লোকসভা নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি ভারতের ক্ষমতাসীন দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। সরকার গঠন করতে তাকিয়ে থাকতে হয়েছে এনডিএ জোটের সঙ্গীদের দিকে। শেষমেশ তা সম্ভব হয়েছে চন্দ্রবাবু নাইডু ও নীতিশ কুমারের লিখিত সমর্থন নিয়ে। কিন্তু জোটসঙ্গী এই দলগুলোর আবদার কি বিজেপি নেতা নরেন্দ্র মোদি পূরণ করবেন?
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি বলছে, কেন্দ্রীয় সরকারের গুরুত্বপূর্ণ কিছু পদে নিজেদের দাবি জানিয়ে রেখেছেন বিজেপির জোটসঙ্গী তেলেগু দেশাম পার্টির (টিডিপি) চন্দ্রবাবু নাইডু ও জনতা দল ইউনাইটেড বা জেডির (ইউ) নীতিশ কুমার।
তবে, বেশ কয়েকটি সূত্রের বরাতে এনডিটিভি জানিয়েছে, মন্ত্রিপরিষদের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো নিজেদের হাতেই রাখতে চাইছে বিজেপি। এমনকি পার্লামেন্টেও নিজেদের প্রভাব রাখতে চাইছে তারা।
বিজেপির চার জোটসঙ্গী টিডিপি, জেডি (ইউ), শিবসেনা ও লোক জনশক্তি পার্টি-রাম বিলাস। এর মধ্যে চন্দ্রবাবু নাইডুর টিডিপি জিতেছে ১৬টি আসনে। এ ছাড়া নীতিশ কুমারের জেডি (ইউ) ১২টি, একনাথ শিন্ডের শিবসেনা ৭ ও চিরাগ পাসওয়ানের লোক জনশক্তি পার্টি-রাম বিলাস জিতেছে ৫টি আসনে।
এসব আসন মিলিয়েই সরকার গঠন করতে যাচ্ছেন নরেন্দ্র মোদি। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিতে চলেছেন তিনি। তবে, জোটের পুরোনো নেতা চন্দ্রবাবু নাইডু ও নীতিশ কুমারের নজর এখন কেন্দ্রের গুরুত্বপূর্ণ সব পদের দিকে। এরই মধ্যে নিজেদের আবদারও জানিয়ে দিয়েছেন এই দুই নেতা।
এই দুই নেতার মধ্যে একটু বেশি গুরুত্ব পাচ্ছেন চন্দ্রবাবু নাইডু। আর তিনি চাইছেন, লোকসভার স্পিকার পদটা যেন তাঁর দল থেকে দেওয়া হয়। আর নীতিশ কুমারের জেডি (ইউ) চাইছে, তারাও জোটের গুরুত্বপূর্ণ পদ চান। এনডিএ জোটের বিশেষ সমন্বয়ক কমিটির নেতৃত্বও চান নীতিশ কুমার।
কিন্তু চন্দ্রবাবু নাইডুর টিডিপিকে স্পিকারের পদ দিতে রাজি নয় বিজেপি। এর পরিবর্তে তারা টিডিপিকে ডেপুটি স্পিকারের পদের প্রস্তাব করতে পারে। আর নীতিশ কুমারের জেডিকে (ইউ) দেওয়া হতে পারে রাজ্যসভার ডেপুটি চেয়ারম্যানের পদের প্রস্তাব।
গত ১০ বছর কেন্দ্রীয় সরকার পরিচালনায় ক্ষমতার পূর্ণ ব্যবহারে অভ্যস্ত নরেন্দ্র মোদি এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকে এবার শুনতে হবে অন্যদের মতামতও। কারণ জোট সরকার ছাড়া আর কোনো পথ ছিল না মোদির। তাই অন্যদের মতামতকে অগ্রাহ্য করার সুযোগ নেই।
বিশ্লেষকদের মতে, এভাবে কাজ করার অভিজ্ঞতা মোদির নেই। গত তিন দশকে তিনি তিনবার গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী এবং দুবার প্রধানমন্ত্রী হয়ে একরকম একচ্ছত্র আধিপত্য নিয়ে কাজ করেছেন। এখন হুট করে সমন্বয় করে, ঐকমত্যের ভিত্তিতে রাজনীতি করা তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। এই নতুন কাজের ধরন তিনি কতটা গ্রহণ করতে পারবেন, তার ওপরেই এই সরকারের স্থায়িত্ব নির্ভর করছে।
বেশ কয়েকটি সূত্রের বরাতে সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়া টুডে বলছে, মন্ত্রিপরিষদে এবার আর নিজের ইচ্ছার প্রতিফলন করতে পারবেন না নরেন্দ্র মোদি। জোটসঙ্গীদের কিছু মন্ত্রণালয় দিয়ে দিতে হবে। এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে চারটি মন্ত্রণালয় নিয়ে। স্বরাষ্ট্র, পররাষ্ট্র, প্রতিরক্ষা ও অর্থ—এই মন্ত্রণালয়গুলো কোনোক্রমেই হাতছাড়া করতে চাইছে না বিজেপি।
এনডিটিভি বলছে, পরিবহন খাত ও এর উন্নয়ন বিভাগটাও নিজেদের হাতেই রাখতে চান বিজেপির শীর্ষ নেতারা। নির্বাচনের ইশতেহারে চারটি বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছিলেন নরেন্দ্র মোদি। দারিদ্র, নারী, তরুণ ও কৃষক—এই চার বিষয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত খাতগুলোও বিজেপি নিজেদের পকেটেই রাখতে চায়।
এর মধ্যে সড়ক যোগাযোগে গত ১০ বছরে বেশ প্রশংসা কুড়িয়েছেন নরেন্দ্র মোদি। এই ধারা হারাতে চাইবে না বিজেপি। এ ছাড়া রেল মন্ত্রণালয়ে নীতিনির্ধারকের পদ চাইছে নীতিশ কুমারের জেডি (ইউ)। তবে, বিজেপি বলছে তারা এই মন্ত্রণালয়কে ঢেলে সাজাচ্ছে, এ কারণে এই মন্ত্রণালয় ছাড়া যাবে না।
এর পরিবর্তে জেডিকে (ইউ) পঞ্চায়েতি রাজ, আঞ্চলিক উন্নয়নের মতো খাতগুলোর গুরুত্বপূর্ণ পদ প্রস্তাব করা হবে। টিডিপিকে দেওয়া হতে পারে সিভিল অ্যাভিয়েশন ও স্টিল বিভাগের পদ। এ ছাড়া পর্যটন, স্কিল ডেভেলপমেন্ট, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এবং আর্থ সায়েন্স খাত সঙ্গীদের প্রস্তাব করতে পারে বিজেপি।
একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেয়ে বেশ বিপাকেই পড়েছেন বিজেপি নেতা নরেন্দ্র মোদি। পার্লামেন্টে নিজেদের মতো সব আইন পাস করাতে পারবেন না। এর বাইরে জোটের রয়েছে কিছু জটিলতা। বিজেপি যেখানে হিন্দুত্ববাদের রাজনীতি বা ধর্মভিত্তিক রাজনীতিতে অভ্যস্ত, অন্যদিকে নীতিশের জেডি (ইউ) ও নাইডুর টিডিপি দুই দলই নিজেদের দাবি করে ধর্মনিরপেক্ষ হিসেবে।
মুসলিম ভোটারদের সমর্থনের ওপর নির্ভর করে নীতিশের জেডি (ইউ) ও নাইডুর টিডিপি। এমতাবস্থায় এই জোটে ফাঁটল দেখা দেয় কিনা, সেটি দেখার বিষয়। আর জোট না ভাঙলেও মোদি আর আগের মতো প্রভাব বিস্তার নাও করতে পারেন। ছাড়তে হতে পারে গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়।



