ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয়বারের মতো প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর থেকেই মেটার প্রতিষ্ঠাতা মার্ক জাকারবার্গ চেষ্টা করে যাচ্ছেন ট্রাম্পের সাথে দীর্ঘদিনের দূরত্ব ঘুচিয়ে তাঁর কাছাকাছি আসতে। শুধু ট্রাম্পই নন, রিপাবলিকান পার্টির অতি-ডানপন্থি মতাদর্শে বিশ্বাসী নেতৃবৃন্দের রোষানল থেকে বাঁচতেও জাকারবার্গ এখন তাঁদের সুরে কথা বলতে শুরু করেছেন। আগামী ২০ তারিখ ট্রাম্পের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানকে সামনে রেখে সম্প্রতি বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন জাকারবার্গ। তাতে স্পষ্ট যে, নিজেকে ট্রাম্পপন্থী প্রমাণ করতে তিনি এখন মরিয়া। জাকারবার্গের নেওয়া এমন সব পদক্ষেপ সম্পর্কে জানার আগে চলুন ট্রাম্পের সাথে জাকারবার্গের বিরোধপূর্ণ সম্পর্ক নিয়ে কিছুটা আলোচনা হয়ে যাক।
ট্রাম্প ও জাকারবার্গের মধ্যে সম্পর্কের টানাপোড়েন
ট্রাম্পের সাথে জাকারবার্গের এক সময়ের বিরোধপূর্ণ সম্পর্কের সূচনা মূলত ২০২১ সালে। এর প্রেক্ষাপট হচ্ছে ২০২০ সালে অনুষ্ঠিত আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ফলাফলকে কেন্দ্র করে সংঘটিত ক্যাপিটল হিল দাঙ্গা। ২০২১ সালের ৬ জানুয়ারি’র এই দাঙ্গায় অংশ নেওয়া নিজের সমর্থকদের প্রশংসা করে পোস্ট করায় ট্রাম্পকে সে বছরের জুন মাসে ফেসবুক ও ইন্সটাগ্রাম থেকে ২ বছরের জন্য নিষিদ্ধ করে মেটা। ট্রাম্পের কার্যক্রমকে ‘জননিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরুপ’ বিবেচনা করেই এমন কঠোর সিদ্ধান্ত নেয় বলে জানায় প্রতিষ্ঠানটি।
এরপর রিপাবলিকানদের দাবি’র মুখে ২০২৩ সালের জানুয়ারি’তে ট্রাম্পের উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয় মেটা। যদিও অপরাধের পুনরাবৃত্তি হলে বড় ধরণের শাস্তির কথাও জানানো হয় মেটার তরফ থেকে। স্বাভাবিকভাবেই তখনও ফেসবুক ও ইন্সটাগ্রামে ট্রাম্পের কার্যক্রম মেটার পর্যবেক্ষণাধীন ছিল। অর্থাৎ, মেটার প্ল্যাটফর্মে ট্রাম্পের উপর বিধিনিষেধ তখনও কিছুটা বহালই ছিল বলা যায়।
পরবর্তীতে গত বছর জুলাই’তে নির্বাচনী প্রচারণা শুরুর প্রাক্কালে ট্রাম্পের ফেসবুক ও ইন্সটাগ্রাম ব্যবহারের উপর থেকে সব রকম নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নেয় মেটা। আমেরিকার জনগণকে প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী সকলের কথা ও রাজনৈতিক অভিব্যক্তি সম্পর্কে সমানভাবে জানার সুযোগ করে দিতেই এই সিদ্ধান্ত নেয় বলে জানায় তাঁরা।
উল্লেখ্য, ২০২১ সালে ক্যাপিটল হিল দাঙ্গার দু’দিনই পরই জনপ্রিয় মাইক্রোব্লগিং সাইট টুইটার (বর্তমানের এক্স) ব্যবহারেও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয় ট্রাম্পের উপর। তাঁদের প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে ট্রাম্প সহিংসতা আরও উসকে দিতে পারেন, এমন ঝুঁকির কারণেই টুইটার ট্রাম্পের অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দেয়। এরপর ২০২২ সালের অক্টোবরে ইলন মাস্ক টুইটার কিনে নেওয়ার পর পরই (নভেম্বরে) ট্রাম্পের উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নেয় এই সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মটি- যেটি ২০২৩ সালের জুলাই থেকে ‘এক্স’ নামে পরিচিত।
এখানে বলে রাখা আবশ্যক, জনপ্রিয় সোশ্যাল মিডিয়াগুলোতে নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়তে থাকায় ডোনাল্ড ট্রাম্প ২০২১ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি চালু করেন নিজের মালিকানাধীন প্ল্যাটফর্ম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’। বিগত কয়েক বছরে নিজের সমর্থকদের সাথে যোগাযোগের ক্ষেত্রে এই প্ল্যাটফর্মটিকেই ট্রাম্প সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করেছেন।
জাকারবার্গের সাথে ট্রাম্পের বিরোধ অবশ্য ফেসবুক, ইন্সটাগ্রামে তাঁর নিষেধাজ্ঞার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। ২০২০ সালের নির্বাচনে জো বাইডেনের কাছে পরাজিত হওয়ার পর থেকে বেশ ক’বার তিনি অভিযোগ করেছেন, নির্বাচনে জাকারবার্গ তাঁর ও তাঁর দলের বিরুদ্ধে কাজ করেছেন। শুধু তাই নয়, গত বছর ৩ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত নিজের বই ‘সেভ আমেরিকা’-তেও ট্রাম্প অভিযোগ করেন যে, ২০২০ নির্বাচনে জাকারবার্গ তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করেছেন। ট্রাম্প অবশ্য অভিযোগ করেই থেমে থাকেননি। নিজের স্বকীয়তা বজায় রেখে জাকারবার্গকে রীতিমতো হুমকি দেন, ২০২৪ নির্বাচনে এমন কিছু করলে মেটার প্রধান নির্বাহীকে বাকি জীবন জেলে কাটাতে হবে!
এছাড়া বিভিন্ন সময় ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তাঁর অনুসারীরা মেটার সেন্সরশিপ নীতিমালাকে ‘পক্ষপাতদুষ্ট’ বলেছেন। মেটার প্ল্যাটফর্মগুলো’তে ট্রাম্প ও রিপাবলিকান দলের কনটেন্ট কম দেখানো হয় বলেও অভিযোগ করেছেন ডানপন্থী রাজনীতিকরা। পাশাপাশি ডাইভারসিটি প্রোগ্রামের মতো মেটার বিভিন্ন কার্যক্রম নিয়েও বিভিন্ন সময় সমালোচনায় মুখর হয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প ও রিপাবলিকান পার্টির অতি-ডানপন্থি মতাদর্শে বিশ্বাসী অনেকেই।
ট্রাম্পের সাথে সম্পর্কোন্নয়নে জাকারবার্গের বিভিন্ন পদক্ষেপ
গত ৫ নভেম্বরের নির্বাচনে জাকারবার্গ কোনো প্রার্থীর পক্ষেই সরাসরি প্রচারণায় অংশ নেননি। তবে গত বছরের মাঝামাঝি থেকেই ট্রাম্পের প্রতি তাঁর সুর নরম হতে শুরু করে। গত জুলাই’তে পেনসিলভেনিয়ায় এক নির্বাচনী প্রচারণায় ভাষণ দেওয়ার সময় ট্রাম্পের উপর প্রাণনাশের হামলা হয়। হামলার পর মুহূর্তেই মঞ্চে ট্রাম্প আমেরিকার পতাকা নিয়ে সমর্থকদের উদ্দেশ্যে নিজের মুষ্টিবদ্ধ হাত শুন্যে তুলে ধরেন। জাকারবার্গ বিষয়টিকে ‘ব্যাডঅ্যাস’ অর্থাৎ সাহসী, এবং একইসাথে অনুপ্রেরণামূলক বলে ট্রাম্পের প্রশংসা করেন।

অথচ এর ৪ মাস আগেই ট্রাম্প নিজের ট্রুথ সোশ্যাল অ্যাকাউন্টে পোস্ট করে জাকারবার্গকে ‘জনগণের শত্রু’ বলে অভিহিত করেছেন। এমনকি চীনের মালিকানাধীন টিকটক নিষিদ্ধ করলে তা মেটার জন্য সুবিধাজনক হবে বলেও মত দেন তিনি এবং এই কারণ দেখিয়ে তিনি রীতিমতো টিকটকের পক্ষে অবস্থান নেন!
গত নভেম্বরের নির্বাচনে ট্রাম্প জয়ী হওয়ার পর থেকে ট্রাম্প ও তাঁর বিভিন্ন নীতির পক্ষে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করতে শুরু করেন জাকারবার্গ। পাশাপাশি ট্রাম্পের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগও বাড়তে থাকে। ২৭ নভেম্বর থ্যাংকসগিভিং ডে’র আগের দিন সন্ধ্যায় (থ্যাংকসগিভিং ইভ) ট্রাম্পের আমন্ত্রণে এক নৈশভোজে অংশ নেন মেটার প্রতিষ্ঠাতা। এই প্রেক্ষাপটে মেটার এক মুখপাত্র বলেন, ‘আমেরিকার উদ্ভাবনী ক্ষমতার ভবিষ্যত নির্ধারণে এটা গুরুত্বপূর্ণ এক সময়।’
ফ্লোরিডার পাম বিচে ট্রাম্পের মার-এ-লাগো রিসোর্টে আয়োজিত এই নৈশভোজে ট্রাম্প ও জাকারবার্গের মিলিত হওয়ার ঘটনাটিকে প্রযুক্তি বিশ্বে বেশ গুরুত্বের সাথেই দেখা হয়েছে। বিশ্বব্যাপী সোশ্যাল মিডিয়া’তে যে বড় ধরণের পরিবর্তন আসতে চলেছে তার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছিল তাঁদের এই সাক্ষাৎপর্বের মাধ্যমেই।

এই সাক্ষাতের পর থেকে ট্রাম্পের সাথে জাকারবার্গের সম্পর্কোন্নয়ন আরও ত্বরান্বিত হয়েছে। গত ১২ ডিসেম্বর মেটার তরফ থেকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অভিষেক অনুষ্ঠানের ফান্ডে ১ মিলিয়ন ডলার অনুদান দেওয়ার ঘোষণা আসে। শুধু তাই নয়, আসন্ন শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানকে সামনে রেখে গত দু’সপ্তাহে ট্রাম্প-ঘনিষ্ঠ দু’জন ব্যক্তিকে মেটার পরিচালনা বোর্ডে স্থান করে দিয়েছেন জাকারবার্গ। এদের একজন জোয়েল কাপলান এবং অপরজন ডানা হোয়াইট।
২০১১ সাল থেকে মেটার গ্লোবাল পাবলিক পলিসি ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে কর্মরত কাপলানকে এবার চিফ গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স অফিসার পদে উন্নীত করা হয়েছে। উক্ত পদে তিনি সদ্য পদত্যাগ করা নিক ক্লেগের স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন। উল্লেখ্য, রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের প্রশাসনে দীর্ঘ ৮ বছর কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে কাপলানের, ছিলেন হোয়াইট হাউজের গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারকদের একজনও। রিপাবলিকানদের সাথে, বিশেষ করে অতি-ডানপন্থীদের সাথে, রীতিমতো গলায় গলায় সম্পর্ক কাপলানের। কাপলানের পাশাপাশি ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ডানা হোয়াইটকেও নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বোর্ডে। হোয়াইট এর আগে আল্টিমেট ফাইটিং চ্যাম্পিয়নশিপ (ইউএফসি)-এর সিইও হিসেবেও কাজ করেছেন।
ফ্যাক্ট-চেকিং এর পরিবর্তে কমিউনিটিকেন্দ্রিক সেন্সরশিপ চালু
সামনের দিনগুলো’তে ট্রাম্পের সাথে একই পথে চলার সবচেয়ে বড় ইঙ্গিতটি জাকারবার্গ দিয়েছেন গত ৭ জানুয়ারি। সেদিন এক ভিডিও বার্তায় তিনি মেটার মালিকানাধীন প্ল্যাটফর্ম ফেসবুক, ইন্সটাগ্রাম ও থ্রেডসে ‘ফ্যাক্টচেকিং’ বাতিল করার ঘোষণা দেন। এছাড়া ফ্যাক্টচেকারদের সরিয়ে কমিউনিটি-কেন্দ্রিক সেন্সরশিপ চালু করার কথাও জানান তিনি। কমিউনিটি-কেন্দ্রিক সেন্সরশিপ চালু করার মাধ্যমে সেন্সরশিপ ইস্যুতে মেটার অবস্থান এখন ট্রাম্প-ঘনিষ্ঠ ইলন মাস্কের মালিকানাধীন প্ল্যাটফর্ম এক্সের অনুরূপ।
উল্লেখ্য, এক্স প্ল্যাটফর্মে স্বাধীন কোনো ফ্যাক্টচেকার নিয়োগ করা হয় না। ফ্যাক্টচেকিং তথা সেন্সরশিপের জন্য তাঁরা ‘কমিউনিটি নোটস’ সিস্টেম অনুসরণ করে থাকে। এই ব্যবস্থায় ফ্যাক্ট-চেকিং এর দায়িত্ব বর্তায় কমিউনিটি বা ব্যবহারকারীদের উপরেই। এই পদ্ধতি’তে এক্সের অনুমোদিত কনট্রিবিউটররা মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট চিহ্নিত করে সেখানে নোটস সংযুক্ত করে দেন। আর এই নোটসেই কনটেন্ট সম্পর্কে নিজেদের আপত্তির বিষয়টি বিস্তারিত তুলে ধরেন কনট্রিবিউটররা। যেসব কনটেন্টে এরুপ কমিউনিটি নোটস যুক্ত করা হয় সেগুলোর ঠিক নিচেই ছোট একটি বক্স দৃশ্যমান হয়, যেখানে লেখা থাকে ‘রিডারস অ্যাডেড কনটেক্সট’। এক্স প্ল্যাটফর্মে এভাবেই কনটেন্ট মডারেট বা সেন্সর করা হয়। এবার মেটা তাঁদের প্ল্যাটফর্মগুলোতে চালু করতে যাচ্ছে ‘কমিউনিটি নোটস’ মডেল।
২০১৬ থেকে ২০২৪- দুই নির্বাচনের মাঝেই সব বদলে গেল!
২০১৬ প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে মিথ্যা ও ভুল তথ্যের ব্যাপক ছড়াছড়ির প্রেক্ষাপটে মেটা প্রথমবারের মতো স্বাধীন ফ্যাক্ট-চেকিং চালু করে তাঁদের প্ল্যাটফর্মে। এজন্য নিয়োগ দেওয়া হয় ফ্যাক্টচেকারও। এবার আরেকটি (২০২৪) প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পর ফ্যাক্ট-চেকিং বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিল প্রতিষ্ঠানটি। মজার বিষয় হচ্ছে, দুটি নির্বাচনেই জয়ী হয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প, কিন্তু এরই মাঝে আমূল বদলে গেছে সেন্সরশিপ ইস্যুতে জাকারবার্গ ও মেটার অবস্থান।
হঠাৎ করে ফ্যাক্ট-চেকিং বন্ধ করার কারণ হিসেবে জাকারবার্গ বলছেন, সেন্সরশিপের এই সিস্টেম রাজনৈতিকভাবে অনেক বেশি পক্ষপাতদুষ্ট হয়ে উঠেছে। ফলে ফ্যাক্ট-চেকিং যতটা না বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করেছে তার চেয়ে বেশি নষ্ট করেছে বলে মনে করেন মেটার সিইও।
মেটার সাইটে প্রকাশিত ভিডিও বার্তায় জাকারবার্গ তাঁর প্রতিষ্ঠানের সেন্সরশিপ নীতিতে এই বড় পরিবর্তনের পেছনে সাধারণ মানুষের মত প্রকাশের অধিকার বা বাকস্বাধীনতা’কে অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়টিকেও কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘সাম্প্রতিক নির্বাচনগুলো একটি তাৎপর্যপূর্ণ বড় পরিবর্তনের দিকে ইঙ্গিত করছে যেখানে আরও একবার বাকস্বাধীনতাকে প্রাধান্য দেওয়ার সংস্কৃতি চালু করার প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হচ্ছে।’
ফ্যাক্ট-চেকিং থেকে সরে এসে কমিউনিটি-ভিত্তিক সেন্সরশিপ কৌশল অবলম্বন করায় এবার থেকে ফেসবুক, ইন্সটাগ্রাম ও থ্রেডসে বিতর্কিত বিভিন্ন বিষয়েও (যেমন জেন্ডার ও ইমিগ্রেশন) কনটেন্ট দেখা যাবে বলে স্বীকার করেছেন জাকারবার্গ। তিনি এও বলে রেখেছেন, আগের তুলনায় তাঁর প্ল্যাটফর্মগুলো খারাপ কনটেন্ট কম চিহ্নিত করবে। উল্লেখ্য, মেটার নতুন এই সেন্সরশিপ নীতি তিনটি প্ল্যাটফর্মে- ফেসবুক, ইন্সটাগ্রাম ও থ্রেডসে- প্রযোজ্য হবে। বর্তমানে এই প্ল্যাটফর্ম তিনটি’তে সারা পৃথিবীর প্রায় ৪০০ কোটি মানুষ যুক্ত রয়েছে।
সেন্সরশিপ নীতি’তে পরিবর্তনের কারণ হিসেবে মেটা যা-ই বলুক না কেন, সমালোচকরা স্পষ্টতই এর পেছনে রাজনীতি দেখতে পাচ্ছেন। বিশেষ করে মেটার বিরুদ্ধে রক্ষণশীলতা-বিরোধী পক্ষপাতের যে অভিযোগ ট্রাম্প ও তাঁর অনুসারী রিপাবলিকানরা অতীতে বিভিন্ন সময় এনেছেন- সেগুলোই জাকারবার্গকে ফ্যাক্টচেকার-মুক্ত হতে বাধ্য করেছে বলে মনে করছেন অনেকে।
নতুন জাকারবার্গের আবির্ভাব?
সেন্সরশিপ ইস্যুতে নীতিগত এই পরিবর্তন কতটা বাধ্য হয়ে নেওয়া ‘আত্মরক্ষামূলক’ সিদ্ধান্ত, আর কতটা ‘সুযোগসন্ধানী’, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। বিশেষ করে পরিবর্তন যখন প্রতিষ্ঠানকে ছাপিয়ে ব্যক্তি জাকারবার্গকেও প্রভাবিত করে তখন এই প্রশ্নটি আরও বেশি প্রাসঙ্গিক ও জোরাল হয়ে উঠে।
জাকারবার্গের ব্যক্তিত্ব, মনন-মানসিকতার সাথে যাদের পরিচয় আছে তাদের কাছে আজকের ব্যক্তি জাকারবার্গকে অনেকটাই অচেনা মনে হতে পারে। এই পরিবর্তন তাঁর পোশাক-পরিচ্ছদ, কর্মকাণ্ড, নীতি ও মনন-মানসিকতা- সর্বক্ষেত্রেই পরিব্যাপ্ত।
গত শুক্রবার (১০ জানুয়ারি) জনপ্রিয় পডকাস্টার জো রোগ্যানের পডকাস্ট শো’তে অংশ নিয়েছেন জাকারবার্গ। সেখানে তিনি এমন কিছু মন্তব্য করেছেন যেটা এমনকি আজকের জাকারবার্গের মুখেও বিস্ময়কর শোনায়। পডকাস্টের এক পর্যায়ে তিনি পুরুষ শক্তি’র (ম্যাসকিউলিন এনার্জি) পুনরুত্থানের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন।

শুধু তাই নয়, শিকার করা ও মিক্সড মার্শাল আর্টে (এমএমএ) অংশ নেওয়ার মাধ্যমে নিজেকে আগের চেয়ে বেশি পুরুষোচিত (ম্যানলি) বলে মনে হয় বলেও উল্লেখ করেন তিনি। পাশাপাশি তিনি এও বলেন, ওয়েস্টার্ন সোসাইটি ও কর্পোরেট আমেরিকানরা এখন পৌরুষহীন (নিউটার্ড বা ইমাসকুলেটেড) হয়ে পড়েছে। প্রেক্ষাপট যা-ই হোক না কেন, এক সময়ের প্রগতিশীল মূল্যবোধের পতাকাবাহী, ডেমোক্রেট-ঘেঁষা জাকারবার্গের মুখে এমন মন্তব্য অনেকটা গ্রীষ্মকালে তুষারপাতের মতোই মনে হতে পারে।
পরিবর্তনের ছোঁয়া সার্বিকভাবেই তাঁর ব্যক্তিত্বে লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সেটা যেমন তাঁর বেশভূষায় দৃশ্যমান, তেমনি বিভিন্ন শখপূরণ ও কার্যক্রমেও। একসময়ের অতিমাত্রায় প্রযুক্তি-অনুরাগী (টেক নার্ড) জাকারবার্গ এখন মিক্সড মার্শাল আর্ট নিয়ে যেমন সিরিয়াস তেমনি করেন সার্ফিংও। আবার কখনও আলোচনায় আসেন জন্মদিনে স্ত্রি প্রিসিলা চ্যানের ভাস্কর্য তৈরি করে, কেননা স্ত্রীর ভাস্কর্য তৈরি’র রোমান ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে চান জাকারবার্গ! চল্লিশ-বছর-বয়সী জাকারবার্গের জীবনে এমন সব অভূতপূর্ব ঘটনার ঘনঘটা দিনকে দিন যেন বেড়েই চলেছে। কেউ কেউ অবশ্য এসবের মাঝে মধ্যবয়সী সংকট উত্তরণের প্রচেষ্টা দেখতে পাচ্ছেন। তবে কারণ যাই হোক, ব্যক্তি জাকারবার্গের মধ্যে পরিবর্তন যে এসেছে, আসছে সেটা নিয়ে অন্তত কারো মনে কোনো সন্দেহ নেই।
জো রোগানের অনুষ্ঠানে জাকারবার্গের ব্যক্তিত্বে আরেকটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে। সাধারণত তিনি প্রতিদ্বন্দ্বী কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সমালোচনা করেন না। কিন্তু এবার তাঁকে দেখা গেল কড়া ভাষায় অ্যাপলের সমালোচনা করতে। আলোচনার এক পর্যায়ে জাকারবার্গ বলেন, ‘(আইফোন) এর মাধ্যমে (অ্যাপল) অনেকগুলো স্বেচ্ছাচারী নিয়ম আরোপ করেছে। দীর্ঘদিন তাঁরা যুগান্তকারী কিছুই উদ্ভাবন করেনি। স্টিভ জবস এনেছিল আইফোন, এবং ২০ বছর পরে এখনও তাঁরা সেই সাফল্যের উপর ভর করেই চলছে।’
জাকারবার্গের ক্ষেত্রে বিষয়টিকে নিছক ব্যক্তিগত মতপ্রকাশ হিসেবে দেখা যাচ্ছে না। কেননা নিজের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধেও তাঁকে এমন সমালোচনা করতে খুব একটা শোনা যায়নি এর আগে। অথচ এখানে মেটার সাথে অ্যাপলের সরাসরি কোনো প্রতিদ্বন্দ্বীতা নেই বললেই চলে; আর এ কারণেই বিষয়টি আরও বেশি বিস্ময়কর বলে মনে হয়। আজকের জাকারবার্গের সাথে ৬ মাস আগের জাকারবার্গের পার্থক্য বোঝাতে ছোট্ট একটি উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে।
আমেরিকার’তে টিকটক নিষিদ্ধের বিষয়ে গত জুলাই’তে ট্রাম্প ও জাকারবার্গের মতামত জানতে চাওয়া হয়। ট্রাম্প নিজের চীন-বিরোধী অবস্থান থেকে সরে এসে টিকটকের পক্ষে কথা বলেন শুধুমাত্র এই কারণে যে, টিকটক নিষিদ্ধ হলে মেটা লাভবান হবে। অন্যদিকে, জাকারবার্গ তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠান টিকটক নিষিদ্ধ করার প্রসঙ্গে বলেন, ‘এটা (এই বিষয়ে মন্তব্য করা) আমার ক্ষমতার বাইরে।’ জো রোগানের পডকাস্টে অ্যাপলের আইফোন-নির্ভরতা নিয়ে সমালোচনা করা জাকারবার্গ মেটা’র শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী টিকটক সম্পর্কে বিরুপ কোনো মন্তব্য করেননি মাত্র ৬ মাস আগেও।
তাই সার্বিকভাবে আজকের মার্ক জাকারবার্গকে দেখে কারও যদি ‘জাকারবার্গ ২.০’ বলে মনে হয় তাহলে আর যাই হোক তাকে দোষ দেওয়া যায় না।
মেটার ডাইভারসিটি প্রোগ্রাম বাতিল
জাকারবার্গের সাথে ইলন মাস্কের সম্পর্ক যে খুব মধুর নয় সেটা নিয়ে নতুন করে বলার কিছু নেই। তবে কমিউনিটি-কেন্দ্রিক সেন্সরশিপ চালু করার মাধ্যমে মাস্কের প্ল্যাটফর্ম এক্স-কেই অনুসরণ করেছে জাকারবার্গের মেটা। গত শুক্রবার (১০ জানুয়ারি) জানা গেল মেটা আরও একটি বিষয়ে এক্সের দেখানো পথেই হাঁটতে চলেছে।
জাকারবার্গের প্রতিষ্ঠান তাঁদের সকল প্রকার ডাইভারসিটি প্রোগ্রাম বাতিল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং একটি আভ্যন্তরীণ মেমো প্রকাশ করে বিষয়টি সম্পর্কে কর্মীদেরকে অবগতও করেছে। ডাইভারসিটি, ইক্যুয়িটি এন্ড ইনক্লুশন বা ডিইআই প্রোগ্রাম বাতিল করার মাধ্যমে ট্রাম্পের ডাইভারসিটি-বিরোধী নীতির পক্ষেই এবার অবস্থান নিলেন জাকারবার্গ।
কী এই ডাইভারসিটি প্রোগ্রাম?
আমেরিকা’তে ২০২০ সালে পুলিশ হেফাজতে নিহত হন কৃষ্ণাঙ্গ নাগরিক জর্জ ফ্লয়েড। এই প্রেক্ষাপটে বিশ্বজুড়ে শুরু হয় ‘ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার’ আন্দোলন। সে সময় মেটাসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চালু করা হয় ডাইভারসিটি প্রোগ্রাম- যার মূল উদ্দেশ্য ছিল কর্মী, সাপ্লায়ার, প্রশিক্ষণার্থীসহ বিভিন্ন অংশীজনের মাঝে বৈচিত্র্য ও ন্যায্যতা নিশ্চিত করার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবেশ তৈরি করা। শুধু তাই নয়, ডিইআই প্রোগ্রামের অধীনে কর্মী ও সাপ্লায়ার নির্বাচনেও ডাইভারসিটি নীতি অনুসরণ করা হয়েছে এতদিন।
তবে ট্রাম্প ও তাঁর অনুসারীদের মতো আমেরিকার রক্ষণশীলরা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ডাইভারসিটি প্রোগ্রামের সমালোচনা করে আসছেন শুরু থেকেই। চলতি সপ্তাহেই ইলন মাস্ক ও ট্রাম্প-ঘনিষ্ঠ বেশ কয়েকজন ডিইআই প্রোগ্রামের সমালোচনা করে বলেন, এই প্রোগ্রামের কারণে লস অ্যাঞ্জেলসে চলমান ভয়াবহ দাবানলের প্রতিক্রিয়ায় যথাযথ উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব হয়নি, যদিও এর কোনো প্রমাণ তাঁরা এখনও দেখাতে পারেনি।
২০২৩ সালে আমেরিকায় বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি’তেও ডাইভারসিটি প্রোগ্রাম বাতিল করার আদেশ দিয়ে রায় দেয় দেশটির সুপ্রিম কোর্ট। ফলে ডিইআই প্রোগ্রামের বিপক্ষে রক্ষণশীলদের দাবি আরও জোরাল হয়েছে সাম্প্রতিক সময়ে। এই প্রেক্ষাপটে মেটার পাশাপাশি সম্প্রতি অ্যামাজনও তাঁদের ডাইভারসিটি প্রোগ্রাম বাতিল করার ঘোষণা দিয়েছে।
ডিইআই প্রোগ্রাম বাতিল প্রসঙ্গে প্রকাশিত মেমো’তে মেটা’র মানবসম্পদ বিভাগের ভাইস প্রেসিডেন্ট জানেল গেইল বলেন, ‘আমেরিকা’তে বৈচিত্র্য, ন্যায্যতা ও অন্তর্ভুক্তি সম্পর্কিত কার্যক্রম পরিচালনার আইনগত ও নীতিগত অবস্থানে পরিবর্তন আসছে।’
শুধু তাই নয়, ডিইআই প্রোগ্রাম নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের রায়’কেও তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত বলে উল্লেখ করেছেন গেইল। তিনি এও বলেন যে, কেউ কেউ ডিইআই প্রোগ্রাম’কে নির্দিষ্ট কয়েকটি গ্রুপের পক্ষে ‘অগ্রাধিকারমূলক আচরণ’ হিসেবে দেখেন। আর এই সব কারণ দেখিয়েই গেইল মেটার কর্মীদেরকে জানিয়ে দেন যে, এখন থেকে ডিইআই প্রোগ্রামের জন্য আলাদা কোনো টিম কাজ করবে না তাঁদের প্রতিষ্ঠানে। মেটার প্রধান ডাইভারসিটি অফিসার ম্যাক্সিন উইলিয়ামস এখন থেকে নতুন দায়িত্ব পালন করবেন।
শেষ কথা…
কোনো সন্দেহ নেই যে, জাকারবার্গ তাঁর প্রতিষ্ঠান মেটায় সাম্প্রতিক যে পরিবর্তনগুলো নিয়ে এসেছেন তার পেছনে ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ট্রাম্পের রক্ষণশীল নীতির বড় প্রভাব রয়েছে। জো রোগান শো’তে তিনি স্পষ্ট করেই ট্রাম্পের প্রশংসা করেছেন, ‘তিনি (ট্রাম্প) শুধু চান আমেরিকা জয়ী হোক’। এর আগে গত ৭ জানুয়ারি নিজের ইন্সটাগ্রাম অ্যাকাউন্টে জাকারবার্গ বলেন, ‘আমরা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সাথে কাজ করতে যাচ্ছি।’
সম্প্রতি টেলিগ্রাম অ্যাপ প্রতিষ্ঠাতা পাভেল দুরভ মেটার সেন্সরশিপ ইস্যু’তে জাকারবার্গের অবস্থান পরিবর্তন প্রসঙ্গে তাঁকে কিছুটা খোঁচা দিয়েই এক্স অ্যাকাউন্টে বলেন, ‘আজকে অন্যান্য প্ল্যাটফর্মগুলোও সেন্সরশিপ শিথিল করার ঘোষণা দিচ্ছে। তবে তাঁদের নতুন আবিষ্কৃত মূল্যবোধের আসল পরীক্ষা হবে তখন যখন রাজনীতির আবহে আবার পরিবর্তন আসবে। আপনি কোনো কিছুকে সমর্থন করেন বলা অনেক সহজ যখন আপনার হারানোর কিছু থাকে না।’
এই প্রসঙ্গে দুরভের সাথে দ্বিমত পোষণ করাটা কিছুটা দুরুহই বটে। তাই দুরভের মতোই বলতে হয়, জাকারবার্গের চিন্তা-চেতনায় সাম্প্রতিক যে পরিবর্তন এর কতটা ‘আত্মরক্ষামূলক’ আর কতটা ‘সুযোগসন্ধানী’— সেটা বুঝতে অপেক্ষা করতে হবে আমেরিকার রাজনৈতিক আবহে পরবর্তী বড় পরিবর্তন আসা পর্যন্ত।
সে পর্যন্ত না হয়, জাকারবার্গকে ‘আরেক ইলন মাস্ক’ হিসেবে দেখতেই অভ্যস্ত হয়ে উঠুক প্রযুক্তি বিশ্ব।
তথ্যসুত্র: রয়টার্স, দ্য গার্ডিয়ান, মেটা, বিবিসি, নিউইয়র্ক টাইমস, পলিটিকো, ব্লুমবার্গ, দ্য টাইমস, বিজনেস ইনসাইডার, সেমাফোর, ডেইলি মেইল, সিবিএস নিউজ, এবিসি নিউজ ও ইন্ডিয়া টুডে
আরও পড়ুন:
- গুগল সার্চে ২০২৪, কোন বিভাগে কী শীর্ষে
- রোবোট্যাক্সি, অপটিমাসসহ ইলন মাস্কের আলোচিত সেরা ৬ প্রযুক্তি
- ‘নতুন’ স্মার্টফোন: প্রয়োজন, নাকি অন্য কিছু?
- এআই নিয়ে ব্যস্ত টেক জায়ান্টরা, কার্বন প্রতিশ্রুতির কী হবে
- রিসেট বাটন কী, চাপলে কী হয়?
- মাস্কের ‘এক্সমেইল’ যে বার্তা দিচ্ছে গুগল–অ্যাপলকে
- প্রযুক্তি খাতে কর্মী ছাঁটাই লাখের বেশি, এর শেষ কোথায়?


ট্রাম্পের ফেইসবুক ও ইন্সটাগ্রাম অ্যাকাউন্ট ফিরিয়ে দিচ্ছে মেটা
ট্রাম্পের তহবিলে জাকারবার্গের অনুদান ১ মিলিয়ন ডলার
ফেসবুক, ইন্সটাগ্রামে সেন্সরশিপ কমবে, জানালেন জাকারবার্গ
ট্রাম্প আসছে, তাই বাতিল করা হচ্ছে যে প্রোগ্রাম
মেটার সেন্সরশিপ ইস্যুতে যা বললেন টেলিগ্রামের পাভেল দুরভ
