জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময়ের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। তিনটি পৃথক অভিযোগে তাকে এই দণ্ড দেওয়া হয়। এ ছাড়া আরও দুটি অভিযোগে তার আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
এ মামলার অন্য দুই আসামির মধ্যে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকেও মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। মামলার রাষ্ট্রসাক্ষী ও পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনকে দেওয়া হয়েছে পাঁচ বছরের সাজা।
গত বছরের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণআন্দোলনের মুখে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে আশ্রয় নেন শেখ হাসিনা। বর্তমানে তিনি দিল্লিতেই অবস্থান করছেন। ধারণা করা হচ্ছে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানও ভারতেই আছেন। শেখ হাসিনাকে ফেরত চেয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে ভারতকে আনুষ্ঠানিক চিঠি দেওয়া হয়েছে, কিন্তু তাতে সাড়া মেলেনি।
সোমবার রায়ের পর পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন জানিয়েছেন, তাকে আবারও ফেরত চাওয়া হবে। তিনি বলেন, ‘স্থানীয়ভাবে ভারতীয় হাইকমিশন এবং দিল্লিতে বাংলাদেশের হাইকমিশনের মাধ্যমে শেখ হাসিনাসহ দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের ফেরত চাইবে ঢাকা। তাদের ফেরত চেয়ে যে কোনো মুহূর্তে দিল্লিকে চিঠি পাঠানো হবে। চিঠির পর ভারতের প্রতিক্রিয়া দেখে পরবর্তী পদক্ষেপ নেবে বাংলাদেশ।’
আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুলও শেখ হাসিনাকে ফেরত চেয়ে ভারতকে চিঠি দেওয়ার কথা জানিয়েছেন।
ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে বন্দি প্রত্যর্পণ চুক্তি আছে। এই চুক্তির আওতায় ভারতে অবস্থান করা বাংলাদেশের আদালতে সাজাপ্রাপ্ত কোনো আসামিকে ফেরত চাইতে পারে বাংলাদেশ। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ের পর শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খানকে এই চুক্তির আওতায় ফেরত চাইতে পারে বাংলাদেশ।
তবে দুই দেশের মধ্যে সই হওয়া এই প্রত্যর্পণ চুক্তিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারা আছে। এই ধারায় বলা হয়েছে, যাকে হস্তান্তরের জন্য অনুরোধ জানানো হচ্ছে তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ যদি ‘রাজনৈতিক’ হয়, তাহলে সেই অনুরোধ খারিজ করা যেতে পারে।
বিবিসি বাংলা এক প্রতিবেদনে বলেছে, কোন কোন অপরাধকে ‘রাজনৈতিক’ বলা যাবে না, তার মধ্যে রয়েছে হত্যা, গুম, অনিচ্ছাকৃত হত্যা, বোমা বিস্ফোরণ ও সন্ত্রাসবাদের মতো অপরাধ। শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে যে মামলাগুলো হয়েছিল, তার মধ্যে হত্যা, গণহত্যা, গুম ও নির্যাতনের অভিযোগ রয়েছে। ফলে আপাতদৃষ্টিতে তার বিষয়টিকে ‘রাজনৈতিক’ বলে খারিজ করা ভারতের জন্য কঠিন।
২০১৬ সালে চুক্তিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংশোধনী আনা হয়। এর ১০(৩) ধারায় বলা হয়েছে, অভিযুক্তের হস্তান্তরের সময় অনুরোধকারী দেশকে প্রত্যেক অভিযোগের পক্ষে সাক্ষ্য প্রমাণ পাঠানোর প্রয়োজন নেই; শুধু সংশ্লিষ্ট আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা থাকলেই অনুরোধ বৈধ ধরা হবে।
বিবিসি বাংলার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চুক্তিতে এমন কিছু ধারা আছে, যা প্রয়োগ করে অনুরোধ-প্রাপক দেশ অনুরোধ নাকচ করতে পারে। যেমন, অনুরোধ-প্রাপক দেশেও যদি অভিযুক্তের বিরুদ্ধে কোনো ‘প্রত্যর্পণযোগ্য অপরাধে’ মামলা চলে, তাহলে সেটি দেখিয়ে অন্য দেশের অনুরোধ খারিজ করা যায়। শেখ হাসিনার ক্ষেত্রে এটি প্রযোজ্য নয়, কারণ ভারতে তার বিরুদ্ধে কোনো মামলা চলছে না।
দ্বিতীয় ধারাটি হলো, যদি অনুরোধ-প্রাপক দেশের মনে করে অভিযোগগুলো ‘সরাসরি ন্যায়বিচারের স্বার্থে, সরল বিশ্বাসে আনা হয়নি’, তাহলেও তারা অনুরোধ নাকচ করতে পারবে। অভিযোগগুলো যদি ‘সামরিক অপরাধ’ হয়, যা সাধারণ ফৌজদারি আইনের আওতায় পড়ে না, তাহলেও অনুরোধ নাকচ করা যাবে। বিবিসি বাংলার মতে, ভারত এখনও বলতে পারে, শেখ হাসিনা বাংলাদেশে সঠিক ও সুষ্ঠু বিচার পেয়েছেন বলে তারা মনে করছে না।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ের প্রায় তিন ঘণ্টা পর ভারত সংক্ষিপ্ত প্রতিক্রিয়া দিয়েছে। দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, তারা রায়টি নজরে নিয়েছে।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় লিখেছে, ‘ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশী হিসেবে ভারত সব সময়ের মতোই বাংলাদেশের মানুষের স্বার্থ সমুন্নত রাখার ব্যাপারে নিবেদিত, যার মধ্যে শান্তি, গণতন্ত্র, অন্তর্ভুক্তিমূলক ব্যবস্থা এবং দেশের স্থিতিশীলতা অন্তর্ভুক্ত। এটি নিশ্চিত করার জন্য সংশ্লিষ্ট পক্ষের সঙ্গে আমরা গঠনমূলকভাবে কাজ করব।’
ভারতের শীর্ষ কর্মকর্তাদের উদ্ধৃত করে বিবিসি জানিয়েছে, এই রায়ের পরও দিল্লির অবস্থান পরিবর্তন হয়নি এবং শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশের হাতে হস্তান্তরের কোনো প্রশ্ন ওঠেনি। তিনি ৫ আগস্ট ২০২৪ থেকে আজ পর্যন্ত ভারতের কাছে আশ্রয় পাচ্ছেন বা দেওয়ার অবস্থান অপরিবর্তিত।



