ঘূর্ণিঝড় রিমাল থেকে বাঁচতে বাগেরহাটের আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়া মানুষের জন্য পর্যাপ্ত খাবারের ব্যবস্থা করা হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। স্বেচ্ছাসেবীদের দেওয়া চিড়া ও বিস্কুট খেয়ে কোনোরকমে দিন কাটিয়েছেন ঘরবাড়ি ছেড়ে যাওয়া অসহায় মানুষ। ঘূর্ণিঝড়ের আগে কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় ভেঙেছে নড়বড়ে বাঁধ, প্লাবিত হয়েছে বাগেরহাটের বিস্তীর্ণ অঞ্চল।
রামপাল সরকারি কলেজের আশ্রয়কেন্দ্রে দুই নাতি ও মেয়েকে নিয়ে রোববার আশ্রয় নেন তানজিলা বেগম। সোমবার পর্যন্তও সেখানে যায়নি কোনো খাবার। স্বেচ্ছাসেবীদের দেওয়া শুকনো চিড়া খেয়ে ক্ষুধা মেটান তারা।
তানজিলা বেগম জানান, রিমালের আঘাতে বাড়ি-ঘর ভেঙে গেছে। অসুস্থ হয়ে পড়েছে বড় নাতি। আশ্রয়কেন্দ্রে অসহায় হয়ে দিন পার করছেন তারা। একই অভিযোগ আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়া অন্যদেরও।
তবে প্রশাসনের দাবি, বৈরি আবহাওয়ার কারণে ত্রাণ দেওয়া যাচ্ছে না।
রামপাল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রহিমা সুলতানা বুশরা বলেন, কোনো কোনো আশ্রয়কেন্দ্রে খিচুড়ি ও শুকনো খাবার দিতে বলা হয়েছে। কিন্তু বৈরি আবহাওয়ার কারণে ত্রাণ দেওয়া যাচ্ছে না। ইউপি চেয়ারম্যানদের এ বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া আছে। এ ছাড়া ডিসির কাছে ত্রাণের জন্য নগদ অর্থ বরাদ্দের কথা বলা হয়েছে।
ঘুষিয়াখালি চ্যানেলের দুর্বল বাঁধ উপচে পানি ঢুকে পড়ায় পানিবন্দী রামপালের ৩০ হাজার মানুষ। এ বিষয়ে বাগেরহাট পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আবু রায়হান মোহাম্মদ আল বিরুনী বলেন, রামপাল ও মোংলায় ৯৮ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ প্রয়োজন। ঘূর্ণিঝড়ে সমগ্র বাগেরহাটে ক্ষতির মুখে পড়েছে ৫ লক্ষাধিক মানুষ। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১ হাজার ৪৮০ কিলোমিটার বাঁধ।
এদিকে প্রবল ঘূর্ণিঝড় রিমালের আঘাতে উপকূলের জেলাগুলোর বিদ্যুৎ নেটওয়ার্ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিদ্যুৎহীন আড়াই কোটি মানুষ। ক্ষতি এড়াতে অনেক এলাকার বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ রাখা হয়েছে। বিদ্যুৎ না থাকায় সারা দেশে প্রায় ২৫ হাজার মোবাইল ফোন টাওয়ার বন্ধ রয়েছে। এতে মোবাইল নেটওয়ার্ক বিভ্রাট অনেকটা দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে।
গেল রোববার মধ্যরাত থেকে লক্ষ্মীপুর জেলার কোথাও নেই বিদ্যুৎ। বিদ্যুৎ কখন স্বাভাবিক হবে তা বলতে পারছে না বিদ্যুৎ অফিস। বিদ্যুৎ না থাকায় ব্যাহত হচ্ছে মোবাইল নেটওয়ার্কও। লক্ষ্মীপুর-রামগতি সড়কে রাস্তার ওপর গাছ উপড়ে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। গাছ সরিয়ে সোমবার দুপুর নাগাদ যোগাযোগ স্বাভাবিক হয়।
বাগেরহাটে রোববার বিকেল থেকে প্রায় ৫ লাখ গ্রাহক বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। শরীয়তপুরে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ থাকায় প্রায় ৩ লাখ ৬৫ হাজার গ্রাহক বিচ্ছিন্ন রয়েছে।
স্থানীয়রা বলছেন, রোববার রাত ১১টার দিকে বিদ্যুৎ চলে যায়। এরপর থেকে আর বিদ্যুতের দেখা মেলেনি।
গতকাল সোমবার ঘূর্ণিঝড় রিমাল স্থল গভীর নিম্নচাপ আকারে দুর্বল হয়ে বাংলাদেশ পার হলেও উপকূলে রেখে গেছে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির চিহ্ন। আর দুর্বল হওয়ার পরও বহু সময় ধরে চলে এর তাণ্ডব। গতিবেগের ওঠা–নামাও ছিল বড় ব্যবধানে। গত কয়েক দশকে বাংলাদেশে ভয়াবহ ঘর্ণিঝড়গুলোর মধ্যে অন্যতম সিডর, আইলা। কিন্তু সেসব ঘূর্ণিঝড় যতটা সময় ধরে উপকূলে তাণ্ডব চালায়, তারচেয়ে বেশি সময় ধরে চলে প্রবল ঘূর্ণিঝড় রিমালের তাণ্ডব।
রোববার রাত ৮টার দিকে উপকূলে আছড়ে পড়ার পর, ১৩ ঘণ্টা ধরে ব্যাপক শক্তি নিয়ে চলে ধ্বংসযজ্ঞ। ফুঁসে ওঠা নদীর পানিতে প্লাবিত হয় জনপদ। সোমবার সকালে দুর্বল হওয়ার পরও এর প্রভাব উপকূলীয় এলাকায় ছিল লক্ষ্যণীয়। বাঁধে ভাঙন-জলোচ্ছ্বাসের কারণে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বিভিন্ন জেলায়।
ঘূর্ণিঝড় রিমালের আচরণ ছিল অন্য ঝড়ের তুলনায় সম্পূর্ণ ভিন্ন। এটি দুর্বল হয়ে সোমবার ভোর ৬টায় প্রবল ঘূর্ণিঝড় থেকে ঘূর্ণিঝড়ে এবং পরে স্থল গভীর নিম্নচাপে রূপ নেয়। কিন্তু তারপরও দিনভর ঝোড়ো হাওয়া আর বৃষ্টি চলে দেশজুড়েই।



