ভারতের বহুল আলোচিত নির্বাচন শেষ। টানা তৃতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন নরেন্দ্র মোদি। এই হিসেবে তিনি এখন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী পণ্ডিত জওহরলাল নেহরুর কাতারে চলে গেলেন। এটা রাজনীতিক মোদির জন্য যেমন বিরাট এক প্রাপ্তি, তেমনই এবারের পুরো নির্বাচন প্রক্রিয়া ও ফলাফল ভারতীয় গণতন্ত্রের সাবালকত্বেরও বড় প্রমাণ। তবে এখনো নেহরুর চেয়ে একটি বিষয়ে মোদি অনেক পিছিয়ে। নেহরু প্রধানমন্ত্রী ছিলেন ১৬ বছর ২৮৬ দিন। মোদিকে এই রেকর্ড ভাঙতে হলে এই পাঁচ বছর তো টিকতেই হবে, ২০২৯ সালেও প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিতে হবে। ততদিনে তিনি অশীতিপর হওয়ার পথে চলে যাবেন।
তবে ২০১৪ সালের মে মাসে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়ে এবং টানা ১০ বছর একাদিক্রমে পূর্ণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার চালিয়ে নরেন্দ্র মোদি পণ্ডিত নেহরুর অনেক রেকর্ডই ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছেন। এর মধ্যে প্রধান হলো—ধর্মনিরপেক্ষ, উদার ও বহুমতের সমন্বয়ে চলা রাষ্ট্রকাঠামো। দেশ হিসেবে ভারত যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর এক অনন্য উদাহরণ। এখানে ধর্মের যত না ভিন্নতা আছে, তারচেয়ে জাতি-জনজাতি, ভাষা, সংস্কৃতির বৈচিত্র্য বিপুল। এটাই ভারতের সৌন্দর্য। ভারত সম্পর্কে শুধু বলাই হয়ে থাকে না, সেখানকার অধিকাংশ রাজনীতিক বিশ্বাসও করেন, এই বৈচিত্র্যর মধ্যে বিদ্যমান একতাই দেশটিকে টিকিয়ে রেখেছে, বিশ্বের দরবারে অন্যরকম মর্যাদা দিয়েছে।
কিন্তু এই যে হিন্দুত্বের এক সরলরৈখিক ধারণা নিয়ে বিজেপি বা তাদের নেতা নরেন্দ্র মোদি এগিয়েছিলেন, তাতে খণ্ডকালীন কিছু সুফল তাঁরা পেয়েছেন সত্যি। কিন্তু ২০২৪-এর লোকসভা নির্বাচন তাঁদের মনে করে দিয়েছে, পথটা ভুল। যে হিন্দু-হিন্দি-হিন্দুস্তানের গরিমা নিয়ে তাঁরা বাজার মাত করার কথা ভেবেছিলেন, সেটা বহুত্ববাদী ভারতীয় সমাজে দীর্ঘ সময়ের জন্য কার্যকর না। সেজন্য মুঘলরা ৩৩১ বছর, ইংরেজরা ১৯০ বছর ভারতে শাসনের পরও এর সমাজ কাঠামোয় হাত দেওয়ার সাহস দেখায়নি। বরং বাস্তবতা মেনে নিয়ে শাসকের ভূমিকা পালন করে গেছে। এ তো গেল দূরের ইতিহাস। এমনকি ১৯৪৭-এ স্বাধীনতার পর হিন্দি-হিন্দুস্তান (যার মধ্যে নরম হিন্দুত্বের লুকায়িত আবেশও ছিল) বয়ান প্রত্যাখান করেছিল ভারতবাসী। হিন্দি চাপিয়ে দেওয়ার প্রতিবাদে দক্ষিণ ভারতের মানুষের সে সময় ফুঁসে ওঠা তারই বড় প্রমাণ। কিন্তু এ থেকে কোনো শিক্ষাই নেননি নরেন্দ্র মোদি ও অমিত শাহরা।
অযোধ্যয় ভেঙে ফেলা বাবরি মসজিদের স্থানে রামমন্দির তৈরির স্বপ্নের বাস্তবায়ন এবার নির্বাচনী বৈতরণি পার করে দেবে এমনটাই ভেবেছিলেন নরেন্দ্র মোদি। কিন্তু তা হয়নি। অযোধ্যা যে এলাকার মধ্যে পড়ে সেই ফৈজাবাদে হেরেছে বিজেপি। জিতেছেন সমাজবাদী পার্টির প্রার্থী। অথচ এই আসনের ৮০ শতাংশ ভোটারই ধর্মীয় পরিচয়ে হিন্দু। এটাই ভারতের বহুত্ববাদী পরিচয়ের বৈশিষ্ট্য। পাশাপাশি উত্তর প্রদেশ রাজ্যেও অখিলেশ-রাহুলের জোট এক ঝটকায় পেছনে ফেলে দিয়েছে মোদির বিজেপিকে। মোদির জন্য একই ধরনের ধাক্কা এসেছে রাজস্থান ও হরিয়ানা থেকে। কিছুটা বিহার থেকেও। তবে সবার ধারণা ছিল বিহারে ইন্ডিয়া জোট আরও ভালো করবে। এত দিন হিন্দিভাষী অঞ্চল সম্পর্কে ‘হিন্দুত্বের চারণভূমি’ হিসেবে যে মিথ প্রচলিত ছিল, তাকে দূরে ঠেলে ওই অঞ্চলের মানুষ প্রমাণ করেছেন, তাঁরাও আর পাঁচজনের মতোই ভারতীয়।
এই নির্বাচন সীমা লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে ভারতীয় ভোটদাতাদের এক সতর্কবার্তা। ১৯৭৫ সালে সব নাগরিক অধিকার হরণ করে জরুরি অবস্থা জারি করেছিলেন কংগ্রেস নেত্রী ও তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী। এর পেছনে ছিল নিজের বজ্রমুষ্টি আরও দৃঢ় করার বাসনা। কিন্তু এর দুই বছর পরই ১৯৭৭-এর নির্বাচনে ইন্দিরাকে হারিয়ে সবক শিখিয়ে দেন ভারতের ভোটাররা। ২০২৪-এ তারই যেন পুনরাবৃত্তি হলো। তবে ইন্দিরা গান্ধীর চেয়ে নরেন্দ্র মোদি কিছুটা ভাগ্যবান। তাঁকে বিদায় নিতে হয়নি। তবে ৩০৩ থেকে টেনে ২৪০-এ নামিয়ে এনেছেন ভোটররা। গত ১০ বছরের চর্চিত একচেটিয়া মোদি এখন জোট এনডিএ-তে বদলে গেছে। বর্তমান ভারত, তথা বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে এটাই‑বা কম কীসের।
এই সুযোগে নরেন্দ্র মোদি পারলেন না অটলবিহারি বাজপেয়ি হতে। ১৯৯৮ থেকে দুটি নির্বাচনের মাধ্যমে ২০০৪ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় ছিল বাজপেয়ি সরকার। ২০০৪ সালে অনুষ্ঠিত লোকসভা নির্বাচনে ফল প্রকাশের পর দেখা যায়, বিজেপি পেয়েছে ১৩৮টি আসন। আর তাদের জোট এনডিএ পায় ১৮৯টি আসন। এ সময় তরুণ বিজেপি নেতা প্রমোদ মহাজন ছুটে যান বাজপেয়ির কাছে। আরও কিছু দলের সমর্থন নিয়ে বাজপেয়ির নেতৃত্বে এনডিএ সরকার গড়ার চেষ্টা করবেন কিনা, এই অনুমতি নিতে। বাজপেয়ি এই তরুণ নেতাকে বলেছিলেন, ‘মানুষ আমাদের বিরোধী দলের আসনে বসার অনুমতি দিয়েছে, সরকারে নয়।’ এরপর আর কথা বাড়াননি প্রমোদ মহাজন। এটাই ছিল একজন তরুণের জন্য একজন প্রাজ্ঞ রাজনীতিকের শিক্ষা। নরেন্দ্র মোদির সামনে এবার নৈতিক পরাজয় স্বীকার করার সুযোগ ছিল। তিনি তা নেননি। বরং শরিকদের আরও কতভাবে প্রলুব্ধ করা যায়, তাতেই ব্যস্ত হয়ে পড়লেন সবাই মিলে।
তবে বিজেপি যাই বলুক ২০২৪-এর লোকসভা নির্বাচন হয়েছে অনেকটাই দ্বিদলীয় জোটের মধ্যে। এনডিএ বনাম ইন্ডিয়া। আর এর ফলে ইন্ডিয়া নামে একটি শক্তিশালী বিরোধী জোট উপহার দিল ভারতীয় ভোটাররা, যা প্রকৃত গণতন্ত্রের জন্য এক আবশ্যিক শর্ত। ২০১৯ সালে শতকরা ৩৭ জনের ভোট পেয়ে মোদির দল ৩০৩টি আসন পেয়েছিল। এবার তাদের বিরুদ্ধে পড়া শতকরা ৬৩টি ভোটের অধিকাংশ এক জায়গায় আনতে পারার জন্য শক্তিশালী বিরোধী পক্ষ সরকারের সাথে সমানে সমানে টক্কর দেওয়ার জোর পাবে। তাদের জন্য বড় আশঙ্কা হলো, ক্ষমতায় বসে বিজেপি নিজেই ২৭২-এর ধাপ পার হতে জোট ভাঙতে পারে, দল ভাঙতে পারে। রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রত্যক্ষ সহায়তায় মোদি-শাহ জুটির গত পাঁচ বছরের কাজে সে আশঙ্কা জোরালোই হয়। সেক্ষেত্রে এটাও একটা লড়াই। গণতন্ত্রে বিরোধীপক্ষ সব ধরনের লড়াই অব্যাহত রাখবে, এটাই দেশের মানুষ প্রত্যাশা করে। আর এবার তো সংখ্যায় ভারী করে দিয়ে দাবিটা আরও জোরদার করেছেন ভোটাররা। এ পর্যন্ত বিরোধী ইন্ডিয়া জোটের সবচেয়ে বড় সিদ্ধান্ত হলো বিরোধী আসনে বসা এবং উপযুক্ত সময়ের জন্য অপেক্ষা করা। গত ১০ বছর ধরে মোদি-শাহ জুটির তুচ্ছ-তাচ্ছিল্ল্যর পাশাপাশি রাষ্ট্রযন্ত্র যেভাবে বিরোধী-দলন অভিযান চালিয়েছে, তাতে এই সিদ্ধান্তের জন্য তারা ধন্যবাদ পেতেই পারে। কারণ, ভোটারের পুরো ম্যান্ডেট না পেয়ে সরকার গঠনের না ঝাঁপানো যথার্থ গণতান্ত্রিক মানসিকতার পরিচায়ক।
এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ১০ বছর পর ভারত আবার জোট সরকারের যুগে ফিরে যেতে চলেছে। অর্থাৎ, ১৯৮৯ সাল থেকে জোট সরকারের যে ধারা তৈরি হয়েছিল, তা ফিরে আসায় বহুত্ববাদী ভারতীয় সমাজের দর্পণ সেখানে পুনঃপ্রতিষ্ঠা হতে চলেছে। ভারতের মতো একটা যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোতে শক্তিশালী কেন্দ্রীয় সরকার খুবই জরুরি, এই মত অনেকের। কংগ্রেস দল হিসেবে আগে এই ধারণায় বিশ্বাস করত। এখন বিজেপির এই বিশ্বাস আরও অনেক গভীর। কিন্তু শক্তিশালী কেন্দ্রীয় সরকারের আমলে দেশের যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো বা ফেডারেল স্ট্রাকচার ক্ষয় হতে হতে লয়ের পথে যেতে বসেছে, গত ১০ বছরে মোদি সরকারের শাসন তারই প্রমাণ।
২০২৪-এর নির্বাচনে ভোটারেরা তাঁদের দায়িত্ব পালন করেছেন। এবং পরবর্তী দায়িত্ব সঁপেছেন বিরোধী ইন্ডিয়া জোটের ওপর। কারণ গত ১০ বছরে তাঁরা নরেন্দ্র মোদি ও তাঁর সরকারকে হাড়ে হাড়ে চিনেছেন। ফলে ভারতের ভবিষ্যৎ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে রাহুল, অখিলেশ, মমতা, উদ্ধব, তেজস্বীরা কী ভূমিকা পালন করেন, সেটাই দেখার।
লেখক: নির্বাহী সম্পাদক, ডিজিটাল মিডিয়া, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন
[এই মতামত লেখকের নিজস্ব। এর সঙ্গে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পাদকীয় নীতিমালার কোনো সম্পর্ক নেই।]
আরও পড়ুন:


এ ক্ষেত্রেও প্রথম মোদি
