ঘূর্ণিঝড় রিমাল বয়ে গেছে বাংলাদেশের ওপর দিয়ে। দেশের দক্ষিণাঞ্চলের ওপর দিয়েই মূল ধকল গেছে বলা যায়। বঙ্গপোসাগরে সৃষ্ট এই ঘূর্ণিঝড়ে ঠিক কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হলো–সে হিসাব আসেনি এখনো। এখনো সবাই ব্যস্ত রিমালের তাণ্ডব কাটিয়ে উঠতে। অঝোরে বৃষ্টি ঝরছে। বাতাসের গতিও স্বাভাবিক হয়নি। এ অবস্থায় প্রাণহানিসহ আর্থিক ক্ষয়ক্ষতির হিসাবে বসা যায় না। তবে যতটা খবর পাওয়া গেছে, প্রাণহানি বিবেচনায় এই ঝড় ২০০৭ সালের সিডরের তুলনায় কম ক্ষতি করেছে। কিন্তু অর্থনৈতিক ক্ষতির বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে হলে অপেক্ষা করতে হবে।
আবহাওয়া বিশেষজ্ঞরা যেমনটা বলছেন, ঘূর্ণিঝড় রিমাল বাংলাদেশে এ যাবৎকালে হওয়া ঘূর্ণিঝড়গুলোর মধ্যে সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী। কেউ কেউ বলছেন, এটি বাংলাদেশের স্থলভাগ অতিক্রমে এমনকি ৪৫-৪৮ ঘণ্টাও লাগাতে পারে। তেমনটি হলে এটি আইলার রেকর্ড (৩৪ ঘণ্টা) ছাড়িয়ে যাবে।
বাংলাদেশে হওয়া ঘূর্ণিঝড়গুলোর খোঁজখবর যারা রাখেন, তাঁরা জানেন ১৯৯১-এর ঘূর্ণিঝড়ের পর সিডরের প্রভাবে তাৎক্ষণিক ক্ষতি হয়েছিল সবচেয়ে বেশি। আর আইলায় হয়েছিল দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি। এবার ঘূর্ণিঝড় রিমালের কারণে এই দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতিই বেশি হবে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
রিমালের কারণে শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত ১৩ জনের প্রাণহানি হয়েছে। আহতের সংখ্যা সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট কিছু জানা যায়নি। শেষ পর্যন্ত হতাহতের সংখ্যা যেখানেই দাঁড়াক, তা সিডরের সরকারি ভাষ্যের ২৪৭১ এবং সে সময়কার গণমাধ্যমের ভাষ্যের ৩৫০০ সংখ্যা থেকে কমই হবে। এটা ভীষণ স্বস্তির কথা। এই স্বস্তির মূলে আছে–প্রযুক্তিগত উন্নতি ও প্রশাসনিক সক্ষমতা।
রিমালের সবচেয়ে বড় প্রভাব সম্ভবত পড়তে যাচ্ছে কৃষিতে। এই সূত্রে তাৎক্ষণিক ও দীর্ঘমেয়াদি কিছু করণীয়ও সামনে চলে আসে। মনে রাখা জরুরি যে, নিত্যপণ্যের বাজার এমনিতেই ঊর্ধ্বমুখী। এ অবস্থায় কৃষিতে আরেকটি ধাক্কা অনেক বেশি অনুভূত হতে পারে
এর সাথে সাধারণ মানুষের সচেতনতা আরও বাড়লে প্রাণহানি উল্লেখযোগ্য হারে কমানো সম্ভব। এর একটা বার্তাও কিন্তু রিমাল দিয়ে গেল। রোববার (২৬ মে) রাত আটটার দিকে ঘূর্ণিঝড়টির কেন্দ্র মোংলার দক্ষিণ-পশ্চিম দিক দিয়ে পশ্চিমবঙ্গ উপকূল ও বাংলাদেশের খেপুপাড়া উপকূল অতিক্রম শুরু করে। ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাট, পিরোজপুর, পটুয়াখালী, বরগুনা, ভোলাসহ উপকূলের বিভিন্ন জেলায় ঝোড়ো হাওয়া বয়ে যায়। এ সময় বাতাসের গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ৯০ থেকে ১২০ কিলোমিটার। এর প্রভাবে উপকূলের বিভিন্ন এলাকায় জলোচ্ছ্বাসের সৃষ্টি হয়। সিডরের সময়ও বেশ উঁচু জলোচ্ছ্বাস হয়েছিল। সেই জলোচ্ছ্বাসের ধাক্কাতেই প্রাণহানি হয়েছে। রিমালে প্রথম মৃত্যুর কারণ হিসেবে ছিল উপড়ে যাওয়া গাছের আঘাত। অর্থাৎ, যিনি মারা গেছেন, তিনি নিরাপদ স্থানে ছিলেন না। অথচ বেশ আগে থেকেই ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলের মানুষদের আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়ার অনুরোধ, আদেশ, নির্দেশ ইত্যাদি দেওয়া হচ্ছিল। কিন্তু সাড়া পাওয়া যাচ্ছিল না।
ব-দ্বীপ অঞ্চল হওয়ায় ঝড়-জলে এক রকম অভ্যস্ত এ দেশের মানুষ। প্রতি বছর ঘুরে ঘুরে কালবৈশেখীর আসা তো একটা নিত্য ঘটনা। এ অঞ্চলের মানুষদের প্রায় সবার মধ্যেই ঝড়-বাদল নিয়ে এক ধরনের বিশেষজ্ঞ মত দেওয়ার প্রবণতা দেখা যায়। এটি একদিকে যেমন সাধারণ মানুষের সচেতনতার ইঙ্গিতবাহী, তেমনি এটি জরুরি পরিস্থিতিতে বিশেষজ্ঞ মত গ্রহণ না করার প্রবণতারও মূলে রয়েছে। ফলে অনেক সময়ই জরুরি পরিস্থিতিতে প্রশাসনিক নির্দেশনা না মানার একটা সাধারণ প্রবণতা দেখা যায়। পাশাপাশি ঘর রেখে আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়ায় একটা অনিরাপত্তা বোধও কাজ করে। সেটা চুরি, ডাকাতি, সম্পদহানির শঙ্কা থেকে।
এর সাথে যুক্ত হয়েছে দেশের আবহাওয়া পূর্বাভাস ব্যবস্থা নিয়ে মানুষের মধ্যে থাকা দীর্ঘদিনের অবিশ্বাস। সাধারণ্যে একটা কথা প্রচলিত যে, আবহাওয়ার পূর্বাভাসে রোদ বললে, বৃষ্টি হবে এবং বৃষ্টির আভাস দিলে দিন থাকবে খটখটে। যদিও পরিস্থিতি অনেকটাই বদলেছে। সচেতন যে কেউ এটা স্বীকার করতে বাধ্য হবেন যে, গত কয়েক বছরে বাংলাদেশের আবহাওয়া পূর্বাভাস ব্যবস্থা আগের চেয়ে অনেক ভালো হয়েছে। কিন্তু প্রচলিত ধারণা ভাঙেনি। এরই প্রভাব পড়ে প্রাকৃতিক দুর্যোগের মতো গুরুতর পরিস্থিতিতে।
পাশাপাশি রিমালকে কেন্দ্র করে এই অভিযোগও তুলছেন আবহাওয়া বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ যে, সোমবার সকাল সকাল আবহাওয়া অধিদপ্তর যখন জানাল, রিমাল স্থল গভীর নিম্নচাপে পরিণত হয়েছে, তখনো আসলে রিমাল প্রবল ঘূর্ণিঝড়ই ছিল। এ ক্ষেত্রে তাঁরা ভারতীয় আবহাওয়া অধিদপ্তরের কলকাতায় স্থাপিত রাডারের তথ্য হাজির করে বলছেন, আমাদের আবহাওয়া অধিদপ্তর যখন বলছে, রিমাল দুর্বল হয়েছে, তারও বেশ কয়েক ঘন্টা পর দুপুর ৩টার সময় খুলনা বিভাগের সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাট, ও বরিশাল বিভাগের পিরোজপুর, বরগুনা জেলার একাধিক উপজেলার ওপর দিয়ে ঘণ্টায় ৯০ থেকে ১০০ কিলোমিটার গতিবেগের বাতাস প্রবাহিত হচ্ছে। শুধু তাই নয়, ভারতের আবহাওয়া অধিদপ্তর সোমবার ১২টার দিকে জানিয়েছিল, রিমাল সোমবার সন্ধ্যায় স্থল গভীর নিম্নচাপে পরিণত হবে। ফলে বিশেষজ্ঞদের অভিযোগ–বাংলাদেশের আবহাওয়া পূর্বাভাস মানুষকে বিভ্রান্ত করেছে।
স্বস্তির বিষয় হলো–বড় ক্ষতি হয়নি। বিশেষত সিডরের চিহ্ন বুকে নিয়ে টিকে থাকা খেপুপাড়ার মানুষ যে সতর্কবার্তা শুনেছে, তা স্পষ্ট। এটি প্রশংসনীয়।
আবহাওয়া বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, রিমাল প্রচলিত অন্য ঘূর্ণিঝড়গুলোর চেয়ে আলাদা। এর গতিবেগ কম থাকায় পূর্ণশক্তি বা তার কাছাকাছি শক্তি নিয়ে এটি স্থলভাগে বেশি সময় থাকছে। উচ্চগতির ঘূর্ণিঝড় চকিতে লণ্ডভণ্ড করে দিয়ে যায়। কিন্তু কম সময় থাকার কারণে, দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি কম হয়। রিমাল এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। তাঁরা বলছেন, বঙ্গপোসাগরে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড়গুলো ইদানীং এমন আচরণই করছে। কারণ, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বঙ্গোপসাগরের অতি উষ্ণ অবস্থা শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি করছে। এমন ঝড়ে বাতাসের গতি কমে এলেও এর সঙ্গে প্রচুর মেঘ আসছে, যা ঘূর্ণিঝড়ের পর প্রবল বৃষ্টি ঝরাচ্ছে। ফলে বন্যার আশঙ্কা থাকছে। বাংলাদেশে ঘুর্ণিঝড়ের সময় বিশেষত দক্ষিণের জেলাগুলোর জন্য বাঁধ খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি দুশ্চিন্তার কারণ। এই বাঁধের মাধ্যমেই লোনা পানি থেকে আবাদি জমি রক্ষা পায়, যা সরাসরি কৃষির সাথে সম্পর্কিত। ঝড় যত দীর্ঘ সময় ধরে থাকবে, স্থলভাগের অভ্যন্তরে থাকা বাঁধগুলো তত ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কায় থাকবে। রিমালের ক্ষেত্রে সে বিষয়টিই হয়েছে। অর্থাৎ, রিমালের প্রাথমিক ধাক্কা অবকাঠামোতে হলেও সম্ভবত এর সবচেয়ে গভীর ছাপ রেখে যাচ্ছে কৃষিতেই।
সিডরের সময়কার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে দেখা গেছে, সিডরে অত্যধিক প্রাণহানির কেন্দ্রে ছিল সাধারণ মানুষের মধ্যে আশ্রয়কেন্দ্রে না যাওয়ার প্রবণতা। এর পর আরও বেশ কয়েকটি ঘূর্ণিঝড়ের কবলে পড়েছে বাংলাদেশ। আর সর্বশেষ তো এল রিমাল। প্রতিবারের মতো এবারও দুর্যোগপ্রবণ এলাকাগুলোর মানুষকে আশ্রয়কেন্দ্রে নিতে বেগ পোহাতে হয়েছে প্রশাসনকে। বারবার বিবৃতি দিতে হয়েছে। মহাবিপদ সংকেত দেওয়া সত্ত্বেও অনেকেই আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়াকে এড়িয়ে যেতে চেয়েছে। এখনো পাহাড়ে বারবার নির্দেশনা দেওয়া সত্ত্বেও মানুষ আশ্রয় কেন্দ্রে যাচ্ছে ন। প্রশাসন শেষ পর্যন্ত বলছে, প্রয়োজনের জোর করে তাদের আশ্রয় কেন্দ্রে নেওয়া হবে। পাহাড়েও এই না যাওয়ার পেছনে সম্ভবত অনিরাপত্তাবোধই সবচেয়ে বেশি সক্রিয়।
সে যাই হোক, স্বস্তির বিষয় হলো–বড় ক্ষতি হয়নি। বিশেষত সিডরের চিহ্ন বুকে নিয়ে টিকে থাকা খেপুপাড়ার মানুষ যে সতর্কবার্তা শুনেছে, তা স্পষ্ট। এটি প্রশংসনীয়। একইসঙ্গে রিমাল যেহেতু দেশের সবচেয়ে বেশি এলাকায় সরাসরি প্রভাব রেখে যাওয়া ঘূর্ণিঝড় হিসেবে এরই মধ্যে একটি তকমা নিজের করে নিয়েছে, সেহেতু উপকূল অঞ্চলের বাইরে অন্য অঞ্চলের মানুষের এ সম্পর্কিত সচেতনতা বড় প্রশ্নচিহ্ন রেখে গেছে।
আগেই বলা হয়েছে, রিমালের সবচেয়ে বড় প্রভাব সম্ভবত পড়তে যাচ্ছে কৃষিতে। এই সূত্রে তাৎক্ষণিক ও দীর্ঘমেয়াদি কিছু করণীয়ও সামনে চলে আসে। মনে রাখা জরুরি যে, নিত্যপণ্যের বাজার এমনিতেই ঊর্ধ্বমুখী। এ অবস্থায় কৃষিতে আরেকটি ধাক্কা অনেক বেশি অনুভূত হতে পারে। একই সঙ্গে অর্থনৈতিক সংকটের বিষয়টিও মাথায় রাখা জরুরি। সব মিলিয়ে ঝড়-পরবর্তী উদ্ধার কার্যক্রম এবং সাধারণ মানুষকে স্বাভাবিক জীবনে ফেরানোর ক্ষেত্রে যথাযথ পরিকল্পনা খুবই জরুরি।
সিডরের মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা এ বিষয়ে সতর্ক হতে বলে। কারণ দেখা যায়, দুর্যোগ-পরবর্তী নানা সহায়তা গুটিকয় মানুষের হাতে চলে যায়। এ নিয়ে উপদ্রুত অঞ্চলের এক শ্রেণির মানুষ এমনকি বাণিজ্যেও নেমে পড়ে। ত্রাণের টিন, চাল থেকে শুরু করে ওষুধ পর্যন্ত লাইন ধরে নিয়ে বাজারে বিক্রি করে অনেকে। ফলে সরকারি-বেসরকারি সহায়তা সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্বপ্রাপ্তদের সত্যিকারের দায়িত্বশীল হতে হবে। না হলে উপদ্রুত মানুষ সহায়-সম্বলহীন থেকে যাবে, আর এক শ্রেণির মানুষ দুর্যোগকে সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করে বসবে। সেটা যেন না হয় সেদিকে আশা করি প্রশাসনসহ দায়িত্বশীল সংস্থাগুলো নজর রাখবে।
লেখক: উপবার্তা সম্পাদক, ডিজিটাল বিভাগ, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন
[এই মতামত লেখকের নিজস্ব। এর সঙ্গে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পাদকীয় নীতিমালার কোনো সম্পর্ক নেই।]



