দীর্ঘ দশ বছর ধরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় চালানো দক্ষ চালক এবং বিজেপির প্রতাপশালী নেতা অমিত শাহকে মন্ত্রিসভায় চায় না বিজেপির শরিকেরা। বিহারের মুখ্যমন্ত্রী নীতিশ কুমার ও অন্ধ্রপ্রদেশের চন্দ্রবাবু নাইডুকে পাশে না পেলে হয়তো টানা তৃতীয়বার নরেন্দ্র মোদির প্রধানমন্ত্রী হওয়ার স্বপ্ন অনেকটা ফিকে হয়ে যেত। আর সেই সুযোগই এবার নিল বিজেপির নেতৃত্বাধীন জোট এনডিএর শরিক নেতারা। অমিত শাহকে মন্ত্রিপরিষদ থেকে বাদ দেওয়ার পাশাপাশি নিজেদের মতো সবচেয়ে গুরত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় চেয়ে বসেছে জোটের নেতারা। ভাগ্যিশ, প্রধানমন্ত্রী পদ চেয়ে বসেনি।
লোকসভা নির্বাচনের ফলাফলের পর বুধবার বিকেলে শরিকদের সঙ্গে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক করে বিজেপির নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোট। ওই সভায় নরেন্দ্র মোদির বিজেপির নেতৃত্বে সরকার গঠনের বিষয়ে একমত হয়েছেন জোট নেতারা। সভায় মোদিকে সরকার গঠনে দ্রুত কাজ চালিয়ে যেতে বলেছেন বিহারের মুখ্যমন্ত্রী জনতা দল ইউনাইটেডে বা জেডির (ইউ) নেতা নীতিশ কুমার। তাহলে সরকার গঠনে আপত্তি কোথায়? আপত্তি আসলে এখানেই।
বিজেপি এককভাবে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেনি। ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) ২৪০টি আসন পেলেও দিল্লির মসনদে পৌঁছাতে দরকার ২৭২টি আসন। ফলে, জোটের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে দুবারের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে। অন্যদিকে, বিরোধী ইন্ডিয়া জোটও পায়নি ম্যাজিক ফিগারের দেখা। ফলে বিজেপিকে যেমন জোটের শরিকদের সাথে আলোচনায় বসতে হচ্ছে, তেমনি কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন ইন্ডিয়া জোটও চাইছে আলোচনার মাধ্যমে ২৭২ আসনের সেই ম্যাজিক ফিগারের বন্দোবস্ত করতে। ফলে সরকার গঠনে কিংমেকার হিসেবে দেখা দিয়েছেন তেলেগু দেশম পার্টির (টিডিপি) চন্দ্রবাবু নাইডু ও জনতা দল ইউনাইটেডে বা জেডির (ইউ) নীতিশ কুমার। ওই দুজনের হাতে আছে ২৮টি আসন। আর এই সুযোগটিই কাজে লাগিয়েছেন নীতিশ এবং নাইড়ু।
জোটের সভায় নীতিশ এবং নাইড়ু দুজনই স্পিকারের পদ চেয়ে বসেছেন। স্পিকারের পদ তো একটি। তাহলে জোট ধরে রাখতে কাকে ছেড়ে কাকে রাখবেন মোদি! একজনও হাতছাড়া হলে ভেস্তে যাবে মোদির টানা তিনবারের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার স্বপ্ন। ধুলিস্যাৎ হয়ে যাবে ইতিহাস গড়ার স্বপ্ন। এদিকে, অন্ধ্রপ্রদেশের তেলেগু দেশম পার্টির (টিডিপি) চন্দ্রবাবু নাইডুর হাতে যেহেতু ১৬ আসন রয়েছে তাই তাঁর চাহিদাও হয়তো বেশি। তিনি মোদির মন্ত্রিসভায় চেয়েছেন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তিন মন্ত্রণালয়, যার মধ্যে আছে প্রতিরক্ষা ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মতো মন্ত্রণালয়। অন্যদিকে, বিহারের মুখ্যমন্ত্রী জনতা দল ইউনাইটেড বা জেডির (ইউ) নীতিশ কুমার দাবি করে বসেছেন, উপপ্রধানমন্ত্রী, অর্থমন্ত্রী এবং রেলমন্ত্রীর পদ। নীতিশ যে ঝানু রাজনীতিবিদ, সেটার প্রমাণ তিনি মোদিকে দেখিয়ে দিলেন। মাত্র ১২টি আসনের বিপরীতে চেয়েছেন রাষ্ট্রের অতি গুরুত্বপূর্ণ এসব পদ।
মোদির মন্ত্রিসভায় প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন রাজনাথ সিং এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন অমিত শাহ। দুজনই মোদির খুব ঘনিষ্ঠজন। তাছাড়া অমিত শাহ এবারের নির্বাচনে ৭ লাখ ভোটের বেশি ব্যবধানে গান্ধিনগর থেকে জয় পেয়েছেন। এ ছাড়া অমিত শাহ যেভাবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবহার করেছেন, মন্ত্রণালয় যদি মোদির হাত ছাড়া হয়ে যায়, সেক্ষেত্রে কতটা নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারবেন মোদি, সে প্রশ্ন থেকেই যায়। এর বাইরে নীতিশ ও নাইড়ুর দাবি মেনে নিলে মোদির বিজেপির শিবিরে যে প্রভাব পড়বে, তা সামাল দেওয়া কি মোদির পক্ষে সহজ কোনো ব্যাপার হবে? এমন প্রশ্ন কিন্তু থেকেই যায়। শুধু তাই নয়, উপপ্রধানমন্ত্রী, অর্থমন্ত্রী, রেলমন্ত্রী, প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদ ছেড়ে দিয়ে মোদি মন্ত্রিসভা তাহলে চালাবেন কী করে। ২৪০ আসন পাওয়া বিজেপির হাতেই–বা থাকবে কী? গৃহবিবাদই তো তখন বাস্তবতা হয়ে উঠতে পারে।
টানা তৃতীয়বারের মতো নরেন্দ্র মোদির দল বিজেপির নেতৃত্বাধীন জোট সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও সরকার গঠন করা নিয়ে যে সংকট তৈরি হয়েছে, তা সমাধানে আগামীকাল আবারও জোটের সঙ্গে বৈঠকে বসতে যাচ্ছেন মোদি। সংকট সমাধানে আবারও প্রমাণ দিতে হবে মোদির ম্যাজিকেল নেতৃত্বকে। ভোটের মাঠ পার করলেও এখনই বলা যাচ্ছে না যে, সরকার গঠনের সংকট কেটেছে। সে পর্যন্ত হয়তো বৈঠকের ফলের দিকে চেয়ে থাকতে হবে ভারতকে। গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী ও পরে দুই দফায় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে একনায়কের মতো সরকার চালিয়ে এসেছেন মোদি। সেই মোদি কি শরিকদের দাবি-দাওয়া মেনে নিয়ে সরকার চালাতে পারবেন? সেই প্রশ্ন কিন্তু থেকেই যাবে।
এদিকে, ভারতের রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর কাছে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন দেশটির বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। পদত্যাগপত্র দেওয়ার সময় মোদিকে নতুন সরকার গঠন হওয়ার আগ পর্যন্ত দায়িত্ব পালনের জন্য অনুরোধ করেছেন মুর্মু। এনডিএ জোট সরকার গঠন করলে আগামী শনিবার ৮ জুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেবেন নরেন্দ্র মোদি। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যাবে আস্থা ভোট নিয়ে। আছে এনডিএ ও ইন্ডিয়া জোটের জটিল সব হিসাব–নিকাশ। বারবার ভোল পাল্টানো নীতিশ কুমারের ১২ আসনই এখন ভারতের রাজনীতিতে ফল নির্ধারক হয়ে উঠছে।
শরিকেরা যেভাবে মন্ত্রণালয় চেয়েছেন, তাতে স্বরাষ্ট্র, প্রতিরক্ষা, রেল, অর্থ মন্ত্রণালয় নিয়ে আলাপে বসতে হচ্ছে বিজেপিকে। এর মধ্যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ছেড়ে দিতে হলে মোদি–অমিত জুটির এনফোর্সমেন্ট ডেরেক্টরেট (ইডি) নিয়ে খেলাটার কী হবে? মোদি–অমিত জুটির জন্য এ বেশ জটিল প্রশ্ন। একই সঙ্গে শঙ্কাও। কারণ, এই এক মন্ত্রণালয় দিয়ে বিরোধী দমনের যে উদাহরণ তাঁরা সৃষ্টি করেছেন, তা–ই না বুমেরাং হয়ে আসে আবার। ফলে জোটের সভায় সিদ্ধান্ত আসাটা সহজ হবে না কোনোভাবেই।



