ভারতে ভোটের ফলপ্রকাশ হয়েছে গত ৪ জুন মঙ্গলবার। ফলের গতিমুখ বুঝতে পেরে বেলা ১২টার দিকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি প্রথম ফোনটি করেন চন্দ্রবাবু নাইডুকে। পরে নীতিশ কুমারকে। তবে নীতিশ ওই দিন কোনো বিজেপি নেতার ফোন ধরেননি বলে অভিযোগ আছে। এমনকি বিহারের রাজ্য বিজেপির সভাপতি নীতিশের বাসভবনে গিয়েও তাঁর দেখা পাননি। তবে এর একদিনের মধ্যে নরেন্দ্র মোদি এনডিএ জোটের নেতা নির্বাচিত হলেন। পাশে ডেকে নিলেন দুই বড় সহযোগী বিহারের মুখ্যমন্ত্রী নীতিশ কুমার ও অন্ধ্রপ্রদেশের ভবিষ্যৎ মুখ্যমন্ত্রী চন্দ্রবাবু নাইডুকে। একই দিনে তিনি রাষ্ট্রপতির কাছে পদত্যাগপত্র পেশ করলেন। এবং ঘোষণা দিলেন, এনডিএ জোটের নেতা হিসেবে তিনি তৃতীয়বারের মতো শপথ নিতে যাচ্ছেন। এনডিএ জোটগতভাবে ২৭২-এর বেশি (২৯৩) আসন পাওয়ায় সরকার গঠনের একমাত্র দাবিদার হিসেবে উঠে এসেছে, এ বিষয়ে সন্দেহ নেই। এখন পর্যন্ত সবকিছু ঠিকঠাক চললে শনি অথবা রোববার নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে নতুন সরকার শপথ নিতে চলেছে।
প্রশ্ন হলো—দশ বছর ক্ষমতায় থাকার পর এবং জোটগতভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েও নরেন্দ্র মোদি পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার জন্য এতটা মরিয়া কেন? ২০১৪ সালে লোকসভার নির্বাচনের ফল ঘোষণা হয় ১৬ মে। একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের পরও নরেন্দ্র মোদি এর ১০ দিন পর ২৬ মে প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। ২০১৯-এ লোকসভার ভোটের ফল ঘোষণা হয়েছিল ২৩ মে। আগের চেয়ে আরও বেশি আসন পাওয়া আসন সত্ত্বেও এর সাত দিন পর মোদি দ্বিতীয়বারের মতো ভারতের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। ২০২২ সালে যোগী আদিত্যনাথের নেতৃত্বে বিজেপি উত্তর প্রদেশে জয় পায় ১০ মার্চ। কিন্তু তাঁকে দ্বিতীয়বারের জন্য মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হয়েছিল ১৫ দিন। অথচ তিনি ছিলেন দলের মধ্যে অটোমেটিক চয়েজ বা বিকল্পহীন পছন্দ। কিন্তু মোদি-শাহ জুটির সবুজ সংকেত না পাওয়ায় লক্ষ্ণৌর কুর্সিতে বসতে পারেননি জেতার সাথে সাথে। ৪ জুনের ঘোষিত ফলাফল অনুযায়ী এবারের লোকসভায় একক গরিষ্ঠতা হারিয়েছে নরেন্দ্র মোদির বিজেপি। সরকার গড়ার জন্য একান্তই নির্ভর করতে হচ্ছে জোটের শরিকদের ওপর, যাদের এতদিন তারা কোনো পাত্তাই দেয়নি। তারপরও ফল ঘোষণার ৪-৫ দিনের শপথ নিতে মরিয়া মোদি। কেন?
তাহলে একক গরিষ্ঠতা হারানোই কি এর পেছনে মুখ্য কারণ হিসেবে কাজ করছে? শরিকদের ওপর বিশ্বাস রাখতে পারছেন না নরেন্দ্র মোদি? হতেই পারে। কারণ, গত পাঁচ বছরে শরিকদের সাথে এমন আচরণ করেছেন মোদি-শাহ জুটি যে তাতে তাঁদের ওপর আস্থা রাখার তেমন কোনো যুক্তিগ্রাহ্য কারণ নেই। নীতিশ কুমারের কথাই ধরা যাক। তিনি বেশ কয়েকবার জোট বদল করেছেন। গত বছরও তিনি কংগ্রেস ও আরজেডির সাথে ছিলেন। বিজেপি বিরোধী ইন্ডিয়া মহাজোটের তিনি অন্যতম রূপকার। এই জোটের প্রথম বৈঠক তাঁর রাজ্যের রাজধানী পাটনায় হয়েছিল। হঠাৎ কী এমন হলো যে, জোট সঙ্গীদের আক্কেলগুড়ুম করে দিয়ে রাতারাতি তিনি ফিরে গেলেন বিজেপির সাথে। অমিত শাহ যাকে ঘোষণা দিয়েছিলেন কোনো দিন জোটে না নেওয়ার জন্য, সেই নীতিশকে সাদরে বরণ করে নিলেন নিজেদের সাথে। কিন্তু এই পল্টিবাজির পেছনে কী এমন ছিল, যা কেউ বলতে পারছে না। পারছে না কারণ, প্রমাণ নেই কারও কাছে। তবে অনেকের অভিযোগ, প্রতিবেশী ঝাড়খণ্ডের মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত সরেনের দশা হতে পারে, এমন হুমকিও নাকি পেয়েছিলেন নীতিশ। ফলে মুখ্যমন্ত্রীর কুর্সি থেকে সরাসরি জেলে যাওয়ার চেয়ে পল্টি মারাই শ্রেয় বলে তিনি মনে করেছেন। এবার মোদির সাথে বৈঠকের পরও নীতিশের সাথে ইন্ডিয়া জোটের একাধিক নেতা কথা বলছেন। তেজস্বী যাদবের তো চাচা নীতিশের ওপর অগাধ আস্থা। কী করবেন নীতিশ শেষ পর্যন্ত—বিরাট প্রশ্ন!
নীতিশের মতো অতটা সৌভাগ্যবান ছিলেন না চন্দ্রবাবু নাইডু। তাঁর বাড়িতে ইডি, সিবিআই, আয়কর বিভাগ সবাই হানা দিয়েছে। জেলের ঘানিও টানতে হয়েছে। চন্দ্রবাবু যে তাঁর শ্বশুর এনটি রামরাওকে পেছন থেকে ছুরি মেরেছিলেন, এ অভিযোগ শুধু নরেন্দ্র মোদি করেননি, আমিত শাহও সমাবেশ করে ঘোষণা দিয়েছিলেন। তাঁদের সম্পর্কে চন্দ্রবাবুর মনোভাব ছিল অন্যরকম। চন্দ্রবাবু বলেছিলেন, ভারতের যেকোনো রাজনীতিক নরেন্দ্র মোদির চেয়ে ভালো। এই তিন নেতার বক্তব্যের ভিডিও রেকর্ড এখন ভারতের অসংখ্য ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সোশ্যাল মিডিয়া হ্যান্ডেলে ঘুরছে। চন্দ্রবাবু সর্বশেষ তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী স্ট্যালিনের সাথে বৈঠক করেছেন। মোদিকে প্রতিশ্রুতি দিয়ে আসার পর অনুষ্ঠিত এই বৈঠকের ছবি সমাজ মাধ্যমে ভাইরাল। বিজেপির সাথে সরকারে যাওয়ার ঘোষণার পর অন্ধ্রপ্রদেশে চন্দ্রবাবুর ছবি পোড়ানো হয়েছে। তাঁর শপথ গ্রহণের দিনও পিছিয়ে গেছে বলে শোনা যাচ্ছে। ফলে ভারতের রাজনীতির এই বিষয়গুলো আসলে খুব সরলরৈখিক পথ ধরে এগোচ্ছে না, তা জোর দিয়ে বলা যায়।
আরেক সহযোগী বিহারের চিরাগ পাশোয়ান। পাঁচটি আসন তাঁর দলের হাতে। গত মেয়াদে চিরাগের লোক জনশক্তি পার্টিকে ভাঙার মধ্য দিয়ে বিজেপি শরিক দলগুলোকে লন্ডভন্ড করে দেওয়ার কাজে হাত পাকানো শুরু করেছিল। এবার ভোটের আগে সেই চিরাগকে সাথি করতে হয়েছে। গরজ বড় বালাই। সব মিলিয়ে বিজেপি সম্পর্কে অন্য শরিকদের মনোভাবও এই তিনজনের চেয়ে খুব একটা আলাদা নয়।
ফলে একদিকে সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকা, অন্যদিকে এহেন শরিকদের ওপর নির্ভরতা-নির্ভর ভবিষ্যৎ নরেন্দ্র মোদিকে চিন্তায় ফেলবেই, এটা বিস্ময়কর কোনো বিষয় নয়। গত দুটি মেয়াদ তিনি যেখানে একনায়কের ঢঙে চলেছেন, সেখানে এটা তো বিরাট বিড়ম্বনা। কারও মন জুগিয়ে চলা তো ক্ষমতাধর নরেন্দ্র মোদির ডিএনএতেই নেই। এর মধ্যে শরিকদের নানা বায়ানাক্কা শুরু হয়েছে। মনমতো মন্ত্রণালয় পাওয়া থেকে শুরু করে লোকসভার স্পিকার পদ পর্যন্ত—অনেক দাবি শরিকদের। শরিকেরাও বুঝে গেছে, এটাই মোক্ষম সময়। এই রকম একটা টালমাটাল সংসদে স্পিকার পদ বিরাট গুরুত্বপূর্ণ। তারা জানে, মোদি একবার ক্ষমতায় গেড়ে বসতে পারলে তাদের আর দাম থাকবে না। পাশাপাশি অমিত শাহকে মন্ত্রিসভা থেকে বাদ দেওয়ার দাবি উঠেছে। মোদি সেটা পারবেন কি পারবেন না, ভবিষ্যৎই বলবে। ফলে গত দুবারের মতো সহজ হবে না মোদির তৃতীয়বারের শুরুটা।
এ তো গেল বাইরের কথা। ঘরের ভেতরে যা চলছে, সেটা নিয়েও নরেন্দ্র মোদি শঙ্কিত। সে কারণে এত তাড়িঘড়ি করে শপথ নেওয়ার উদ্যোগ। বিশেষ করে উত্তর প্রদেশের বিজেপির ফল অন্যদের মতো দলের সর্বস্তরের নেতা-কর্মীকে চমকে দিয়েছে। অযোধ্যায় বাবরি মসজিদের জায়গায় রামমন্দির তৈরি ও উদ্বোধনের পরও মোদির দল ওই রাজ্যে ভালো করতে পারেনি। এমনকি অযোধ্যা যে সংসদীয় এলাকায় সেই ফৈজাবাদে বিজেপি প্রার্থী হেরে গেছেন সমাজবাদী পার্টির কাছে। স্মৃতি ইরানির হারের কথা না হয় বাদই দেওয়া গেল। কিন্তু গণনার প্রথম তিন রাউন্ডে প্রধানমন্ত্রী মোদি যে কংগ্রেস প্রার্থীর থেকে পিছিয়ে ছিলেন, তা তো কেউ ভুলছে না। গতবার যে বারানসী থেকে তিনি প্রায় ৫ লাখ ভোটে জিতেছিলেন। এবার সেই সংখ্যা দেড় লাখে নেমে এসেছে। তাঁর চেয়ে অনেক বেশি ভোটে জিতেছেন রাহুল ও অখিলেশরা। কী ব্যাখ্যা এর? বিজেপির মধ্যেই কথা উঠেছে অন্তর্ঘাতের। কে করল এই অন্তর্ঘাত?
মুখ্যমন্ত্রী যোগীর সমর্থকেরা বলছেন, মোদি-শাহ জুটি এই রাজ্যে নিজেদের খেয়াল‑খুশিমতো প্রার্থী দেওয়ায় দলের এই হাল হয়েছে। তাঁদের এই কথায় যথেষ্ট যুক্তি আছে। ভোটের প্রচারের শুরুতে বিজেপির কোনো পোস্টার-ব্যানারে বুলডোজার মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথের ছবি দেওয়া হয়নি। পুরোটাই ছিল মোদিময়। কিন্তু প্রথম দুই দফা ভোটের পর অবস্থা বেগতিক দেখে মোদির পাশে ফেরত আনা হয় যোগীকে। তাতে খুব একটা কাজ হয়নি। মোদি-শাহ সমর্থকেরা পাল্টা অভিযোগ করছেন, মোদি যাতে আগের মেয়াদের মতো শক্তিশালী হয়ে সরকার গঠন না করতে পারেন, সেজন্য এই অন্তর্ঘাত। বিজেপির এই অন্তর্দলীয় কোন্দল প্রকাশ্যে এল মোদির দাপট কমার সাথে সাথে। এটা এতদিন ‘মিত্রদের’ মধ্যে চাপাছিল। এখন আর কারও তেমন রাখঢাক নেই। তবে মোদির জন্য এখন পর্যন্ত সুবিধা হলো, বিজেপির পিতৃ সংগঠন আরএসএস মুখ খোলেনি। তবে আরএসএস-এর নাম দিয়ে সংবাদমাধ্যমে নানা ভাষ্য আসতে শুরু করেছে। যার কোনোটিই আসলে মোদি-শাহ জুটির পক্ষে যায় না।
এখনো পর্যন্ত বিজেপি সংসদীয় দলের বৈঠকের সময় জানানো হয়নি। সংসদীয় দলের বৈঠক ছাড়া নরেন্দ্র মোদির পক্ষে বিজেপির সংসদীয় দলনেতার স্বীকৃতি পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। তিনি হয়তো হবেন, এটা নিশ্চিত। তারপরও আইন, নিয়ম এসব বলে তো একটা কথা আছে। তাহলে বিজেপি সংসদীয় দলের নেতা নির্বাচিত হওয়ার আগেই তিনি হয়ে গেলেন এনডিএ জোটের প্রধান মুখ। কারা তাঁকে এই স্বীকৃতি দিলেন জোট শরিকদের শীর্ষ নেতারা। কিন্তু এই স্বীকৃতি তো আসতে হবে এনডিএ জোটের সব শরিক দলের এমপির কাছ থেকে। আসলে গত ৫ জুন জোটের বৈঠকে নরেন্দ্র মোদিকে নেতা নির্বাচনের যে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, যেখানে নীতীশ কুমার ও চন্দ্রবাবু নাইডুর সই আছে বলে বলা হচ্ছে, তার আইনি ভিত্তি খুবই দুর্বল।
তবে নরেন্দ্র মোদির জন্য সবচেয়ে বিপর্যয়কর কাজটা করেছেন মহারাষ্ট্রের বিজেপি নেতা দেবেন্দ্র ফড়নবিশ। মহারাষ্ট্রে বিজেপির নির্বাচনী বিপর্যয়ের সব দায়িত্ব মাথায় নিয়ে নিজের পদ থেকে (উপমুখ্যমন্ত্রী) সরে দাঁড়ানোর কথা বলেছেন ফড়নবিশ। এই ফড়নবিশই একসময় মহারাষ্ট্রে বিজেপির মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন। উদ্ধবের সরকার ভাঙতে তিনিই সব কলকাঠি নেড়েছেন। সবশেষে উপমুখ্যমন্ত্রী হওয়ার অপমান সহ্য করতে হয়েছে। জনপ্রিয় এই মারাঠা নেতাকে খুব জেনে বুঝেই সাইজ করা হয়েছে। আর তিনিও ঝোপ বুঝে কোপ মারলেন। এই আলোচনা বিজেপির ভেতরে-বাইরে সর্বত্র যে, দলের ফলাফলের বিপর্যয়ে দায়িত্ব নিয়ে যদি ফড়নবিশ পদত্যাগ করতে পারেন, তাহলে যারা বিজেপিকে ৩০৩ থেকে ২৪০-এ নামিয়েছেন, তাঁরা পদে থাকেন কোন যোগ্যতায়? এই ‘যারা’র আসলে নরেন্দ্র মোদি, তাঁর বিশ্বস্ত অমিত শাহ ও বিজেপির সভাপতি জেপি নাড্ডা। এখনো ফড়নবিশের পদত্যাগপত্র গ্রহণ করা হয়নি, এটাই বাঁচোয়া। নাহলে মোদি-শাহ জুটির বিরুদ্ধে প্রচার কোন পর্যায়ে যেত বলা কঠিন।
এখন নিশ্চয় বুঝতে পারছেন নরেন্দ্র মোদির হাতে এবার সময় এত কম কেন।
লেখক: নির্বাহী সম্পাদক, ডিজিটাল মিডিয়া, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন
[এই মতামত লেখকের নিজস্ব। এর সঙ্গে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পাদকীয় নীতিমালার কোনো সম্পর্ক নেই।]
আরও পড়ুন:


মোদি-বিরোধীরা এতটা ছন্নছাড়া কেন?
