বাজেট বরাদ্দের চেয়ে বাস্তবায়নে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সভাপতি ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমেদ। সোমবার ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ), ডর্প ও হেলভেটাস বাংলাদেশ আয়োজিত ‘জলবায়ু, পানি ও স্যানিটেশন বিষয়ক বাজেট প্রতিক্রিয়া’ শীর্ষক আলোচনায় তিনি এ তাগিদ দেন।
এ সময় এই অর্থনীতিবিদ বলেন, ‘প্রতিবছরই নিয়মতান্ত্রিকভাবে বাজেট আসবে, কোথাও বরাদ্দ বাড়বে আবার কোথাও কমবে। কিন্তু বাজেটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বাস্তবায়ন কিভাবে হচ্ছে ও কোথায় হচ্ছে সেটা।’
কাজী খলীকুজ্জমান বলেন, ‘আমাদের উন্নয়ন বাজেটের প্রথম তিন মাসে বাস্তবায়ন হয় ৩ শতাংশ, পরের তিন মাসে হয় ৯ শতাংশ এবং শেষ নয় মাসে সেটা হয়ে যায় ২৭/২৮ শতাংশ। তারপর থাকে তিন মাস, সেই তিন মাসে বাজেটের আকার কিছুটা কমানো হয়। বাজেট বাস্তবায়ন হয়ে যায় ৮০ শতাংশ। এটার ম্যাজিকটা কি আমি জানিনা। ওই সময় বাজেটের টাকা ব্যয় করতে হবে তাই করা হয়, এবং তাড়াহুড়া করে কাজের মান খারাপ হয়ে যায়। আরেকটা দিক হচ্ছে, এই রকম ব্যয় করার হিড়িক যখন পড়ে তখন নয়-ছয় করার সুযোগ হয়, অনেকের পকেট ভারি হয়।’
কাজী খলীকুজ্জমান বলেন, ‘অনেকে বলেন, এই খাতে বরাদ্দ বাড়েনি, ওই খাতে কম হয়েছে। কিন্তু আমি বলি বাজেট বরাদ্দ বাড়িয়ে কি হবে, যদি খরচ না হয়। তারপর খরচ কোথায় হচ্ছে সেটা দেখার বিষয়, কতটা মান সম্পন্ন হচ্ছে সেটাও আরেকটা বিষয়। আমাদের নীতি তৈরি করায় কোন সমস্যা নেই, সার্বিক দিক নির্দেশনায় কোন ঘাটতি নেই। টেকসই, উন্নয়ন ও কল্যান রাষ্ট্র গঠনের কথা বঙ্গবন্ধু যেমন বলেছেন তেমন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও বলেছেন, সমস্যা হয় বাস্তবায়নে।’
অর্থনীতি সমিতির সভাপতি বলেন, ‘এবার যে বাজেটে আমাদের মূল্যস্ফীতির লক্ষ্য ধরা হলো ৬ দশমকি ৫ শতাংশ ও প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৭৫ শতাংশ। এটা কিভাবে হবে? এ বিষয়ে বাজেট বক্তব্যে কিছু বলাও নেই। চলতি বাজেটে মূল্যস্ফীতি ধরা হয়েছে ৬ শতাংশ। এটা সারা বছরে কমেতো নাই বরং বেড়েছে, বাজেট দেওয়ার পর আরো বেড়েছে। এখন ১০ শতাংশের কাছাকাছি। অথচ মূল্যস্ফীতি শ্রীলংকার মূল্যস্ফীতিও আমাদের চেয়ে কম। তাদের যেটুকু বেড়েছিল তারা তা নিয়ন্ত্রণ করেছে।’
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে যে আর্থিক পদক্ষেপগুলো নেওয়া হয়েছিল সেগুলো কাজ করছে না মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘অন্যদেশে এসব পদক্ষেপ কাজ করে, আমাদের দেশে করেনা, কেন? কারন আপনারা যাকে বলেন সিন্ডিকেট, আমি বলি দুষ্ট চক্র। এই দুষ্ট চক্রগুলোতে যারা আছে, তারা সঠিক পদক্ষেপগুলোকেও বাস্তবায়ন করতে দেয়না। আমাদের দেশে দুষ্টচক্র প্রায় সবজায়গাতেই রয়েছে। দুষ্ট চক্র আছে আলুর বাজারে, পানসুপারির বাজারে, ডলারের বাজারে আছে। বিদেশের শ্রমবাজারেও দুষ্ট চক্র রয়েছে, যার প্রমান কয়েকদিন আগেই দেখা গেল। দুষ্টচক্রগুলো যেখানে আছে সেখানে যত ভালো পদক্ষেপই নেওয়া হোক না কেন, যতক্ষণ পর্যন্ত দুষ্টচক্রের লম্বা হাতগুলো হ্রাস করা না হয় ততক্ষণ তা বাস্তবায়ন হবেনা।’
দুর্নীতির ক্ষেত্রে শুণ্য সহনশীল হওয়ার তাগিদ দিয়ে কাজী খলীকুজ্জমান বলেন, ‘এবার দুজন রাঘব বোয়ালকে বিচারের মুখোমুখি করার প্রক্রিয়া চলছে। আমি আশা করবো শেষ পর্যন্ত বিচার হবে।’
কাজী খলীকুজ্জমান বলেন, ‘আইএমএফ বলছে ব্যাংক খাতে সুশাসন বাড়াতে হবে, কর জিডিপি বাড়াতে হবে, বিদ্যুতের দাম ও গ্যাসের দাম বাড়াতে হবে। আইএমএফ’র যে শর্তগুলো মানলে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সুসংগঠিত হতে পারতো, সেগুলো বাস্তবায়ন হলো না। এর মধ্যে কোনটা বাড়ছে যেটা সাধারণ মানুষের উপর পড়ে সেটা। যেমন বিদ্যুতের দাম। কারন সাধারণ মানুষ খুব একটা প্রতিবাদ করতে পারবেনা। ব্যাংক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা হয়নি, কর জিডিপিও বাড়ছেনা। কেন হচ্ছেনা? কারন যারা বাস্তাবায়ন করেন, তারা সঠিকভাবে কাজ করেন না। এক্ষেত্রে দিক নির্দেশনার সমস্যা নেই আমি আগেই বলেছি। যারা বাস্তাবায়ন করেন তারা অনেক সময় দিক নির্দেশনার বাইরে গিয়ে কাজ করেন, নিজের মতো করে করেন। তারা এক চোখা সিদ্ধান্ত নেন, ঘুম থেকে ওঠেই মনে হলো এটা করবো করে ফেলেন। উদাহরন হলো ডলারের মূল্য হঠাৎ ১১০ টাকা থেকে একদিনেই ৭ টাকা বাড়িয়ে ১১৭ টাকা করা। এটা আস্তে আস্তে বাড়াতে পারতে। তারা এটা চিন্তা করলোনা এটাতে মূল্যস্ফীতি কতটা বেড়ে যাবে, আমদানি খরচ বেড়ে যাবে।’
জিডিপিতে মনোযোগ দেওয়ার পরামর্শ দিয়ে এই অর্থনীতিবিদ বলেন, ‘কারন আমরা যে বাজেটই দেইনা কেন, তা বাস্তবায়নে সরকারের সামর্থ বাড়াতে হবে। এজন্য কর জিডিপি বাড়াতে হবে। উন্নত দেশগুলোতে কর জিডিপির হার ৩৪ শতাংশের উপরে। সেখানে আমরা ৮-৯ শতাংশের মধ্যে রয়েছি। শ্রীলংকা ও পাকিস্তানও আমাদের চেয়ে ওপরে রয়েছে। এই পিছিয়ে থাকার কারন হলো, যাদের আছে তারা কর দিচ্ছেনা, আর সাধারন মানুষকেই হয়রানি করা হচ্ছে। যারা দিচ্ছেনা তারা বহাল তবিয়তেই আছে। যারা নজরদারি করেন তাদের যোগসাজসে পার পেয়ে যাচ্ছেন।’



