সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কানের পাশ দিয়ে গুলি বেরিয়ে যায়নি, কানে লেগে বেরিয়ে গেছে। একটু এদিক-ওদিক হলেই তাঁর জীবন সংশয় হতে পারত। আসলেই কি গুলিটা ট্রাম্পের কানে লেগেছে? না। গুলিটা প্রকৃতপক্ষে আঘাত করেছে আমেরিকার বর্তমান রাজনীতির কেন্দ্রে। এই কেন্দ্রেই জমা আছে ঘৃণা, বৈষম্য, অন্যের প্রতি অশ্রদ্ধা, ক্ষমতা দখলের মরিয়া চেষ্টা। সামান্য কম্পনে উদ্গীরণের মধ্য দিয়ে, যা সহজে ছড়িয়ে পড়ে সমাজ দেহে। যদিও ট্রাম্প গুলিতে আহত হওয়ার পরে প্রেসিডেন্ট বাইডেনসহ অন্য রাজনীতিকেরা যা বলেছেন তার মোদ্দা কথা, আমেরিকার গণতন্ত্রে হিংসা-বিদ্বেষের কোনো স্থান নেই। কিন্তু এর চাষ তো দীর্ঘদিন ধরে তাঁরাই করছেন।
আসলে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আমেরিকার রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব ক্রমাগত সংঘাতপূর্ণ হয়ে উঠছে। যা সমাজের মধ্যেকার বিভক্তিকে আরও বাড়িয়ে চলেছে। এই প্রবণতা আমেরিকার জন্য একেবারে নতুন নয়। তবে এর তীব্রতা এবং ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য হিংসার আশ্রয় নেওয়ার প্রবণতা বেড়েছে। দিনে দিনে এই প্রবণতার বাড়বাড়ন্ত হওয়ার পেছনে অতীতের পাশাপাশি দেশটির বর্তমান ব্যবস্থাও সমানভাবে দায়ী।
এর মধ্যে সবচেয়ে নজর কেড়েছে সমাজে ঘৃণার প্রসার। দীর্ঘ গৃহযুদ্ধের পর থেকে মার্কিন সমাজে বেশ কিছু দিন এই বিষয়টি সুপ্ত অবস্থায় ছিল। শ্বেতাঙ্গ-কৃষ্ণাঙ্গ বিদ্বেষের পাশাপাশি কিছুকাল ধরে যুক্ত হয়েছে ভূমিপুত্রদের অধিকার বনাম ‘দখলদার ও অনভিপ্রেত অভিবাসী স্রোতের’ অভিযোগ। এখন পর্যন্ত আমেরিকার সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ শ্বেতাঙ্গ।
কিন্তু তারা বা তাদের পূর্বপুরুষেরা যে মূলত ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে আসা অভিবাসী–এই কথাটা তারা ভুলে যায়। তাদের এই ভাবনা মজ্জাগত হয়ে গেছে যে, আমেরিকায় থাকার অধিকার একমাত্র তাদের এবং বহুবর্ণ-ভাষার অভিবাসীরা তাদের জাতিগত, অর্থনৈতিক ও সামরিক শ্রেষ্ঠত্বকে ক্ষুণ্ন করছে। সাম্প্রতিক সময়ে এই ভাবনার পালে সবচেয়ে বেশি বাতাস যিনি দিয়েছেন, তিনি হলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। এই ঘৃণার বিষই হয়তো সদ্য কৈশোর উত্তীর্ণ ২০ বছরের এক তরুণকে তাঁর দিকে বন্দুক তাক করার মতো ঘৃণ্য কাজ করতে প্রলুব্ধ করেছে।
গত জুনে শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের এক জরিপের দিকে নজর ফেরানো যাক, তাহলে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হয়ে যাবে। এই জরিপের ফলাফল বলছে, ট্রাম্পের পক্ষে নয়, বরং তাঁর বিরুদ্ধে সহিংসতার প্রতি সমর্থন বেড়েছে। প্রাপ্তবয়স্ক আমেরিকানদের মধ্যে ১০ শতাংশ ট্রাম্পকে ঠেকাতে সহিংসতার আশ্রয় নেওয়াকে সমর্থন করেছেন। অন্যদিকে প্রায় ৭ শতাংশ মার্কিনি হিংসার আশ্রয় নিয়ে হলেও ট্রাম্পকে ক্ষমতায় বসানোর বিষয়টি সমর্থন করেন। ভাবতে পারেন, দুপক্ষ মিলিয়ে মোট প্রাপ্তবয়স্ক মার্কিনিদের ১৭ শতাংশ ক্ষমতাকে ঘিরে হিংসার আশ্রয় নেওয়াকে যথার্থ মনে করেন। এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো, ট্রাম্পের দ্বিতীয়বার প্রেসিডেন্ট হওয়া ঠেকাতে হিংসাকে যারা সমর্থন করেন, তাঁদের ৩০ শতাংশের বেশি লোকের বন্দুক আছে। বলা হচ্ছে, ২০ বছরের তরুণটি যে অস্ত্র দিয়ে গুলি ছুড়েছিল, সেটি তাঁর বাবার।
বিষয়টি এমন কান টানলে মাথা আসবেই। একটার সাথে আরেকটি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। অল্পেই সহিংসতার চরম রূপ প্রদর্শনের পেছনে দেশটির বন্দুকনীতি কম দায়ী না। দেশটির দুই প্রধান রাজনৈতিক দলের কেউই এই আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে আগ্রহী নয়। ফলে সহজে হাতে পাওয়া অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্রের অপব্যবহার যেন ডালভাত হয়ে গেছে। আছে চরম পক্ষপাতদুষ্ট মূলধারার গণমাধ্যম। এরা সমাজে সুস্পষ্ট ভেদ রেখা টেনে দিয়েছে। নিউইয়র্ক টাইমস, ওয়াশিংটন পোস্ট, সিএনএন-এর মতো গণমাধ্যম ঘোষিতভাবে ট্রাম্পের বিরোধী।
সম্পাদকীয় নিবন্ধে নিউইয়র্ক টাইমস বলছে, ট্রাম্পের আমেরিকা শাসনের কোনো যোগ্যতাই নেই। এটা কী সংবাদমাধ্যমের কাজ? অন্যদিকে ফক্স নিউজসহ একাধিক সংবাদমাধ্যম ট্রাম্পের পক্ষে। তারা শ্বেতাঙ্গ-শ্রেষ্ঠত্ব প্রচারের নামে অন্য সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ ছড়িয়ে যাচ্ছে।
আর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কথা যত না বলা যায়, ততই ভালো। এখানে অপতথ্যের ছড়াছড়ি বললে ভুল হবে, বলা ভালো মিথ্যার সাইক্লোন চলছে। ফেসবুক, এক্স (পুরোনো টুইটার), ইনস্টাগ্রামসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং মেসেজিং অ্যাপ তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোকে বিভিন্ন সময়ে কী ধরনের সমস্যা সৃষ্টি করেছে, তা সবার জানা। এই দৈত্যসম প্রতিষ্ঠানগুলো কোনো দেশে ক্ষমতার দোসর, কোনো দেশে আবার ক্ষমতার পালাবদলের সমর্থক। তাদের কার্যকলাপে এই সন্দেহ গভীর হয়েছে যে, প্রতিষ্ঠানগুলো সিদ্ধান্ত গ্রহণের লাটাই আসলে অন্য কারও হাতে। এসব প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশের মালিক আমেরিকানরা। সবারই নিশ্চয় মনে আছে, ট্রাম্প কখনোই তাঁর প্রচারের সহযোগী হিসেবে আমেরিকার মূলধারার সংবাদমাধ্যমকে বেছে নেননি। তাঁর প্রিয় ছিল টুইটার। কথায় কথায় তিনি টুইট করতেন।
প্রেসিডেন্ট হওয়ার আগে বা প্রেসিডেন্ট থাকাকালে নিজের কথা মূলত প্রচার করেছেন টুইটার, ফেসবুক ও অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। ট্রাম্পের বেড়ে ওঠার এই সহযোগীরাই আবার ২০২১ সালের ৬ জানুয়ারি ক্যাপিটল হিলে ট্রাম্প সমর্থকদের উন্মত্ততার কারণ দেখিয়ে তাঁর অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দেয়। গত চার বছর ধরে এ অবস্থাই চলছিল। এখন যখন ট্রাম্পের হোয়াইট হাউসে ফিরে আসার সম্ভাবনা উজ্জ্বল হচ্ছে, তখন তিনি একে একে ফিরে পাচ্ছেন তাঁর বন্ধ হওয়া সব অ্যাকাউন্ট। ইলন মাস্ক টুইটার কেনার পরই ট্রাম্পের প্রতি প্রসন্ন হয়েছিলেন। কিছুদিন আগে হয়েছেন জাকারবার্গ সাহেব। এই ঘটনাকে আপনি কী দিয়ে ব্যাখ্যা করবেন? এই ঘটনা প্রমাণ করে–২০২১-এ ট্রাম্পের অ্যাকাউন্ট বন্ধ করা ভুল ছিল অথবা এখন খুলে দেওয়াটা ভুল।
এরা কী তা স্বীকার করবে? বিভিন্ন সমাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের এই দ্বৈতনীতি সারা দুনিয়াকে ভুগিয়েছে। এখন গোকুলে বাড়তে বাড়তে নিজ দেশ আমেরিকাকেও ছাড়ছে না।
তবে এই প্রতিষ্ঠানগুলোই সর্বনাশের একমাত্র কারণ নয়। মূলধারার সংবাদমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, আগ্নেয়াস্ত্র নীতি, ঘৃণার রাজনীতির পাশাপাশি আর্থিক বৈষম্য, আত্মপরিচয় হারানোর ভয়, সমাজকে একসূত্রে গাঁথতে না পারার রাজনৈতিক ব্যর্থতাসহ নানাবিধ কারণ আছে এই সর্বনাশের পেছনে। আর এগুলো এক দিনে হয়নি। গণতন্ত্রের চর্চা নিয়ে আমেরিকার শাসকেরা গর্ব করেন ঠিকই, কিন্তু তা ভোট-সর্বস্ব হওয়ায় দিনে দিনে অনেক ফাঁক-ফোকর বেরিয়ে পড়েছে। এর মধ্যে একটি হচ্ছে রাজনীতিকদের ওপর অবিশ্বাস। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ানের এক জরিপ বলছে, প্রাপ্তবয়স্ক আমেরিকানদের মধ্যে ৫৮ দশমিক ৬ শতাংশ মনে করে, আজকে আমেরিকার যে পরিস্থিতি, তাতে দেশটির সবচেয়ে মৌলিক রাজনৈতিক ও সামাজিক সমস্যাগুলো সমাধান করতে পারবে না নভেম্বরের নির্বাচন। এটা একটা ভয়াবহ দিক। সাধারণ মানুষ যখন নির্বাচিত শাসকের ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলে, তখন আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার একটা প্রবণতা তার ভেতরে দেখা যায়। দেশে দেশে এর প্রমাণ আছে।
আমেরিকাতেও অকুপাই ওয়াল স্ট্রিট থেকে ব্ল্যাক লাইভ ম্যাটারসসহ নানা আন্দোলন দানা বেঁধেছে। কিন্তু সে দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্ব তাকে কাঙ্ক্ষিত জায়গায় পৌঁছে দেওয়ার পরিবর্তে যেকোনোভাবে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন এবং সফলও হয়েছেন। ফলে মানুষ ক্রমে রাজনীতি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে।
ট্রাম্পের ওপর গুলি চালানোর ঘটনাকে কেন্দ্র করে আমেরিকার রাজনীতিকেরা যদি শুধু বিবৃতি দিয়ে দায় সারেন বা একে শুধু আইন‑শৃঙ্খলাজনিত সমস্যা মনে করেন তাহলে সমাধান কঠিন। এর জন্য প্রয়োজন রাজনীতিক, শাসক গোষ্ঠী ও ক্ষমতাসীনদের আত্মসমালোচনা এবং বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে সেই অনুযায়ী বহুমুখী পদক্ষেপ নেওয়া। না হলে বিত্তের দাপট বা সত্যকে চাপা দেওয়ার কূটকৌশল সবার জন্য হিতে বিপরীত হতে পারে। তাই বৃহস্পতিবারের গুলির ঘটনা শুধু ট্রাম্প নয়, সবার জন্য শিক্ষণীয়। শিখবেন কিনা সেটা তাঁদের ব্যাপার।
লেখক: নির্বাহী সম্পাদক, ডিজিটাল মিডিয়া, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন
[এই মতামত লেখকের নিজস্ব। এর সঙ্গে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পাদকীয় নীতিমালার কোনো সম্পর্ক নেই।]
আরও পড়ুন:
- আমেরিকায় নির্বাচনী সমাবেশে হামলায় রক্তাক্ত ট্রাম্প, নিহত ২
- আমেরিকায় এ ধরনের সহিংসতার কোনো স্থান নেই: বাইডেন
- ট্রাম্প টাওয়ারসহ নিউইয়র্কজুড়ে নিরাপত্তা বাড়ল
- ট্রাম্পের ওপর হামলা মার্কিন নির্বাচনে যে প্রভাব ফেলবে
- ট্রাম্পকে গুলি করে হত্যার চেষ্টাকারীর পরিচয় প্রকাশ
- ট্রাম্পকে গুলি: হামলাকারী সম্পর্কে যা জানা গেল
- গুলি করেছে বাইডেনের লোক, অভিযোগ কলিন্সের
- এখন পর্যন্ত হামলায় ৪ মার্কিন প্রেসিডেন্টের মৃত্যু, বেঁচে গেছেন ৭ জন


স্কুলে বুলিংয়ের শিকার ছিলেন ট্রাম্পের ওপর হামলাকারী
ট্রাম্পের ওপর হামলা মার্কিন নির্বাচনে যে প্রভাব ফেলবে
