কখনও কখনও আমরা হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং ঢাকার আশপাশের এলাকার উপর দিয়ে, আমাদের শহরের উপর দিয়ে যুদ্ধবিমান উড়তে দেখি। এই বিমানগুলো অবিশ্বাস্য গতিতে চলে এবং একটি তীব্র, রোমাঞ্চকর শব্দ তৈরি করে, যা আমাদের অনেককে বিশেষ করে শিশু‑তরুণদের আলোড়িত করে। এই ধরনের দৃশ্য প্রায়শই যুদ্ধবিমানের পাইলট হওয়ার স্বপ্নকে অনুপ্রাণিত করে। তবে এই উত্তেজনার পেছনে একটি বিপজ্জনক বাস্তবতা রয়েছে, যা আমরা খুব কমই বিবেচনা করি।
এই কঠোর সত্যটি হৃদয়বিদারকভাবে বাস্তব হয়ে সামনে এসেছে গত ২১ জুলাই, যখন বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর এফ–৭ বিজিআই মডেলের একটি যুদ্ধবিমান উত্তরার দিয়াবাড়িতে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে বিধ্বস্ত হয়। কাছের একটি বিমানঘাঁটি থেকে উড্ডয়নের কিছুক্ষণ পরই এটি বিধ্বস্ত হয়। জেটটি কারিগরি ত্রুটির শিকার হয় এবং পাইলট ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মো. তৌকির ইসলাম সাগর ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা থেকে এটিকে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন। তিনি জীবন বাঁচাতে বেরিয়ে আসেন। কিন্তু বিমানটি ইতিমধ্যেই নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছিল।
ফলাফল ছিল ভয়াবহ।
বিমানটি সরাসরি স্কুলের ওপর বিধ্বস্ত হয়। আগুনের সূত্রপাত হয়, দেয়াল ধসে পড়ে এবং ভয়াবহ এক আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। শিশু শিক্ষার্থী, শিক্ষক, প্রতিষ্ঠানের কর্মীসহ অনেকে নিহত হন। আহত হয় অনেকে, যাদের মধ্যে বেশ কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। পাইলট, যিনি প্রথমে বেরিয়ে এসে বেঁচে গিয়েছিলেন, পরে গুরুতর আঘাতের কারণে হাসপাতালে মারা যান। এটি বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ সামরিক বিমান দুর্ঘটনা।
এই ঘটনাটি আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষার কথা মনে করিয়ে দেয়–যুদ্ধবিমানের দৃশ্য রোমাঞ্চকর হলেও ঝুঁকি বাস্তব। সামরিক বিমানগুলো খেলনা নয়। তাদের গতি, শক্তি এবং প্রযুক্তিগত জটিলতার অর্থ হলো–যেকোনো ত্রুটির ফলে একটি বিশাল বিপর্যয় ঘটতে পারে, বিশেষ করে জনবহুল শহরাঞ্চলে। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও উত্থাপন করে: বেসামরিক অঞ্চল এবং স্কুলের কাছাকাছি কি সামরিক প্রশিক্ষণ বিমান বা যুদ্ধবিমান পরিচালনার অনুমতি দেওয়া উচিত?
আমরা যখন নিরীহ কোমল প্রাণগুলোর চলে যাওয়া নিয়ে শোকরত, তখন আমাদের বিমান চলাচলের নিরাপত্তা নীতিগুলোও বিবেচনা করতে হবে। পাইলটের সাহসিকতা, উদ্ধারকারীদের নিষ্ঠা এবং ঢাকার জনগণের দেখানো ঐক্য ও কান্না হারিয়ে যাওয়া প্রাণ ফিরিয়ে আনতে পারে না। তবে এই সবকিছুই আমাদের অনুপ্রাণিত করতে পারে, যাতে এই ধরনের দুর্ঘটনার পুনরাবৃত্তি না হয়।
বেসামরিক উড়োজাহাজগুলো মূলত যাত্রী ও পণ্যসম্ভার নিরাপদে, আরামদায়ক এবং দক্ষতার সাথে পরিবহনের জন্য ডিজাইন করা হয়। আর যুদ্ধবিমান যুদ্ধ, নজরদারি, বাধাপ্রদান এবং কৌশলগত আক্রমণের মতো সামরিক মিশনের জন্য তৈরি করা হয়।
বেসামরিক উড়োজাহাজগুলো পূর্ব-নির্ধারিত রুটে উড্ডয়ন ও অবতরণ করে এবং তা হয় ধীর ও স্থিরতা বজায় রেখে। অন্যদিকে, যুদ্ধবিমানগুলো অত্যন্ত গতিশীল এবং আক্রমণাত্মকভাবে উড়ে যায়। তারা মিশনের সময় দ্রুত আরোহণ, খাড়া ডাইভ, তীক্ষ্ণ বাঁক, লুপ এবং রোল সম্পাদন করে।
বেসামরিক বিমানবন্দরে কেন যুদ্ধবিমান যুদ্ধ কৌশল পরিচালনা করা উচিত নয়:
হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের মতো বেসামরিক বিমানবন্দরগুলো যাত্রীবাহী বৃহৎ আকারের বাণিজ্যিক উড়োজাহাজ পরিচালনা করে। ফাইটার জেট কৌশলগত ফ্লাইটের অংশ হিসেবে এর হঠাৎ আরোহণ, তীক্ষ্ণ বাঁক, উচ্চ গতি এবং অপ্রত্যাশিত গতিপথ জড়িত, যা বাণিজ্যিক উড়োজাহাজের নিরাপদ উড্ডয়ন পথের সাথে সাংঘর্ষিক হতে পারে। এটি মাঝ আকাশে সংঘর্ষ বা রানওয়েতে অনুপ্রবেশের ঝুঁকি বাড়ায়।
বেসামরিক বিমানবন্দরগুলো সুশৃঙ্খলভাবে ফ্লাইট পরিচালনার জন্য কঠোরভাবে এটিসি (এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল) পদ্ধতি অনুসরণ করে। ফলে ফাইটার জেট নির্ধারিত টেকঅফ, ল্যান্ডিং ও উড়োজাহাজ চলাচলের এ প্রবাহকে ব্যাহত করতে পারে। পাশাপাশি ফাইটার জেটগুলো অত্যন্ত জোরে ও সনিক বুম বা শকওয়েভ সৃষ্টি করে। বেসামরিক বিমানবন্দরের আশপাশে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় এই ধরনের কৌশল অনুশীলন জনসাধারণের মধ্যে ভয়, আতঙ্ক তৈরি করে, যা এমনকি প্যানিক অ্যাটাক পর্যন্ত করতে পারে।
শাহজালালে যুদ্ধবিমানের ক্ষেত্রে কী অনুশীলন করা হয়?
হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর একটি বেসামরিক বিমানবন্দর হলেও এটি প্রায় সময় বাংলাদেশ বিমানবাহিনী বিশেষ সমন্বয়ের মাধ্যমে ব্যবহার করে। এই বিমানবন্দর যুদ্ধ অনুশীলনের জন্য নয়। বরং ট্রানজিট স্টপ হিসেবে একে ব্যবহার করা যেতে পারে।
নিয়মিত যুদ্ধবিমান প্রশিক্ষণ, অনুশীলন, বা যুদ্ধ কৌশল নির্দিষ্ট বিমানঘাঁটিতে করা হয়। আমাদের দেশে এমন ঘাঁটি হচ্ছে–বিএএফ ঘাঁটি বঙ্গবন্ধু (কুর্মিটোলার কাছে), বিএএফ ঘাঁটি জহুরুল হক (চট্টগ্রাম) অথবা বিএএফ ঘাঁটি মতিউর রহমান (যশোর)।
ঢাকা বিমানবন্দর কি বিমানবাহিনীর উড়ান অনুশীলনের জন্য নিরাপদ?
ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর মূলত যাত্রীবাহী, বাণিজ্যিক বিমান উড়ানের জন্য একটি ব্যস্ত বিমানবন্দর। ঢাকা বিমানবন্দরটি একটি জনাকীর্ণ শহর এলাকায় অবস্থিত, যেখানে এই ধরনের সামরিক উড়ানের জন্য পর্যাপ্ত জায়গা নেই। এটি নিয়মিত বিমানবাহিনীর উড়ান অনুশীলন বা কৌশলের জন্য তৈরি নয়।
ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাছে সাম্প্রতিক দুর্ঘটনাটি একটি গুরুতর সতর্কতা ছিল। এটি ছিল বিপর্যয়কর, এবং এটি স্পষ্টভাবে আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, আমাদের আরও সতর্ক হতে হবে। যদি আমরা এই ঝুঁকিগুলোকে উপেক্ষা করতে থাকি, তাহলে পরবর্তী দুর্ঘটনা আরও বিপজ্জনক হতে পারে এবং সম্ভবত আরও মারাত্মক হতে পারে। অনেক দেরি হওয়ার আগে বিমান চলাচলের নিরাপত্তাকে গুরুত্ব সহকারে নেওয়ার সময় এসেছে।
একটি প্রধান উদ্বেগ হলো যে, বিমানবাহিনীর জেটগুলো হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের মতো একটি বেসামরিক বিমানবন্দরের ওপর দিয়ে উড়ছে, যা ইতোমধ্যে বাণিজ্যিক ফ্লাইটের জন্য খুব ব্যস্ত। এই বিমানবন্দরটি ঘন আবাসিক এবং বাণিজ্যিক এলাকা, বাড়িঘর, স্কুল, হাসপাতাল, অফিস দ্বারা বেষ্টিত। যুদ্ধবিমানগুলো উচ্চ গতিতে ওড়ে এবং এর নিরাপদে নানা যুদ্ধ কৌশল অনুশীলনের জন্য আরও অনেক বেশি খোলা জায়গা প্রয়োজন। তাই এই ধরনের ফ্লাইটগুলো বেসামরিক এলাকার উপর দিয়ে নয়, বরং নির্দিষ্ট সামরিক বিমানঘাঁটিতে হওয়া উচিত।
আরেকটি প্রধান সমস্যা হলো বিমানবন্দরের কাছে উঁচু ভবনের অবস্থান। বিশেষ করে রানওয়ে অ্যাপ্রোচ পাথ বরাবর এ ধরনের ভবনের অবস্থান নিরাপদ টেকঅফ ও ল্যান্ডিংয়ের সময় পাইলটদের বাড়তি চিন্তার কারণ। উড়োজাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিয়ম অনুসারে এই অঞ্চলগুলোতে উঁচু ভবন নির্মাণ কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ছিল। কিন্তু এখন আমরা উত্তরা, নিকুঞ্জ, তেজগাঁও এবং বনানীর মতো জায়গায় নতুন নতুন আকাশচুম্বী ভবন দেখতে পাচ্ছি।
অতীতে তেজগাঁওকে কেবল শিল্প এলাকা হিসেবে মনোনীত করা হয়েছিল এবং অঞ্চলটিতে উঁচু ভবন নির্মাণের অনুমতি ছিল না। কিন্তু আজ তেজগাঁওকে একটি বাণিজ্যিক অঞ্চলে রূপান্তর করা হচ্ছে এবং উঁচু ভবনগুলো সব ঝুঁকি উপেক্ষা করে দ্রুত উপরে উঠছে।
বনানীও একই ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, বনানীর শেরাটন হোটেল তার উচ্চতা সীমা অতিক্রম করেছে বলে জানা গেছে, যার সত্যতা অনেকেই ইতিমধ্যেই জানেন। তবুও কেউ পদক্ষেপ নিচ্ছে না। দুর্ঘটনা না হওয়া পর্যন্ত আমরা চুপ থাকি। তারপর দোষারোপের খেলা শুরু হয়। রাজউক ক্যাবকে দোষ দেয়, ক্যাব ডেভেলপারদের দোষ দেয় এবং শেষ পর্যন্ত আসলে কিছুই পরিবর্তন হয় না।
আসল প্রশ্ন হলো–এই ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলো কীভাবে অনুমোদন পাচ্ছে? কেন নিরাপত্তা বিধি প্রয়োগ করা হচ্ছে না? আমরা কি চোখ খোলার আগে একটি বড় বিপর্যয় ঘটার জন্য অপেক্ষা করছি?
এখনই পদক্ষেপ নেওয়ার সময়। আমাদের অবশ্যই বিমান চলাচলের নিরাপত্তা বিধি কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে। রানওয়েতে উড়োজাহাজের প্রবেশের পথগুলো সুরক্ষিত করতে হবে এবং বিমানবন্দরের কাছে অনিরাপদ নির্মাণ বন্ধ করতে হবে। এটি কেবল নীতিমালার বিষয় নয়, এটি জীবন রক্ষার বিষয়। আসুন পরবর্তী দুর্ঘটনার আগেই পদক্ষেপ নিই, পরে নয়।
লেখক: বৈমানিক ও গবেষক, এভিয়েশন সেফটি এন্ড এয়ারক্রাফট এক্সিডেন্ট ইনভেটিগেশন, এভিয়েশন এন্ড এরোস্পেস ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ
[এই মতামত লেখকের নিজস্ব। এর সঙ্গে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পাদকীয় নীতিমালার কোনো সম্পর্ক নেই।]



