টানা তৃতীয়বারের মতো নরেন্দ্র মোদির দল বিজেপির নেতৃত্বাধীন জোট সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও সরকার গঠন করা নিয়ে তৈরি হয়েছে সংকট। বিজেপি যেমন একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি, তেমনি বিরোধী ইন্ডিয়া জোটও পায়নি ম্যাজিক ফিগারের দেখা। ফলে বিজেপিকে জোটের শরিকদের সাথে আলোচনায় বসতে হচ্ছে, তেমনি কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন ইন্ডিয়া জোটও চাইছে আলোচনার মাধ্যমে ২৭২ আসনের সেই ম্যাজিক ফিগারের বন্দোবস্ত করতে। এ বাস্তবতাতেই ভারতের রাজনীতিতে সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত নাম এখন নীতিশ কুমার। কিন্তু কেন তিনি এত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠলেন?
এর কারণ বিজেপি এককভাবে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেনি। ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) ২৪০টি আসন পেলেও দিল্লির মসনদে পৌঁছাতে দরকার ২৭২টি আসন। ফলে, জোটের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে দুবারের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে। অন্যদিকে, কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন ইন্ডিয়া জোট পেয়েছে ২৩৪টি আসন। তারাও তাকিয়ে আছে জোটের দলগুলোর দিকে। নিজেদের জোটে ভেড়াতে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে দুই শিবির। এখানেই দুই জোটের কাছে কিংমেকার হিসেবে দেখা দিয়েছেন তেলেগু দেশম পার্টির (টিডিপি) চন্দ্রবাবু নাইডু ও জনতা দল ইউনাইটেডে বা জেডির (ইউ) নীতিশ কুমার।
তবে, চন্দ্রবাবু নাইড়ু ইতিমধ্যে এনডিএ জোটের সঙ্গেই থাকছেন বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন। তবে, বিহারের নীতিশ কুমার নিয়ে ধোঁয়াশা কাটছে না দুই জোটের। এখন কোটি টাকার প্রশ্ন হয়ে উঠেছে—নীতিশ কুমার কোন দিকে যাবেন?
কেন নীতিশ কুমার এত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছেন
ভারতের লোকসভা নির্বাচনে বিহার থেকে নীতিশ কুমারের জনতা দল ইউনাইটেডে বা জেডির (ইউ) ১২টি আসন পেয়েছে। মাত্র ১২টি আসন নিয়েই কিংমেকার হয়ে উঠেছেন নীতীশ। অন্যদিকে, অন্ধ্রপ্রদেশের চন্দ্রবাবু নাইডুর নেতৃত্বাধীন তেলেগু দেশম পার্টির (টিডিপি) পেয়েছে ১৬টি আসন। যেহেতু তিনি বিজেপির এনডিএ জোট থেকে বের হবেন না। তিনি ভারতের পার্লামেন্টের স্পিকার হওয়ারও স্বপ্ন দেখছেন। চন্দ্রবাবু নাইডু ১৬টি আসন নিয়েও বিজেপি ২৭২ এর ম্যাজিকেল ফিগারে পৌঁছাতে পারছে না। ভারতের লোকসভা নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় বিজেপি জোটের কাছে নীতিশের ওই ১২টি আসন এখন অনেকটা সোনার হরিণ বনে গেছে।
আগেও জোট ভেঙেছেন নীতিশ
গিরগিটির রং বদলের মতোই বারবার জোট বদল করেছেন নীতিশ। ২০১৪ সালে যে এনডিএ জোটে ভর করে ক্ষমতায় আসে মোদির বিজেপি। ২০১৪ সালে সেই এনডিএ জোট থেকে বেরিয়ে একা নির্বাচন করেন নীতিশ। এরপর ২০১৫ সালে লালুপ্রসাদ যাদবের সঙ্গে মিলে জোট করেন। দুই বছর না যেতেই আবার এনডিএ জোটে যুক্ত হন তিনি। এরপর ২০২২ সালে আবারও জোট থেকে বেরিয়ে যান নীতিশ। এরপর যোগ দেন কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন ইন্ডিয়া জোটে। বলা হয়, যাদের নেতৃত্বে ওই ইন্ডিয়া জোটের তৈরি হয়েছিল, তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন নীতীশ। নীতীশ কুমার ভোটের আগে এ বছরের জানুয়ারিতে শরিক বদলে যোগ দিয়েছিলেন এনডিএতে। এবার তিনি কি জোটে থাকবেন—এটি এখন কোটি টাকার প্রশ্ন। নীতিশ কুমার প্রধানমন্ত্রী পদে বিজেপির নরেন্দ্র মোদির নাম ঘোষণার সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করেছিলেন ১৯৯০ সাল থেকে বিহারের মুখ্যমন্ত্রীর পদে থাকা এই অভিজ্ঞ রাজনীতিবীদ। এমনকি, লোকসভা নির্বাচনে নিজ দলের খারাপ পারফরম্যান্সের কারণে মুখ্যমন্ত্রী পদ থেকে পদত্যাগও করার ইতিহাসও রয়েছে নীতিশ কুমারের। ফলে, নীতিশকে নিয়ে একটু ভয়ে থাকতে পারেন মোদি।
জোট থেকে নীতিশের চাওয়া
নীতিশ কুমার ভোটের আগেই শরিক বদলে যোগ দিয়েছিলেন এনডিএতে। আর ফল প্রকাশের পর রহস্যজনক গতিবিধি দেখা গেল নীতিশ কুমারের। ফলাফল প্রকাশ্যে আসার পর ইন্ডিয়া জোটের আরজেডির শীর্ষ নেতা তেজস্বী যাদবের সঙ্গে এক উড়োজাহাজে করে দিল্লি সফর করেন বিহারের মুখ্যমন্ত্রী। এদিক, আজ বিকেল ৪টা থেকে শুরু হওয়া এনডিএ জোটের বৈঠকে এই সময়ের সবচেয়ে আলোচিত নেতা হয়ে ওঠা নীতীশ কুমার এবং চন্দ্রবাবু নাইড়ুর যোগ দেওয়ার কথা। এনডিএ জোটের বৈঠকে যোগ দিতে জোটের শীর্ষ নেতারা দিল্লিতে এসেছেন। ওই বৈঠকেই সিদ্ধান্ত হবে পরবর্তী সরকার গঠন প্রক্রিয়া নিয়ে। এরপরই হয়তো জানা যাবে আসলে কী হতে চলেছে সরকার গঠন নিয়ে। এদিকে, ইন্ডিয়া টুডের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিহারের নীতিশ কুমার ইতিমধ্যে জোটের কাছে নতুন সরকারে তিনটি মন্ত্রণালয় দাবি করেছে।
এদিকে শিবসেনার একাংশের নেতা উদ্ভব ঠাকরে বলেছেন, তেলেগু দেশম পার্টির (টিডিপি) চন্দ্রবাবু নাইডু ও জনতা দল ইউনাইটেডে বা জেডির (ইউ) নীতিশ কুমারের সঙ্গে আলাপ চালিয়ে যাচ্ছে কংগ্রেস। তাদের ইন্ডিয়া জোটে আনতে চাইছে কংগ্রেস। জোটের আলাপে এই ঘটনা বিজেপির জন্য বেশ উদ্বেগজনকই বটে। এই দুই নেতা ছাড়া সরকার গঠন আটকে যেতে পারে মোদির বিজেপির। জোটের মধ্যে থাকলে এ দুজনে মিলে মোদিকে দিতে পারবেন ২৮টি আসন। এর মাধ্যমে সরকার গঠন সহজ হবে বিজেপির। যদি বড় রকমের হেরফের না হয় মোদির টানা তৃতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হওয়া সময়ের ব্যাপার মাত্র।
ইতিমধ্যে ভারতের রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর কাছে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। পদত্যাগপত্র দেওয়ার সময় মোদিকে নতুন সরকার গঠন হওয়ার আগ পর্যন্ত দায়িত্ব পালনের জন্য অনুরোধ করেন প্রেসিডেন্ট মুর্মু। এদিকে, এনডিএ জোট সরকার গঠন করলে আগামী শনিবার ৮ জুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করবেন নরেন্দ্র মোদি।



