাই মান্যতা পায়।
দুই. নির্বাচনী প্রচারে সাম্প্রদায়িকতার বিষ ঢেলে দেওয়ার পরও নরেন্দ্র মোদি বা বিজেপির বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিতে পারেনি ইসি। মুসলমানদের ব্যাপারে নানা ধরনের মানহানিকর বক্তব্য দেওয়ার জন্য মোদিকে চিঠি পাঠানোর সাহস দেখাতে পারেনি তারা। মোদির অভিযোগের চিঠি দিয়েছে বিজেপির সভাপতি জেপি নড্ডাকে। ভারসাম্য রাখতে রাহুলের বক্তব্য নিয়ে কংগ্রেসের সভাপতিকে চিঠি দিয়েছে। শাসক দলের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ করলেই, খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে দায় সারছে কমিশন। বিজেপির কর্ণাটক শাখা মুসলমান-বিরোধী ভিডিও এক্স বা টুইটারে প্রকাশের পরও ইসি দায়হীন। এই দায়হীনতা থেকে ভক্তি রসের উদ্রেক হয়। সে কারণে বিজেপিকে কিছু না বলে এক্স-কে ভিডিওটি সরিয়ে ফেলতে বলে। এতে সাপও মরল, লাঠিও ভাঙল না। এইভাবে বিতর্ক তৈরি হলেও ভ্রুক্ষেপ নেই রাজীব কুমার ও তাঁর দুই সহযোগীর।
তিন. বিভিন্ন পর্বে ভোটগ্রহণ শেষে কোনো সংবাদ সম্মেলন করে না নির্বাচন কমিশন। এ ব্যাপারে তারা নরেন্দ্র মোদির অনুগামী। দিল্লিতে জাতীয় প্রেস ক্লাব এজন্য ইসিকে অনুরোধ করে চিঠি দিয়েছে। কিন্তু কে শোনো কার কথা। প্রথম পর্বের ভোটের পর জানা গেল ৫৯ শতাংশ ভোট পড়েছে। ১১ দিন পরে ইসির হিসাবে তা হয়ে গেল প্রায় ৬৭ শতাংশ। একই ঘটনা ঘটেছে দ্বিতীয় পর্বেও। তৃতীয় বা চতুর্থ পর্ব নিয়ে কোনো কথাই বলেনি তারা।
সবচেয়ে বড় বিষয়, ভোট শেষে শুধু শতকরা হিসাব বলা হচ্ছে। অথচ ২০১৯-এ ভোটের দুদিনের মধ্যে ভোটকেন্দ্র ধরে ভোট পড়ার হিসাব দেওয়া হয়েছিল। সেখানে নারী-পুরুষের বিভাজনও থাকত। হিসাব আসতে দেরি হচ্ছে এই অজুহাত দেখিয়ে রাজীব কুমার কমিশন লুকোছাপার আশ্রয় নিয়েছে। এতে নরেন্দ্র মোদি, বিজেপি বা রাজীবের সাথীদের লক্ষ্য পূরণ হলেও ভারতের নির্বাচনী ব্যবস্থার ওপর তা স্থায়ী প্রশ্ন চিহ্ন রেখে যাবে। এমনকি ভোটে যদি কোনো অসততা নাও হয়ে থাকে, তবুও।
লেখক: নির্বাহী সম্পাদক, ডিজিটাল বিভাগ, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন
আরও পড়ুন:


মোদির ক্ষমতায় ফেরা কি ক্রমে কঠিন হচ্ছে
কাকে ভোট দিলেন মোদি?
এ ক্ষেত্রেও প্রথম মোদি
